21 Jan 2018 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 14 December 2017 দিবস  (পঠিত : 280) 

বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রাসঙ্গিক কথা

     

মোহাম্মদ আব্দুল হক:বাংলাদেশ প্রিয় স্বদেশ এবং স্বাধীন মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বুদ্ধিজীবী দিবস, ভাষা আন্দোলন, একুশে ফ্রেব্রুয়ারি ইত্যাদি শব্দমালা বাংলাদেশের মানুষের অতি আপন। মাঠে, সভামঞ্চে, রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ এলেই উল্লেখিত দিবসের সাথে অধিক গুরুত্বের সাথে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এসে যায় পরম ভাবে। আসাটাই স্বাভাবিক আর না আসা চরম অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ মুক্তিযুদ্ধের সময় কথা, কবিতা, গান, পরামর্শ দিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধাদেরকে প্রেরণা যুগিয়েছেন তাঁদের প্রতি। তাই এখানে আমাদের এই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আলোচনায় শহীদ বুদ্ধিজীবী
দিবস গুরুত্ব পাবে সব সময় গভীর শোক ও শ্রদ্ধায়। মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় শিক্ষিত ও মেধাবী বাঙালিদের অস্থিত্ব দৃশ্যমান হয়। এখন দেখা যাক কোন নষ্ট গোষ্ঠির দুষ্ট চিন্তায় কেমন করে এলো এই ভয়াবহ শোকের দিবসটি।


