15 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 23 September 2014 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 5198) 

দর্শনের মহামানব রুশো

দর্শনের মহামানব রুশো
     

সেলিম আউয়াল : একজন মহামানব মানবজীবনের দু:খ দুর্দশার কারন খোঁজ করে স্থির নিশ্চিত হয়েছিলেন- মানুষ প্রকৃতি থেকে যতদূর সরে গেছে, তার জীবনে দুঃখ দুর্দশা ততই বেড়ে গেছে। কাজেই তাকে আবার সুস্থ হতে হলে প্রকৃতির মায়া মাখানো বুকেই ফিরে যেতে হবে। তাঁর এ সিদ্ধান্তের ফলেই তিনি ঘোষনা করেছিলেন ‘প্রকৃতির কোলে ফিরে যাও’ (Back to nature) শীর্ষক নীতি। আর এই মহামানব হচ্ছেন সুবিখ্যাত ফরাসী মনীষী জাঁ জ্যাক রুশো (Jean Jaeques Rouseau)
অষ্টাদশ শতকের ফরাসী মুক্ত বুদ্ধি পথিকৃৎ অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন জাঁ জ্যাক রুশো । দার্শনিক, সমাজতত্ত¡বিদ, সৌন্দর্যতত্ত¡বিদ এবং শিক্ষনের ক্ষেত্রে তাত্তি¡ক হিসেবে জ্যাক রুশো খ্যাতি অর্জন করেন। ফরাসী বিপ্লবের দার্শনিক সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আমোঘ বাণীর উদগাতা এবং গনতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক জ্যাক রুশো চিন্তার জগতে একটা চির ্উজ্জ্বল নাম।
জ্যাক রুশো জন্মগ্রহন করেন সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ১৭৭২ খৃস্টাব্দে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। জ্যাক রুশোর জন্মের পর তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন এজন দরিদ্র দক্ষ ঘড়ি মেরামতকারী। তবে তিনি সুস্থ মনোভাব সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন না. তাঁর চরিত্রে ছিল না কোন স্থিরতা। তাইতো সন্তান লালন পালনের দায়িত্ব তিনি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে দারুন ব্যর্থ হয়েছিলেন। জ্যাক রুশো যখন দশ বছরের বালক তখন তাঁর বাবা তাকে তাঁর ভাইয়ের কাছে রেখে জেনেভা থেকে পালিয়ে যান। বাল্যকালে জ্যাক রুশো অনেক দু:খ কষ্ট সহ্য করেন। নিজের জীবন ধারনের জন্য শৈশবকাল থেকেই বিচিত্র জীবিকা অবলম্বন করেন। তিনি কিছুদিন এক দয়ামায়াহীন নকশা অঙ্কনকারী খোদাইকারীর অধীনে শিক্ষানবীশ হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তাকে অনেক তিরস্কার লাঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছিলো। জ্যাক রুশো ষোল বছর বয়সে জেনেভা ছেড়ে জীবিকার খোঁজে বের হন এবং এক এক করে চৌদ্দটি বছর ভবঘুরে জীবন কাটান। এই সুদীর্ঘ ভবঘুরে জীবনে তিনি অনেক উপকারী ও মহৎলোকের সংস্পর্শে আসেন। কিন্তু কোথাও স্থায়ীভাবে বাস করার ইচ্ছে তার ছিল না। তাঁর দেমাগ, অহংকার ও অশোভন আচরণ অনেক ক্ষেত্রে তার বন্ধুদের ব্যথিত করেছে। ১৭৪২ খৃস্টাব্দে জ্যাক রুশো প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আসেন। ১৭৪৩ খৃস্টাব্দে তিনি ভেনিসের ফরাসী রাষ্ট্রদূতের সেক্রেটারী নিযুক্ত হন। কিন্তু সেখানে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে ঝগড়াঝাটি করে সেটা ছেড়ে দিয়ে প্যারিসে ফিরে আসেন। এখানে শান্তশিষ্টভাবে বসবাসের চেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হন।
১৭৫০খ্রিষ্টাব্দে দিজন (Dijon) একাডেমী কতৃক আয়োজিত এক রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়ে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। একাডেমী ঘোষিত প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল: বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শিল্প কি মানুষের জীবনকে উন্নত করেছে, না তাকে অধিকতর কলুষময় করেছে ?’ জ্যাক রুশো এই প্রতিযোগিতার জন্য একটি প্রবন্ধ পেশ করেন। এ রচনাতেই রাষ্ট্র এবং সমাজ দর্শনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। প্রচলিত চিন্তাধারার বিরোধীতা করে জ্যাক রুশো তার এই প্রবন্ধেই দেখাতে চেষ্টা করেন যে, তথাকথিত সভ্যতার পূর্ব যুগেই মানুষ অধিকতর স্বাভাবিক এবং যথার্থ মানুষ ছিল। জ্যাক রুশোর মতে ইতিহাসের সভ্যতা যত অগ্রসর হয়েছে মানুষের জীবন তত কৃত্রিম এবং জটিল হয়ে দাড়িয়েছে। সভ্যতার পূর্বেই মানুষ সহজ ও স্বাভাবিক ছিল।
