20 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 7 November 2017 শিক্ষা

মতামত : সোজাসাপ্টা

     

আলমগীর হোসাইন:: ডিগ্রি (বাঁশ) কোর্স বাংলাদেশের একটি শিক্ষা ব্যাবস্থার নাম ! চাকরি নামের সোনার হরিন ধরতে চাই উচ্চ শিক্ষার সার্টিফিকেট ঘোড়া । ঘোড়া খোঁজতে গিয়ে কারো জীবন খোঁড়া কেউ দিশেহারা । ঘোড়া পেয়েও অনেকের হরিন থাকে অধরা । অল্পসংখ্যক সন্ধান পায় সেই সোনার হরিনের, বাকিদের জীবনে অভিশাপ হয়ে হাজির হয় বেকারত্ব । শুধু চাকরি নয়, উচ্চ শিক্ষিত না হলেতো সমাজের সংজ্ঞায় মুখপুড়া বলদ । তাই সমাজে মাথা উঁচু করে দাড়াতে কিংবা বলদ উপাধি থেকে রেহাই পেতে হলেও প্রয়োজন পড়ে উচ্চ শিক্ষার ।
উচ্চ শিক্ষার খায়েশ মেটাতে এইচ.এস.সির পর শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ । পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হলে মিলে মোটাদাগের স্বস্তি, তবু মাঝেমাঝে কিছু অসস্থির খবরও পাওয়া যায় । টাকার দাপটে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা চলে কিছুটা থাথাথৈথৈ ভাব নিয়ে তবে সেখানেও কিছু প্রতিষ্টানের বিরুদ্ধে আছে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ । কিন্তু জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যাবস্থার মারপ্যাঁচের অথৈ জলে পড়ে দিক হারা এক বিশাল জাতির যেন চলথাম-থামচল অবস্থা । ডিগ্রির অবস্থাতো আরো করুন । একেবারে লেজেগুবরে ।
উচ্চতর ডিগ্রির সুবাদে ডিগ্রি (পাস কোর্স) জীবনে কোথায় আশির্বাদ ডেকে আনবে, তার বদলে হয়েছে অভিশাপের জোগাড়। একেতো দীর্ঘ সময়ের সেশনজট তার উপর আবার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি । তিন বছরের কোর্স পাঁচ বছরে এসেও অনেক সময় পিছলে পিছলে ছয় বছর নিয়ে টান দেয়। শেষ বর্ষে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে যদি কেউ কোন এক বিষয়ে একটু এদিক সেদিক মানে রোজাল্ট খারাপ হয় তবে সাত বছরের আদুভাই হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই । ঠিকটাক তিন বছরের মাথায় শিক্ষাব্যাবস্থার এ দূর্ঘটনায় পড়ে চার বছর খোয়া গেলেও কিছুটা মানা যেত । কিন্তু ছয় সাতটা সাল ! অবস্থা বেসামাল ।
বাবা-মায়ের আশা থাকে সন্তান উচ্চ শিক্ষিত হয়ে চাকরি নেবে । সংসারে অভাবের অন্ধকার ঘুচিয়ে ধপ করে জ্বলে উঠবে সুখের আলো । কিন্তু সে আশা যেন নিভু নিভু করে প্রতিনিয়ত । ২০১৩ সালের ডিগ্রি (পাস) ৩ বছর মেয়াদী কোর্সের শিক্ষার্থীরা ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এসে দিয়েছে শেষ বর্ষের পরিক্ষা । রেজাল্ট বের হতেহতে ২০১৮ এর মাঝামাঝি আর সার্টিফিকেটে পেতেপেতে সময় গিয়ে কড়া নাড়বে ২০১৯ এর দুয়ারে । বিজ্ঞ পাঠকের এবার চোখ কপালে উঠেছে নিশ্চই ! এটাই চরম বাস্তবতা । যেন কিচ্ছু করার নেই মন চাইলে পড়। হ্যা মন চায়না বলে কেউ পড়ালেখা বাদ দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়, কেউ লেগে যায় পৈত্রিক ব্যাবসায়। ২০১৩ সালে ভর্তিকৃত এই শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকে পা দিয়েছিল ৬-৭ বছর বয়সে । এইচ.এসসি পাশ পর্যন্ত শিক্ষা জীবন ১২ বছর সহ মোট ১৮-১৯ বছর। এরপর ডিগ্রির রেজাল্ট পর্যন্ত সময় ধরলে যোগ হয় আরো নিদেন পক্ষে ছয় বছর ক্ষেত্র বিশেষে অনেকের সাতও হয় সব মিলিয়ে বিএ (পাস) পাশ করতেই পার হয়ে যায় জীবনের ২৫ থেকে ২৬ বছর । আমার এ হিসাব পাক্কা । রেজাল্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করুন হিসাব মিলে যাবে ।
