20 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 13 November 2017 সমসাময়ীক লেখা

দ্য ব্লুহোয়েল সুইসাইড গেমঃ জাতির জন্য অশনীসংকেত

     

বেলাল আহমদ চৌধুরী:

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি জানাহারা ইমাম বলেছেন সন্তান পিতা মাতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শ্রেষ্ঠ স্বপ্ন, শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। সেই সন্তান তাদের সামনে মারা গেলে সেই দু:খ কষ্টের তুলনা হয় না। বিজ্ঞানের আর্শিবাদে মানুষ বিশেষ জ্ঞানের সহায়তায় জীবনের সর্বস্থরের রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে। ইন্টারনেট বিজ্ঞানের সেরকম একটি বিস্ময়কর আবিস্কার। বিশ্বের গতিময়তার এক মাইল ফলক ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের কল্যাণে পৃথিবী এখন মানুষের হাতের মুটোয় বন্দী। বিশেষ করে পৃথিবী এখন তরুণ তরুণীদের জন্য স্বর্গরাজ্য। আমাদের নিকট ভবিষ্যৎ দূর্ভাগ্যের না সৌভাগ্যের তা বর্তমান সময়কে মূল্যায়ন করলেই আঁচ করা যাবে বৈকি? নৈতিক অধ:পতন মানেই সর্বনাশ। এই ফুলের সুরভী, চাঁদের হাসি, সোনালী বর্ণচ্ছটা কেন জানি আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
আজ কাল আমাদের তরুণ তরুণীরা বড্ড ব্যস্থ হয়ে পড়েছে মুঠোফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ভিডিও গেইম ইত্যাদি নিয়ে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এগুলোর ইতিবাচক দিক যে নেই তা বলব না। অধিকিন্তু স্কুলের কোমলমতি ছেলে/মেয়েদের-কে নিদ্ধারিত পাঠ্যতালিকায় পার্থিব জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে ইতিবাচক দিকগুলোর পরিচয় করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পরিবার থেকে স্কুল পর্যন্ত গড়ায়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচীতে মৌলিক মানবিক, নীতি-নৈতিকতা, সচেতনতা ও মূল্যবোধ চর্চার ওপর খেয়াল রেখে পাঠ্যবিষয় সন্নিবেশিত করা আবশ্যক, তা হলে শিশু বয়স থেকেই কোমলমতি সন্তানরা সততা, নৈতিকতা ভাল মন্দ এসব কিছু পরিবারের পাশা-পাশি স্কুলে চর্চা করে আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারবে।
একজন শিশুকে জীবনের প্রথম পাঠ ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। স্বধর্মে প্রেম পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা আর অধর্মের প্রতি দয়া এই তিনটি শিক্ষার বীজ শিশুমনে বপণ করতে হবে। এই শিক্ষা জীবনভর অনৈতিকতার কুফল থেকে তাঁকে রক্ষা করবে। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাকালে দেখা যাবে মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয় পরিবার, সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে বিস্তৃত হচ্ছে। ইদানিং কিশোর-কিশোরীদের অপরাধ জগতে জড়িযে পড়ার পিছনে অবাধ সামাজিক যোগাযোগ ইন্টারনেট সাইবার জগৎ, পর্নোগ্রাফির অবাধ ছড়াছড়ি। এসবই আমাদের সন্তানদেরকে অতিমাত্রায় আবেগ তাড়িত করে আকৃষ্ট করে তুলছে। এই জন্য সামাজিক সচেতনতা জরুরী হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক রাষ্ট্রের সুদৃঢ় ভীত হলো তার যুবশক্তির সুরক্ষা ও সুশিক্ষা। পুষ্প যেমন ধীরে ধীরে বিকশিত হয়, তেমনি কিশোর-কিশোরীরা বিকশিত হওয়ার সাথে তার চারপাশের পরিবেশ যদি স্বচ্ছ, নি:স্কলুস দেখতে পায় তা হলে সেখানে নির্ভরতা থাকা সম্ভব।
