18 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 2 November 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 324) 

তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম

তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম
     

হারান কান্তি সেন:
যখন প্রথম দিন কলেজের পথে পা বাড়িয়েছি তখন কে যেন বললো-কলেজ যাচ্ছ,স্কুলের সব কিছু ভুলে যাও।কলেজে চলাফেরা,ক্লাশ করা,উপস্হিতি দেয়া সবকিছু আলাদা এবং আমাদের আম্বরখানা কলোনীর পাশের বাড়ির ইলুভাই বললেন-এখানে আরেকটা সুবিধা হলো কলেজের স্যাররা স্কুলের মত বেত দিয়ে পিটান না!
দুরু দুরু বুকে সিলেট শহরের লামাবাজারে মদন মোহন কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করি।এদিকে গেট থেকে'ই চোখে পড়লো আমাদের (প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্র-ছাত্রী)স্বাগত জানিয়ে নানান রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের মিছিল।আগের দিন শুনেছিলাম আমাদের ক্লাশরুম দু'তলায়। তাই কলেজে ঢুকে খুঁজতে থাকি স্কুল জীবনের বন্ধুদের।
বিল্ডিং-এর কাছে যেতেই দেখি জটলা পাকিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে অনেক ছাত্র-ছাত্রী উৎসুক হয়ে কি যেন দেখছে!এখন দেখি বেশ স্বাস্হ্যবান কালোমত গায়ের রং ছেলেটি মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে! সে তখন বেহুশ আর তার মুখ দিয়ে ফেনা'র মত বেরুচ্ছে।কে একজন বললো-"এ্যাই এটা মৃগি(এপিলেপ্সি) ব্যামার -এর নাকের কাছে চামড়ার জুতা নিয়ে লাগাও দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে!"
পিছন থেকে আরেকজন বললো-' এর দুইপাটি দাঁতের মাঝে পয়সা মানে ১০ পয়সি কয়েন ধরে রাখো দেখবে তার দাঁতকপাটি লাগবে না!' এদিকে আমার সামনের ছাত্রটিকে পাশের জন বলে-"তুমি পারবে ওর দাঁতের মাঝে পয়সা ধরতে?" উত্তরে এই ছেলেটি বলে -"না রে ভাই আমি পারবো না-পয়সা ধরলে যদি আঙ্গুল কামড়ে দেয়!"
নেতা নেতা মনোভাবের আরেকজন আবার তার নিজের বাম পায়ের সু খোলে বেহুশ ছেলেটির নাকের কাছে আলতো করে ধরতেই দেখা গেল ছেলেটির খিঁচুনী ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল এবং সে আস্তে আস্তে স্হীর হয়ে মাটিতেই শোয়ে থাকে!
এদিকে আমাদের স্কুলের এক সহপাঠী দ্রুত এসে আমার হাত ধরে বলে-"দোস্ত তাড়াতাড়ি ক্লাশে আয়, স্যার কমন রুম থেকে বেরিয়ে এদিকে আসছেন।" আমরা শ"দুয়েক ছাত্র-ছাত্রীর অনেকেই সোলেমান হলের পাশের আমাদের জন্য নির্ধারিত ক্লাশটিতে ঢুকে পড়লাম।
একটু পরে'ই স্যার এসে ঢুকলেন। তিনি আমাদের বাংলা'র স্যার।
এবার স্যার তাঁর চেয়ারে না বসে টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন-
আমি বিজিত কুমার দে।তোমাদের বাংলা পড়াবো।এই শহরে কেটেছে আমার শৈশব,কৈশোর,আর তারুণ্যের সোনালী সব দিনগুলো। আমার পৈত্রিক নিবাস এই শহরের কেন্দ্রস্হল চৌহাট্টায়।তোমরা নিশ্চয়'ই দেখে থাকবে ওখানে সেন্ট্র্যাল ফার্মেসী নামে একটি ঔষধের দোকান আছে-ওটি আমাদের পারিবারিক ব্যবসা এবং এর পিছনের বড় বাড়িটি আমাদের।
তক্ষুনী আমরা এ ও'র দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকি-কারণ ওই ফার্মেসী আমাদের অনেক চেনা।
স্যার এরপর বলেন-"আজ আমি তোমাদের নির্দিষ্ট কোন চাপ্টার পড়াবো না-চল আজ আমরা গল্প করে কাটাই।"
এই গল্পের মাঝে'ই তিনি অনেক উপদেশমূলক গল্প বলতে থাকেন।এরমধ্যে দু'একটি গল্প আজও(সেই ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর)আমার মনে গেঁথে আছে।
স্যার কথায় কথায় বলেন-"স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন-এই পৃথিবীতে যখন জন্মেছ তখন তোমাদের একটা চিহ্ন রেখে যাওয়া উচিত এবং তোমরা নিজেদের কর্ম দ্বারা তা'ই প্রমাণ করবে।কারণ মানুষ তার কর্মগুণেই সেরা হয় এবং সবার মুখে মুখে তার সুনাম ও জয় জয়কার উচ্চারিত হতে থাকে।তোমরা শিক্ষা,খেলাধুলা,সাহিত্য,সঙ্গীত ইত্যাদি ক্ষেত্রে আউটস্ট্যান্ডিং যোগ্যতম অবদান রাখতে পার।আর তখন তোমাদের শিক্ষক হিশেবে আমি'ই সবচেয়ে বেশি খুশি হবো।
এরপর থেকে আমি কখনো স্যারের ক্লাশ মিস করতাম না এবং লক্ষ্য করতাম বিজিত স্যার ছাত্রদের সাথে নিস্পাপ শিশুর মত মিষ্টি করে কথা বলতেন।তখন একেকটা ক্লাশের ব্যাপ্তি ছিল ৪৫ মিনিট এবং স্যারের পিরিয়ডগুলো যেন ১৫ মিনিটে শেষ হতে!
আমরা অনেকেই নিজেরা নোট করে স্যারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি খুব সহযোগিতা করতেন।
আজ যখন স্যার নিজের জীবনের ৮৫ বছর পূর্ণ করে ৮৬'র বারান্দায় তখন আমি শ্রষ্টার কাছে এই প্রার্থনা করি আমাদের প্রিয় এই স্যার যেন সুস্হ দেহে শতায়ূ হোন।


Free Online Accounts Software