20 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 23 October 2017 সাক্ষাৎকার  (পঠিত : 1776) 

শিক্ষকতা মধ্যে দিয়ে আলো ছড়ানো স্বপ্ন দেখতেন কবি পান্না রানী রায়

শিক্ষকতা মধ্যে দিয়ে আলো ছড়ানো স্বপ্ন দেখতেন কবি পান্না রানী রায়
     

তাসলিমা খানম বীথি:
কবি পান্না রানী রায় সিলেট এক্সপ্রেসের সাথে একান্ত আলাপচারিতা বলেন,আমার বেড়ে উঠা সিলেটের লালদিঘীর পাড় এলাকায়। বাসা ও দোকান একসাথে ছিল। প্রতিষ্ঠানের নাম কমলাভান্ডার। এখান থেকেই আমি স্কুল ও কলেজ জীবনের পড়াশুনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি ১৯৮৩ সালে। এখন অবশ্য আমার বাবার বাড়ির সবাই বাড়ি করেছে শহরের দাড়িয়াপাড়ায়। সেখানেই সবাই থাকে।
আমার শিক্ষাজীবন শুরু করি সিলেট সরকারি অগ্রগামী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিশু স্কুল থেকে। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭৩ সালে হাইস্কুল সেকশনে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। এই স্কুলেই কেটেছে আমার জীবনের স্বর্ণালী সময়। দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাশেই আমি প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছি। সব সময় Class Captain থাকতাম, সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অত্যন্ত সম্মান করতাম, আবার ভয়ও পেতাম। কখনো আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেছি মনে পড়ে না। ছোটবেলা থেকেই আমি অত্যন্ত স্বল্পভাষী ও শান্ত স্বভাবের ছিলাম।
স্কুল জীবনের অনেক স্মৃতি মনে দোলা দিচ্ছে এ মুহূর্তে। একবার চতুর্থ শ্রেণির ‘এ’ সেকশনে শ্রদ্ধেয় শাহানা ম্যাডাম ক্লাশ নিতে আসলেন। উনি আমাদের ইংরেজি পড়াতেন।
ক্লাশে ঢুকেই দেখলেন আমি লাস্ট বেঞ্চে বসেছি। উনার ঐ মুহূর্তের রাগত কণ্ঠ এখনো মনে পড়ে। উনি বলেছিলেন, ‘দেখো ফাস্ট গার্ল বসে আছে লাস্ট বেঞ্চে’’। কিন্তু আমি একে কোন বিষয় মনে করিনি, কারো উপর জোর খাটাইনি যে, আমি প্রথম বেঞ্চে বসব বা আমার বসার অধিকার আছে। আমার ঐ শিশুমনের ধারণা ছিল, আমি যে কোনো জায়গায় বসলেই হলো, আমি তো পড়া শিখে এসেছি। ম্যাডাম আমাকে খুব স্নেহ করতেন। উনার জন্য রইল আমার অনেক শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।

স্কুল জীবনের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কথা তাদের অবয়ব সব সময় মনে পড়ে। কত না স্নেহ পেয়েছি তাদের কাছ থেকে। আনোয়ারা আপা, ছকিয়া আপা, সাফিয়া খাতুন, পান্না আপা, শাহানা আপা, করিম স্যার, আরতি দি, নমিতা দি, ধীরা দি, ছবি আপা, সুজাতা দি, পুতুল দি, লাভলি দি, বিলকিস আপা, আরতি দি, কৃষ্ণা দি, জেবুন্নেছা আপা, আরো অনেক ম্যাডাম যাদের নাম এ মুহূর্তে মনে আসছে না। সকল শিক্ষকদের প্রতি রইল আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। ঐ সময় প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইয়াকুতি বেগম ম্যাডাম। একজন শিক্ষক ও একজন প্রশাসক দুয়ের সমন্বয়ে গড়া ছিলো তার ব্যক্তিত্ব। তাদের প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা।

শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব সব সময় আমার কাছে অনুকরণীয় ছিলো। ঐ সময় থেকেই শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক ও আমার জন্য প্রকৃত পেশা হিসাবে মনের গহীনে সযতনে স্থান দিয়ে নিজেকে তৈরি করতে থাকি।
মনে পড়ে আমার সহপাঠীদের কথা আমার প্রিয় বান্ধবীদের কথা। আজো অনেকের সাথেই যোগাযোগ আছে, যদিও তারা দেশ বিদেশে বসবাস করছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অনেক ভালো আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক মিতা, ডাক্তার নাজরা, রত্না, কাকলী কথা সাহিত্যিক পাপড়ি রহমান, সচিবালয়ের কর্মকর্তা ফাহিমা ইয়াসমিন, এডভোকেট পারভীন, অগ্রগামী স্কুলের শিক্ষিকা রোশনা ও নাজমা বেগম, প্রবাসী কর্মজীবী ইমা, ডেইজী, লাভলী, নাজরীন, রাজা (প্রবাসী), হাসন রাজার বংশধর, মনশ্রী দে (জবা), মদন মোহন কলেজের গণিতের শিক্ষক ছিল এখন আমেরিকা প্রবাসী। আরো যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলো ঝর্ণা, সমসাদ, মমতাজ, কল্পনা, আলো, বলাকা, চমন, ফরিদা আরো অনেকে। যাদের নাম এ মুহূর্তে মনে আসছে না। ছাত্রজীবনের অনেক ঘটনা মাঝে মাঝে মনে হলে একাই হাসি পায়।

মনে পড়ে বর্ষাকালে স্কুলের পুকুরের পানিতে মাঠের সবুজ ঘাস ডুবে থাকত। আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। প্রিয় বান্ধবী বন্যার খুব শখ হলো টিফিন পিরিয়ডে ঘাসের মাঠে হাঁটবে। শুরুও করল তাই। একটু পরে ক্লাশ থেকে শুনি ওর চিৎকার। বারান্দায় যেয়ে দেখি ওর পায়ে জোঁক ধরেছে আর ‘ও’ প্রচন্ড জোরে লাফাচ্ছে ফেলবার জন্য। কিন্তু কিছুতেই ওটা পা থেকে নামছে না। এ দৃশ্য দেখে আমরা কয়জন নিচে নামলাম, প্রাণান্ত চেষ্টা করলাম ওর পা থেকে ওটা ফেলার জন্য, কিন্তু ব্যর্থ! পরে গেলাম মূল গেটের বাইরে থাকা চানাচুরওয়ালা দাদুর কাছে, লবণের জন্য। লবণ এনে ওর পায়ে দেয়ার পর ওটা পা থেকে পড়ল মাটিতে, বেশ খানিকটা রক্ত চুষে নিয়েছে ওটা, কিন্তু জোঁক পড়ার পরও বন্যার পা দিয়ে রক্ত পড়ছে। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক হৈ চৈ উৎকণ্ঠা। ওকে ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠালাম। ক্লাশের বেঞ্চে শুইয়ে দিলাম। মাথায় বাতাস করলাম, তারপর ওর ছুটির ব্যবস্থা করে ওকে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। পরদিন ও রেষ্ট নিল। স্কুলে আসলো না। কারণ আমরা ধরে নিলাম। রক্ত খেয়েছে জোঁকে, তাই ও খুব দুর্বল। আজো বিষয়টি মনে পড়লে হাসি পায়। এত ভীতি, এত উত্তেজনা শহরে বড় হয়েছি বলেই হয়ত!

পুকুর ঘিরেই আরেকটি স্মৃতি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। স্কুলে ‘বিজ্ঞান মেলা’ হচ্ছে। বান্ধবীদের মধ্যে অনেকে এসেছে, অনেকে আসেনি। লাভলী এসেছিল মনে আছে। দুজনে হাত ধরে হাঁটছি, দেখছি। এভাবে একসময় পুকুর পাড়ে গেলাম। আসলে পুকুরটা আমাদের কাছে খুব প্রিয় ছিল। হালকা বাতাসে পানির মৃদু দোলন অথবা বৃষ্টির ধারায় পানির মুখরতা, উচ্ছলতা চেয়ে চেয়ে দেখতাম। একটি সুইমিং পুল ছিল, ছিল বাঁধানো সিঁড়ি। যা হোক পুকুর পাড়ে ঐ সময় আমি ও লাভলি ছাড়া আর কেউ নেই। আমার ইচ্ছা হলো পুকুরে পানিতে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখবো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম কথা বলতে বলতে দুজনে। শেষ সিঁড়িতে পা রাখতেই আমি শ্যাওলায় পা পিছলে পানিতে প্রায় ডুবে যাচ্ছিলাম, আজো লাভলীর সেই চিৎকার কানে ভাসে ‘‘ও পান্না গো’’ বলে সে আমাকে ঝাপটে ধরে উঠিয়েছিল। দুজনেই ঐ সময় সাঁতার জানি না। কি হতো। ভাবছি হয়ত আমি বা দুজনেই ঐ পুকুরে লাশ হয়ে যেতে পারতাম, হইনি কারণ সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় ছিল।

