20 Jan 2018 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 9 January 2018 আইন-অপরাধ  (পঠিত : 1296) 

জামেয়া ক্বাসিমুল উলুম দরগাহ মাদ্রাসার ৫ কোটি টাকা মূল্যের ভূমি আত্মসাতের চেষ্টা

     

কাউসার চৌধুরী: দেশের শীর্ষ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া ক্লাসিমুল উলুম দরগাহে হযরত শাহজালাল (রহ:) মাদ্রাসার প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের ভূমি আত্মসাতে একটি ভূমিখেকো চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছে। চক্রটি জাল দলিলের মাধ্যমে শহরতলীর ছালিয়া মৌজায় মাদ্রাসার প্রায় ৩ একর ভূমি তাদের নামে রেকর্ড করে নিয়ে গেছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে অনুপস্থিত দেখিয়ে কোনো ধরণের যাচাই বাচাই ছাড়াই সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা মাদ্রাসার ভূমি দিয়েছেন ভূমি খেকো চক্রকে। যে বৃদ্ধার নামে জাল দলিল ও হেবা দলিল সৃজন করে এই জালিয়াতি করা হয়েছে ওই শরিফুল বেগমই আদালতে জবানবন্দী দিয়ে বলেছেন, তিনি আদৌ এই ভূমির মালিক নন। এমনকি দলিলের ব্যাপারেও তার কিছুই জানা নেই। এঘটনায় সম্প্রতি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ৭ জনের নাম উল্লেখ করে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রের সাথে কথা বলে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। জালিয়াতি চক্রের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
যে ভাবে ভূমির মালিক দরগাহ মাদ্রাসা
সিলেট শহরতলীর ছালিয়া মৌজার ধোপাগুল এলাকার প্রায় ৮ একর ভূমি ওয়াকফ মূলে জামেয়া ক্বাসিমুল উলুম দরগাহে হযরত শাহজালাল (রহ:) মাদ্রাসায় দান করা হয়। সিলেট নগরীর সাগরদিঘীর উত্তরপাড়ের বাসিন্দা হাজী রিফাত উল্লার পুত্র হাজী আপ্তাব মিয়া ১৯৯২ সালের ২৬ মে সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের ৭৫৬৬ নং দলিল মূলে ওই ভূমি দান করেন। দরগাহ মসজিদের দীর্ঘদিনের ইমাম ও মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ মাওলানা মুহাম্মদ আকবর আলীর নামে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এই ভূমি গ্রহণ করেন।
২৬ বছর ধরে চলছে হিফজ বিভাগ
ভূমি প্রাপ্তির পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ঐবছরই সেখানে পৃথক হিফজ বিভাগের কার্যক্রম শুরু করেন। দরগাহ মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের একটি অংশ শহরতলীর ধোপাগুলে পরিচালিত হয় এমন খবর সিলেট অঞ্চলের লোকজনও অবগত রয়েছেন। বর্তমানে এই শাখায় ৪০ জন ছাত্র হিফজ বিভাগে অধ্যয়ন করছেন। রয়েছেন দু’জন শিক্ষক। ছাত্র-শিক্ষকদের আবাসিক অবস্থার মধ্যেই বিগত ২৬ বছর ধরেই চলছে হিফজ বিভাগ। বিশাল এই ভূমির কিছু অংশে সীমানা দেয়াল রয়েছে। বেশ কিছু জমিতে স্থানীয়রা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিজ নিয়ে চাষাবাদ করেন। এই শাখা থেকে ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী হিফজ সম্পন্ন করে হাফিজ হয়েছেন।
ভূমি খেকো চক্রের লোলুপ দৃষ্টি
দরগাহ মাদ্রাসার এই বিপুল পরিমান ভূমি ২৬ বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কখনো কোনো মালিক দাবীদার কেউ না এলেও সম্প্রতি শোনা যায় এই ভূমির মধ্যে এক মহিলার মালিকানা রয়েছে। শরিফুল বেগম নামের বৃদ্ধা মহিলাকে আপন নানী সাজিয়ে মাদ্রাসার ভূমির মধ্যে ২ দশমিক ৭৯ শতক ভূমির মালিকানা দাবী করেন মোঃ শুক্কুর মিয়া নামের এক ব্যক্তি।
হঠাৎ সেটেলমেন্টের খবর
বছর খানেক আগে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সংবাদ পান ধোপাগুলের ভূমি নিয়ে শুক্কুর মিয়া নামের এক ব্যক্তি সেটেলমেন্ট আদালতে মামলা করেছেন। কিন্তু সেটেলমেন্টে এবিষয়ে অনেক খোঁজ খবর নেয়ার পরও এর কোন হদিস না পেয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ হতাশ হয়ে পড়েন। মামলা হলে আইন অনুযায়ী বিবাদী পক্ষকে মামলার বিষয় ও তারিখ অবগত করে চিঠি দেয় সেটেলমেন্ট অফিস। কিন্তু কোনো চিঠি না পাওয়ায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শুরু হয় দরগাহ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দৌড়ঝাঁপ।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পেরেশানি
