20 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 14 November 2017 সমসাময়ীক লেখা

মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কী করে!

     

বেলাল আহমদ চৌধুরী:
মানুষের জীবন ও প্রাণের নিরাপত্তা লাভ একান্তই অপরিহার্য। মানুষ যদি জীবন রক্ষায় নিরাপত্তাই লাভ না করল তা হলে খাদ্য বা জীবনোপকরণ ও নাগরিক অধিকার নিতান্তই তার জন্য অর্থহীন। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা লাভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে কোনরূপ কারণ ব্যতিত এবং আইনের চুড়ান্ত বিচার দন্ড স্বরূপ প্রাণ সংহার ব্যতীত অন্য কোন ভাবে মানুষকে হত্যা করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
চরম নৃশংসতা ঘটেই চলেছে দেশ জুড়ে। শুধু গুলি করে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি ঘাতকরা। আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে মানুষকে। মানুষ হত্যা করে লাশের গায়ে ইট বেঁধে জলের নিচে ডুবিয়ে গায়েব করে দিতে চেয়েছে। প্রশ্ন জাগে কেন এ আগ্রাসী মনোভাব? কেন এ ভায়োলেন্স? কেন এ নিষ্ঠুরতা? কেন অহরহ ঘটছে এমন জঘন্যতম নৃশংসতম সহিংসতা?
এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে বুঝতে হবে উলেøখিত অপরাধগুলোর অন্তর্নিহিত কারণগুলো। (১) অনৈতিক পরিবেশ থেকে বেড়ে ওঠা। (২) ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশীল না করা। (৩) পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক পাপ পঙ্খিলতার মধ্যে বসবাস করা। তাছাড়া বলতে হয় আমাদের বিদ্যমান সমাজ মূল্যবোধ নারীকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে মর্যাদা দিতে জানে না। সমাজে ঘটে চলা হাজারো ঘটনা আর অপরাধের মধ্য দিয়ে সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রায়শই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। ‘রুপা’ নামের তরুণীর নির্মম বিয়োগান্ত ঘটনা সাম্প্রতিক কালের সবচাইতে জঘন্যতম ঘটনা বলেই দেশবাসী মনে করেন।
দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশিত সংবাদ মারফত জানা যায় রুপা নামের তরুণী ২৫ আগষ্ট দিবাগত রাত বগুড়া থেকে ছোঁয়া পরিবহনের বাসযোগে অন্যান্য যাত্রীদের সাথে ময়মনসিংহ কর্মস্থলে ফিরছিলো। কিন্তু, পথিমধ্যে অন্যান্য যাত্রীরা নিজ নিজ গন্তব্যস্থানে নেমে পড়েন। তখন বাসে একা যাত্রী হয়ে পড়ে রুপা নামের হতভাগ্য মেয়েটি। তখন ছোয়া পরিবহনের ড্রাইভার ও হেলপাররূপী পাঁচ দুর্বৃত্ত একজন অসহায় তরুণীকে ‘শিকার’ হিসাবে চলন্ত বাসে ধর্ষণ উপভোগ করে এক পর্যায়ে ঘাড় মটকে হত্যা করে মধুপুর বন এলাকায় রাস্তায় ফেলে যায়।
ধর্ষণ মানেই হলো গায়ের জোরে নিজের পশুবৃত্তকে চরিতার্থ করা। দেশে হত্যা, ধর্ষণ, বলৎকার, অপহারণের পর গুম করে লাশ খাল, নদী, সাগরে ভাসিয়ে দেয়া ইত্যাদি আশঙ্কাজনক ভাবে মহামারির আকার ধারণ করেছে। কিন্তু, আফসোস হলো একজন অসহায় নারীর সম্ভ্রম নষ্ট করে নরপশুরা ক্ষান্ত না হয়ে “ঘাট মটকে” হত্যা করা যে কত বড় নিষ্ঠুর পৈচাশিক ও লোমহর্ষক ঘটনা জন্ম দিয়েছে- যা ইতিপূর্বের সকল ঘটনাকে অতিক্রম করে জাতীর ভীতকে নাড়া দিয়েছে।