আরেকটি ঘটনা বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক পাপড়ি রহমানকে নিয়ে। ও দেখতে সুন্দরী এবং ওর চোখ দুটি কাজল কালো। দেখে মনে হয় কাজল দিয়ে রেখেছে। এটাও সপ্তম শ্রেণির ঘটনা। বাংলা ক্লাশ। আপা ক্লাশে আসলেন। তিনি কেন জানি সেদিন ওর দিকে চোখ পড়ল। তিনি হঠাৎ রেগে বলে উঠলেন, ‘‘তুমি স্কুলে চোখে কাজল পড়েছ কেন?’’ পাপড়ি বিনীত স্বরে বললো, আপা আমি কাজল দেইনি, তিনি আরো রেগে গেলেন। এই ভেবে যে, কাজল দিয়েছে, আবার মিথ্যাও বলছে। শাস্তিস্বরূপ সারা ক্লাশ সময় ‘ও’ দাঁড়িয়ে রইল। আমরা ক্লাশের সবাই স্তম্ভিত কিন্তু সত্য বলারও সাহস কারো নেই, কারণ তাতে যে বেয়াদবি হবে!
আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখন ১০ বছরের মধ্যে মা কোনদিন স্কুলে যাননি। যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি, বাবা স্কুলে ভর্তি করানোর পর এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা ঐ সময় রিক্সায় যাতায়াত করতাম। সকাল বেলায় পিসিদের সাথে যেতাম। আমাদের দেড়টায় ছুটি হলেও উনাদের ছুটি হতো সাড়ে ৪টায়। আমরা একসাথে আসতাম। বাসায় যেতাম রিকসা পাওয়ার একটা যন্ত্রণা ছিল, হয়ত তা পাওয়ার জন্য দাঁড়াতে হতো আরো ১ ঘন্টা। বাসায় ফিরে খাওয়ার পর পরই নেমে আসত সন্ধ্যা। তিনতলা বাড়ীর ছাদে ছিল আমাদের পূজোর ঘর। সন্ধ্যা আরতি এবং নিচতরার সব ঘরে ধুপবাতি দেখানো আমার রুটিন work ছিল। তারপর হালকা টিফিন এবং পড়তে বসা। আমাকে পড়তে বসানোর জন্য কোন দিন মা-বাবাকে চেষ্টা করতে হয়নি, উল্টা কেন এত বই নিয়ে পড়ে থাকি তার জন্য মাঝে মাঝে মায়ের বকুনি খেয়েছি, বাবার নিকট নালিশও করেছেন। মাঝে মাঝে খেতে ডাকলে সময়মত যাই না, বই ছেড়ে উঠতে চাই না ইত্যাদি অভিযোগ।

আমাদের পড়ার ঘর ছিল দোতলায়। যৌথ পরিবারে ৭ ভাইবোন একসাথে একই ঘরে পড়তাম। বাবা ১০/১৫ দিন পর পর আসতেন পড়ার ঘরে। উদ্দেশ্য আমাদের খাতা, কলম কোনা কিছুর প্রয়োজন আছে কিনা। বিশেষ করে আমার ব্যাপারে ‘ভালভাবে পড়াশুনা করার’ কোন উপদেশ দেবার প্রয়োজন হয়নি কোনদিনও।

ছোটবেলায় আমাদের পরিবারের বন্ধন ছিল অত্যন্ত মজবুত। বাবা, মা, কাকু, কাকীমা, আমাদের দৃষ্টিতে এদের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। আজো নেই। সবাই সমান শ্রদ্ধা পাওয়ার অধিকার রাখত এবং পেত। মা ও কাকীমা সকল অনুষ্ঠানে একই রকম পোশাক ও গহনা পড়তেন আবার আমরা দুবোন ও কাকাতো বোন নির্মলা রায় (আমেরিকা প্রবাসী) আমরা একই রকম সব পড়তাম। ভাই ৪জনও তাই। এভাবে হেসে খেলে কলেজ পর্যন্ত সময় কেটেছে।
পারিবারিক শিক্ষাগুলো আমাদের যে রকম ছিল তা হচ্ছে নম্রতা, বিনয়ী, ধর্মীয় কার্যে অংশগ্রহণ অর্থাৎ সামাজিক যা মূল্যবোধ ছিল তাকে পুরোপুরি অনুসরণ করা এটাই তাদের শিক্ষা ছিল। মনে পড়ে বড়দের জুতোতে পা লাগলেও অন্যায় কাজ করেছি বলে মনে মনে অনুতপ্ত হতাম। পরীক্ষার সময় বাসার সকল গুরুজনদের প্রতিদিন প্রণাম করে যেতাম। আমাদের বাসায় ঐ সময় যে মাসী কাজ করত। তিনি আমার গুরুজন সুতরাং তাকেও প্রণাম করে যেতাম পা ছুঁয়ে, বড়দের সাথে মুখে মুখে কথা বলা তো দূরের কথা, চোখ তুলে কথা বলার সাহস রাখতাম না, আমার বাবার সাথে কথা বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে যেত। কারণ বাবা একটু রাগী ছিলেন। তাই সত্য কথাটাও বলতে পারতাম না। জিহ্ব ভারী হয়ে যেতো।

আমার নিজের ঠাকুর মা (বাবার মা) কে আমি বা আমার মাও দেখেন নি। তিনি আমার বাবার বিয়ের আগেই মারা গেছেন। আমাদের যৌথ পরিবারে আমৃত্যু পর্যন্ত আরেক গুণীজন ঠাকুরমা পেয়েছিলাম, যিনি সম্পর্কে আমার বাবার পিসিমা। এই ঠাকুরমার বিয়ে হয়েছিল শুনেছি ৯ বছর বয়সে এবং তিনি বিধবা হয়েছিলেন ১১ বছর বয়সে। স্বামী সংসার কি জিনিস তিনি তা বুঝতেই পারেন নি। ১৩ বছর বয়সেই উনাকে নিয়ে আসা হয় বাবার বাড়িতে, আমার দাদুর সংসারে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উনি থেকেছেন।
হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ নেই। তাই উনার মন কে পরিবার ও সমাজ প্রস্তুত করে তুলেছিলো কিভাবে তিনি কাটাবেন তার এ জীবন পরিক্রমা। তার কাছে গল্প শুনেছি পাড়ার সব মহিলাদের বিকালে রামায়ণ, মহাভারত পাঠ করে শুনাতেন এবং যে সব মহিলাদের স্বামী, সন্তান বাইরে কাজ করতো তাদের চিঠি লিখে দিতেন। তিনি বলতেন শ্বশুর বাড়িতে তিনি ছিলেন শিক্ষিত বৌ। উলেøখ্য তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছিলেন।

বিধবা হবার পর তাকে কিনে দেয়া হলো একটি সিঙ্গার মেশিন। অনেক কাজ করতে পারতেন। তার কাছ থেকে আমি অনেক সেলাই কাজ ছোটবেলায় শিখেছি। শুধু কাপড় বানানো নয় খৈ, মুড়ি, চিড়া ভাজার কৌশল, পিঠা, নাড়– বানানো, নানা রকম আল্পনা দেয়া শিখেছি। পরবর্তী জীবনে এই সেলাই কর্মকে আমি অনেক দূর নিয়ে গিয়েছি। নকশী কাঁথার ওয়াল ম্যাট, ক্রসটিচ এর টেবিল ক্লথ, ভরাট সেলাই, বাটিক, ব্লক, টাই ডাই, শাড়ির কাজ, বিছানা চাদর, গায়ের চাদর, বাচ্চাদের কটি, নানান নকশা, গায়ের চাদরে নানা কাজ অজস্র করেছি। আমি ছোটবেলা থেকে চিত্রাংকন করতে খুব ভালবাসতাম। প্রাকৃতিক দৃশ্য, বড় বড় মনীষিদের অবয়ব আঁকতাম। জলরং, পেন্সিল রং, অল্প স্বল্প অভ্যাস ছিল। রংয়ের খেলা বড় অপূর্ব, নিজের অনুভূতিকে কত ভাবেই না রাঙানো যায়, বিশেষ করে জল রংয়ের তুলির আঁচড়ে। কিন্তু এ চর্চাটা অব্যাহত রাখতে পারিনি, তবে সন্তানদের মধ্যে বিশেষ করে আমার মেয়ে যখন স্কুলে ভর্তি হয় ওর ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত গভীর মমতা দিয়ে ওকে শিখিয়েছি। শিশু একাডেমী ও শিল্পকলার প্রতিটি প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে প্রচুর প্রাইজ পেয়েছে সে। ছেলেকেও শিখিয়েছি তবে ‘ও’ আমার কাছ থেকে তেমনটা শিখতে পারেনি। ইচ্ছা হয় আবার তুলি হাতে নেই আবার নতুন করে শুরু করি। কারণ যে কোনো বয়সে শিখার জন্য, আমার ছাত্র হতে দ্বিধা নেই আজো।

