Sylhet Express : সিলেট এক্সপ্রেস - সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক
   26 Sep 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 27 November 2011 সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  (পঠিত : 1205) 

টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধে প্রয়োজন রাজনীতি নয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন

     

মাহমুদুর রহমান দিলওয়ার :--বিখ্যাত চিন্তাবিদ ম্যাথসিনি বলেছেন,Who dies if country lives, Who lives if country dies অর্থাৎ দেশ মরলে বাঁচে কে, দেশ বাঁচলে মারে কে? দেশের চলমান রাজনীতিতে প্রতিহিংসা কিংবা অনৈক্য চরম আকার ধারণ করেছে। আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট ক্রমশ বাড়ছে।
উদারতা ও সহিষ্ণুতা নেই বললেই চলে। পারস্পরিক দ্বিধা-দ্ব›দ্ব, উক্তি-কুটক্তির মহড়া চলছে। জনমনে প্রতিনিয়ত উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। রাজনীতিতে আদর্শিক মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে দেশ গড়ায় ঐক্যমত অনিবার্য। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা, শান্তি-শৃংখলা সুনিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দ্ব›দ্ব কাম্য নয়। দেশ ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে কোন বাঁধা রাজনৈতিক নীতি হতে পারে না। রাজনীতিবিদদের কন্ঠেই শুনা যায়, ব্যক্তি থেকে দল বড়, দল থেকে দেশ বড়। সুতরাং দেশের সার্বিক কল্যাণে ব্যক্তি ও দলের চেয়ে দেশকেই সবার উপরে স্থান দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের উল্টো নীতি অনুসরনের কোন সুযোগ অনুসন্ধান অপ্রত্যাশিত।
টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধে দেশ জেগে উঠছে। সর্বমহলে এ নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা আর পর্যালোচনা চলছে। কিন্তু প্রধান রাজনৈতিক শিবিরে দ্ব›দ্ব কমছে না। গত মঙ্গলবার ঢাকার ধামরাইয়ে এক বিশাল ছাত্র গণজমায়েতে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধে সরকারকে নিশ্চুপ না থেকে প্রতিবাদ জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা সামনে থেকে আপনাদের সহযোগিতা করবো।’ এমন বক্তব্যে সাধারণ মানুষ অনেকটা আশান্বিত হয়েছিলো। জনগণ ধারনা করেছিলো হয়তো সরকার ও বিরোধীদলের মাঝে এ ইস্যুতে ঐক্য লক্ষ্য করা যাবে। কিন্তু তা কখনই সম্ভবপর হবে বলে হয়না! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেছেন, আমরা ভারতের গোলামী করিনা। বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুন্ন করে কেউ একক ভাবে কিছু করতে পারবে না। আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। এ দেশের স্বার্থ কিভাবে রক্ষা করতে হবে তা আওয়ামীলীগ জানে।’ টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের আগে যৌথ জরিপের দাবি জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে চিঠি লিখেছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। এ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠে আওয়ামীলীগের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এখন পত্র লিখছেন। কিন্তু যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন টিপাইমুখের সমস্যা শুরু হয়, তখন প্রতিবাদ করেন নি কেন!’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণে সমর্থন দিয়েছে এটা মিথ্যাচার। প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, দয়াকরে আপনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড দেখুন। সেখানে আছে, খালেদা জিয়া ঐ সময়ে ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন।’ সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে কথা বলেছেন সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর ২৬ এপ্রিল’৯২, ২৭ মার্চ’ ৯৫ ও ১১ আগষ্ট’০৩ ভারত সরকারকে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মান থেকে বিরত থাকার আহবান জানিয়ে চিঠি দেন।’
টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাঁধ নির্মিত হলে বাংলাদেশের কোন ক্ষতি হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে ভারত। স¤প্রতি দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ‘টিপাইমুখের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় জলবিদ্যুৎ সংস্থা (এন এইচ পিসি), রাষ্ট্রায়ত্ত জলবিদ্যুৎ সংস্থা (এসজেভিএন) ও রাজ্য সরকারের মধ্যে ২২ অক্টোবর যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের ক্ষতি না হওয়ার আশ্বাসকে গোঁজামিল হিসেবে মনে করেন সমাজ ও প্রাণবৈচিত্র্য বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার।
