24 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 18 August 2013 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 13367) 

আমার সোনার কলম

আমার সোনার কলম
     

সেলিম আউয়াল;--আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকলাম কলমটির দিকে, সোনার কলম। মেরুন কালার প্লাস্টিকের বডি। মুখটা স্টিল জাতীয়, তার উপর ঘন সোনার প্রলেপ। নিবটা সোনার। কলমের ঠিক মধ্যিখানে একটি সোনার রিং। পেছনের দিকে আরেকটি সোনর রিং। আব্বা আর কাজী চাচা (আমার বন্ধু কাজী মাসুদের আব্বা) ভালো করে কলমের গায়ের লেখাগুলো পড়লেন--PARKAR-69. 2.5ct gold, Made in England.

সোনার কলমটি আমার চাচা আবদুল আহাদ ইংল্যান্ড থেকে পাঠিয়েছেন। আমার জন্মের কাছাকাছি সময়ে তিনি ইংল্যান্ডে যান। কলম যখন পাঠান আমি তখন ক্লাস ফোর অথবা ফাইভে পড়ছি। পড়াশোনায় ভালো করছি। তাই এগিয়ে যাবার সোনার চাবি আমার জন্যে। এ চাবি দিয়ে শিক্ষার একেকটি দরোজা খুলবো। কলমটির সাথে একটি জ্যামিতি বক্স। জ্যামিতি বক্সাটও অসাধারণ। বক্সের ভেতরে মখমলের বিছানায় কম্পাস, চাঁদা, ত্রিভুজ এইসব। এতো দামী জ্যামিতি বক্স আমার সহপাঠী কারো তো ছিলোনা, আমার উপরের ক্লাসের কাউকেও ব্যবহার করতে দেখিনি। সেই জ্যামিতি বক্সটি আমার আর ব্যবহার করা হয়নি। ইন্সটুযুম্যান্টগুলো এতো জটিল যে, এগুলো ব্যবহার করতে পারিনি। সবাই-ই চীনের গ্রেট ওয়াল ব্রান্ডের জ্যামিতি ব্যবহার করতো। আমিও করেছি। ধীরে ধীরে জ্যামিতি বক্সের একটা দুটো যন্ত্র হারাতে হারাতে একদিন বক্সটাও হারিয়ে ফেলি। পরে জেনেছি এইসব জ্যামিতি মুলত প্রকৌশলীরা ব্যবহার করেন।
সোনার কলমটি হাতে আমার পরপরই ব্যবহার শুরু করে দিয়েছি। তখন আম্বরখানা দরগাহ গেইট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম। তখন আমাদের স্কুলে একটি লোক আসতো সাইকেল চেপে। তার কাজ ছিলো কলমে নাম লেখা। দারুন সুন্দর হাতের লেখা। বাংলার চেয়ে ইংরেজী লেখা ছিলো খুব সুন্দর। প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে লেখতো। তার কাছে ছিলো ছোট্ট হাতুড়ী, বাটাল আর চক। সাইকেলের হ্যান্ডেলের উপর বসানো একটি ছোট্ট একটি স্ট্যান্ড। সেই স্ট্যান্ডে কলম আটকিয়ে বাটালে হাতুড়ি টুকে টুকে কলমের গায়ে নাম লেখতো। সম্ভবত প্রতিটি অক্ষরের জন্যে অথবা শব্দের জন্যে তাকে দিতে হতো আট আনা, সেটা চুয়াত্তর-পঁচাত্তর সালের কথা।
আমারও শখ চাপলো সোনার কলমে নাম লেখাবো। কয়েকদিনের টিফিনের পয়সা জমিয়ে অপেক্ষায় লোকটি কখন আসে। পয়সাগুলো পকেটে পড়ে পড়ে কাঁদে, লোকটাতো আসেনা। হঠাৎ একদিন পেয়ে যাই। টিফিন আওয়ারে আমরা মাঠে ছুটাছুটি করছি, তখুনি দেখি ক্রিং ক্রিং বেল বাজিয়ে লোকটি এসেছে। আমার পকেটে সেই টাকাগুলো আছে। দৌড়ে ছুটে যাই লোকটার কাছে, আমার কলমে নাম লেখে দেন। লোকটা কলমটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে। আমার মুখের দিকে চেয়ে বলে, বাচ্চা মানুষ, তুমি এতো দামী কলমে লেখো। গর্বে বুক ভরে যায়, মনে হয় আমি সবার চেয়ে উঁচুতে। লোকটি আমার কলমটা তার সাইকেলের হ্যান্ডেলের উপর বসানো স্ট্যান্ডে আটকায়। তারপর কলমের মেরুন কালার বডিতে ছোট্ট বাটাল লাগিয়ে ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে আলতো করে ঠুকে ঠুকে অনেকগুলো বিন্দু খুদাই করে। তারপর খুদাই করা বিন্দুগুলো ভরে দিলো এক ধরনের সোনালী পাউডারে। ঝলমলে সোনালী হরফে লেখা আমার নাম ফুটে উঠলো কলমের গায়ে। কলমের মুখটি সোনার, হরফগুলো সোনার।