বিষয়টি জানার পর মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী, প্রিন্সিপাল মাওলানা মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়াসহ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করে এই চক্রের সন্ধানে নানা তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রথমেই তারা জানতে পান শরিফুল বেগম নামের এক মহিলার নামে একটি দলিলমূলে সেটেলমেন্টে মামলা করা হয়।
১৯৬৮ সালের ২৩ জুলাই তারিখের দলিল নং ১১২০৮। শুক্কুর মিয়া এই দলিলমূলে শরিফুল বেগমকে আপন নানী উল্লেখ করে ২০১৫ সালের ৮ জুলাই একটি হেবা দলিল করেন। হেবা দলিল নং ৭৫০৯/১৫। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এক সময় নিশ্চিত হন দলিল দু’টি জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা হয়েছে। এরপর সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার কাছ থেকেও রায়ের কপিও সংগ্রহ করেন তারা।
সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার রহস্যজনক ভূমিকা
পর্যালোচনা করে দেখা যায় শরিফুল বেগমের নামে ২০১৪ সালে সেটেলমেন্ট অফিসে ৩০ ধারার আপত্তি (মামলা) করা হয়। সেটেলমেন্ট অফিসার পৃথ্বীশ রঞ্জন সরকারকে এই মামলার আপত্তি অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী ও একই বছরের ৯ এপ্রিল মাত্র দু’টি তারিখে শুনানী করেই ঐ দিনই রায় ঘোষণা দেন। প্রায় ৩ একর ভূমি নিয়ে দেয়া রায়ে তিনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে গরহাজির দেখিয়ে একতরফা রায় দেন। সেটেলমেন্ট অফিসার রহস্যজনক কারণে এই রায় দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে এই সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা সিলেট থেকে ময়মনসিংহে বদলি হয়ে চলে গেছেন। মাদ্রাসা শুক্কুর মিয়ার বিরুদ্ধে ৩১ ধারার আপত্তি করেছেন। যা বর্তমানে শুনানীর অপেক্ষায় রয়েছে।
জালিয়াতির নমুনা
শরিফুল বেগমের নামের ১৯৬৮ সালের ১১২০৮ নং দলিলের টিপসহি নং- ৬৪৮৫, ৬৪৮৬, ৬৪৮৭, ৬৪৮৮, ৬৪৮৯ ও ৬৪৯০। কিন্তু এর আগের দলিলের (দলিল নং ১১২০৭/৬৮) টিপসহি নং ৬৪৮৫ এবং শরিফুল বেগমের দলিলের পরের দলিলের (দলিল নং ১১২০৯/৬৮) টিপ সহি নং ৬৪৮৬ ও ৬৪৮৭ দেখা গেলে শরিফুল বেগমের এই দলিল নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। দলিল তিনটির সার্টিফাই কপি দেখার পর পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর এমন তথ্য। এ বিষয়ে সিলেট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের মহাফেজ খানা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারী সদর সাব রেজিষ্ট্রারী অফিস থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, ১৯৬৮ সালের শরিফুল বেগম নামে কোন দলিল সম্পাদন হয়নি।
প্রতারণার শিকার বৃদ্ধা শরিফুলও
পুরো বিষয়টি যার নামে করা হয় সেই বয়োবৃদ্ধা শরিফুল বেগম গত ২১ ডিসেম্বর নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে একটি ঘোষণা পত্র দেন। সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ দিঘীরপারের মৃত আমজাদ আলীর স্ত্রী (বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জের উত্তর রনিখাইয়ে বসবাসরত) ৭১ বছর বয়সী শরিফুল বেগম ঘোষণা পত্রে বলেন, ছালিয়া মৌজার ধোপাগুল এলাকার ঐ ভূমি তিনি কখনো খরিদ করেননি এবং ১৯৬৮ সালের ১১২০৮/৬৮ নং দলিলটিও তার নয়। তিনি বা তার স্বামী, পিতা বা মাতা কেউই কোন কালে এই ভূমির মালিক ছিলেন না। ২০১৫ সালের ৭ জুলাই সম্পাদিত হেবা ঘোষণাপত্রটি বুঝে শুনে করেননি। তাকে প্রতিমাসে সরকার কর্তৃক এক বস্তা চাউল দেয়া হবে মর্মে আশ্বাস দিয়ে তার মেয়ে মোছাঃ ছাবিয়া খাতুনের সৎপুত্র শুক্কুর মিয়া প্রতারণার মাধ্যমে ভূল বুঝিয়ে উক্ত হেবা দলিল সৃজন করে।
অবশেষে থানায় মামলা দায়ের
