18 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 26 October 2017 সাক্ষাৎকার  (পঠিত : 1222) 

শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও মাওলানা ভাসানীর আদর্শ বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেন সৈয়দ আশরাফ

শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও
মাওলানা ভাসানীর আদর্শ বাস্তবায়নের
স্বপ্ন দেখেন সৈয়দ আশরাফ
     

তাসলিমা খানম বীথি:
-কে এসেছে রে?
গলার আওয়াজ শুনে রুমের বাইরে থেকেই সালাম দেই। সালামের আওয়াজ শুনে তিনি বললেন, নারীর কন্ঠ! এত দিন পর নারীর কন্ঠ শুনতে পেলাম। তখন তিনি ধীর স্থিরভাবে বেডরুমের বাইরে আসলেন। আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না?
প্রবীণ আইনজীবী সৈয়দ আশরাফ হোসেন, তার সাথে আগে পরিচয় ছিলো না। বললাম, প্রবীণ সাংবাদিক মুহম্মদ বশিরুদ্দিন সাহেবের সাথে এসেছি, আপনার সাক্ষাতকার নেবার জন্য।
আমাদেরকে তার ড্রইংরুমে বসালেন। অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে তার জীবনের ৮৩টি বসন্তের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলছিলেন। চুরাশীতে পা দিয়েও তিনি এখনো প্রাণবন্ত, সতেজ সজীব। বই পড়তে প্রচন্ড ভালোবাসেন তিনি। তাই চশমার পাওয়ার ৩৫০ হলেও দিব্বি বই পড়ে অবসর সময়কে পার করে দিচ্ছেন।

এডভোকেট সৈয়দ আশরাফ হোসেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার বালিঙ্গা গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী বনেদী পরিবারে ১৯৩০ সালের ৩০ শে আগস্ট জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবা মরহুম সৈয়দ আরব আলী ব্রিটিশ ভারতের পুলিশে চাকুরি করতেন। তিনি ছিলেন দারোগা। সে সুবাদে তৎকালীন আসাম রাজ্যের বিভিন্ন থানায় পরিবার নিয়ে থাকতেন। সৈয়দ আশরাফ হোসেনের জন্মের সময় বাবা কাছাড় জেলার হাফলং থানার ওসি ছিলেন। সেখানেই তিনি জন্মগ্রহন করেন।

এডভোকেট সৈয়দ আশরাফ হোসেনের বাবার মৃত্যুর পর তাদের পরিবার বালিঙ্গায় রয়ে গেলো। পরিবারে কিছুটা দূর্যোগ নেমে এলো তখন। সাত ভাইবোনেরা সবাই ছিলেন বয়সে ছোট। চাচাদের তত্তাবধানে স্থানীয় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করে নিজ উদ্যোগে দীঘিরপার রক্ষিনী মোহন হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি, পরে বিয়ানীবাজার হরগোবিন্দ হাইস্কুলে ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি হন। বাড়ি থেকে অনেক দূরত্বের রাস্তা অতিক্রম করে স্কুলে যাতায়াত কঠিন হওয়ায় তিনি মামার সঙ্গে চট্টগ্রামে গিয়ে ডাবলমুরিং থানার রাহাত আলী হাইস্কুলে ক্লাশ এইটে ভর্তি হন। তার মামা চাকুরির সুবাদে চট্টগ্রামে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে মামার নির্দেশে তিনি বিয়ানীবাজার হাইস্কুলে নবম শ্রেনীতে ভর্তি হন। এখান থেকেই তিনি ১৯৫৪ খ্রি. মেট্টিক পাশ করেন। বিয়ানীবাজার হাইস্কুলে অধ্যয়নকালেই বাংলায় ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’ এবং যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনের পক্ষে কাজ করেন। মিটিং-মিছিল এবং সভা-সমিতিতে যোগদান করেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারেও তিনি শরীক হন।

মেট্রিক পাস করার পর তিনি এমসি কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৬ সালে ইন্টারমেডিয়েট, ১৯৫৮ সালে বি.এ পাশ করেন। পরিবর্তীতে তিনি এলএলবি পরীÿায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৫ সালে সিলেট বারে যোগদান করেন। এমসি কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি প্রত্যÿ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন-এর সঙ্গে জড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে তিনি সংগঠনের পক্ষ থেকে নির্বাচন করেন এবং এমসি কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সৈয়দ আশরাফ হোসেন সাত ভাইবোনদের মধ্যে চতুর্থ। তাঁর বড় ভাই সৈয়দ আমীর আলী পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে চাকুরি করতেন। স্বাধীনতার পর তিনি দেশে ফিরে চা বাগানের ব্যবস্থাপক থেকে অবসর নিয়েছেন। বর্তমানে তিনি বড়শালা নিজ বাড়িতে অবসর জীবন যাপন করছেন। তিনি পত্র-পত্রিকায় কলাম লেখেন। দূর্নীতি প্রতিরোধ আন্দোলন সিলেট এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। দ্বিতীয় ভাই সৈয়দ মোহাম্মদ আলী রেলওয়েতে চাকুরি করতেন। অবসর জীবন যাপনকালে মারা যান। চতুর্থ ভাই সৈয়দ মোস্তফা কামাল মমÍই। তিনিও ছিলেন একজন কলম সৈনিক, রাজনীতিবিদ। তিন বোনদেরও বনেদী পরিবারে বিয়ে হয়েছে।