ছোঁয়া পরিবহনের লোমহর্ষক ঘটনা ১৬ ডিসেম্বর ২০১২ ভারতের দিলøীতে একজন ছাত্রীকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এই ঘটনা পুরো ভারত জুড়ে তোলপাড় হলেও আমাদের দেশের ছোয়া পরিবহনের ড্রাইভার ও হেল্পারদের পৈচাশিক ঘটনায় সমাজ অনেকটা নিশ্চুপ। তবে কী একটা নৃশংস অপরাধের খবর পড়ে আমরা দু:খবোধ করার পাশা-পাশি মনে মনে এই ভেবে স্বস্থি পাই যে, আমি তো ওই অবস্থায় পড়িনি? কিংবা আমার আপনজন কেউ ঔরূপ ঘটনার স্বীকার হননি? আমি ভাবছি মানুষের মধ্যে যেন বিকার নেই। যেন সবই গা-সহা হয়ে যাচ্ছে। অথচ আলøাহ তায়ালা মানুষের প্রাণ ও জীবনকে অত্যাধিক সম্মানাই বানিয়েছেন। একজন মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানব সমষ্টিকে হত্যা করার সমপর্যায়ের অপরাধ।
ইতিপূর্বে ২০১৩ সালে মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণের শিকার হয় একজন পোশাক শ্রমিক। ২০১৫ সালে ঢাকায় মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় গারো তরুণীকে এবং গাজীপুরের কালিগঞ্জে নৌকার চার মাঝির হাতে ধর্ষণের শিকার হন এক নারী কর্মী, ২০১৬ সালে ময়মনসিংহে বাসে ধর্ষণ এবং বরিশালে বাস চালক ও ড্রাইভারের হাতে ধর্ষণের শিকার হন দুই বোন, ২০১৭ সালে সিদ্ধিরগঞ্জে ট্রাকে ধর্ষণের শিকার এক কিশোরী। বিভিন্ন পরিবহনে নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শান্তি না হওয়ার ধর্ষণ জণিত অপরাধ ভেড়েই চলেছে।
পরিবহনে নারীদের নিগ্রহ ও নিরাপত্তা তথা যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে সরকারকে নতুন মাত্রায় চিন্তা করতে হবে। এতদবিষয়ে কয়েকটি সুপারিশ উপস্থাপন করছি।
(১) পাবলিক পরিবহনে গাড়ীর ড্রাইভার ও হেল্পারদের জীবনবৃত্তান্ত মালিক পÿ নিকটবর্তী পুলিশ ষ্টেশনে জমা দিতে বাধ্য থাকিবেন।
(২) পাবলিক পরিবহন ষ্টেশন থেকে ভ্রমনস্থান ও আগমন ষ্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে যাত্রী উঠানো বন্ধ করতে হবে।
(৩) পাবলিক পরিবহনে প্রত্যেক যাত্রীর ভিডিও ফুটেজ করে রাখতে হবে। তাছাড়া প্রত্যেক টিকেটে যাত্রীর পূর্ণাঙ্গ নাম, ঠিকানা লিখতে হবে।
(৪) পাবলিক পরিবহন প্রস্থানের পূর্বে হাইওয়ে পুলিশের ছাড়পত্র অবশ্যই নিতে হবে।
(৫) পাবলিক পরিবহনে নূন্যপÿেদুইজন আর্মড সিকিউরিটি নিয়োগ দিতে হবে।
আমাদের দেশে বিদ্যমান সমাজ মূল্যবোধ নারীকে নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে শিখেনি। প্রতিনিয়ত সমাজে নারীদের প্রতি নেতিবাচক কর্মকান্ডের বহি:প্রকাশ ঘটছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে কঠোর হতে হবে। আমাদের দেশে আইন ও বিচার নিতান্তই আইনের গেড়াকলে আবদ্ধ। দন্ডবিধি আইনের শিথিল ধারা-উপধারা অপরাধীদের অভয়াশ্রম। অনেক সময় দেখা যায় মামলার প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতায় বিচারের বাণী নিবৃত্তে কাঁদে।
পরিশেষে বলব সমাজ থেকে এ ধরণের লোমহর্ষক ঘটনা ও নিষ্ঠুরতা নির্মুল করতে হলে ‘সামারী কোর্ট’ গঠন করে ধৃত অপরাধীদেরকে ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রাণসংহার করার বিধান চালু করতে হবে। মানবাধিকার কমিশন এ বিষয়ে সুচিন্তি পরামর্শের মাধ্যমে নারী সুরক্ষায় সচেতনতা ঘটে তুলার অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।



বেলাল আহমদ চৌধুরী
কবি ও কলামিষ্ট।
মোবা: ০১৭১১-৩১১৯২০


Free Online Accounts Software