সোনার কলম পাবার কালে আমরা টিপ কলম দিয়ে লেখতাম। টিপ দিলে কলমের সিস বেরোয়। আজকের বলপয়েন্টের দূর্বল সংস্করণ। স্যাররা বলপেন দিয়ে আমাদের লেখালেখি পছন্দ করতেন না। বলপেনে লেখলে হাতের লেখা নষ্ট হয়ে যায়। এজন্যে পরীক্ষার খাতায় ঝর্ণা কলম দিয়ে লেখতাম। একটু মোটা ধরনের কলম। নিবের অংশ খুলে দোয়াত থেকে কালি ঢালতাম কলমে। কালি ঢালার জন্যে ছিলো প্লাষ্টিকের ড্রপার। টিপ দিয়ে ড্রপারের সব বাতাস বের করে দিতাম। টিপ দেয়া অবস্থায়ই ড্রপারটি কালির দোয়াতে ডুবিয়ে ড্রপারের গা থেকে হাত সরিয়ে নিতাম। তখন দোয়াত থেকে কালি উঠে আসতো ড্রপারের ভেতর। ড্রপারটি দোয়াত থেকে আলতো করে তুলে কলমের গায়ের কালি রাখার স্থানটিতে নিয়ে ড্রপারে টিপ দিতাম। সবটুকু কালি চলে যেতো কলমের শরীরের কালিদানিতে। তখন খুব জনপ্রিয় ছিলো সুলেখা কালি। ছোট ছোট কাঁচের বোতলে কালি থাকতো, বোতলগুলোকে বলতাম দোয়াত। এক দোয়াত কালির দাম বোধ হয় ছিলো তিন চার টাকা। তখন বাজারে আরো একটি ট্যাবলেট পাওয়া যেতো, ছোট ছোট প্যাকেটে থাকতো। সম্ভবত দাম আট আনা এক টাকা। দোয়াতের কালি শেষ হয়ে গেলে তাতে পানি ঢুকিয়ে সেই ট্যাবলেট ছেড়ে দিতাম। ধীরে ধীরে ট্যাবলেটটি গুলে মিশে যেতো পানির সাথে। এইভাবে হয়ে যেতো এক দোয়াত কালি। হাতে বানানো এ ধরনের কালিতে একটি অসুবিধে ছিলো, তাতে এক ধরনের খাদ জমে যেতো। সেইসব খাদ আটকে যেতো কলমের নিবে। তখন হালকা গরম পানিতে কলম ধুয়ে সেইসব খাদ পরিষ্কার করতে হতো। তবে খাদ জমুক আর নাই জমুক পরীক্ষার আগে আমরা কলম পরিষ্কার করে নিতাম। পরীক্ষার খাতায় লেখতে লেখতে কখন কালি শেষ হয়ে যায়, সতর্কতার জন্যে পরীক্ষার হলে কালির দোয়াতও নিয়ে যেতাম।

