17 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 9 March 2013 এক্সপ্রেস লাইফ স্টাইল  (পঠিত : 10309) 

প্রবল ইচ্ছা শক্তি: জীবনের সফলতা

প্রবল ইচ্ছা শক্তি: জীবনের সফলতা
     

আফতাব চৌধুরী;--
জীবনকে সফল ও সুন্দর করে তোলার শক্তি ও সামর্থ প্রত্যেক মানুষের হাতেই রয়েছে। ইচ্ছাশক্তির সঠিক প্রয়োগে তা সম্ভব হয়ে ওঠে। মানুষের এ ইচ্ছাশক্তিকে মানব বিজ্ঞানী চার্লস লেকমন ABC বলে অভিহিত করেছেন। ABC হল- ‘That old ABC-Ability, Breaks and Courage’-এর উপরই জীবনের সফলতা নির্ভর করে। এ সফলতার মধ্যে জীবনের আনন্দ নিহিত থাকে। মানুষ স্বতন্ত্র জীব। তাদের একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রয়েছে। সেজন্য প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব সব কর্মই নিজেকে করতে হয়। আলবেয়ার ক্যামুর এক বিখ্যাত গদ্য রচনার অন্যতম কল্প-চরিত্র সিসিফাসের জীবনতত্ত্ব ও দর্শন এখন অনেকের কাছেই তাদের জীবনের অন্বিষ্ঠ। প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে নিজস্ব এক ধ্যান-ধারণা, আস্থা বা বিশ্বাস আছে। ইচ্ছাশক্তি এ সমস্ত ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি মানুষই চায় তার জীবন সফল ও সুন্দর হয়ে উঠুক। মনের সব আশা পূর্ণ হোক। এ চরম আকাঙ্খা পূরণের জন্য কর্মোদ্যম ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন। জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এ সত্য উপলব্ধি করেও অনেকের জীবন সফল হতে পারে না, কারণ তাদের প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তির অভাব বিদ্যমান। জীবন-চক্রে দুর্বল মানসিকতা বা দুর্বল ইচ্ছাশক্তি মানুষের সফলতার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে সিগমন্ড ফয়েড বলেছেন, ‘To have one’s ideas exclusively focused an one central interest’. লাচিত বরফুকন এ প্রবল ইচ্ছাশক্তির সাহায্যেই একরাতের মধ্যে গড় বেঁধে শত্রুপক্ষকে প্রতিরোধ করেছিলেন। ক্যামুর ভাষায় বলা যায় ‘We angels can’t do anything, against man’s freedom of choice’। সুতরাং নিজের একাগ্রতা এবং একনিষ্ঠতাই একজন মানুষকে সফলতার চরম শিখরে পৌঁছে দেয়। সোফেকুলের ভাষায় বলা যায়- ‘The reward of toil’। মানুষকে কঠিন অস্তিত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে জীবন নির্বাহ করতে হয়। যাদের ইচ্ছাশক্তি প্রবল তাদের মনে হতাশা জায়গা করে নিতে পারে না। তারা নিজেদের গতিপথ নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। নিজের ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য তারা প্রতিটি কাজ পরিকল্পিতভাবে করে। নিজের ইচ্ছায় কোনও কাজ করলে সে কাজের উপর আতমবিশ্বাস জন্মে। তাই সংকল্প গ্রহণ করে কোনও কাজ করলে তার সফলতা অবশ্যম্ভাবী। সফলতা নির্ভর করে মনের ভাবনার উপর। ইচ্ছাশক্তি যত বাড়বে ততই জ্ঞানের পরিসরও বাড়তে থাকবে। এটিকে সমাজ বিজ্ঞানী ফিলিপ গুয়েদালার ভাষায় `A chemical compound of man with moment’ বলা যেতে পারে। জীবনকে ধাতুর উপাদান সংযোগের মতো কমানো বা বাড়ানো যায়। সুউচ্চ হিমালয়ের দুর্গম পথ অতিক্রম করে এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহণ করার সময় ট্রেনজিং নোরগে বা এডমান্ড হিলারীর সাফল্যের পেছনে অবশ্যই ছিল প্রবল ইচ্ছাশক্তি। একটা সময়ে জীবনে সফলতা আসে। তাই জীবনের প্রত্যেকটি মুহুর্তকে কীভাবে উপভোগ করা যাবে সেটা ব্যক্তি জীবনের ইচ্ছা বা আকাঙ্খার উপর নির্ভর করে। বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক হেমিংওয়ে তাঁর বিশ্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস `The old man and the sea’- র প্রধান চরিত্র সান্তিয়াগোর জীবনে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন মনের প্রবল ইচ্ছাশক্তির। বৃদ্ধ শান্তিযাগো জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও মনের ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্কুচিত করেননি। গভীর সমুদ্রের বুকে মাছ ধরার দৃঢ়তার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে মনের আগ্রহ, সাহস ও ধৈর্য। বার্ধক্য তাঁর শরীরকে স্পর্শ করলেও মনকে করতে পারেনি। মাছ ধরার জন্য বড়শির টোপ পানিতে ফেলে তিনি মনের একান্ত ইচ্ছাশক্তির জোরে আহবান করেছেন- `Fish eat them, Fish eat them, please eat them…- এটা মাছ ধরার দৃঢ়তা। এভাবে প্রত্যেক মানুষের জীবনে সফলতা আসে। নৈতিক ইচ্ছাশক্তির পথ ধরেই মানুষের সমাজ জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। সমগ্র মানব সমাজের শান্তি, স্বাধীনতা তথা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে নৈতিক ইচ্ছাশক্তি। জ্যোতির্ময় আত্মার মধ্যে অনুভূত ইচ্ছাশক্তি মানুষকে আদর্শায়িত করে। এ সম্পর্কে ড. ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্র প্রধান সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণ বলেছেন, ‘মানুষ যখনই নিজের আত্মাকে সু-সংহত ভাবে অন্তর্মুখী করে একাগ্রচিত্তে অনুধ্যানে ব্রতী হয়, তখনই তার অন্তরের গোপনে এক অদ্ভুত এবং অত্যাশ্চর্য অনুভূতির উদয় হয়। এ উপলব্ধি প্রাণবন্ত হয়ে তাকে দুর্বারভাবে আকর্ষণ করে এবং সামগ্রিক সত্তার সঙ্গে একাত্ম হয়। এতেই ইচ্ছাশক্তি বাস্তব রূপ পায়। মানুষ যদি জীবনযুদ্ধে নামে তাহলে সে যুদ্ধে ইন্ধন যোগাবে মনের দৃঢ়তা এবং যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ইচ্ছাশক্তি। ‘The old man and the sea’- তে এ কথাটাই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বৃদ্ধের মতে, ‘But the man is not made for defeat. A man can be destroyed but not defeated …’ অর্থাৎ মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু হেরে যায় না। মনের আকাঙ্খাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে নিন্দুকের নিন্দা, ঠাট্টা ইত্যাদিতে ভ্রূক্ষেপ করতে নেই। মনের দুর্বলতা, শারীরিক বৈকল্য অথবা বার্ধক্যের পরিসীমাকে এড়িয়ে চলতে হবে। এগুলো অতিক্রম করে মনের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগালে জীবনে সফলতার বিপুল সম্ভাবনা খোঁজে পাওয়া যাবে। নির্ভীক আত্মার অজেয় ইচ্ছাশক্তির বলেই তা সম্ভব। সুখের স্পর্শানুভূতিতে একজন মানুষ সমস্ত জীবন আনন্দে কাটিয়ে দিতে পারে। সুন্দর জীবন গড়ে তোলার জন্য মনোবৈজ্ঞানিক আলেকজান্ডার হেমিলটন বলেছেন, কোনও জিনিসের গবেষণা করে আমরা যখন এর ভেতর প্রবেশ করতে পারব তখনই এর অন্তর্নিহিত অর্থ খোঁজে পাব। আমার মনের শক্তি বেড়ে যাবে। মানুষ আমাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবে। এটা একমাত্র শ্রম এবং ইচ্ছাশক্তির যথার্থ প্রয়োগেই সম্ভব হবে। সুতরাং আমাকে নিশ্চিত হতে হবে আমার লক্ষ্যস্থল সম্পর্কে। কী করলে জীবনে সফলতা আসবে তা নির্ধারণ করে তবেই জীবনযুদ্ধে নামতে হবে। নির্দিষ্ট কাজে সফল হলে জীবনে যে আনন্দ পাওয়া যায় সে আনন্দকে কোনও মূল্যে কেনা যায় না। মনে রাখতে হবে- ‘right mental attitude of courage, frankness and good cheer.’ শুদ্ধচিত্ত, দৃঢ় মনের সাহস এবং সম্ভাবনা ব্যক্তি জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাধাকৃষ্ণ সে জন্যই বলেছেন, ‘মানব-আত্মার বিরামহীন ব্যাকুল বাসনার মধ্যে নিবিড় ঐক্যের সন্ধান পাওয়া যায়। মানুষ সৎ, সাহসী এবং সংগ্রামী মনের হলে বিজয় নিশ্চিত। মানুষ সামাজিক জীব হলেও মুক্ত জীব। মুক্ত মনে মানুষকে সৎ কর্ম, সৎ চিন্তা করতে হবে। তাই জীবনকে নিজের ইচ্ছেমতো গড়ে তোলা যায়। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বলা যায়-ইচ্ছাশক্তির সাহায্যেই জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানো যায়। আমরা জীবনটাকে আদর্শ হিসেবে গড়তে পারি অথবা জীবনটাকে একটা অনুষ্ঠানে পরিণত করতে পারি। সমাজে এ সমস্ত লোকই শক্তিশালী এবং আদর্শ হয়ে ওঠে ও জীবনে সফলতার চরম শিখরে পৌঁছে যেতে পারে। এর জন্য ত্যাগ এবং যুদ্ধের মানসিকতার দরকার। জন্মের সময় কেউ খ্যাতিমান হয়ে জন্মায় না। কাজের মধ্য দিয়েই প্রত্যেকে সফল হয়। ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে মনকে একাগ্র করে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সংগ্রাম করলে জীবন সফল হবেই। He who thinks he can. এটা সত্যি। ভাবনা ঠিক রাখলে সততা আসে চরিত্রে। সুতরাং ইচ্ছাশক্তিকে আশ্রয় করে ক্রমবিকাশের পথে এগিয়ে গেলে জীবন একদিন মানব জীবনের পরিপূর্ণতার উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে পড়বে।


Free Online Accounts Software