স্কুল জীবন শেষ করে ভর্তি হলাম সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে। ১৯৮১ সালে। কলেজটি মাত্র সরকারি হয়েছে। মনে পড়ে স্যার ম্যাডামদের কথা। জিতেন স্যার (প্রয়াত), বেদানা ম্যাডাম, মান্নান স্যার, খালেদা ম্যাডাম, সুনীতি ম্যাডাম, প্রদীপ স্যার, বাছিত স্যার, হুমায়ুন কবীর স্যারের কথা। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে সহকারি অধ্যাপক পদে যোগদান করতে গিয়ে মহিলা কলেজের রসায়নের হুমায়ুন কবীর স্যার কে পাই। এবং এম.সি কলেজে ইংরেজির প্রফেসর শামসুন নাহার (বেদানা) ম্যাডামের সাথে চাকুরি করেছি। এরা সকলেই আমার পথ প্রদর্শক ছিলেন। আজন্ম ঋণী আমি উনাদের কাছে।
তখন সিলেট কুমিল্লা বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ১৯৮২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেই এবং সমগ্র বোর্ডে মানবিক বিভাগে সম্মিলিত মেধা তালিকায় প্রথম বিভাগে ৩য় স্থান (3rd Stand) অধিকার করি। মনে আছে রিজাল্টের পর প্রিন্সিপাল ম্যাডাম এর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আয় আমার বুকে আয়, আমাকে যে এত আনন্দ দিবি আমার যাবার বেলায়, তা আমি ভাবতে পারিনি।’ উল্লেখ্য সে বছরই ম্যাডাম অবসরে যান। ম্যাডামের প্রতি রইল আমার অজস্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। পত্র পত্রিকা, রেডিওতে ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপা হলো। বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছবি দেবার জন্য ছবি তুললাম কাষ্টঘর ‘পান্না স্টুডিও'তে কাকুর সাথে যেয়ে। আজ মনে পড়ছে আরেকজন শিক্ষাগুরুর কথা যিনি ঐ সময় এম.সি কলেজে দর্শন বিভাগের শিক্ষক (বিমল স্যার) তিনি এম.সি কলেজের হিন্দু হোস্টেলের দায়িত্বে ছিলেন। তাই তিনি হোস্টেল কোয়ার্টারে থাকতেন। পরীক্ষায় দুমাস আগে একদিন কাকুকে বললাম (কাকুর পরিচিত) আমাকে স্যারের বাসায় একটু নিয়ে যাবেন। কাকু নিয়ে গেলেন। আমি আমার সকল যুক্তিবিদ্যার নোট খাতা সাথে নিয়ে গেলাম, উনাকে দেখালাম। আমার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো উনার পরামর্শ নেয়া, এবং নোটের মান কেমন হয়েছে তা জানা। কিন্তু উনার উত্তরে আমি হতবাক! তিনি বললেন, সব ঠিক আছে একটু ঘষামাজা করলে ভাল হয়। আরো বললেন মনোযোগী এমন ছাত্রী পেয়ে আমি এভাবে ছেড়ে দিতে পারিনা। কাল থেকে তুমি আমার কাছে পড়তে আসবে, আমি, নোটগুলোতে কিছু পয়েন্ট যুক্ত করে দেব।’’ আমি বিনয়ের সাথে বললাম আমার হাতে মাত্র দুমাস সময়, কিভাবে আমি প্রতিদিন আপনার বাসায় লালদিঘীর পাড় থেকে আসব? উনি মানলেন না। মাকে বললাম, কিন্তু বাবাকে নয়, ভয়ে। শুরু হলো আরেক কর্মকান্ড। প্রতিদিন আড়াইটা-তিনটায় বেরিয়ে পড়তাম মামার সাথে বাসায় ফিরে আসতাম সন্ধ্যার পর। ঐ মামার কাছে আমি চির ঋণী হয়ে রইলাম কারণ যতক্ষণ আমি পড়তাম ততক্ষণ উনি বাইরে হাটাহাটি করতেন। তবে কষ্টের প্রতিদান পেয়েছি। যুক্তিবিদ্যার দু'পেপারেই লেটার নাম্বারের বেশি পেয়েছিলাম। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমিও এম.সি কলেজের ছাত্র। রিজাল্টের পর বাবা জানলেন স্যারের কথা। উনি চেয়েছিলেন মিষ্টি নিয়ে আমাকে স্যারের বাসায় নিয়ে যাবেন তবে আমি গিয়েছিলাম কাকুর সাথে। সে অনেক মধুর মধুর স্মৃতি।

১৯৮২ সালের পুরোটা চলে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আশায়। আমরা বরাবরই দেখে এসেছি সিলেট থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। আমাদের সময়ও গিয়েছে। আমার ইচ্ছা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব। এখন ভাবি নিজের উপর কতটুকু আত্মবিশ্বাস ছিল, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা তখন সবার পরে হতো। আমি এখানেই ভর্তি হবো বলে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেই নি, ফরমও তুলি নি। উল্লেখ্য, তখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়নি।

১লা জানুয়ারি ১৯৮৩ সালে আমি বাবার সাথে রাতের মেইল ট্রেনে ভর্তির উদ্দেশ্যে সিলেট ছেড়ে ঢাকা গেলাম। তখন ঢাকা সিলেট বাস সার্ভিস বা আন্তঃনগর কোন ট্রেন ছিল না। তখন সময় লাগতো অনেক। ট্রেনে পরবর্তীতে আমি একবার ১৭ ঘন্টায়ও ঢাকা থেকে সিলেট এসেছি। যা হোক পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেলাম। আমার শ্রদ্ধেয় বিমল স্যারের ইচ্ছা ছিল আমি যেন দর্শন নিয়ে পড়ি। আমার ইচ্ছা ছিল অর্থনীতি। কিন্তু ঘটলো আরেক ঘটনা। সিলেট থেকে ঢাকা যাবার সময় পরিচিত একজন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. রঙ্গঁলাল স্যারের সাথে পরিচিত হতে বললেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক। স্যারের সাথে পরিচিত হবার পর, উনার ব্যক্তিত্ব ও কথাবার্তা শুনার পর তারই ছাত্রী হবার বাসনা মনে জেগে উঠলো। অথচ সমাজবিজ্ঞান আমি আগে পড়িনি। এ বিষয় সম্পর্কেও ভাবিনি। পরের দিন মৌখিক পরীক্ষা, মেধা তালিকায় আমি সব সাবজেক্ট-ই পেতে পারি, কিন্তু আমি বললাম, সমাজবিজ্ঞান নিয়ে পড়বো। বিষয় নির্বাচিত হয়ে গেল, কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার বাবা, তিনি বললেন কি হলো? আমি উত্তরে বললাম ‘সমাজবিজ্ঞান’। বাবা অবাক হয়ে রাগত স্বরে বললেন, তুমি তো এ বিষয় পড়তে আসোনি। আবার viva বোর্ডে যাও, স্যারদের বল, অর্থনীতি বা দর্শন পড়বে। আমি চুপ, একটি কথাও বলার সাহস নেই। কি বা উত্তর দেব, এটাতো আমার অন্য সিদ্ধান্ত। যা হোক বাবা আর কিছু বললেন না। ঢাকার বাসায় চলে এলাম। এখানে আরেক দুর্বলতাও কাজ করেছিল মনে, আমার বাবার নামও ‘রঙ্গলাল’ রায় ছিল, স্যার ছিলেন ‘রঙ্গলাল সেন’। এই দুটি মানুষের কাছে আমি জন্ম জন্মান্তর ঋণী থাকব। তাদের মমতা, আশীর্বাদ আমার প্রতি এত ছিলো যে তা বর্ণনা করার মত নয়। দু’জনই আমাদের ছেড়ে অন্য জগতে চলে গেছেন, আমি দুজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির আত্মার শান্তি মঙ্গল কামনা করছি, তারা যেন স্বর্গবাসী হন।