তিনি বলেছেন, বাঁধ নির্মাণ করা হবে না, এমন কথা বলা হয়নি। তারা ‘বাংলাদেশের ক্ষতি হবে না’ বলেছে। ড. আকবর আলি খান মনে করেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও যৌথ সিদ্ধান্তের আগে এ ধরনের একটি বাঁধ নির্মাণের চুক্তির কোনো মানে হয়না। এটা বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারত যেটি করছে, এটি সঠিক কোন মনোভাব নয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) পরিচালিত একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হলে সামনে সিলেটের ২৬ শতাংশ এবং মৌলভীবাজার জেলার ১১ শতাংশ জলাভূমি শুকিয়ে যাবে। এ ছাড়া বারদাল, দামনির হাওর পুরোপুরি এবং হাকালুকি ও কাওয়ারদীঘি হাওরের ২৫ শতাংশ এলাকা শুকিয়ে যাবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটের অমলসিদে যেখানে বরাক নদ সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, সেখানে পানি প্রবাহ বর্ষাকালে ১ দশমিক ৮ মিটার কমে যাবে। কুশিয়ারা নদীতে গড়ে কমে যাবে ১ মিটার। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে অমলসিদে পানি প্রবাহ ১ দশমিক ৪৮ মিটার বাড়বে। শুকনো মৌসুমে জানুয়ারি মাসে এ পানি প্রবাহ সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৯ মিটার বাড়তে পারে। এতে করে সুরমা-কুশিয়ারার পানি তাত্তি¡ক ব্যবস্থা ধ্বংস হবে এবং এর সাথে ধ্বংস হবে সুরমা-কুশিয়ারা-মেঘনা নদী অববাহিকার পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য। এ ছাড়া বাঁধের ফলে বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা নদীর তলদেশ কোথাও কোথাও ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পলি জমে ভরাট হয়ে যাবে। বন্ধ হয়ে যাবে অনেক শাখা নদীর মুখ।
বাঁধের নিম্ন অববাহিকার ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত নদী ভাঙ্গন মারাত্মক আকারে বৃদ্ধি পাবে। (২৪ নভেম্বর, নয়াদিগন্ত) টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্পের উদ্যোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে একটি নির্মোহ সমীক্ষারও দাবি জানিয়েছেন। তারা সরকারকে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এর সমাধান করার পাশাপাশি আন্তজাতিক বিভিন্ন সংগঠন, আদালত এবং জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপন করে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মান বন্ধে ভারত সরকারকে বাধ্য করার ব্যাপারেও মতামত দিয়েছেন। বাপার সভাপতি অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমদ বলেছেন, ‘টিপাইমুখ বাঁধ এই অঞ্চলের মানবিক ও পরিবেশ বিপর্যয় তৈরি করবে।
সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস সত্তেও এ উদ্যোগে সারাদেশের মানুষ ক্ষুদ্ধ ও ব্যথিত।’ জাতিসংঘের পানি বিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস আই খান বলেন, ‘বরাকে আড়াআড়ি বাঁধ দেয়া হলে সেখানে বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে তিন ভাগের এক ভাগ হয়ে যাবে। এতে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ২-৩ ফুট বেড়ে যাবে। এমনিতেই ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা অববাহিকার তুলনায় মেঘনা অববাহিকা অনেক নিচু। বরাকে বাঁধের কারণে সমুদ্রের ইঞ্চি লেভেল ৩-৪ মিটার বেড়ে গেলে ও পরে ৫ মিটার পর্যন্ত লোনাপানি প্রবেশ করবে। অর্থাৎ সিলেট শহর পর্যন্ত সমুদ্রের লোনাপানি প্রবেশ করবে। এতে মেঘনার তীরবর্তী ১৬ জেলার হাওর, বাওড় বিল, জলাশয়, ফসলি জমি, ঘরবাড়ী সব কিছুতে লোনাপানি প্রবেশ করবে। তিনি মনে করেন, এ বাঁধের ফলে বনাঞ্চল ধ্বংস হবে, গাছপালা মরে যাবে, জীবজন্তু মরে যাবে, পানযোগ্য পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দেবে।’
সাবেক পানিসম্পদ সচিব আসাফ উদ্দৌলাহ বলেন, ‘ফারাক্কা থেকে পানি না পাওয়ায় আজ গোয়ালন্দে ফেরি পার হতে পানি পাওয়া যায় না। যুগ যুগ ধরে যে নদীতে পানি ছিল, বড় লঞ্চ ছিল, ষ্টিমার চলত, সেই নদীতে আজ কেন ফেরি পার হতে পারছেনা? ফেরি চরে লেগে যাচ্ছে। সরকারের একজনও বলছেনা যে, ফারাক্কার কারণে এটা হয়েছে। কেন এই হানমন্যতা!’ টিপাইমুখ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক নদী আইন বিশেষজ্ঞ ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘ভারতের মন্ত্রীদের মতো করে বাংলাদেশ সরকারের নীতি নির্ধারকরাও বলছেন এ প্রকল্পে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না! উজানের দেশে টিপাইমুখের মতো একটি দৈত্যাকৃতির জলাধার নির্মাণ ভাটির দেশের কোনো ক্ষতি করবে না এটি স্বয়ং ভাটির দেশটি বলছে এই নজির সারা বিশ্বের আছে বলে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের ভূমিকা শুধু নতজানুমূলক নয়, একই সঙ্গে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ বিশিষ্ট ভূ-বিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ আব্দুর রব বলেছেন, ‘টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ে সরকার সদিচ্ছা দেখাচ্ছে। সরকারের উচিৎ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান করা। এ ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে সবাই সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। (২৬ নভেম্বর, আমার দেশ) টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধে আপামর জনতা জাতীয় ঐক্য চায়। আসুন, দোষারোপ আর প্রতিহিংসা নয়; দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ ভাবে টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধে সোচ্চার হই।


Free Online Accounts Software