আমরা যখন ফাইভ সিক্সে পড়ি পঁচাত্তর ছিয়াত্তরের দিকে তখন আরেকটি কলম ছিলো খুব জনপ্রিয়। চীনের তৈরী ইযুথ কলম। এইসব কলমের বডির সাথেই ড্রপার লাগানো থাকতো। কলমের নিব দোয়াতে ডুবিয়ে ড্রপার টিপে কালি ভরা হতো। ড্রপারগুলো ছিলো স্বচ্ছ- ভেতরে কালির পরিমান দেখা যেতো। আরেকটি কলম ছিলো খুব জনপ্রিয়, উইংসাং এটিও চীনের, দাম ছিলো ইয়থের চেয়ে বেশী। এরচেয়ে দামী ছিলো পাইলট কলম। এটা সাধারণত কলেজের ছাত্র শিক্ষক বা সরকারী কর্মকর্তারা ব্যবহার করতেন। স্কুলের ছাত্ররা ইয়ুথ আর উইংসাং ব্যবহার করতো।

এমনি এমনি আমি সুলেখা কালি ব্যবহার করলেও সোনার কলমে ভরতাম পেলিকান কালি। এটি ছিলো তখন সবচে দামী কালি। জার্মানীতে তৈরী হতো। এক দোয়াত পেলিকান কালির দাম দিয়ে কয়েক দোয়াত সুলেখা অথবা ইয়থ কালি কেনা যেতো।

সাদা কাগজে পেলিকান কালি দিয়ে যখন লেখতাম মনে হতো হরফগুলো সাদা কাগজ থেকে উঠে আসছে। ঝলমলে হরফগুলো যেন অন্ধকারে নুপুর পরা জোনাকী কন্যা। ক্লাস ফাইভ থেকেই ছড়া কবিতা লেখি। একটা লম্বা এক্সারসাইজ খাতায় গল্প লেখি, কবিতা লেখি, ছড়া লেখি, সেই খাতাটি এখনো আছে। আমার হাতের লেখা সুন্দর না হলেও সোনার কলম দিয়ে ধুসর পান্ডুলিপিতে লেখা হরফগুলো এখনো ঝলমলে। কলমের নিবের আগাটা কখন ভেংগে যায় মনে নেই। হাত থেকে পড়েই। মহা মুশকিল, শহরের সবগুলো ঘড়ির দোকানে দেখালাম কারো কাছে এই কলমের নিব নেই। সবার কাছে ইয়থ, উইংসাং আর বড়ো জোর পাইলট কলমের নিব। তখন ঘড়ির দোকানে কলম মেরামত করা হতো। সিটি কর্পোরেশন ছিল পৌরসভা। পৌরসভার সামনের রাস্তায় কলম মেরামতকারীরা বসতো। একটি পোর্টেবল ডিসপ্লে বোর্ডে নানা ধরনের কলম সাজানো থাকতো। কলমগুলো বিক্রি করা হতো। আর থাকতো নানান ধরনের নিব, কলমের পার্টস আর কলম সারাবার প্লাস, চিমটে ধরনের ছোটখাটো হাতিয়ার।
আমার মনে আছে জিন্দাবাজারের গার্লস হাইস্কুলের উল্টো দিকে পারভীন মাইক হাউসের পাশের একটি দোকানে অথবা বারান্দায় একটি লোক কলম ঠিক করতো। হাঁটতে হাঁটতে তার কাছে গেলাম, ওই এক কথা পারকারের নিব নেই। লোকটা বললো পুরনো কলম তারা কেনে। আমার সাথে ছিলো এক ফ্রেন্ড সাঈদ। বললো এটা কতো দিয়ে কিনবেন। লোকটা ঝটপট জবাব দেয় বিশ টাকা। আমি চমকে উঠি। ভেবেছিলাম লোকটা পাঁচ দশ টাকা বলবে। বিশ টাকা মানে একটা ইয়থ কলম কেনে আরো কয়েকটি টাকা হাতে থাকবে। সাঈদ বললো বেচে দে। আমি তখন ক্লাস সিক্স অথবা সেভেনে পড়ি। বাসার পাশের দোকান থেকে ছোট্ট একটি জিনিস কেনার অভ্যেসও নেই। সব কেনাকাটাই আব্বা করেন। এজন্যে আব্বাকে না বলে এইভাবে কলমটি বেচে দেবার সাহস আমার নেই। সেদিন আর কলমটি বেচা হয়নি। বাসায় এসে ড্রয়ারে রেখে দিই। কিছুদিন পর চাচা লন্ডন থেকে আসলে কলমের দুর্দশার কথা জানাতেই চাচা বললেন অসুবিধে নেই। লন্ডনে যে দোকান থেকে কিনেছেন সেই দোকান থেকে নিব বদলানো যাবে।

