18 Jan 2018 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 10 January 2018 অন্য পত্রিকার সংবাদ  (পঠিত : 520) 

খুনোখুনিতে উত্তপ্ত সিলেট

খুনোখুনিতে উত্তপ্ত সিলেট
     

ওয়েছ খছরু খুনোখুনির শহরে পরিণত হয়েছে সিলেট। রাজনৈতিক হত্যা, অপরাধীদের হাতে খুন যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার। এ অবস্থায় সিলেটের সর্বত্র এখন বিরাজ করছে আতঙ্ক। নতুন বছরের শুরু হলো সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট থেকে। ছাত্রদলের মিছিলে নিজ দলের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত শিমু। ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর র‌্যালিতে তিনি একই বলয়ের প্রতিপক্ষ গ্রুপের ক্যাডারদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন।
ছাত্রদলের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো ছাত্রলীগেও। ৪ঠা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আতঙ্কের জনপদ টিলাগড়ে ছাত্রলীগের আজাদ ও রঞ্জিত গ্রুপের কর্মীদের গুলি বিনিময়, ককটেল বিস্ফোরণ, সশস্ত্র মহড়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জের ধরে রোববার রাতে টিলাগড়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে খুন করা হয় ছাত্রলীগের রঞ্জিত গ্রুপের কর্মী তানিম খানকে। এ ঘটনায় সিলেটে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। তানিম খান সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা। রোববার তানিম খান নগরীর টিলাগড়ে বন্ধুদের নিয়ে অবস্থান করছিল। খবর পেয়ে আজাদ গ্রুপের কর্মীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। তারা তানিমকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার জন্য ছাত্রলীগের রঞ্জিত গ্রুপের কর্মীরা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও স্থানীয় কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের ভাতিজা সাদিকুর রহমান আজলা ও কুখ্যাত অপরাধী ডায়মন্ডকে দায়ী করেছে। তারা জানিয়েছে- খুনের ঘটনার নেতৃত্ব ছিল ওই দু’জন। দু’জনই ছাত্রলীগের আজাদ গ্রুপের শীর্ষ নেতা। তবে ঘটনার পর রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে টিলাগড়ের একটি ছাত্র ম্যাস থেকে ডায়মন্ডকে গ্রেপ্তার করেছে। এর সঙ্গে আরো তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। সোমবার রাতে তাদের ৪ জনকে তানিম খুনের সন্দেহভাজন আসামি দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত এ খুনের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার এজাহার থানায় দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন শাহপরাণ থানার ওসি আক্তার হোসেন। তিনি বলেন- এজাহার পাওয়ার পরপরই অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালানো হবে। এদিকে তানিম খুনের ঘটনায় সোম ও মঙ্গলবার দুই দিন সিলেটের এমসি ও সরকারি কলেজে ছাত্রধর্মঘট পালন করেছে ছাত্রলীগের রঞ্জিত গ্রুপের কর্মীরা। তাদের ধর্মঘটের কারণে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে। প্রশাসনের অনুরোধের প্রেক্ষিতে গতকাল বেলা দেড়টার দিকে আন্দোলনরত রঞ্জিত গ্রুপের ছাত্রলীগের কর্মীরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আজ বুধবার থেকে তারা খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এ কর্মসূচি শুরু করবে। কর্মসূচির মধ্য রয়েছে সিলেটের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল, বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন ও শুক্রবার নিহত তানিমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল। ওদিকে নতুন বছরে হত্যার সূত্রপাত ঘটিয়েছে ছাত্রদল। ছাত্রদলের কাজী মেরাজ গ্রুপের কর্মী নাবিল রাজা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মিছিলে অগ্রভাগে যাওয়াকে কেন্দ্র করে নাবিল রাজার সঙ্গে বিরোধ বাধে লিটন গ্রুপের কর্মীদের। নগরীর কোর্ট পয়েন্টে আসা মাত্র নাবিলরাজা প্রতিপক্ষ লিটন গ্রুপের কর্মীদের ওপর ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এ সময় নাবিল রাজাকে সামলাতে হাতে বুকে ছুরিকাঘাতপ্রাপ্ত হন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাসনাত শিমু। এ সময় ছুরিকাঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ছাত্রদলের