একটা কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। আমরা যখন ভর্তি হই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল বড়ই আন্দোলন মুখর। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। প্রায়ই মনে পড়ে একটি রক্ষণশীল পরিবারের বড় সন্তান হয়ে ঐ সময় কত না বাঁধা পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে যেতে হয়েছিল। এখন এখনকার পিতামাতাদের দেখি ভর্তির জন্য কোচিং এবং সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড়াতে হয়। যা রীতিমত একটি ভর্তি যুদ্ধ। কিন্তু এত কিছুর পরও চাওয়া ও পাওয়ার সাথে কতটুকু মিল থাকে? যা হোক, আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন এবং ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ইত্যাদি প্রতিদিন-ই প্রায় পত্রিকায় ছাপা হতো। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। বাবা পত্রিকা কিনে এনে আমাকে উনার ঘরে ডাকতেন। আমি যেতাম। উনি খাটে বসে আমাকে উনার সরাসরি চেয়ারে বসতে বলতেন। তারপর পত্রিকার সেই আন্দোলনের কথাবার্তা, সংঘর্ষ, হলবন্ধের সংবাদ জোরে জোরে পড়তে বলতেন। আমি বুঝতে পারছিলাম, আমার গলা শুকিয়ে আসতো তবু পড়তাম। পড়া শেষে উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হবো কিনা। আমি নিরব কিছুক্ষণের জন্য। কারণ আমার মাথায় ঘুরতো আমার স্বপ্ন তাই ‘না’ শব্দটি বললেই যে আমি হেরে যাব। মনের সকল শক্তি একত্র করে বলেছিলাম ‘‘হ্যাঁ হবো।’’ আজ বুঝি ছোট্ট একটি শব্দের কত না শক্তি ছিল। এখন অভিভাবক হয়ে বুঝি তখন না ছিল মোবাইল, না ছিলো হলে ফোনের সুবিধা, না ছিল যাতায়াতের সুবিধা, মা বাবার মনে কত না দুশ্চিন্তা কাজ করছিলো তা আমি বুঝতেই পারিনি। কিন্তু আমার বাবা সেই বাবা ছিলেন যাকে পরবর্তীতে বলতে শুনেছি, আমার সন্তান যেন কোনদিন বলতে না পারে আমি তাকে যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দেইনি। আমার কষ্ট হলেও সেই কাজটি করিনি। বাবা আমাকে ভর্তি করতে ১ মাস ঢাকা থেকে হলে উঠিয়ে (শামসুন নাহার হল) তবেই সিলেট এসেছেন।

১৯৮৬ সালে বের হবার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় হতে কিন্তু ১৯৮৫-১৯৮৬ সালের পরীক্ষা শেষ হলো ১৯৮৯ সালে এবং রিজাল্ট হলো ১৯৯০ সালে। অর্থাৎ ৪টি বছর ঝরে গেল। ১৯৯১ সালে প্রথম চাকুরির ইন্টারভিউ দিলাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘সহকারি শিক্ষকের’ পদে। চাকরি হয়ে গেলো এবং আমার Posting হলো আমারই নিজের স্কুল সরকারি অগ্রগামি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, জিন্দাবাজার, সিলেটে। ১৯৯২ সালে এপ্রিল মাসে যোগদান করি। তখনও অধিকাংশ শিক্ষক আমার নিজ স্কুল জীবনের শিক্ষক ছিলেন। তখন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন আনোয়ারা খাতুন ম্যাডাম। এখানে চাকুরিরত অবস্থায় ১৯৯২ সাল থেকেই প্রথম বিসিএস পরীক্ষা দিতে শুরু করেছিলাম। এ পরীক্ষায় অনেকগুলো ধাপ, সব সম্পন্ন করতে ১৯৯৩ সালে বেশ কয়মাস চলে যায়। রিজাল্ট হয় ১৯৯৩ সালেই এবং বিসিএস হয়ে যায়। ছাত্র জীবনেই স্বপ্ন ছিলো শিক্ষক হবো, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজের সাধ্যমত আলো ছড়াবো। আমার বিভিন্ন পত্রপত্রিকার ও রেডিওতে সাক্ষাৎকারেও তাই বলেছিলাম। স্বপ্ন পূরণ হলো কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো পদায়ন নিয়ে। আমাকে নিয়োগ দেয়া হলো নওগাঁ বিএসসি মহিলা কলেজে। তখন যমুনা সেতু হয়নি। ১৯/১১/১৯৯৩ তারিখে স্কুলে চাকরিতে পদত্যাগপত্র জমা দেই। ২১/১২/১৯৯৩ তারিখে নওগাঁ ঐ কলেজে যোগদান করি। ঐ কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আরেক ম্যাডামও যোগদান করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন ময়মনসিংহের তাহমিনা পারভীন। দুজন মিলে একটি বাসা ভাড়া করে থাকতাম। ১৯৯৪ সালে আমি বদলী হয়ে নরসিংদী সরকারি কলেজে যোগদান করি। এখানে যোগদানের সাড়ে ৭ বছর পর আমার পদোন্নতি হয় আমাকে আবার পদায়ন করা হয় ল²ীপুর সরকারি কলেজে সহকারি অধ্যাপক রূপে (সমাজবিজ্ঞান বিভাগে)। ঐ কলেজে নরসিংদী থেকে প্রতি সপ্তাহে একা যাতায়াত করতাম। ঐখানে বাসা ভাড়া নিয়ে একা থেকেছি। তখন খুবই কষ্ট হতো যাতায়াত করতে, নিজে রান্না, বাজার করে খেতে হত। বেশি কষ্ট হতো ছোট বাচ্চাদের জন্য। খুব কাঁদতাম ওদের জন্য। আমার ছেলেটাও কাঁদত আমার জন্য। তবে ‘ও’ খুব চাপা স্বভাবের ছোটবেলা থেকেই কেঁদেই মুখ ধুয়ে নিতো। তাই কেন কাঁদছো জিজ্ঞাসা করলেই বলতো, আমার চোখে ময়লা পড়েছে তাই ধুয়ে আসলাম। মাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে কিন্তু ঐ সময় টিফিন প্রতিদিন সে ফেরত নিয়ে আসতো। এখানেও জিজ্ঞাসা করলে বলতো খেলতে খেলতে খাবার সময় হয়নি। একদিন আমিও মাথায় হাত বুলিয়ে গভীর মমতা দিয়ে জানতে চাইলাম কেন টিফিন খাও না? তখন ‘ও’ যা উত্তর দিয়েছিলো সে কথাগুলো মনে হলে এখনও আমার চোখে জল আসে। বললো সব বন্ধুদের মা এসে টিফিন খাওয়িয়ে দেয়, আমি চেয়ে চেয়ে দেখি, কিন্তু তুমি তো আসো না। তাই আমার খেতে ইচ্ছা হয় না। ফিরত নিয়ে আসি। কখনো জানালা দিয়ে ফেলে দেই। কখনো কুকুরকে দিয়ে দেই।

আমি ভাবি চাকুরীজীবি মায়ের সংসারে যৌথ পরিবারের প্রয়োজনীয়তা কত বেশি। যে সময়টুকু ওরা মা-বাবাকে কাছে পায় না ততটুকু সময় বিশেষ করে দাদু ঠাকুরমা, কাকু, পিসিদের সাথে গল্প করে কত না মধুর সময় কাটাতে পারে, কিন্তু এ সুযোগ এখন আর থাকছেই না। ফলে ঐ সময়ের ভাবনায় বাচ্চাদের মনোজগতে জন্ম নেয় ভীতি, আতংক, প্রতিশোধপ্রবণতা, হিংস্রতা। এক্ষেত্রে আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এসব বাচ্চাদের মনোজগতের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য প্রয়োজন উন্নত শিশু লালনপালন কেন্দ্র। দু’বছর ল²ীপুর চাকুরী করার পর আমি বদলী হয়ে চলে আসি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে। যদিও আবেদন করেছিলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের জন্য। হলো না। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাসা নিয়ে থাকতাম। এ কলেজে এসে আমার বিভাগেই সহযোগী অধ্যাপক রূপে এমন একজন কর্মউদ্যোগী, পরিশ্রমী ম্যাডামকে পেলাম যার ফলে আমার ভিতরের বিভিন্নমুখী কাজ করার প্রবণতা বেড়ে যেতে লাগলো। তিনি আর কেউ নয় আমাদের মাউশির সদ্যবিদায়ী মাননীয় ডিজি ম্যাডাম প্রফেসর ফাহিমা খাতুন। উনার কাছ থেকে আমি অনেক কাজ শিখেছি এবং নিরবে অনেক কাজ বিভাগের জন্য করেছি। বিভাগে তখন অনার্স খোলা হলো। উদ্বোধন করলেন তখনকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যার উল্লেখ্য নরসিংদী কলেজেও আমার উদ্যোগে অনার্স খুলেছি। আমরা বিভাগে প্রচুর অনুষ্ঠান করতাম। বিভিন্ন দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। আমরা বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রদের শপথ নিয়ে সেমিনার করেছি। ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন কাজে লাগিয়েছি। ১ যুগ আগের কথা কিন্তু আজও ছাত্রছাত্রীদের সাথে যোগাযোগ আছে, শিক্ষকের সঙ্গে তো বটেই। আজও আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে। কিন্তু তাই বলে আমার বর্তমান কর্মস্থলের ছাত্রছাত্রীদের সাথে ভাববিনিময় হয় না তাই নয়। এখানকার ক্ষেত্র অনেক বড়। ২০০৮ সালে আমার পদোন্নতি হয় সহযোগী অধ্যাপক রূপে এবং ২০শে আগস্ট ২০০৮ এম.সি. কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান রূপে যোগদান করি। অদ্যাবধি এ পদে আছি।