তারপর চাচা লন্ডন নিয়ে গেলেন। বছর খানেক পর চাচা যখন দেশে আসলেন নিয়ে আসলেন কলমকে সুস্থ করে।
সোনার কলমটিতে পেলিকান কালি ভরি। ফুলস্কেপ সাইজের খাতায় গল্প কবিতা লেখা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অটোগ্রাফ সংগ্রহ শুরু করি সেই কলম দিয়ে। আমার কলম দিয়ে বোধ হয় প্রথম লিখেছিলেন প্রেসিডেন্ট সাত্তার, তখন তিনি প্রেসিডেন্ট। সিরিয়াল মনে নেই। এরপর আর যারা লিখেছেন জেনারেল ওসমানী, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, খন্দকার মুশতাক, কমরেড মনি সিংহ, কামরুল হাসান, মেজর জলিল, নাসের ভুলু আরো অনেকে। তারা আমার অটোগ্রাফ খাতায় লিখে দিয়েছেন।

আমার বন্ধু মকবুল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ে। প্রায় প্রতিদিন চিঠি লেখে। ধবধবে অফসেট কাগজে পেলিকান কালির হরফে। সেও ফাউন্টেন পেন ব্যবহার করতো। তার কলমটি বোধহয় পাইলট কলম ছিলো। বললো ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখার মজাই আলাদা। কাগজের বুকে লেখলে খস খস শব্দ হয়। আল্লাহতায়ালা কলমের খস খস শব্দের কসম কেটেছেন। আমাকে আর পায় কে। আমি লেখি আর কান পেতে কলমের খস খস শব্দ শুনি। পেলিকান কালিও বাজারে নকল হয়ে যায়। কখন নকল পেলিকান কালি দিয়ে লেখতে গিয়ে আমার সোনার কলমের দম বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম প্রথম লেখা আটকে যেতো। তারপর একদম বন্ধ। বার বার ধুয়েও কাজ হয়না। তখন নিজেও অনেক বয়েসী হয়ে উঠেছি। বলপেন দিয়ে দ্রুত লেখার কাজ সারি। সোনার কলমটা রেখে দিই স্টিলের আলমারীতে তুলে।
তারপর এলো মধ্যপ্রাচ্যের রমরমা দিন। আমার চাচা মৌলভী আবদুর রহিম থাকেন দুবাই। খানসাহেব মসজিদ নামের এক মসজিদের ইমাম সাহেব। সব সময় প্রচেষ্ঠা থাকে আমার মন ভরা। সেই সাতাত্তর আটাত্তরের দিকে আমার জন্যে দুবাই থেকে নিয়ে এলেন চমৎকার একটি কলম। স্টিলের বডি, কলমের গায়ে ছোট্ট একটি ইলেকট্রনিক্স ঘড়ি। অবাক হয়ে যাই। তারপর কতো ধরনের কলম হাতে এসেছে। কলম নাড়লে দেখা যায় ভেতরের পানিতে মাছ ছুটোছুটি করছে। কোন কলম দিয়ে লেখলে সুবাস বের হয়। আমার প্রবাসী আত্মীয় স্বজন সবাই আমার জন্যে নিয়ে আসে চমৎকার সব কলম। আমার লেখতে ইচ্ছে হয়না। মনে হয় কালি ফুরিয়ে যাবে। আমি ইকোনো দিয়ে লেখার কাজ সেরে নিই। ওয়ারড্রোবে জমে থাকে সেইসব কলম। তারপর একদিন আবিষ্কার করি যতেœ জমানো সেইসব কলমের কালি শুকিয়ে গেছে।