১৭৫৪ খ্রীস্টাব্দে লেখা ডিস-কোর্সেস অন ইকুয়ালিটি (Discourses on equality) প্রবন্ধে তিনি তাঁর এই ভাবধারা আরো সুস্পষ্ট করে তোলেন। যে, ‘Man is naturally good and only institutions is he made bad’- মানুষ স্বাভাবিকরূপে সৎ কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের এই সহজাত সততা নষ্ট করেছে। ১৭৬২ খৃস্টাব্দে তাঁর আরো দুটো বিখ্যাত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়. তার একটি ‘এমিলি (Emile)এটা হচ্ছে শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ আর অপরটি হচ্ছে সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট
(Social contract) বা সামাজিক চুক্তি।
রুশোর মতে, একমাত্র চুক্তির উপর ভিত্তিশীল একটি সমাজই এর সদস্যদের জন্য নৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার বিধান করতে পারে। এই ব্যবস্থায় কতৃত্বের সাথে আনুগত্যের সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব হয়। তিনি বলেন যে, কোন মানুষ অন্য আর একজন মানুষের উপর স্বাভাবিক কতৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে না। তিনি আরো বলেন, বল প্রয়োগের মাধ্যমে আইনগত কতৃত্বের উৎপত্তি হয় না। সুতরাং আইনগত কতৃত্বের মুল হচ্ছে ব্যক্তির সম্মতি এবং এই সম্মতির মূল তাই সামাজিক চুক্তি। সামাজিক চুক্তির মাধ্যমেই মানুষ রাজনৈতিক সমাজ গঠনে সক্ষম হয়।
এমিলি প্রকাশিত হবার পর রুশোর বিপ্লবী চিন্তায় ফরাসী সরকার এবং যাজক শ্রেণী রুষ্ট হয়ে উঠে। প্যারিসের আর্চ বিশপ এবং ফরাসী পার্লামেন্টও একে নিন্দে করে। জেনেভার সরকার ও বইটিকে ‘অসৎগ্রন্থ’ বলে চিহ্নিত করে। এরপর থেকে তিনি ভবঘুরের মতো জীবন কাটান। রাষ্ট্রীয় নিগ্রহের আশংকায় একসময় ফ্রান্স পরিত্যাগ করেন। জার্মানিতে গিয়ে তিনি মহামতি ফ্রেডারিকের বন্ধুত্ব লাভ করেন, কিন্তু তিনটে বছরপর স্থানীয় পর্যায়ে সন্দেহের উদ্রেক হলে তিনি জার্মানী ত্যাগ করেন। ১৭৬২ খৃস্টাব্দে ইংল্যান্ডে গেলে বৃটিশ রাজা তৃতীয় জর্জ (GeargeIII) তাঁর জন্য একটা পেনসনের ব্যবস্থা করেন। এখানে তিনি হিউমওবার্কের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেন। বার্ক কিন্তু রুশোর অহংকারকে অসহনীয় মনে করেন এবং তাদের বন্ধুত্ব ক্ষণস্থায়ী হয়। হিউম কিন্তু রুশোকে ভালোবাসেন। এখানেও রুশোর সবকিছুকে সন্দেহের চোখে দেখেন এবং ইংল্যান্ড ছেড়ে আবার প্যারিসে চলে আসেন। দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটিয়ে অবশেষে রুশো ১৭৭৮ খৃস্টব্দে আত্মহত্যা করে জীবনের সমাপ্তি টানেন।
আধুনিক বিশ্ব সৃষ্টিতে রুশোর প্রভাব ছিল যুগান্তকারী। তিনি ফরাসী বিপ্লবের শীর্ষস্থানীয় অগ্রদূত ছিলেন। জ্যাঁ জ্যাক রুশো সম্পর্কে বলতে গিয়ে ল্যানসন (Lanson) বলেন, তাঁকে আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি প্রবেশ পথে দেখতে পাওয়া যায়।’

নিম্নোক্ত বইগুলোর সাহায্য লিখিত:
ক. দর্শনের নানা প্রসঙ্গ-দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ
খ. দর্শন কোষ-সরদার ফজলুল করিম
গ. রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কথা-ড: এমাজউদ্দিন আহমদ
রচনা:- ৩/৭/৮৩ প্রকাশ; রেবাসি,



Free Online Accounts Software