18 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 28 November 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 389) 

সাম্প্রদায়িক মানুষ মাত্রেই সামাজিক

     

মোহাম্মদ আব্দুল হক:
সাম্প্রদায়িক এবং অসাম্প্রদায়িক শব্দের উপর আমার নিজস্ব বোধশক্তি ও যুক্তি নিয়ে আপনাদের আসরে উপস্থিত হয়েছি। সাম্প্রদায়িক শব্দের এ পর্যন্ত বাংলায় প্রচলিত ব্যাখ্যা আমি গ্রহণ করতে পারছিনা। এই দুটি শব্দ আমাদের রাজনীতিকগণের অঙ্গনে অধিক আলোচিত, একটি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক এবং অপরটি হলো অসাম্প্রদায়িক। কখনো কখনো ব্যক্তি বিশেষের কথা বা কৃত কাজের ক্ষেত্রে, আবার কখনো কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে কোনো সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পিছনে এ শব্দ দুটির কোনো একটিকে জুড়ে দিয়ে হৈ চৈ শুরু করে দেই আমাদেরই সমাজের কেউ কেউ। বিষয়টি নিয়ে আপনাদের সামনে এখন আমি অর্থাৎ আপনাদের সমাজের একজন কোনো হৈ চৈ ফেলে দিতে আসিনি। এ সংক্রান্ত অতি সাদামাটা কথা নিয়ে কিছুদূর যেতে যেতে একটা মতের মিল ঘটাতে পারবো, আমি আশাবাদী।


যারা সমাজভুক্ত তারা সামাজিক আর যারা সম্প্রদায়ভুক্ত তারা সাম্প্রদায়িক। সামাজিক প্রতিষ্ঠিত কাজে থাকা সামাজিকতা আর সাম্প্রদায়িক নিয়মাধীন কর্মে এগিয়ে চলা সাম্প্রদায়িকতা। এখানে সামাজিকতা শব্দের ন্যায় সাম্প্রদায়িকতা শব্দটি ইতিবাচক। কিন্তু ইংরেজি শব্দ Communalism এর বাংলা সাম্প্রদায়িকতা শব্দটিকে এ অঞ্চলে নেতিবাচক ইঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়। এর পিছনে ব্রিটিশ শাসনাধীন উনবিংশ শতাব্দীর ভারত উপমহাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে হিন্দু - মুসলমানদের ধর্মীয় দাঙ্গা দায়ী। তবে এখানে ওইসব ইতিহাসের দিকে নজর না দিয়ে আমরা সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক শব্দের অর্থ, প্রয়োগ ও গুরুত্বের দিকে এগিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকবো।


সাম্প্রদায়িকতা শব্দের সাথে আমাদের অতি পরিচিত শব্দ 'সম্প্রদায়' এর মিল আছে দারুণভাবে। সম্প্রদায় বলতে সহজেই বুঝি কোনোনা কোনো গোষ্ঠী বা জাত যারা যুগ যুগ ধরে একান্ত নিজস্ব উৎসব, কাজ ও সংস্কৃতি লালন করে চলেছে। হতে পারে জেলে সম্প্রদায় কিংবা কামার, কুমার, মুচি, বেদে, চাষী আবার ভূমী মালিক সম্প্রদায় আছে। আমাদের এ অঞ্চলে তথা সারা দুনিয়ায় ধর্মীয় সম্প্রদায় বিশেষ গরুত্ব পায় এবং এ নিয়ে বিভিন্ন সময় তোলপাড় করা ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। হিন্দু - মুসলিম মারামারি, বৌদ্ধ - মুসলিম দাঙ্গা, ইহুদী - মুসলমান মারামারি আবার ধর্মের ভিতরে থেকে সুন্নি - শিয়া দ্বন্দ্ব প্রায় সময়েই ঘটে চলে বিশ্বে।


এই সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িকতা শব্দদ্বয় কিন্তু মানুষকে ঘিরেই। এখানে তা কোনোভাবেই পাখি বা ইতর প্রাণীদের বেলায় আসবে না। মানুষ মাত্রই তার নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি টান অনুভব করবে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের জীবনাচারের সাথে চলে আসা যুগে যুগে বংশ পরম্পরায় লালিত কৃষ্টি বা দুখ - সুখ মিশানো উৎসবে গভীর ভালোবাসা থাকা স্বাভাবিক মানি। এইযে প্রত্যেক গোষ্ঠী বা জাত সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শিকড়ের বন্ধনের সীমায় বসবাসকারী মানুষ, এদেরকেই ওই নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বলা হয়। এখানে নেতিবাচক কিছু নাই। নিজস্ব সংস্কৃতি ও লালিত পালিত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি ও বিশ্বাস থাকাই স্বাভাবিক এবং ইহাই সাম্প্রদায়িকতা। এ ধরনের সাম্প্রদায়িকতার ধারক মানুষরাই সাম্প্রদায়িক। আমার অর্জিত সংজ্ঞায় নেতিবাচক কিছু খোঁজার সুযোগ নাই। এ যুগে কিংবা সেই দূর অতীতের প্রস্তর যুগেও এ ধরনের সাম্প্রদায়িক লোক তাদের নিজ সম্প্রদায়কে ঘিরে থাকে। এ খুবই ভালো এবং ইতিবাচক।