বিংশ শতাব্দীর উত্তাল সময় সারা বিশ্বময়। তখন ১৯৪৭ খ্রীষ্টিয় সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের চুড়ান্ত বিজয়ে আমরা ভারত উপ মহাদেশে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি রাষ্ট্র দেখতে পাই। পাকিস্তান স্বাধীনতা পায় ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ খ্রীষ্টিয় সালে আর ভারত স্বাধীন হয় একদিন পরে অর্থাৎ ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ খ্রীষ্টিয় সালে। ভারত ভাগের পিছনে আছে দ্বিজাতি তত্ত্বের এক ইতিহাস। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ' র নেতৃত্বে পাকিস্তানের শাসন যন্ত্রের কেন্দ্র হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির অগণতান্ত্রিক ও নিষ্ঠুর শাসন ও শোষন নীতির ফলে হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থানরত বাঙালি প্রায় পঁচিশ বছর নিষ্পেষিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানি মিলিটারি শাসক দ্বারা। সেই সাথে
ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের চক্রান্তের যোগসাজশ বা তলায়তলায় বোঝাপড়া। ওরা প্রথমে আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়ে বুঝে যায় বাঙালি সহজে অন্যায়ের কাছে মাথা নত
করার জাতি নয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, রক্ত দিয়ে রাজপথ রাঙিয়ে, জীবন দিয়ে
বাঙলার ছাত্র- জনতা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে। এখানে স্যালুট জানাই সালাম, বরকত, রফিক সহ সকল ভাষা শহীদদের। প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো আজ সারা বিশ্বে পালিত হয় ' একুশে ফেব্রুয়ারি ' আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ খ্রীষ্টিয় সালে ভাষা আন্দোলন বিজয়ী বীর বাঙালিকে অন্যায় ভাবে শাসন করা যাবেনা এই সত্যটা ওরা বুঝতে পারেনি। শাসক গোষ্ঠি বৈষম্য মূলক আচরণ চালিয়ে যেতে থাকে। আর ততোদিনে বাঙালিও প্রস্তুত হতে থাকে, নেতাও পেয়ে যায়। দিনে দিনে নির্যাতিত
জনতার কথা নেতার কন্ঠে শুনতে পেয়ে আত্মবিশ্বাসী বাঙালি ছাত্র- জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়। দীর্ঘ দিনের আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আসে ১৯৭০ খ্রীষ্টিয় সালের সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে আমাদের এ অঞ্চল অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ বিপুল ভোট পেয়ে জয়ী হয় এবং গণতান্ত্রিক ভাবে সরকার গঠনের অধিকার পায়। কিন্তু
ক্ষমতায় থাকা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্র গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে
শিখেনি এবং ইতিহাস থেকেও শিখলো না। বাধ্য হয়ে ৭ ই মার্চ ১৯৭০ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঘোষনা করলেন, " এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" এই ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।তারপর আসে ইতিহাসের ভয়াবহতম ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ কালরাত্রি। ওইদিন একদিকে বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কে গ্রেফতার করা হয় আর পাশাপাশি রাতের আঁধারে ঘুমন্ত নিরীহ ঢাকা বাসীর উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চালায় নির্মম গুলি। গুলি খেয়ে মানুষ মরে আর ট্যাঙ্কের গোলার আঘাতে চলে ধ্বংস লীলা। নেতৃত্ব থেকে আগেই স্বাধীনতার ঘোষনা এসেছিলো। তাই বীর বাঙালি ভয়ে ভীত না হয়ে ধীরে ধীরে সংঘটিত হয়ে দেশের আরও ত্যাগী নেতা ও বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে যুদ্ধ কৌশল ঠিক করে দেশের স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। অস্র, গুলি, বোমা, সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পাকিস্তানি হায়েনার দল এবং সেই সাথে জোট বাধা এদেশের মাটিতে লালিত অকৃতজ্ঞ রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর বিরোদ্ধে বীর বাঙালী অল্প-সল্প ট্রেনিং নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে। রক্ত আর লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বিজয় যখন
প্রায় নিশ্চিত তখনই রাজাকার, আলবদর বাহিনী এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা করে। ওরা বুঝে গেছে পাকিস্তানি পতাকা এদেশে আর থাকছে না। তাই একটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই ওরা এদেশের জ্ঞাণী ও প্রজ্ঞাবান খুঁজে খুঁজে হত্যার নক্সা আঁকে। কারণ ওরা জানতো আদর্শ জাতি গঠনে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। আর তাই এদেশকে বুদ্ধিজীবী শূন্য করার লক্ষ্যে জামাত ইসলাম এর বাহিনী রাজাকার, আল বদর, আল শামস এর লোকেরা মূলত ১৯৭১ এর ১০ ডিসেম্বর থেকেই তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে এবং ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালেই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এখানে প্রাসঙ্গিক মনে করি তাই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া শহীদ বুদ্ধিজীবীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা উপস্থাপন করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা দানকারী ও ত্যাগী মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চেষ্টা করি। ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ :
১. এ.এন.এম. মুনির চৌধুরী, ২. ডা: জি.সি. দেব, ৩. মুফাজ্জাল হায়দার চৌধুরী, ৪. আনোয়ার পাশা, ৫. জোতীর্ময় গুহ ঠাকুর, ৬. আব্দুল মুক্তাদীর, ৭. এস.এম. রাশিদুল হাসান, ৮. ডা: এ.এন.এম ফাইজুল মাহি, ৯. ফজলুর রহমান খান, ১০. এ.এন.এম মনিরুজ্জামান, ১১. ডা: সেরাজুল হক খান, ১২. ডা: শাহাদাত আলী, ১৩. ডা: এম.এ. খায়ের, ১৪. এ.আর. খান কাদিম, ১৫. মোহাম্মদ সাদিক, ১৬. শারাফত আলী, ১৭. গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ : ১. প্রফেসর কাইয়ূম, ২. হাবিবুর রহমান, ৩. শ্রী সুখ রঞ্জন সমদ্দার এম.সি.এ, ৪. মশিউর রহমান, ৫. আমজাদ হোসেন, ৬. আমিনুদ্দিন, ৭. নাজমুল হক সরকার, ৮. আব্দুল হক, ৯. সৈয়দ আনোয়ার আলী প্রমুখ। আছেন সাংবাদিক : ১. সিরাজুদ্দিন হোসেন, ২. শহীদুল্লাহ কায়সার, ৩. খন্দকার আবু তালেব, ৪. নিজামুদ্দিন আহমেদ, ৫. এ.এন.এম. গোলাম মোস্তফা, ৬. শহীদ সাবের, ৭. সরকার আব্দুল মান্নান (লাদু), ৮. নাজমুল হক, ৯. এম. আখতার, ১০. আব্দুল বাশার, ১১. চিশতী হেলালুর রহমান, ১২. সেলিনা আখতার
সহ অনেকে। চিকিৎসকদের মধ্যে এখানে উল্লেখযোগ্য : ১. মো: ফজলে রাব্বী, ২.
আব্দুল আলীম চৌধুরী, ৩. সামসুদ্দিন আহমেদ, ৪. আজহারুল কবীর, ৫. সোলায়মান খান, ৬. কায়সার উদ্দিন, ৭. মনসুর আলী, ৮. গোলাম মর্তোজা, ৯. হাফেজ উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, ১০. আব্দুল জব্বার, ১১. এস.কে. লাল, ১২. হেম চন্দ্র বসাক, ১৩. কাজী ওবায়দুল হক, ১৪. আল-হাজ্ব মমতাজউদ্দিন, ১৫. ঘাশিময় হাযরা, ১৬. নড়েন ঘোষ,
১৭. শামসুল হক, ১৮. এ. গফুর, ১৯. মনসুর আলী, ২০. এস.কে সেন, ২১. মফিজ উদ্দিন, ২২. আতিকুর রহমান, ২৩. গোলাম সারওয়ার, ২৪. মিহির কুমার সেন, ২৫. অনীল কুমার সিনহা, ২৬. এ.কে.এম. গোলাম মোস্তফা,২৭. মাকবুল আহমেদ, ২৮. এনামুল হক, ২৯. আশরাফ আলী তালুকদার, ৩০. লেফ: জিয়াউর রহমান, ৩১. লেফ.ক. জাহাঙ্গীর, ৩২. লেফ: ক. হাই, ৩৩. মেজর রেজাউর রহমান, ৩৪. মেজর নাজমুল ইসলাম, ৩৫. আসাদুল হক, ৩৬. নাজির উদ্দিন, ৩৭. লেফ: নুরুল ইসলাম, ৩৮. কাজল ভাদ্র, ৩৯. মনসুর উদ্দিন প্রমুখ। আছেন শিক্ষাবিদ : ১. জহির রায়হান, ২. পূর্নেন্দু দস্তিদর, ৩. ফেরদৌস দৌলা, ৪. ইন্দু সাহা, ৫. মেহেরুন্নিসা। শিল্পী ও পেশাজীবি অনেকের নাম পাওয়া যায় : ১. আলতাফ মাহমুদ, ২. দানবীর রানাদা প্রসাদ সাহা, ৩. জোগেষ চন্দ্র ঘোষ, ৪. ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত, ৫. সামসুজ্জামান, ৬. মাহবুব আহমেদ, ৭. খুরশিদ আলম, ৮. নজরুল ইসলাম, ৯. মাহফুজুল হক চৌধুরী, ১০. মহসিন আলী, ১১. মুজিবুল হক। এছাড়া আরও অনেক শ্রেণি পেশার বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা স্বাধীনতার জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছেন।