এম.সি কলেজ একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজ। এই কলেজ হতে হাজার হাজার জ্ঞানী, গুণী প্রাজ্ঞ ব্যক্তি শিক্ষালাভ করে গেছেন। আমার ভাবতে গর্ব হয় যে, এই কলেজেরই প্রাক্তন ছাত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয় এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়। আমি নগণ্য একজন এখানে শিক্ষকতা করি। তবে আমি মনে করি সারাজীবন আমি ছাত্রই রয়ে গেলাম। শিক্ষক হতে এখনো পারিনি। আজও একজন ছাত্রের চেয়েও অনেক বেশি পড়ি। বই হাতে নিয়েই আমার সকালের কার্যক্রম শুরু হয়। এক কাপ চা এবং বই নিরব সকালে আমার বড় প্রিয় সঙ্গী। আমার মাথার পাশে বই, ড্রইং রুমে বই, ডাইনিং রুমে বই। সব জায়গায় আছে বই আর বই। বই পড়া, কিছু লিখা হোক তা কবিতা, ছোটগল্প, সাহিত্য, সমালোচনা, প্রবন্ধ, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে লিখা অথবা সমসাময়িক সমস্যাবলীর চিত্র এবং সমাধান কিভাবে হবে। সমস্যার শেকড় কোথায় তা আমাকে ভাবায়। যখন পত্রিকার পাতায় দেখি যৌতুক বিষয়ক নির্যাতনে বালিকা বধুর ঝুলন্ত লাশ, স্বামী পলাতক, অথবা পাশবিক নির্যাতনে শিশু শ্রমিক হত্যা, অথবা পারিবারিক সহিংসতায় পিতা, পুত্র কন্যাকে বা পুত্র কর্তৃক পিতামাতাকে হত্যার চিত্র দেখি অথবা মাদকাসক্ত সন্তানের মূল্যবোধ বিরোধী অনৈতিক কর্মকান্ড আমাকে কাঁদায়। তবে একটি প্রশ্ন সুধীমহলে রেখে গেলাম, তা হচ্ছে সমাজের এ অস্থির চিত্র সারা বিশ্বেই বাড়ছে কিন্তু কেন? যারা এসব ঘটাচ্ছে শুধু কি তারাই এর জন্য দায়ী নাকি এ ঘটনাগুলো ঘটাবার পিছনে অনেক ঘটনা দায়ী? আমরা কি যারা এসব ঘটায় তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই সমস্যার ইতি ঘটেছে বলতে পারব, নাকি আমাদের আরো কিছু ভাবতে হবে?

আমার ভালমন্দ অনুভূতিগুলো কখন যে কাগজ কলমে স্থান পেতে লাগল তার ইতিহাস ভাবতে গেলে স্কুলের জীবনে ফিরে যেতে হয়। কতটুকু ভালো বা মন্দ লিখছি তা আমার ঐ সময় ভাবার বিষয় ছিল না, কিন্তু অনুভূতিগুলো কিছু কিছু লিখছি কিন্তু এর শুরুটা কিভাবে আজও ভাবি। আমাদের লালদিঘীর পাড় বাসায় দুটো ছাদ ছিলো। ছাদে ফুল ফলের অনেক গাছও ছিল। আমি প্রতিদিন ভোরের আগেই ঘুম থেকে উঠে যেতাম। বালিশে সব সময় একটি এল্যার্ম দেবার বড় ঘড়ি থাকত। ওটার শব্দ এত বেশি ছিল ঘুম ভাঙতে বাধ্য। আজো ঐ শব্দ আমি শুনতে পাই। ভোর হবার আগ পর্যন্ত আমি বালিশে বই রেখে মশারীর ভিতর, বসেই লাইট জ্বালিয়ে পড়া শুরু করতাম। কিন্তু ভোরের সূর্য উঠার আগে মুহূর্তেই বই হাতে নিয়ে ছাদের সিঁড়িতে বসতাম, পড়তাম, পাখির ডাক, ঝিরঝির বাতাস এবং সূর্য উঠার মনোরম দৃশ্য একটি অন্য রকম অনুভূতি যা প্রকাশ করার জন্য ঐ ছোট্ট মনে সৃষ্টির একটি যন্ত্রণা অনুভব করতাম। আগেও বলেছি ঐসব আদৌ কিছু কিনা বুঝিনি, ছন্দ মিলুক না মিলুক আমি লিখতাম এবং তারপর শান্তি কিছুটা পেতাম। এভাবে প্রকৃতি, জীবন, জগৎ কে অন্তরদৃষ্টি দিয়ে অনুভব করার একটি চেতনা ভিতরে গড়ে উঠতে থাকে। এরপর কিছু কিছু লিখা প্রকাশিত হতে থাকে ‘দৈনিক জালালাবাদ’ পত্রিকায়। তখন মনে আছে ছোটগল্প ও একটু একটু কবিতা লিখতাম আর এসব সদ্যজাত এলোমেলো লিখার একমাত্র পাঠক ছিল আমার কাকীমা। উনি প্রথমত আমার মাতৃসম, আমার সৃজনশীল কাজের প্রেরণাদাত্রী। এভাবে গোপনে একটু একটু কাজ চলতে লাগলো পড়ার পাশাপাশি। কিন্তু প্রকাশ হলো ঐ সময় যখন আমি ভাল রিজাল্ট করার পর রেডিওতে সাক্ষাৎকার দেই। সেদিনই প্রথম আমি আমার স্বরচিত কবিতা (সম্ভবত ২১শে ফেব্র“য়ারির উপর লিখা) পাঠ করি সবার সামনে। সাক্ষাৎকার পর্বের শেষে বাবা জিজ্ঞাসা করলেন আমি কোন কবির কবিতা নিজের লিখা বলে পাঠ করলাম এবং কারো লিখা নিজের বলে চালিয়ে দেয়া কত বড় অপরাধ। যা প্রচারিত হবে গণমাধ্যমে, তিনি আমার শান্ত স্বরে বুঝাতে লাগলেন। আমি তখন উত্তরে বাবাকে সত্যটা জানিয়ে নিশ্চিন্ত করলাম যে, বাবা ঐ কবিতাটি আমার নিজেরই লিখা। আমি একটু একটু লিখতে চেষ্টা করি।

ঐ সময় আমার কার্যক্রমের মধ্যে আরো বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিলো। তা হলো বাগান করা এবং নিখুঁত সেলাই করা। কাঁথা স্টিচ দিয়ে করা বড় বড় কয়েকটি Wall mat আছে যেখানে আমার বাংলাদেশের ঐতিহ্য ঢেঁকি, সাপখেলা, বাঁশঝাড়, নৌকা, মাছ ধরার দৃশ্য, ধান কুনা, কৃষাণী, একতারা হাতে বাউল, পালকি, পিঠা ভাজার দৃশ্য ইত্যাদি অন্যদিকে ক্রস স্টিচ দিয়ে করেছি অনেক কাজ।