সৈয়দ আশরাফ হোসেন ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন আন্দোলন-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। সিলেটের গণভোট, ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি স্থানীয় ও জাতীয় আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহন করেন। এরই মধ্যে তিনি ভাসানী ন্যাপ-এ যোগদান করে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সিলেট বিভাগের নেতৃত্ব দেন। সে সময় মাওলানা ভাসানীর সন্তোষে ঘন ঘন যাতায়াত করতেন। এমনিভাবে ভাসানীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। মাওলানা ভাসানীর ‘খোদায়ী খেদমতগার’ ফারাক্কা লং মার্চ ইত্যাদি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন এবং নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে মাওলানার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ‘মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ভাসানী অনুসারী পরিষদ’ গঠন করেন। এ দুটো সংগঠণের মাধ্যমে তিনি মাওলানা ভাসানীর আদর্শ প্রচারের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
এডভোকেট সৈয়দ আশরাফ হোসেন জীবন জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশায় নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন। তিনি ১৯৫৮ সালে শিক্ষা জীবন শেষ করার পর চট্টগ্রামে ইস্পাহানি জুট মিলে লেবার অফিসার হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে মন বসাতে না পেরে চাকুরি ছেড়ে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। সেখানেও অকৃতকার্য হয়ে সিলেটে এসে গ্যাস লাইনের ঠিকাদারী শুরু করেন। ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাস লাইন স্থাপনের ঠিকাদার হিসাবে কাজ করেন। ঠিকাদারী ব্যবসায়ে কোনোমতে উন্নতি করতে না পেরে ফেডারেল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সিলেট অঞ্চলের ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকুরীতে যোগদান করেন। ১৯৮৫ সালের আগ পর্যন্ত সেখানে চাকুরী করে অবসর নিয়ে সিলেট বারে যোগদান করে সফলভাবে আইন পেশা চালিয়ে গেছেন এবং এখনও এ পেশায় নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। সৈয়দ আশরাফ হোসেন একজন প্রকৃত শিÿানুরাগী। তিনি বালিঙ্গা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও ইসলামপুর শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়েও দীর্ঘদিন ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সৈয়দ আশরাফ হোসেন পাঁচ সন্তানের জনক। তার সন্তানেরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তিন কন্যা ও দুই পুত্র ঢাকা ও লন্ডনে বসবাস করছেন। তাঁর সহধর্মীনি সৈয়দা রাবেয়া খানম ২০০৫ সালে ২৫ আগষ্ট না ফেরার দেশে চলে যান। বর্তমানে এডভোকেট সৈয়দ আশরাফ হোসেন শাহজালাল উপশহরের এ ব্লকের নিজস্ব বাসভবনে নি:সঙ্গ জীবন যাপন করছেন।

১৯৪৬ সালে আসাম লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে রাজনীতিতে তার পদচারণা শুরু হয়। তিনি তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। এরপর অনুষ্ঠিত হয় সিলেটের গণভোট (রেফারেন্ডাম)। হাটে-মাঠে-ঘাটে সমবয়সীদের নিয়ে সিলেটকে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একই সাথে স্কুলের পাঠ্যক্রমও চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, অন্যান্য স্কুল কলেজের ছাত্ররা একত্রে গণআন্দোলনের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে নূরুল আমীন সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্ববর্তী এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার অঙ্গিকার করে। সৈয়দ আশরাফ হোসেন তখন চট্টগ্রামের পটিয়ায় আব্দুছ ছাত্তার রাহাত আলী হাইস্কুলের ছাত্র। ছাত্র জনতা তখন নূরুল আমীনের পদত্যাগ দাবি করে। উত্তাল গণজাগরণ হয়। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন, আমাদের শেøাগান ছিল- ভুলব না ভুলব না সালাম- বরকতের খুনে লাল ঢাকার রাজপথ।

সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে প্রবীণ আইনজীবী সৈয়দ আশরাফ হোসেনের এর একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। নগরীর শাহজালাল উপশহরস্থ তার নিজ বাস ভবনে ১০ অক্টোবর ২০১৬ সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি।