শিশুর সঙ্গে মায়ের জীবন নোঙ্গরের মতো গ্রথিত। এই জন্যই বুঝি নেপোলিয়ান বেনোফাইড বলেছেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিব।” কিন্তু দু:খের সঙ্গে বলতে হয় অনেক বাবা মা ভাল অভিভাবক নন অর্থাৎ গুড প্যারেটিং নন। যেমন ছেলে-মেয়ে কি চায় বাবা/মা তা শুনতে চান না। স্কুলের খাতায় কত নম্বর পেয়েছে সেটা দেখা নিয়ে বাবা মা অস্থির। কিন্তু সন্তানের কুশলাদিটুকু তারা জানতে চান না। এমনকি খাতায় নম্বর কম দেখতে পেয়ে তৎÿনাতই শিশুকে বকুনি দিতে কার্পন্য করেন না। তাঁরা সন্তানকে হোম টিউটর, কোচিং সেন্টার, আর্টস্কুল, গানের স্কুলে নিয়ে দিনমান ছুটাছুটি করে বেড়ান। উনারা সন্তানকে গেøাবাল সিটিজেন হিসাবে দেখতে চান। সন্তানের সঙ্গে মমতায় না জড়িয়ে মূল্যবোধের শিÿা না দিয়ে গৃহবন্দী করে হাতে তুলে দেন মুঠোফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ভিডিও গেইমস ও টেলিভিশন এসব কিছু সন্তানকে দিÿা দেয় অনাচার, অবÿয় আর অনৈতিক শিÿা আর তার কারণ হলো ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা। এক সময় ওরা সব কিছুতে নেতিবাচকতা দেখতে পায় সেই সাথে যুক্ত হচ্ছে অস্থিরতা। গৃহবন্দী থেকে সাইবার জগতে আকৃষ্ট হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে কৈশোরের চাঞ্চল্য। যৌবনের উন্মাদনায় নতুনত্বের প্রতি আগ্রহ আর ব্যাকুলতা হলো মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট। কিশোর-কিশোরীরা নতুনত্বের খোঁজে ল্যাপটপে ইন্টারনেটের ব্রাউজিং হিস্ট্রি ওযেব সাইডে খুঁজে বেড়ায় বিজাতীয় সংস্কৃতি। এভাবেই ক্রমান্বয়ে আমাদের তরুণরা জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে ছিন্নমূল হয়ে আকাশ সংস্কৃতিতে আসক্ত হয়ে পড়ে।
অতি সম্প্রতি আমাদের দেশে অশনী সংকেত নিয়ে এসেছে দ্য বøুহোয়েল- সুইসাইড গেম। এই গেমে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি থেকে উদ্ভুদ্ধ হয়ে অবিশ্বাসকে আরও উসকে দেয় এবং কিশোর মনের গহীনে শূন্যতাও হতাসার সৃষ্টি করে। তার কারণ হলো শিশুমনে বিষন্নতা- সেখানে আবেগের প্রকাশ কম। শিশু মনে কোন কিছুই তখন আর ভাল লাগে না, দু:খ বোধ হয় হতাশার জন্ম দেয়। তখনই ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়।
দ্য বøুহোয়েল গেম হলো অন লাইনভিত্তিক একটি গেম যা অনলাইনে একটি কমিউনিটি তৈরী করে। ঐ সব হতাশা গ্রস্থ কিশোর-কিশোরীকে আকর্ষণ করে যা এক চিন্তা থেকে আর এক চিন্তায় দ্রæত নিয়ে মোহগ্রস্থ করে ক্রমশ: চ্যালেঞ্জিং কাজ মোকাবেলা করতে উদ্ভুদ্দ করে। আর! এই চ্যালেঞ্জিং-ই- হলো আত্মহত্যার চিন্তা, প্রবণতা ও মরে যাওয়ার ইচ্ছা।