এসএসসি পরীক্ষা দেবার পরই আব্বাকে আম্মাকে টাইপ রাইটিং শেখতে ভর্তি করান। আম্বরখানা মসজিদের বিপরীতের দোতলা একটি বিল্ডিং এ ছিলো জামান কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউট নামের প্রতিষ্ঠানটি। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুনো পর্যন্ত যতোটুকু সময় পাওয়া যায়- এই সময়টুকুতে আমি বাংলা ইংরেজী টাইপ মোটামুটি শিখে ফেলি। তারপর সরকারী প্রতিষ্ঠান যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে আবার টাইপিং-এ ভর্তি হয়ে মোটামুটি এক্সপার্ট হয়ে যাই। এরপর একটি বাংলা টাইপ রাইটার পেয়ে যাই, ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারি। টাইপ রাইটারের কী বোর্ডে হাত রেখে চোখ বুজে টাইপ করতে পারি। তখন লেখালেখির স্টাইলটি একটু পাল্টে নিই। আজেবাজে একটি কাগজে সাধারণ একটি কলম দিয়ে গল্প কবিতা কিছু একটা লেখি। তারপর কাটাকুটি করতে করতে মোটামুটি একটা চুড়ান্তরূপে নিয়ে আসি। সেই টাইপ রাইটারে টাইপ করি লেখাটি। টাইপ রাইটারে লেখতে আরেকটা সুবিধে ছিলো দু তিন সীট কাগজের সাথে কার্বন পেপার সেট করে একটি লেখা একবার টাইপ করে কযেক কপি লেখা হয়ে যেতো। এইসব কারনে
লেখালেখিতে মোটামোটি একটা কলম হলে চলে। তবুও ভালো কিছু লেখতে গেলেই সাধ হয়, খসখস শব্দ তুলে শাদা কাগজে লেখার। আমার তৃতীয় ভাইটি তখন জেদ্দাহ থাকে। তাকে বললাম আমার জন্যে একটি পারকার কলম পাঠা। সেখানেও ফাউন্টেন কলমের আকাল, সবাই বল পয়েন্টে লেখে। সে অনেক খুঁজে-টুজে এক হালি পারকার কলম পাঠিয়ে দিলো। দুটো বলপেন পার দুটো ফাউন্টেন পেন। বলপেন দিয়া লেখবো বলে আর লেখা হয়নি, একদিন দেখি কালি শুকিয়ে গেছে। ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখি, কিন্তু আশ মেটে না। সেই কালির অভাব, স্মথ লেখা হয়না। হরফগুলো খুব বটলা বটলা মনে হয়। তারপর টাইপ রাইটারের যুগ চলে গেলো, এখন কম্পিউটারের যুগ। আমিও কম্পিউটারের বাংলা ফন্টের কী বোর্ড ‘বিজয় কী বোর্ডে’র বুকে চোখ না রেখেই টাইপ করতে পারি। কিন্তু লেখালেখিটা শুরু করি কলমে । প্রথমে সাধারণ কলম কাগজে লেখাটি তৈরী করি। তারপর যে কোন সহকর্মীকে দিয়ে কম্পিউটারের টাইপ করিয়ে একটি প্রিন্ট বের করি। সেই প্রিন্ট কপিতে কারেকশন করে আবার প্রিন্ট বের করি। পেনড্রাইভে লেখা নিয়ে সিডি করি, ইন্টারনেট ছেড়ে দিই। তাই এখন কলম বলতে বলপেন এবং টাইপ রাইটার।