বীথি: আইনজীবী পেশা কবে থেকে শুরু করেছিলেন?
সৈয়দ আশরাফ: সেটি ১৯৮৫ সালের দিকের কথা। সিলেট জেলা জজ কোর্টের সাথে অর্ন্তভূক্ত হই। এখনো আছি এ পেশায়।

বীথি: এ পেশায় কার উৎসাহ ছিল?
সৈয়দ আশরাফ হোসেন: জীবন জীবিকার তাগিদে নিজের উৎসাহ এ পেশায় যোগ দেই।

বীথি: আপনার পরিবারের আর কেউ কী এ পেশার সাথে জড়িত আছে?
সৈয়দ আশরাফ: আমার পরিবারের আর কেউ আইন পেশায় জড়িত নয়।

বীথি: আপনার জীবনে কোন কোন কাজে পরোÿভাবে অংশগ্রহন করেন?
সৈয়দ আশরাফ: সিলেটের প্রাচীনতম সাহিত্য প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, রেড ক্রিসেন্ট, ডায়াবেটিকস এসব সংগঠনের সাথে জীবন সদস্য হিসেবে আছি। সিলেট শাখার প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ও মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন-এর সভাপতি হিসেবে এখন কাজ করছি।

বীথি: মাওলানা ভাসানীকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সৈয়দ আশরাফ: মাওলানা ভাসানী একজন মহান ব্যক্তি। মহৎ আত্মার অধিকারী ছিলেন। জনদরদী, হতদরিদ্র, মজলুম জনগণের রক্ষাকারী। সৎ এবং সাদাসিদে জীবন যাপন করতেন তিনি।

বীথি: মাওলানা ভাসানীর সাথে আপনার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এরকম গুনী মানুষের সাহাচার্য কাজের অভিজ্ঞতা কথা কিছু বলবেন কী?
সৈয়দ আশরাফ: মাওলানা ভাসানীর সাথে কাজ করার সুবাদে তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। সহজ সরল জীবন যাপন করা। মানুষের সাথে সহিষ্ণু আচরণ করা। আরো অনেক শিক্ষঅমূলক কাজের অভিজ্ঞতা। কারো প্রতি কখনো খারাপ আচরণ করতে দেখেনি, দেখেছি সকলের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। জুলুমকারীকে প্রতিরোধ করা ও ঘৃণা করা।

বীথি: কার আদর্শ আপনাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে?
সৈয়দ আশরাফ: মাওলানা ভাসানীর আদর্শ সবসময় আমার ভেতরে কাজ করে, আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

বীথি: আইনজীবী পেশার ক্ষেত্রে কোন দায়িত্বটি আপনাকে তাড়িত করত?
সৈয়দ আশরাফ: নিরাপরাধী মানুষকে নির্যাতন জুলুম যেন না করা হয় এবং আদালত যেন ন্যায় বিচার করে তার প্রতি আমার প্রচেষ্টা ছিল। নিরপরাধী মানুষ যেন নির্যাতনের শিকার না হয় এটি আমাকে তাড়িত করত।

বীথি: আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যা সম্মুখীন হয়েছেন?
সৈয়দ আশরাফ: নিজের পেশার ক্ষেত্রে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে সততার সাথে কাজ করেছি। সেই জন্য হয়তো কোন সমস্যার সম্মুখীন হইনি।

বীথি: আমরা জানি আপনি হাইস্কুলের অধ্যয়নকালে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’-এর সাথে জড়িয়ে পড়েন। সেই আন্দোলনের সাথে নিজেকে কীভাবে জড়ালেন এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কী?
সৈয়দ আশরাফ: ১৯৫২ সাল তখন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর পুলিশী হামলা হয় এবং সেখানে সালাম, বরকতসহ অনেকেই শহীদ হন পুলিশের গুলিতে। তারপর প্রদেশব্যাপী (পূর্ববঙ্গ) বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনায় আমাদের ভেতরে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয় তখন ছাত্ররা মিলে মিছিল মিটিং করি। এভাবে বাংলা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি।

বীথি: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন স্মৃতি কথা সম্পর্কে কিছু বলবেন কী?
সৈয়দ আশরাফ: অনেক ঘটনা মনে পড়ে। এর মধ্যে উলেøখযোগ্য হল এপ্রিলে দিকে একটি ঘটনা ছিলো। তখন সিলেটে ৭২ ঘন্টার কারফিউ ছিল। কারফিউ শেষ হলে আমি বন্দরবাজারে কিছু বাজার করতে যাই। সেই সময় রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা প্রথম দিকে পাকাস্তানী আর্মি দখলদার বাহিনী জিন্দাবাজারে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান বর্তমানে যেটি (সোনালী ব্যাংক) ৫/৬ জন পুলিশ সদস্য ও একজন হাবীলদারকে বন্দুকের গুলিতে শহীদ করে এবং ব্যাংকের ভেতরে লোহার সিন্দুক ভাঙ্গা চেষ্টা করে। সকালে বাজার করতে গিয়ে সেই সময় যারা নিহত হয়েছেন তাদের লাশ নিজের চোখে দেখেছিলাম। যখন মুক্তিযুদ্ধের সময় কাটানো দিনগুলো কথা মনে পড়ে। এই বীভৎস দৃশ্যটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বীথি: বাংলাদেশ নিয়ে আপনার ভাবনার কথা বলেন?
সৈয়দ আশরাফ: উন্নত, সমৃদ্ধিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবি।