পাঠকের অবগতির জন্যে বলে রাখি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ বুদ্ধিজীবীর উপরোক্ত তালিকা পূর্ণাঙ্গ নয়। যুদ্ধকালীন পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস কর্তৃক সংঘটিত বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাকান্ডের স্মরণে বিজয়ী বাঙালি জাতি ১৯৭২ খ্রীষ্টিয় সাল থেকেই ১৪ ই ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস পালন করে। যুদ্ধে যুদ্ধে বাঙালি যখন বিজয়ের দ্বার প্রান্তে অর্থাৎ চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বুদ্ধিজীবী অপহরণ ও হত্যা করা হয়। সেজন্যে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৪ই ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালের ১৬ ই ডিসেম্বর
৩০ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমাদের চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জায়গা করে নেয়। এদেশের শিক্ষক, কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, লেখক, গবেষক, দার্শনিক, সাংবাদিক, নাট্যকার, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, আইনজীবী, প্রকৌশলী ইত্যাদি নানা শ্রেণি পেশার সাথে জড়িত জ্ঞানী গুণীজনে সমৃদ্ধ আজকের এই বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ অকুতোভয় বুদ্ধিজীবীদেরকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এই দেশের একজন হিসেবে আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মৃত্তিকার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রচার করার নিমিত্তে যে লেখাটুকু উপস্থাপিত হলো তা প্রবন্ধ বা নিবন্ধ যা ই হোক না কেন, আসল কথা হলো নিজেকে জানতে হলে পড়তে হবে, শিকড়ের সাহচর্যে থাকতে হবে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের সৃজনশীল তরুণ - তরুণীর কেউ কেউ ভুল মন্ত্রণায় মাঝে মাঝে পথ হারালেও এদেশীয় সংস্কৃতির টানে, শিকড়ের টানে, মাটির টানে সঠিক পথের খোঁজ পাবেই। মনে রাখি সেই কথা _
" আমি এখানেই আছি
এখানেই বাংলাদেশ,
আমি যেখানেই থাকি
সেখানেই বাংলাদেশ,
আমি যখনই কাঁদি
কাঁদে বাংলাদেশ,
আমি কেবলই হাসি
হাসে বাংলাদেশ
আমি ততোটাই ভালো
যতোটা আমার স্বদেশ।"

# লেখক _ মোহাম্মদ আব্দুল হক
কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক


Free Online Accounts Software