ডিগ্রির পরে মাস্টার্সের হিসাবটা না হয় আপনারাই করুন ।
আচ্ছা অবশেষে রেজাল্টতো হবে সেখানে ফার্স্টক্লাস কয়টা থাকবে ? ইতোপূর্বে ডিগ্রি (পাস) সম্পন্নদের হিসাবের সাথে মিলিয়ে নিলে চুখ বুজে বলা যায় ফার্স্ট ক্লাস আসবে খুবই নগন্য হারে । এখন হয়তো অতি পন্ডিত হয়ে কেউ মুখের উপর ঠাস করে বলে দিতে পারেন । পড়ালেখা করেনি হাদারাম সর্দারেরা কি করে ভাল রোজাল্ট করবে ? আমি বলবো হাদারাম কেউ ছিলোনা হাদারাম কেউ নয় জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থার গড়িমসি অবস্থাই মেধাবী এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে এ পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে । প্রতি শিক্ষাবর্ষের মাঝখানে বিশাল গ্যাপ । এই গ্যাপের কারনে শিক্ষার্থীরা পাঠে মনযোগ হারিয়ে ফেলে । দেখা গেছে ডিগ্রি পাস কোর্সের প্রায় সব শিক্ষার্থীরাই নিজেকে পরিবারের বুজা মনে করে। নিজের এবং পরিবারের চাহিদা মেটাত কেউ পার্ট টাইম, কেউ ফুল টাইম আবার কেউ কোন ধরনের আয়ের উৎস না পেয়ে অস্বস্তিতে ভোগে।ফলে পাঠ থেকে মন সরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক । তাই পরিক্ষার দুই একদিন আগেই শুরু হয় পড়ালেখার ব্যাস্ততা । লক্ষ্য করে দেখুন ছুরি যতই ধার হোক এটা দিয়ে কাজ না করে ফেলে রাখলে এক সময় জং ধরবে, ধার চলে যাবে। ঠিক তেমনি ক্ষুরধার মেধাবীরাও দীর্ঘ গ্যাপের যাতাকলে পড়ে পাঠ মনযোগ হারিয়ে ফেলে । ফলে যা হওয়ার তাই হয় ডিগ্রি পাসের রোজাল্টে দেখা যায় সেকেন্ডক্লাসের বন্যা । থার্ড ক্লাসও কম নয় ।
জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট কমাতে কম কথা হয়নি । রাজপথে নেমেছে শিকার্থীরা । তবু যেই লাউ সেই কদু । শিক্ষাব্যাস্থার উন্নয়ন এবং পরিবর্তনের অনেক আশা নিয়ে এ থেকে বের হওয়ার নানান কৌশলের কথা পত্রিকার পাতায় প্রতিনিয়ত লিখে যাচ্ছেন বিজ্ঞজনেরা । সমান আশা নিয়ে সে লেখা ছাপেন সম্পাদক । কিন্তু যাদের উদ্যেশ্যে পাতার পর পাতা লেখা হয় তাদের কাছে যেন এগুলো এমন কি আর ? এগুলোতে পাত্তা দেওয়ার সময় নেই কারো। তাহলে এতো সব প্রতিবাদ, বিশ্লেষন সব কি শুধু পত্রিকার পাতা ভরানোর জন্য ? যা দিয়ে ঝালমুড়ির টুঙা বানানো ছাড়া কাজের কাজ কিচ্ছু হবেনা ? জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খামেখেয়ালী নীতির ফলস্রোতিতে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে হতাশায় ভুগছে কয়েক কোটি সম্ভাবনাময় মেধাবী মুখ প্রতি বছর সেখানে যুগ হচ্ছে আরো নতুন মুখ ।
বিভিন্ন সূত্রমতে বাংলাদেশে কর্মক্ষম দশ কোটি মানুষের মধ্যে চার কোটি বেকার । এ হিসাবে শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত বেকার রয়েছে । লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৪৭ জনই বেকার । আর এই ৪৭ জনকে নিয়ে বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে এর সিংহভাগই জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাসকোর্স ডিগ্রিধারী ।
.