বলপেন দিয়ে এখন লেখি। নতুন বলপেন দিয়ে লেখতে প্রথমে হরফগুলো হালকা হয়ে যায়। কিছু লেখার পর যখন হরফ গুলো পুরনো দিনের পারকার কলমের লেখার মতো কালো কুচকুচে নিগ্রো হয় তখন ভালো লাগে। লেখার জন্যে কালো কালির বিকল্প কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। অনেক সময় নীল কালির কলম আসে, মেয়েকে দিই। বাবা দিয়েছে তাই নেয়- আমার মতো ওরও প্রিয় কালো কালি।
দু’হাজার তের সাল, আমার মেয়ে নাদিয়া নুসরাত মাশিয়াত এইচ এসসিতে ‘এ’ প্লাস পেলো। বড়ো আনন্দের সংবাদ। আমি নিজেও খারাপ ছাত্র ছিলাম না। ক্লাস ফাইভে অংকে একশ’ পাবার রেকর্ড আছে। কিন্তু চুড়ান্ত পরীক্ষায় যা ধরে রাখতে পারিনি, কিন্তু আমার মেয়ে তা পেরেছে। আম্মা, তিন ভাই, তিন ভাইয়ের বউ, আর পাঁচটি বাচ্চা নিয়ে আমরা সবাই একটি বাসায় একত্রে থাকি। গ্রন্থের ভাষায় একান্নবর্তী পরিবার। মেয়ের সাফল্যে আমাদের মধ্যে আনন্দের ঢেউ, বিয়ে হয়ে যাওয়া বোনগুলোরও মুখ উজ্জ্বল। মেয়েটি এসএসসি-তেও এ প্লাস পেয়েছিলো। এমন আনন্দ দিলো যে মেয়েটি তাকে কি দিয়ে আনন্দ দিই। পরীক্ষার ফল বেরোবার...দিন কেটে যায়,কি দেবো ভেবে পাই না। কষ্ট করে দশ হাজার টাকার একটি বান্ডিল তুলে দিতে পারি। সোনার দাম বেড়ে গেছে, তবুও ছোট্ট দুটো কানের দুল বানিয়ে দিতে পারি। কিন্তু এগুলো যেন আমার মেয়ের যোগ্য পুরষ্কার হয় না। আমার একটি অফিসিয়াল ব্যাগ আছে, চামড়ার তৈরী। আমার ভাই দিদার সৌদী আরব থেকে এনেছিলো। কলম, ছোট খাটো দু’একটি ফাইল, স্টেপলার মেশিন মানে অফিসের টুকটাক জিনিস রেখে ছোট্ট একটি অফিস। আজকলকার লেপটপও খুব ভালোভাবে রাখা যাবে। সেই ব্যাগে আমার অনেকগুলো অফিসিয়াল ইন্সন্ট্রুমেন্টর সাথে সেই সোনার কলমটিও রেখে দিই। মেয়েকে পুরস্কার দেবার কথা ভাবতেই সেই সোনার কলমটির কথা মনে পড়ে। অফিসিয়াল ব্যাগ খুজে দেখি কলমটি আছে। কিন্তু কলম দিয়ে লেখা হয় না। আবার কালি ভরে চেষ্টা করলে হয়তো লেখা যাবে। অনেকদিন বাসায় কালির দোয়াত আনিনি। বাজারেও বোধ হয় সব দোকানে কালির দোয়াত মেলে না। তাহলে কি এই কলমের কোন মূল্য নেই। এই তো আমার সৃজনবেলার প্রথম প্রভাতের সবচে’ দামী হাতিয়ার, অনেক স্বপ্ন নিয়ে এনেছিলেন আমার চাচা। আজ এটা দিয়ে লেখা হয় না, একদিন তো আমার অনেক গল্প কবিতা লেখা হয়েছে এই কলম দিয়ে। এই কলম দিয়ে লেখেছেন দেশের অনেক শীর্ষ ব্যক্তি। আমি জানি আমার মেয়ে যে যুগে প্রবেশ করেছে সেই সময়ে সুলেখা কালির বড়ি দিয়ে কালি বানিয়ে ড্রপার দিয়ে কলমের পেটে ভরার জামানা নেই। বলপেন দিয়ে টুকটাক লেখে সব কাজ সারতে হয় কম্পিউটারে।