প্রচুর ফুলের গাছ লাগাতাম। ঘুম থেকে উঠে দৌড়ে যেতাম গাছের কাছে কোন গাছে নতুন আরেকটি পাতা গজালো বা ফুল ফুটলো। ছাদের উপর কোনো সার ছাড়াই শশা, লাউ, মিষ্টি কুমড়ো অনেক ধরেছে। ঠাকুরমা বলতো সবাই মুখে চিনি দিয়ে গলা গান ধরে মিষ্টি কুমড়োর বিচি বললে তা মিষ্টি হবে এবং প্রচুর মিষ্টি কুমড়ো ধরবে। আমরা তাই করতাম। আজ মনে হলে খুব হাসি পায়। যা হোক একাডেমিক বইয়ের কাজে হাত দেই ২০০৭ সালে সদ্য বিদায়ী মাউশীর ডিজির ম্যাডাম প্রফেসর ফাহিমা খাতুনের অনুপ্রেরণায়। আজও ম্যাডামের সেই বাক্যটি কানে প্রতিধ্বনিত হয়, ‘‘পান্না তুমি তো বই লিখা শুরু করতে পার।’’ আমি বলেছিলাম ম্যাডাম আমি কি পারবো? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘‘তুমি তো ভালো ক্লাশ নেও, একজন টিচার কে দেখলেই বুঝা যায় সে কি পারবে, না পারবে। আমি বলছি তুমি পারবে?’’ সারাদিন রাত কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তারপর সিদ্ধান্ত নিলাম লিখবো, তবে প্রথম বইটা ম্যাডামের সাথে। প্রথম বইটার নাম ছিল 'Social Structure of Bangladesh' বইটির সিলেবাসটা অনেক বড় ছিলো। দেশি বিদেশী বই জার্নাল মিলিয়ে ৪৫-৫০ টা পড়েছি আড়ে। কোন্ বইয়ে কোন্ বিষয়টা পাওয়া যাবে তা মার্ক করেছি। তারপর লিখা শুরু। বইটির প্রচ্ছদ লাল সবুজ অর্থাৎ পতাকার রং। আমাদের সাথে আরেকজন ছিলো। জনাব বন্দে আলী। সে এখনো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে কর্মরত আছে। বইটি ব্যাপক সাড়া জাগাল।
২০০৮ সালে আমি সিলেট এম.সি কলেজে যোগদান করার পর শুরু হলো আমার লিখালেখির একলা পথ চলা। সৃষ্টির উল্লাসে তখন আমি বিভোর আমার নিজের লেখা প্রথম বই। ‘অপরাধবিজ্ঞান’ সারা বাংলাদেশের যত বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধ বিজ্ঞান বিষয় আছে সব সিলেবাস একত্র করে লিখা হয় সে বই যাতে ছিলো ১৯টি অধ্যায়। এই বই লিখতে গিয়ে প্রচুর আইনের বই পড়তে হয়েছে। ধারা দেখতে হয়েছে। বড় বড় ব্যক্তিত্বদের বই পড়েছি।
গাজী শামসুর রহমান এর অপরাধবিদ্যা বি এল দত্ত এর বিভিন্ন পর্বের বই, জার্নাল, কারাগার পরিদর্শনে গিয়েছি। পুলিশ বিভাগীয় কমিশনার অফিসে কথা বলেছি। বইটি প্রচুর সাড়া জাগিয়েছে।
তারপর একে একে অনার্স মাস্টার্সের জন্য অনেক বই লিখেছি। এখনও লিখে যাচ্ছি। তার মধ্যে সারাদেশে যে বইগুলো চলছে -
১. প্রারম্ভিক সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান
২. সামাজিক সমস্যা
৩. সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি
৪. ধ্রুপদী সমাজচিন্তা
৫. বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞান
৬. সমাজবিজ্ঞানের উপাদান
৭. ধ্রুপদী সমাজতাত্তি¡ক মতবাদ
৮. আধুনিক সমাজতাত্তি¡ক মতবাদ
৯. জেন্ডার, সমাজ ও উন্নয়ন (যন্ত্রস্থ)
১০. সমাজবিজ্ঞান পরিচিতি (বিএ পাস)
১১. সামাজিক ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা (যন্ত্রস্থ)
১২. বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো।

প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদ ডিজাইন আমি নিজে করতে পছন্দ করি। রং, মাপ, লিখা প্রত্যেকটা বিষয় নিজে করি। যাতে প্রতিটি বই প্রথম হাতে নিয়ে মনে হয় আমার সদ্যজাত আরেকটি সন্তান। উলেøখ্য বইগুলো কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতার বইমেলায় চলে।
আমার কাব্যগ্রন্থ দুটি ‘আমি নারী’ এবং ‘আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ’। ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমীর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশনা উৎসব ও আলোচনা অনুষ্ঠান হয় পাবলিক লাইব্রেরীর হলরুমে ঢাকায়।
২০১৪ সালে ‘আমি নারী’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয় বাংলা একাডেমীর নজরুল মঞ্চে। আর ২০১৫ সালে ‘আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ’ বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী জনাব নুরুল ইসলাম নাহিদ স্যার।
আসলে একাডেমীর বই লিখাই আমার ধ্যান ও নেশায় পরিণত হয়েছিলো। কিন্তু ২০১৩ সালে ‘হাকালুকি’ সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে অনেক কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী এসেছিলেন। অনুষ্ঠানটি হয়েছিলো হাকালুকির পাড়ে। তবে এ অনুষ্ঠান করার সকল কৃতিত্ব আমার বন্ধু কবি নিপু মলিøকের। তিনি সত্যিকার অর্থে একজন ভালো লেখক এবং একজন ভালো সংগঠক। অবশ্য অনেক আগে থেকে আমিও এ সংগঠনের একজন সদস্য। ঐ অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের মাননীয় এম.পি মহোদয় কবি কাজী রোজী ও বিশিষ্ট লেখক, চলচ্চিত্রকার শহীদুল হক খান উপস্থিত ছিলেন। উনাদের সঙ্গে কবিতার বই বের করার ইচ্ছা প্রকাশ করি আমি। উনারা উৎসাহ দেন সহযোগিতা করেন এবং প্রথম কাব্যগ্রন্থ বের হয় ঢাকা থেকে। এর মধ্যে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ম্যাগাজিনে, নানা বিষয়ে লিখা বের হতে থাকে। পরের বছর ২০১৫ সালে ঢাকা থেকেই বের করি আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ এখানে রয়েছে ৭১টি কবিতা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের স্বাধীনতা কে স্মরণ করে।
উলেøখ্য ২০১৪ ও ২০১৫ সালে আমার স্বামী নিখিল কুমার সাহারও পর পর দুটি বই বের হয়। একটি হচ্ছে ‘অনুরাগ’ (কাব্যগ্রন্থ) অপরটি ‘নির্বাচিত কবিতা’ (কাব্যগ্রন্থ)।
‘আমি নারী’ কাব্যগ্রন্থে নারীর ক্ষমতায়ন, পথ চলার নিরাপদ ব্যবস্থা, ‘সহানুভূতি নয় সমান অধিকারের কথা’ বলতে চেয়েছি।
আর ‘আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ’ কাব্যগ্রন্থে প্রকৃতি, দেশের জন্য ত্যাগ, সততা, মূল্যবোধ, বড় বড় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে লিখা রয়েছে। আবারও বিনয়ের সাথে বলছি আমি জানি আমি হয়ত ভালো লিখি না তবে সাহস করে কাজে হাত দিতে পারি, সেই আত্মশক্তি আমার আছে। আমার মা-বাবা, কাকু, কাকীমা, স্বামী, সন্তান কেউ কোনদিনও আমায় বলেনি চাকুরির বাইরে তুমি আরো কিছু কর। কিন্তু আমি খুবই কর্মচঞ্চল একটি মানুষ। একটা কাজ শেষ হবার আগেই আরো ৫টি কাজ অপেক্ষা করে অর্থাৎ আমি ওদের অপেক্ষা করাই এবং সব কাজের শেষ পর্যন্ত দেখি সফলতা বা বিফলতা কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।

কবি পান্না রানী রায় একজন আদর্শবান শিক্ষক। তার প্রতিটি দিন শুরু হয় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে। তিনি বর্তমানে সিলেট এমসি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার বাবা স্বর্গীয় রঙ্গঁলাল রায়-চাকুরীজীবি
মা ছায়া রানী রায়-গৃহিণী।দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে কবি পান্না রানী রায় সবার বড়। মেঝে বোন আনারকলি রায় ঢাকায় বসবাস করেন, সুব্রত নারায়ণ রায় (ব্যবসায়ী), মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক, ছোট ভাই মনোজ কুমার রায় (ব্যবসায়ী), সিলেট প্লাজা মার্কেটে ‘সানন্দা জুয়েলার্স’ এর মালিক এবং ‘গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীর পরিচালক। তার স্বামী শ্রীযুক্ত বাবু নিখিল কুমার সাহা একজন ব্যবসায়ী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জননী। তার মেয়ে ডাঃ জয়িতা সাহা, ছেলে (বিবিএ অধ্যয়নরত), জ্যোতির্ময় সাহা। বর্তমান ২/খ মৌচাক, সাইফা সামিট, শিবগঞ্জ, সাদিপুর, সিলেটে বসবাস করছেন। তার স্থায়ী বাসস্থান হচ্ছে এ/৩০, মেঘনা, দাড়িয়াপাড়া, সিলেট।

সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে কবি পান্না রানী রায়’র একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়। ৩০ অক্টোবর ২০১৬। সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি।


বীথি: প্রথম লেখাটি কী ছিলো এবং কত সালে প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়?
পান্না রানী রায়: প্রথম লিখাটি সম্ভবত কবিতা ছিল। ছোটগল্প ছিল ‘ঝরা পাতার গল্প’ প্রকাশিত হয়েছিল ‘দৈনিক জালালাবাদ’ নামক সিলেটের স্থানীয় পত্রিকায়। এই পত্রিকার কপিটি আজও আমার কাছে আছে।