ওই সিনিয়র নেতা। এ ঘটনার পর থেকে সিলেটে ছাত্রদলের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ইতিমধ্যে নাবিল রাজাসহ অভিযুক্তদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়েছে। এই দুই খুনের ঘটনায় এখন টালমাতাল সিলেট। এরই মধ্যে গতকাল নগরীর মাছুদিঘীর পাড়ে ঘটেছে আরেকটি নির্মম ঘটনা। মাছুদিঘীর পাড়ের প্রত্যয়-৬২ নম্বর বাসার বাসিন্দা কলেজছাত্র শামসুদ্দিনকে মাছুদিঘীর পাড়ের কলেজের সামনে নির্মমভাবে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছে ছিনতাইকারীরা। ওসমানী হাসপাতালে তিনি এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। চাচার পাঠানো দুই লাখ টাকা তেলিহাওরস্থ ব্যাংক থেকে তুলে তিনি নিজ বাসা মাছুদিঘীর পাড়ে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে কলেজের সামনেই তার ওপর হামলা চালায় কয়েকজন ছিনতাইকারী। এ সময় তারা শামসুদ্দিনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে সঙ্গে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালায়। তবে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসায় ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। ঘটনায় গুরুতর আহত শামসুদ্দিনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। গত দুই মাসে সিলেট আরো ৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে টিলাগড় গ্রুপের হাতে আরো দুই ছাত্রলীগ কর্মী খুন হয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর টিলাগড়ের কিলাররা প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করে ছাত্রলীগের কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুমকে। নগরীর ছড়ারপাড়ের বাসা থেকে দিনদুপুরে ধরে এনে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর মাসখানেক পরই ১৬ই অক্টোবর টিলাগড়ে আজাদ সমর্থিত রায়হান চৌধুরী অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মীদের হামলায় খুন হন রণজিৎ সমর্থিত নিপু অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ। এ দুটি খুনের ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ডায়মন্ডের সম্পৃক্ততা থাকলেও মামলায় আসামি করা হয়নি। এ কারণে ডায়মন্ড আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরন মাহমুদ নিপু অভিযোগ করেছেন- মিয়াদ ও মাসুমের খুনিরা গ্রেপ্তার না হওয়ার কারণে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে সিলেটে। আর কত লাশ পড়লে ঘাতকরা ক্ষান্ত হবে- উল্টো এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। মিয়াদ খুনের ঘটনায় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এম রায়হান চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে মামলাও হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট দিনদুপুরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নগরীর জিন্দাবাজারের এলিগেন্ট শপিং সিটির মোবাইল ফোন সেট ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে হত্যা করা হয়। এর আগে ২০১০ সালের ১২ই জুলাই টিলাগড় পয়েন্টে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মেধাবী শিক্ষার্থী মুক্তিযোদ্ধা সন্তান উদয়েন্দু সিংহ পলাশকে। আগামী ৩০শে ফেব্রুয়ারি সিলেট আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৪ঠা জানুয়ারি সিলেটের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে আসছেন প্রেসিডেন্টও। এই দুই ভিভিআইপির প্রোগ্রাম নিয়ে সিলেটে প্রশাসনে টেনশন বাড়ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সিলেটে খুনোখুনি শুরু হওয়ায় বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আওয়ামী লীগের নেতারা এ নিয়ে দফায় দফায় কথা বলেছেন প্রশাসনের সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন- যারা অপরাধী তাদের বিরুদ্ধে সিলেট পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স। যারাই অপকর্ম করবে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। পুলিশ সে ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি। মানবজমিন ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে | ১০ জানুয়ারি ২০১৮, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:০২


Free Online Accounts Software