প্রায় ৫কোটি টাকা মূল্যের ভূমি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে দরগাহ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আবুল কালাম জাকারিয়া বাদী হয়ে গত ২৭ ডিসেম্বর কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৪৬/৫০০/ধারা ৪১৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৩৪ দ-বিধি এজাহারে পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়। মামলায় এস.এম.পির এয়ারপোর্ট থানার ধোপাগুলের আব্দুল আলী ওরফে তালব আলীর পুত্র শুক্কুর মিয়াকে (৪৮) প্রধান আসামী করা হয়েছে। এছাড়াও জাল দলিল সৃজনে সহযোগিতার অভিযোগে জামিলুর রহমান চৌধুরী, ইমাম উদ্দিন, জিল্লুর রহমান (দলিল লেখক, সনদ নং ১৫৫), শ্যামল দাস, পলক ও মিরা শাহাকেও আসামী করা হয়। বর্তমানে মামলাটি পুলিশ তদন্ত করছে। এ দিকে, গত মঙ্গলবার রাতে প্রধান আসামী শুক্কুর মিয়াকে নিজ বাড়ী থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর এক দিন পর আদালত থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
আদালতে শরিফুলের জবানবন্দী
যে শরিফুল বেগমের নামে পৃথক দলিল সৃজন করে ভূমি মালিকানা দাবী করা হয়েছে এই শরিফুল বেগম গত ২ জানুয়ারী মঙ্গলবার মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতের বিচারক মো: মামুনুর রহমান ছিদ্দিকীর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেন। মামলার স্বাক্ষী হিসেবে আদালত শরিফুল বেগমের জবানবন্দী রেকর্ড করেন। জবানবন্দীতে তিনি বলেন, আমার মেয়ের জামাই মারা যাওয়ার পর শুক্কুররা আমার মেয়েকে মেরে ধরে বের করে দেয়। শুক্কুর সতাই নাতি। একদিন আমার বাড়ীতে গিয়ে অসহায় অবস্থা ও শরীর খারাপ দেখে আমাকে চিকিৎসা করাবে বলে নিয়ে আসে। শুক্কুরের বাসায় ২২দিন রেখে চিকিৎসা করায়। সরকারী ঘরে আমার নাম লিখে দিবে বলে আমার স্বাক্ষর / দস্তখত দিতে হবে বলে। সে বলে প্রতি মাসে ভাতা, একখান কাপড়, এক বস্তা চাউল ও একহাজার টাকা দিবে বলে আমার টিপ চিহ্ন নেয়। এখন শুনি কোন মাদ্রাসার জায়গা নাকি আমি দলিল করে দিয়েছি। কোতোয়ালী থানায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের মামলা দায়েরের পর বৃদ্ধা শরিফুল বেগম আদালতে স্বেচ্ছায় দেয়া জবানবন্দীতে এসব উল্লেখ করেন।
অভিযুক্ত শুক্কুর মিয়া যা বললেন
এ বিষয়ে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে শুক্কুর মিয়া বলেন, ভুয়া দলিল দিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নামজারী করেছে। আমার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে। দরগাহ মাদ্রাসার দলিলটি ভুয়া। এজন্য আমি স্বত্ত্ব মামলা করেছি। এক প্রশ্নের জবাবে শুক্কুর মিয়া দাবী করেন, ১৯৯২ সালের দলিলটিও ভুয়া, যিনি এই জমি দান করেছেন ঐ ব্যক্তির দলিলও ভুয়া।
তিনি দাবী করেন, শরিফুল বেগম আমার নানী হন। হেবা দলিল তিনি নিজে থেকেই করেছেন। এখন যা বলছেন তিনি তার কোন সত্যতা নেই। আদালত ন্যায় বিচার করবেন বলে শুক্কুর মিয়া মন্তব্য করেন।
সেটেলমেন্ট কর্মকর্তার মোবাইল বন্ধ
দরগাহ মাদ্রাসার ভূমি ৩০ ধারায় শুক্কুর মিয়ার পক্ষে রেকর্ড করে দেয়ার বিষয়ে জানতে গতকাল সন্ধ্যায় সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা পৃথীশ রঞ্জন সরকারের মোবাইলে কয়েক দফা কল দেয়া হলে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এবিষয়ে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও মামালার বাদী মাওলানা আবুল কালাম জাকারিয়া বলেন, এঘটনায় আমরা বিস্মিত হয়েছি। থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেটেলমেন্টও আপত্তি দেয়া হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য ও ন্যায় উদঘাটন হবে বলে আমরা আশা করি।
তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য
কোতোয়ালী থানায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস, আই হাদিউল ইসলাম বলেন, সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে মামলাটির তদন্ত চলছে। যার নামে দলিল করা হয়েছিল সেই মহিলা আদালতে এসে জবানবন্দী দিয়ে গেছেন। জাল জালিয়াতির ঘটনায় চুল চেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অভিযুক্ত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।


Free Online Accounts Software