যেখানে অনার্স সম্পন্ন কারিদেরই পর্যাপ্ত চাকরি কাপালে জুটছেনা সেখা ডিগ্রি (পাস) সম্পন্ন কারিদের অবস্থা কি পর্যায়ে সেটা সহজেই অনুমান করা যায় । অনেকে বলেন ডিগ্রি সম্পন্ন করে মাস্টার্স করলে অনার্সের পর মাস্টার্সের সমান যোগ্যতা হয়। তা হয় বটে তবে নিয়োগদানকারী প্রতিষ্টানেরতো প্রথম এবং শেষ পছন্দ অনার্স সহ মাস্টার্স । ডিগ্রি পাস সহ মাস্টার্সের মূল্যায়ন তেমন হয়না। তাহলে কেন এই ডিগ্রি (পাস) ব্যাবস্থা? ডিগ্রি নামের লাগামহীন এই শিক্ষাব্যাবস্থার পেছনে সরকারে কোটি কোটি টাকা লগ্নি করার মানে কি ?
.
বর্তামান সরকারের আমলে সেশনজট কমিয়ে নিয়ে আসার একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে । হয়তো কিছুটা সফল হচ্ছেও কিন্তু সে সফলতার হার খুবই অল্প । আগামী দিনের ডিগ্রি পাস কোর্সের শিক্ষার্থীদের কপালে কি জুটবে তা পরিষ্কার বলা যাচ্ছেনা তেমনি ইতোপূর্বে যারা জীবনের সবচেয়ে মূলবান সময়টুকু ব্যায় করে কোর্সটি সম্পন্ন করলো বা শিগ্রই করবে তাদের জীবনেররই বা উপায় কি হবে ? এরা কি পাবে জীবনে একটু আলোর ছোঁয়া ? আসলে বাঙ্গালীর বাঁশ খাওয়া কথাটির সাথে প্রতিনিয়ত মিলে যাচ্ছে এই ডিগ্রিধারীদের জীবন । কোন এক ওয়াজ মাহফিলে এক হুজুর বক্তৃতার সময় বলছিলেন, “বাংলাদেশটা পুরা একটা বাঁশ বাগান। এক পক্ষ বাঁশ দেয় আরেক পক্ষ বাঁশ খায় ।” ব্যাপারটা এমন যে সেই বাঁশ বাগানেরই এক অংশ বাঁশই যেন শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাঁশ দিয়ে যাচ্ছে । আর শিক্ষাক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় বাঁশের নাম ডিগ্রি (পাস) । এখানে জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বাঁশ দেনেওয়ালা আর পাসকোর্সের শিক্ষার্থীরা হচ্ছে বাঁশ খানেওয়ালা জাতি । পাসকোর্সের এই দূরাবস্তা বিশ্লেষন করে ডিগ্রি (পাস) কোর্সকে বরং ডিগ্রি (বাঁশ) কোর্স বলাই শ্রেয় ।
কথা হচ্ছে ডিগ্রি (পাস) সম্পন্নকারিরা না পারে কোন কাজ , সংকোচিত চাকরিবাজারে না মিলে চাকরি । আর মিললেও সেটা যোগ্যতার সাথে খাপ খায়না । ফলে জীবনটা হয় ধোঁয়ায় অন্ধকার । দূর্বল কাঠামো এবং দূরদর্শী শিক্ষাব্যাবস্থার অভাবই এখানে দায়ী । এ থেকে বের হওয়ার উপায় কি ? আমার মনে হয় এ থেকে মুক্তির একমাত্র মন্ত্র হতে পারে কারিগরি শিক্ষার প্রতি প্রজন্মকে উৎসাহিত করা । আমাদের দেশে আবার এ ব্যাপরে গোড়াতেই গলদ । আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষাকে কামলাগিরি শিক্ষা বলে কটাক্ষ করা হয়। শিক্ষা জীবনের শুরুতে সে কটাক্ষ কানে তুলে অনেকে কামলা না হয়ে ছুটেছিলেন আমলা হওয়ার পিছনে। শেষ পর্যন্ত এসে না হোন কামলা না আমলা । তাই এ ধারনা থেকে বেরিয়ে কারিগরিজ্ঞানের বৃদ্ধিকল্পে উন্নত কারগরি শিক্ষাপ্রতিষ্টান গড়ে তুলতে হবে । এতে করে ডিগ্রি পাস কোর্সের উপর চাপ কমবে । কারিগরিজ্ঞান সম্পন্ন যেকোন ব্যাক্তি যেমন নিজে কিছু করে স্বাবলম্বী হতে পারবে তেমনি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে প্রবাস থেকেও দেশের জন্য সুনাম বয়ে নিয়ে আসতে পারে । অবশেষে একটি কথা যে করেই হোক পাস কোর্সের এই বিশাল গ্যাপের লাগাম ঠেনে ধরতেই হবে। এতে করে সঠিক সময়ে কোর্স সম্পন্ন করে কাজ না হলে ভিন্ন পথে চেষ্টা করা যোতে পারে ।
সার্টিফিকেটের বান্ডেল নিয়ে বগল দাবা করে দ্বারেদ্বারে চাকরির জন্য ঘুরার দিন শেষ হোক । যোগ্যতানুযায়ী নিশ্চিত করা হোক চাকরি। শিক্ষিত দক্ষ বিশাল জনগোষ্ঠীর হাত ধরে বাংলাদেশ উঠে আসুক উন্নত দেশের কাতারে ।

লেখকঃ আলমগীর হোসাইন
শিক্ষার্থীঃ জাতিয় বিশ্ববিদ্যালয়
০১৭৩৯-৮৪৫০৮২


Free Online Accounts Software