২০১৩ সালে রাশিয়ার ফিলিপ বুদেইকিন এফ ৫৭ নামে এই মরননেশা গেমের আবিস্কারক। ২০১৫ সালে গেমটিতে আসক্ত হয়ে প্রথম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এই গেম খেলে ১৬ জন কিশোরীর আত্মহত্যা করে। ২০১৬ সালে বুদেইকিন-কে আটক করা হয়। কথিত ধারণা থেকে বলা যায় নীল তিমিরা নাকি মারা যাওয়ার আগে জল ছেড়ে ডাঙ্গায় ওঠে আসে। এটা যেন আত্মহত্যার সামিলের নামান্তর। এ থেকেই গেম-এর নাম দ্য বøুহোয়েল।
সাম্প্রতিককালে অনলাইন জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় হলো দ্য বøুহোয়েল গেম। এই ভয়ঙ্কর মরণ নেশার ফাঁদে আমাদের নতুন প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা আকটা পড়ছে। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে না সত্যের ভ্রæকুটি। নেশার জালে আবদ্ধ হয়ে উত্তরনের পথ পাচ্ছে না। ওরা অবচেতন মনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। সংস্কৃতি হলো জাতীয় গৌরবময় ইতিহাস। যে সংস্কৃতি সজ্জীন (মড়ড়ফ ষরভব) কে বাদ দিয়ে জাতীয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আত্মহননের পথ দেখায়। সেটা আর যাই হউক না কেন এই নোংরা সংস্কৃতি বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা বলে মেনে নেয়া যায় না। আর দেরী নয়, পরিবার থেকেই এই ভায়োলেন্স অপসংস্কৃতিকে প্রতিহত করতে হবে। এখন থেকে অভিভাবকদের সতর্ক নজরদারী বাড়ানো দরকার সন্তানদের ওপর।
কিশোর-কিশোরীরা কৌতুহল প্রবন। সন্তানদের মধ্যে যদি নি¤েœাক্ত লক্ষণ পরিলÿিত হয় যেমন (১) লেখাপড়ায় মনযোগ কমে যাওয়া। (২) রোম বন্ধ করে থাকা পছন্ করা, (৩) ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়া অর্থাৎ ঘুম এলেও ঘুমাতে না যাওয়া (৪) উত্তেজিত থাকা। ভাংচুর করা বা রাগান্বিত ভাব পরিলীক্ষিত হওয়া (৫) মুঠোফোন, ল্যাপটপ নিয়ে বেশী মগ্ন থাকা। এহেন উপর্যুক্ত কার্যকলাপ সন্তানের মধ্যে পরিলক্ষিত হলে অভিভাবকদের সন্তানকে নিবিড়ভাবে ভালবাসতে হবে এবং একাকী না রেখে সন্তানকে অধিক সময় দিতে হবে। প্রয়োজনে অবস্থা দৃষ্টে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শের জন্য দারস্থ হতে হবে।
আশার কথা হলো অতি সম্প্রতি দ্য বøুহোয়েল গেম নিয়ে উদ্বেগের প্রেÿাপটে রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানী শেষে ১৬ অক্টোবর মাননীয় বিজ্ঞ হাইকোর্ট গেমটির সব লিংক বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ জারী করেছেন এবং বিটিআরসি এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন।
ইন্টারনেট একটি বিশাল নেট ওয়ার্কিং সিস্টেম। যার বি¯Íৃতি পৃথিবীময়। আন্তর্জাতিক তথ্য প্রবাহের সঙ্গে ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ অনলাইন নেটওয়ার্ক প্রচলন শুরু হয়েছে। কাজেই, সময় এসেছে শতাব্দীর এই বিস্ময়কর প্রযুক্তি ইন্টারনেট সেবাকে নিয়ন্ত্রিত রেখে এগিয়ে গেলে তবেই সুফল আসবে।
পরিশেষে বলতে চাই ভয়ঙ্কর এই মরণনেশা থেকে বাঁচতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক উদ্ভুদ্ধ করণ এবং ব্যাপক হারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তবেই; জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে।


বেলাল আহমদ চৌধুরী
কবি ও কলামিষ্ট।
মোবা: ০১৭১১-৩১১৯২০


Free Online Accounts Software