বীথি: একজন প্রবীণ আইনজীবী হিসেবে আপনার স্বপ্নের কথা বলেন?
সৈয়দ আশরাফ: আইনজীবী হিসেবে আমার একটিই স্বপ্ন তা হলো আমার দেশকে নিয়ে। বাংলাদেশে উন্নত আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখি।

বীথি: নিজেকে কতটুকু সফল ব্যক্তি ভাবেন?
সৈয়দ আশরাফ: ছোটবেলা যখন বাবা মারা যান। তখন আমাদের দুরাবস্থা ছিল। সেই পর্যায়ে থেকে এখন যে পর্যায়ে এসেছি। এটি আলøাহর দান। সফলতা হয়েছে তবে পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারেনি।

বীথি: একজন ভালো আইনজীবী হতে হলে কী গুন থাকতে হবে?
সৈয়দ আশরাফ: যে কোন কাজের প্রতি সৎ, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা হতে হবে।

বীথি: তরুণ আইনজীবীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
সৈয়দ আশরাফ: অধ্যয়নের কোন বিকল্প নেই। অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অধ্যয়ন করতে হবে। সত্যের প্রতি দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে।

বীথি: জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন?
সৈয়দ আশরাফ: ছোটবেলা থেকেই আইনজীবী হবার স্বপ্ন দেখতাম। তবে দারিদ্রতার কারনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পেশায় কাজ করেছি। তবে মনের ভেতরে সবসময় তাড়িয়ে বেড়াতো আইনজীবী পেশা। আমার হৃদয়ের ভেতরে লালিত স্বপ্নকে প্রোঢ়ত্বে এসে পূরণ করতে পেরেছি।

বীথি: শৈশবের যে দূরন্তপনার কথা আজো আপনাকে নাড়া দেয় এরকম একটি স্মৃতির কথা বলেন?
সৈয়দ আশরাফ: প্রায় ৫ কিলোমিটার হেঁটে বিয়ানীবাজার হাইস্কুলে যাওয়ার পথে খেয়াঘাটে পাড়ি দিতে হত নৌকা দিয়ে। তখন নৌকার মাঝিকে খুব জ¦ালাতন করতাম। নৌকাতে বসেই বন্ধুরা মিলে নৌকা দুলাতে শুরু করতাম। নৌকার মাঝি খুব রেগে গিয়ে আমাদেরকে বকাঝকা করত। আর সে মাঝি রেগে গিয়ে বলতো এই তোমরা একটারে মারলে আমার কিছু হবে না, মাত্র তিন মাসের জেল হবে।
কিছুক্ষণ প্রাণ খুলে হেসে হা হা.. তার কথা শুনে বন্ধুরা অট্টোহাসি দিতাম। এই স্মৃতিটি মনে পড়লে প্রচন্ড আনন্দ পাই। এখনো একা একা হাসি।

বীথি: কী খেতে ভালোবাসেন?
সৈয়দ আশরাফ: এখন তো কিছুই খেতে পারি না। বয়স হয়েছে খাওয়া দাওয়ার প্রতি কত নিয়ম মেনে চলতে হয়। মুরগীর খোরমা আর ডিম পুডিং খেতে প্রচন্ড ভালোবাসি।

বীথি: কী অপছন্দ করেন?
সৈয়দ আশরাফ হোসেন: মিথ্যাবাদী, অসততা ও অনৈতিক কাজ অপছন্দ করি।

বীথি: জীবনের ৮৩টি বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন। অতীতের সোনালী দিনের কথা মনে পড়লে কী মনে হয়?
সৈয়দ আশরাফ: কত কথা, কত স্মৃতি। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের কথা মনে পড়ে। বন্ধুদের সাথে কাটানো দিনগুলো খুব মনে পড়ে। যারা বেশির ভাগই না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এখন যারা আছে প্রায় দিন আমাদের আড্ডা হয়, দেখা হয়।

বীথি: সবচেয়ে বেশী কাকে মিস করেন?
সৈয়দ আশরাফ: মা বাবা আর স্ত্রী সৈয়দা রাবেয়া খানমকে মিস করি।

বীথি: সিলেট এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
সৈয়দ আশরাফ: আপনাকেও সিলেট এক্সপ্রেসকে ধন্যবাদ।








Free Online Accounts Software