বীথি: আপনার লেখালেখিতে কাদের উৎসাহ ছিলো বেশি?
পান্না রানী রায়: আমার বাবা, মা, কাকু, কাকীমা, স্বামী, সন্তানদ্বয়, সহকর্মী ও বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ বেশি পেয়েছি। তবে মূলত ছাত্রছাত্রীদের ঘিরেই আমার স্বপ্ন, কিভাবে আলোকিত মানুষ গড়া যায়, চেষ্টা করছি কতটুকু সফল হয়েছি তা ওরাই ভালো বলতে পারবে।

বীথি: এই পর্যন্ত আপনার কতগুলো বই বের হয়েছে?
পান্না রানী রায়: এ পর্যন্ত আমার মোট ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। (সমাজবিজ্ঞান সমপর্কিত (১০) এবং (২টি) (কাব্যগ্রন্থ) প্রকাশিত হয়েছে এবং আরো দুটি বইয়ের (একাডেমিক) কাজ চলছে। ২০০৭ সাল থেকে অনার্স মাস্টার্সের বইগুলো সারা বাংলাদেশে চলছে। কলকাতা বইমেলায় আমার বই নিয়মিত যায় এবং কোনো বই ফেরত আসে না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও আমার বই চলে।

বীথি : বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন?
পান্না রানী রায়: বর্তমানে নতুন (একাডেমিক বই) নিয়ে কাজ করছি। বাংলা একাডেমীর অমর একুশে বইমেলায় গবেষণাধর্মী একাধিক গ্রন্থ নিয়ে উপস্থিত হবার জন্য কাজ করছি।

বীথি : কত বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন?
পান্না রানী রায়: শিক্ষকতার বয়স ২৫ বছর। সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে ২ বছরের কাছাকাছি, বাকী সময় সরকারি কলেজে।

বীথি : কত সাল থেকে এম.সি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং কোন কোন জেলায় শিক্ষকতা করেছেন?
পান্না রানী রায়: আমি এম.সি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ) হিসাবে যোগদান করেছি ২০শে আগস্ট ২০০৮ খ্রী:। আমি সরকারি স্কুলে চাকুরী করেছি সিলেট সরকারি অগ্রগামী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে, বিসিএস হওয়ার পর প্রথম যোগদান করি নওগাঁ সরকারি বি.এম.সি. মহিলা কলেজে প্রভাষকরূপে। এরপর প্রভাষক হিসাবে নরসিংদী সরকারি কলেজে। তারপর পদোন্নতি নিয়ে ল²ীপুর সরকারি কলেজে, এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে এবং বর্তমানে পদোন্নতি নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানরূপে এম.সি কলেজে কর্মরত আছি।

বীথি : শিক্ষক হিসেবে নিজেকে কতটুকু সফল ভাবেন?
পান্না রানী রায় : শিক্ষক হিসাবে সফলতা কতটুকু এভাবে ভেবে দেখিনি। কারণ আমি নিজেকে আজো ছাত্রীই ভাবি। পড়ার টেবিলে সারাদিন থাকতে পছন্দ করি। এককাপ চা এবং বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই আমার দিনের কাজ শুরু হয়। কলেজে যাবার আগেই আমি দেড়/দুই ঘন্টা যে কোন বিষয় পড়ি বা লিখি। আবার সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে মগ্ন থাকি। রাত ১টা থেকে দু’টার দিকে ঘুমাতে যাই। তবে যতটুকু শিখি নিয়মিত তা ছাত্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতে চাই। তাছাড়া আমি ক্লাসে শুধু সিলেবাসের বিষয়ই পড়াই না। ছাত্রদের উচ্চ শিক্ষিত ভাল মানুষ হয়ে গড়ে উঠার অনুপ্রেরণাও যোগাই। আমার কাছে মনে হয় একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত একজন ভালো মানুষ হিসাবে। ছাত্রদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, প্রকৃতিকে ভালবাসা, প্রতিদিন কমপক্ষে ১টি করে ভালো কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তা নোট রাখা, পরিবারের প্রতি, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে প্রতিদিনই কমপক্ষে ৫ মিনিট বলি। আমি মনে করি মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করার জন্য একজন শিক্ষক সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
আমি মনে করি ''A good teacher is like a candle, it consumes itself to light the way of others.'' তবে একজন ছাত্রের সাফল্যের জন্য তিনটি বিষয় মনে রাখা জরুরী বলে মনে করি-
1. Know more than other.
2. Work more than other.
3. Expert less than other.
যে যোগ্য তাকে চাইতে হয় না, সফলতা নিজেই তার কাছে ধরা দেয়।

বীথি: একজন শিক্ষকের ভেতরে কতটুকু জ্ঞানের আলো থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
পান্না রানী রায় : আসলে জ্ঞানের কোন পরিধি নেই। ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের মিথস্ক্রিয়ার (Interaction) বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজের প্রেক্ষিতে ভাবতে হবে। শুধু বন্ধুসুলভ আচরণ দিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে কাঙ্খিত লক্ষৌ পৌঁছানো যাবে না তার সাথে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। দুইয়ের মিশ্রণ ঘটাতে হবে কিন্তু তার অর্থ কোন ভাবেই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে নয়। আমি লক্ষ্য করেছি আমার ছাত্রদের মাঝে আমরা যদি চাই তবে যে কোনো কাজ আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ভাবে ছাত্ররা সম্পন্ন করতে পারে। সে মেধা ওদের অধিকাংশের আছে। আমার নিকট মনে হয় ছাত্রদের যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী, বইমুখী করা যায় এবং এক্ষেত্রে শক্ত জবাবদিহিতা থাকে তবে ছাত্রদের শিক্ষার গুণগত মান অনেক বৃদ্ধি পাবে। এর জন্য পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার, বিতর্ক, আলোচনা সভার আয়োজনে তাদের সংযুক্ত ও ব্যস্ত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ছাত্র, শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক সর্বোপরি সরকারি পদক্ষেপ এ সকল কিছুর সমন্বিত কর্মপ্রয়াস প্রয়োজন।

বীথি : এই পর্যন্ত কী কী পুরস্কার পেয়েছেন?
পান্না রানী রায় : আমি ‘নিরব কর্মে’ বিশ্বাসী। তবে আমার জীবন দর্শন হচ্ছে সময়ের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু এ পৃথিবীতে নেই। তাই প্রতি দমে দমে সময়কে যতটুকু সম্ভব কাজে লাগাতে হবে। লক্ষ্যে স্থির ও অবিচল থাকতে হবে এবং তার জন্য যত পরিশ্রম করা দরকার তা করতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি যদি ইতিবাচক (Positive) রাখা যায় তবে ‘বিজয়’ নিজেই এসে ধরা দেয়। তাই বলা যায় লক্ষ্য+পরিশ্রম=সফলতা।
আমি সিলেট ‘পারমিতা’ সংগঠন কর্তৃক শ্রেষ্ঠ লেখিকা নির্বাচিত হই এবং আমার মা কে ‘শ্রেষ্ঠ লেখক মাতা’ সম্মাননা দেয়া হয় ২০১৩ সালে। এছাড়া কবি সংসদ বাংলাদেশ কর্তৃক ‘কবি জীবনান্দ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৫’ (কুয়াকাটা) সাহিত্য সম্মেলন, কুয়াকাটা থেকে প্রদেয়) স্মৃতি’৭১ সম্মাননা পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর ঢাকা। এছাড়া আরো কিছু পুরস্কার রয়েছে।

বীথি: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমি নারী’ এই শিরোনামে আপনী কী বুঝাতে চেয়েছেন। আপনার লেখা বিষয়বস্তু কী?
পান্না রানী রায় : আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমি নারী’। এখানে আমি বুঝাতে চেয়েছি নারীকে অবলা করুণার পাত্র না ভাবা। জীবনের ৩ ভাগে পিতা, স্বামী, পুত্রের ওপর নির্ভরশীলতা বাদ দিয়ে তাদের স্বাবলম্বী হবার সুযোগ করে দিতে হবে। এখানে করুণার চোখে নারীকে দেখার কোন সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে নারী প্রমাণ করেছেন তারা সর্বক্ষেত্রেই পারদর্শী। ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে হিমালয়ের শীর্ষে এ মাটির নারীর পদচারণা রয়েছে। সুতরাং ‘নারী’ বিশ্বকে দেখে পুরুষের চোখ দিয়ে’- এ ভাবনার পরিবর্তন আনতে হবে। নারী বিশ্বকে দেখে নিজের চোখ দিয়ে। নারী আলোকিত হলেই পরবর্তী প্রজন্ম, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আলোকিত হবে তা বুঝতে হবে এবং এক্ষেত্রে পুরুষদের সেই ভূমিকা রাখতে হবে বেশি। নারীর বড় হবার পরিবেশ তাদেরকেই গড়ে দিতে হবে। আমার লিখার মূল বিষয়বস্তু মানবপ্রেম, মানবতার জয়গান। কোন বিভাজন কোন সীমারেখা টেনে নয়, সত্য ও সুন্দরের পূজারী হতে চাই সবসময়।