এ পর্যন্ত বাংলা শব্দ সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে অনেকে নানান রকম ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরের মতে, ' সাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে এক ধরনের মনোভাব। কোনো ব্যক্তির মনোভাবকে তখনই সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যা দেয়া হয় যখন সে এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় ভুক্তির ভিত্তিতে অন্য এক ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধাচরণ এবং ক্ষতি সাধন করতে প্রস্তুত থাকে।' এখানে আমি কি বলতে চাচ্ছি দেখুন। অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পক্ষের কেউ কখনও নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধা রাখেনা। অন্য ধর্ম বা গোষ্ঠীর নীতি ও উৎসবে মানুষের হামলা অসাম্প্রদায়িকতা। আর এদেরকেই আমি বলি সম্প্রদায়ের শত্রু এবং এরাই হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক। যে নিজেকে সম্মান করে ও নিজের ভালোটা বা মন্দটা বুঝে সে কখনও অন্যের ভালো - মন্দের ব্যাপার যেখানে আছে সেখানে উদাসীন থাকতে পারেনা। বরং নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কাজে মনোযোগ রেখেও বৃহৎ সমাজের স্বার্থে ভালো কাজে সকল সম্প্রদায় মিলে যাওয়া হচ্ছে উত্তম সাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রকাশ। এমন একটি উদাহরন হলো, ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালে সু - সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী বাঙালি সংস্কৃতির ধারক জেলে, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, সাহিত্যিক, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্ম নির্বিশেষে সকলের অংশ গ্রহণে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তারপর স্বাধীন বাংলাদেশ।


বুঝতে হবে এ পৃথিবীতে প্রত্যেকেই কোনোনা কোনো সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। আর প্রত্যেক সুচিন্তক ও মননশীল মানুষ সাম্প্রদায়িক। তাহলে অসাম্প্রদায়িক শব্দের খুঁজে কি পাওয়া গেলো দেখে নেয়া যাক। যে বা যারা নিজ সম্প্রদায়কে ও শিকড় সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিকে সম্মান করে সে বা তারা প্রকৃত সাম্প্রদায়িক। পাশাপাশি ভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনকারী ওই সাম্প্রদায়িক মানুষটিকে সু - সাম্প্রদায়িক বলা যায়। আবার যারা আপন সম্প্রদায়কে উগ্র অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে অপরাপর সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদেরকে কথা ও শক্তি দ্বারা অসম্মান করে তারা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক। এখানে কবি - সাহিত্যিকদের একটি সম্প্রদায় টিকে আছে বহুকাল। সাহিত্য চর্চা করে তাঁরাও হয়েছেন সমাজবদ্ধ এবং সুন্দর সমাজ নির্মাণের কঠিন সংগ্রামে মিলে হয়েছেন সু - সাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী।


শেষ করছি আমাদের কথা বলে। এই পৃথিবীর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার ইত্যাদির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ের যে সাম্প্রদায়িকতা আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এখানেও সেই একই কথা চলে, যদি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান কিংবা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজ ধর্মকে ঠিক ঠিক ভাবে জেনে মেনে চলে তাহলে সহাবস্থানকারী সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে মারামারি হবেনা। আর তাহলে আমাদের নিয়ে দুষ্ট রাজনীতির ফায়দা রাজনীতিকগণ নিতে পারবেন না। মূলকথা হলো, সাম্প্রদায়িকতাকে ইতিবাচক রূপ দিয়ে আরো উন্নত চরিত্র গঠনের পদক্ষেপ নিলে আমরা হয়ে উঠতে পারি সু - সাম্প্রদায়িক। উগ্র জাতীয়তাবাদ বা ধর্মের কথা বলে উগ্রতার প্রকাশ ঘটালেই তা হবে বিনাশী এবং চরম অসাম্প্রদায়িকতা। আর তখনই সভ্য মানুষের ' গৌরবের সহাবস্থান সংস্কৃতি ' ও ' মানুষ সামাজিক জীব ' এসব কথার গুরুত্ব হারাবে। যারা সম্প্রদায়ভুক্ত তারাই সামাজিক এবং তারাই সাম্প্রদায়িক।।
# লেখক _ কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক।


Free Online Accounts Software