19 Feb 2018 : Sylhet, Bangladesh :

11 February 2018 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 918) 

৮৭ বছর বয়েসি এক মায়ের কথা

৮৭ বছর বয়েসি এক মায়ের কথা
     

তাসলিমা খানম বীথি:
১. সেদিন ছিলো বৃহস্পতিবার। অফিসের কাজে যখন প্রচন্ড ব্যস্ত তখন চাচার কল। রিসিভ করতেই তিনি কাঁদতে লাগলেন। কাঁদছেন তো কাঁদছেনি। চাচার কান্না শুনে বুঝতে পারি তার মা হয় তো আর বেঁচে নেই। কারন তিনি আমাকে বলেছিলেন তার আম্মা খুবই অসুস্থ। তবুও চাচাকে বলি কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে? আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনার আম্মা ঠিক আছে তো। কান্না একটু থামিয়ে চাচা বললেন, ‘বীথি আমার মাই নাই গো’। জিজ্ঞাসা করি কখন মারা গিয়েছেন। মোবাইলের লাইন কাটার আগে চাচাকে বলি কাঁদবেন না। মায়ের জন্য দোয়া করেন।

২. গত শুক্রবার কৈতর প্রকাশনী অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা শেষ করে বাসায় ফেরার পথে গল্পকার সেলিম আউয়ালকে জিজ্ঞাসা করি চাচার সাথে দেখা হয়েছে কি না। তিনি বললেন, চাচাকে দেখতে বাসায় গিয়েছিলেন। আর বললেন, তোমাকে অনেক স্নেহ করেন তিনি, তাকে দেখতে গেলে ভালো হত। বাসায় ফিরে রাতেই চাচার বন্ধু এডভোকেট মো. আব্দুল মালিককে কল দিয়ে চাচার বাসার ঠিকানা নিই। পরের দিন শনিবার সকালে ছোট বোন আমিনাকে সাথে নিয়ে যতরপুরে যাই।

৩. ৭৯ নবপুষ্প বাসায় ভেতর প্রবেশ করতেই মনে হচ্ছে প্রিয়জন হারানো বেদনা এখনো কাঁদছে বাড়িটি। চারিদিকে নিরব নিস্তত্ব। রুমে সামনে দাঁড়িয়ে বললাম- বেলাল চাচা আছেন। গলা শুনে ভেতর থেকে চাচী আসলেন। চাচার কথা বলতেই বললেন- আপনাকে চিনতে পারলাম না। বললাম আমি বীথি। ভেবেছিলাম তিনি হয়তো আমাকে ছিনতে পারবেন না। কিন্তু না। নাম বলতেই চাচী বললেন- ও সাংবাদিক বীথি। ভেতরে এসো । বসতে বলেই তিনি গরুর মাংস আর পরটা দিয়ে নাস্তা দিতে বললেন আমাদেরকে। এসময় চাচী তার পুত্রবধু সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা: মাসরাবা সুলতানার সাথে পরিচয় করে দেন। চাচার কথা জিজ্ঞাসা করতেই চাচী বললেন- ফযরের নামাজ পড়ে মায়ের কবর জিয়ারত করতে দরগাহ চলে গেছেন। তারপর চাচীর সাথে অনেকক্ষণ কথা বলি। চাচী বলছিলেন তার শাশুড়ি মায়ের কথা। চাচার আম্মা নাকি অনেক গুনী নারী ছিলেন। তাকে অনেক ভালোবাসতেন। তিনি অসুস্থ হবার পর থেকে চাচী নিজের হাতে শাশুড়িকে গোছল করাতেন, খাওয়াতেন। সবসময় পাশে থাকতেন। রাতে ঘুমাতেন না। চাচা আর চাচী মায়ের পাশে বসে থাকতেন। শাশুড়ি মায়ের কথা বলছেন আর বার বার চোখের জল মুসছিলেন। চাচীর কথা শুনে শ্বাশুড়ির প্রতি তার ভালোবাসা আমাকে অনুপ্রাণিত করছিল। চাচীর সাথে কথা বলার ফাঁকেই চাচাকে কল করি। ফোন রিসিভ করতেই বললাম বাসায় অপেক্ষা করছি। তিনি আসছেন বলে লাইন কেটে দেন।

৪. চাচা আসলেন। বসলেন, কথা বললেন। তখন তার চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে মায়ের কবরকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চয় অনেকক্ষণ কেঁদেছেন। চাচীর সাথে পরিচয় করে দিয়ে বলেন আমাকে আরো নাস্তা দিতে। কথা বলছেন মাকে নিয়ে। তার মা বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। ছেলের দেরি হলেই টেনশন করতেন। কখনো চোখের আড়াল হতে দিতে না। প্রচন্ড সৌখিন ছিলেন। রাত জেগে লেখতে বসলে পাশে এসে মা বসতেন আর বেশি জাগতে দিতেন না। লেখালেখিতে তাকে উৎসাহ দিতেন। মায়ের কথা বলতে বলতে চাচার চোখের কোনে জল জমতে শুরু করেছে।

৫. সিলেটের সাহিত্যঙ্গনে আমি যাকে চাচা বলে ডাকি তিনি হলেন বিশিষ্ট কলামিস্ট বেলাল আহমদ চৌধুরী। যার ¯স্নেহ, ভালোবাসা আর আন্তরিকতা মনে হয় সত্যি সত্যি তিনি আমার আপন চাচা। সিলেটে যে কোন পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হলে যে মানুষটি সবার আগে কল করেন তিনি হলেন বেলাল চাচা। আমার লেখা গল্প তাকে মুগ্ধ করে। লেখালেখিতে প্রচন্ড উৎসাহ দেন তিনি। সেদিন অফিসে এসেছিলেন চাচা আর হাতে করে নিয়ে আসেন বিদেশী চকলেট। বললেন তার মায়ের জন্য দোয়ার আয়োজন করেছেন। আমি যেন তার বাসায় যাই। সবশেষে রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা, চাচার আম্মাকে যেন জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন আর চাচাকে যেন সুস্থ রাখেন, ভালো রাখেন।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮


Free Online Accounts Software