বিশিষ্টজনদের সম্মান জানাতে তুলে দেয়া হয় নগরীর সোনার চাবি। তালা নেই তবু চাবি অর্থাৎ নগরীর দ্বার তোমার জন্যে অবারিত। তেমনি সিদ্ধান্ত নিলাম কলমটি আমি তুলে দিই আমার সোনার মেয়ের হাতে, কলমটি যখনই সে স্পর্শ করবে তখন যেন সে ভাবে তার একজন দাদা জ্ঞানী উত্তরসূরীর কামনায় তার বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সোনার কলম। একইভাবে তার বাবা তার মেয়ের জ্ঞানার্জন প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হবার স্বপ্ন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চির জাগরুক রাখার জন্যে তুলে দিলেন সোনার কলম।
১৭ আগস্ট ২০১৩. সন্ধ্যার পর। আমার আম্মা, আমরা তিনভাই, তিনভাইয়ের বউ (সব ছোট ভাই ও তার বউ ইংল্যান্ডে), দুবোন এক ভগ্নিপতি (অপর ভগ্নিপতি হবিগঞ্জ জেলার পারকুল চা বাগানে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত থাকায় অনুপস্থিত) এবং আমাদের বাচ্চাদের সবাইকে নিয়ে ড্রইং রুমে। সবাইকে কয়েকদিন আগে থেকেই শুক্রবার সন্ধ্যায় বাসার আসতে বলেছিলাম কিন্তু কেন আসবে বলিনি। সেই সন্ধ্যায় যখন সবাইকে নিয়ে ড্রইংরুমে বসেছি তখনও বসার উপলক্ষটা কেউ জানে না । প্রথমে পারকার কলমের ইতিহাস, আমার পরকার কলমের ইতিহাসটি বলি। আমার ভাইবোনেরা কলমের কথা ভুলে গিয়েছিলো। এইভাবে বলতে বলতে একসময় আমাদের কৃতী উত্তরসূরী মাশিয়াতের হাতে কলমটি তুলে দেবার কথা বলি। সবাই খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারপর আম্মার নেতৃত্বে পরিবারের সকল সদস্যকে সাথে নিয়ে কলমটি তুলে দিই মাশিয়াতের হাতে। এর আগের রাতে গুগলে সার্চ দিয়েছিলাম। মজার ব্যাপার এ বছর অর্থ্যাৎ ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে পারকার কোম্পানীর বয়স হয়েছে ১২৫ বছর। ১৮৮৮ সালে পারকার কোম্পানী যাত্রা শুরু করে। তখন কোম্পানীটির স্বত্তাধিকারী ছিলেন জর্জ শেফর্ড পারকার এবং আমার কলমটির বয়স ৩৮/৩৯ বছর।
১৫.০৮.২০১৩ ও ১৭.০৮.২০১৩





আরোও ছবি

আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম
আমার সোনার কলম

Free Online Accounts Software