বীথি : লেখালেখি নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
পান্না রানী রায় : লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আমার মনে হয় এ বিষয়টি কোন Construction এর কাজ নয় যে এত সালের মধ্যে এই কাজটি সম্পন্ন করব। এটি সৃষ্টিশীল কাজ চিন্তার চেয়ে অনেক বেশী বা কমও হতে পারে। তবে পরম প্রভুর নিকট প্রার্থনা সবসময় কাগজ, কলম, বই এই বিষয়গুলো ছেড়ে পৃথিবীতে যেন আমি একদিনও না বাঁচি।

বীথি: জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন?
পান্না রানী রায়: জীবনে শিক্ষকতা করতে চেয়েছিলাম। হতে পেরেছি এজন্য প্রভুকে অনেক ধন্যবাদ।

বীথি: কী করতে পছন্দ করেন?
পান্না রানী রায়: কাজের মাঝে ডুবে থাকতে পছন্দ করি। কখন সময় পার হয়ে যায় বুঝতে পারি না, বুঝতে চাইও না।

বীথি: কী অপছন্দ করেন?
পান্না রানী রায়: সময়ের অপচয় অথবা কোন কাজ কখনো না করতে পারাটা আমার খুব অপছন্দের বিষয়। হতে পারে কোন গাছ রোপণ, বা নতুন কোনো রান্না করা, অথবা সেলাই বা সৃষ্টিশীল কোন কাজ করা সে কাজ শুরু করা ও সম্পূর্ণ করার মাঝে আমি আনন্দ পাই। আমি বিশ্বাস করি যে, মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে তার স্বপ্নও ঘুমিয়ে থাকে। কোন মানুষই অমর নয়, কিন্তু সময়ের সঠিক সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে বড় বড় মানুষরা অমরত্ব পেয়েছেন।
আমি তাই ছাত্রদের বলি সময়ের যথার্থ মূল্য দিতে, লক্ষ্য উঁচুতে রাখতে এবং তার কাছে পৌঁছানোর জন্য কাজ করে যেতে, পরিবেশ পরিস্থিতি যা হোক না কেন, মনের শক্তিকে জাগিয়ে তাকে সতর্ক ভাবে পাহারা দিতে পারলেই হলো।

বীথি: অবসরে কী করেন?
পান্না রানী রায়: অবসর সময় আমার থাকে না বললেই চলে। গান শুনতে পছন্দ করি অবসরে। পছন্দের তালিকায় রবীন্দ্রসংগীত একা চুপচাপ শুনতে এবং কাঁদতেও পছন্দ করি। এতে ভারমুক্ত হই। কবিতা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, শাহ আবদুল করিম ও হাছন রাজার কিছু কিছু গান, শ্যামা সংগীত, পুরানো দিনের আধুনিক গান মান্না দে, হৈমন্তী শুক্লা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ফিরোজা বেগম, মিতা হক, এদের গান পছন্দ করি।
সন্তানদের সাথে গল্প করতে খুব পছন্দ করি। গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় থাকে আমাদের যৌথ পরিবারের ছোটবেলার গল্প এবং ওদের ছোটবেলার গল্প। আরো ভালো লাগে মা ও কাকীমার সাথে গল্প করতে। সে গল্পের কোন আদি অন্ত থাকে না। স্মৃতির ভিড়ে আমরা হারিয়ে যাই। যেহেতু আমি বড় সন্তান তাই মা কাকীমার সংসারের কাজকর্ম, উনাদের পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, কর্তব্যপরায়ণতা দেখেছি, শিখেছি। তাদের এই বোধগুলি যখন আলোচনায় আসে আমি তখন তাদের চোখে অন্য পৃথিবী দেখতে পাই। -আমার মা ও কাকীমা পরিবারে আপন বোনের চেয়েও পরস্পর পরস্পরকে ভালবাসতেন আজও বাসেন। উনারা একই রকম গহনা, শাড়ী পড়তেন, উপহারও সেইভাবে পেতেন। দুজনের মধ্যে ব্যতিক্রম কিছু থাকতো না। একা সংসারে বড় মিস করি এসব। বিশেষ করে কর্মজীবী মহিলাদের জন্য। নতুন প্রজন্মকে ‘ভাল মানুষ’ করার জন্য যৌথ পরিবারের বিকল্প নেই।


বীথি: কিসের তাড়নায় লিখতে বাধ্য হন?
পান্না রানী রায় : আমি আমার নিজের মনের তাড়নায় লিখি। আমি অনেক সামাজিক সমস্যা, সমাজের, রাষ্ট্রের, পরিবারের কর্তব্য, বড় বড় ব্যক্তিত্বদের জীবন থেকে শিক্ষা যেমন ‘গণমাধ্যমে নারী’, ‘মাদার তেরেসা’, ‘জলবায়ুর পরিবর্তন- প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’, ‘এনজিও এর ভূমিকা- প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ ইতাদি অনেক বিষয় নিয়ে লিখেছি পত্রপত্রিকায়। অনেক কিছু বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আরো লিখার ইচ্ছা রয়েছে। সমাজের নতুন নতুন সম্ভাবনা যেমন আমাকে তাড়িত করে তেমনি অস্থিরতা আমায় আহত করে প্রতিনিয়ত। আমি সাম্যের গান গাইতে পছন্দ করি। এ সময়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কর্মকান্ডের চর্চা বিশেষ প্রয়োজন মনে করি।

বীথি: শৈশবের যে দুরন্তপনার কথা মনে পড়ে?
পান্না রানী রায়: শৈশবে খুব বেশি চঞ্চল আমি ছিলাম না। তবে আমার মন সব সময়ই নতুন কিছু করবার জন্য বড় অস্থির থাকত, আজো থাকে। একটা কাজ শেষ হবার আগেই মনে মনে আরেকটি কাজ তৈরির মডেল সৃষ্টি হয়ে যেতো। তবে মা-বাবা কোন সময় চাওয়া-পাওয়া নিয়ে যন্ত্রণা দিয়েছি মনে পড়ে না।

বীথি: কাকে বেশি মিস করেন?
পান্না রানী রায়: আমার বাবাকে বড় বেশি মিস করি। ২০০৯ সালে ১১ই মে বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমি বাড়ী থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি ১৮ বছর বয়সে। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে আমার বিয়ে হয়। সংসার ও পড়াশুনা সমান তালে করেছি। কখনো কোন অজুহাত দাঁড় করাইনি। এরপর বড় সন্তানের (মেয়ে) জন্ম এবং তাকে নিয়ে পরবর্তীতে ছেলে তাদের নিয়ে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করা, একক পরিবারের মধ্যেও আবার কখনো স্বামীকে ছাড়া সন্তান নিয়ে থেকেছি কখনো সবাই কে ফেলে একা কর্মস্থলে থেকেছি। যদিও মা বাবার কাছাকাছি থেকে একাকী জীবনের যন্ত্রণা কিছুটা ঘুচাব ভেবেছিলাম কিন্তু ভাগ্যে তা সইল না। আমার এম.সি কলেজে যোগদানের ৮ মাস পরেই বাবা চলে গেলেন। মা আছেন, ....বড় নিবাসী। মার মাঝেই মা ও বাবা দুজনকেই খুঁজে বেড়াই যখন কোন বিষয়ে অনেক কষ্ট পাই, মাকে জড়িয়ে ধরি, কষ্ট ৮০ ভাগ দূর হয়ে যায় কিন্তু মাকে কিছুই বুঝতে দেই না। সমাজ মনে করে বিয়ের পর মেয়েরা পরের বাড়ী চলে যায় কিন্তু আমি মনে করি মেয়ে বা ছেলে উভয়েরই দায়িত্ব পিতামাতার যতœ নেওয়া। যা হোক এ বছর (২০১৬) ১১'মে বাবার মৃত্যুর ৭ বৎসর পূর্ণ হলো। এত বেশি কেঁদেছি আমি বাবার জন্য। মৃত্যুকে মেনে নিতেই পারছিলাম না। মৃত্যুর পর একবারও বাবার ছবি দেখিনি, সহ্য করতে পারি না বলে। আসলে সেই অবয়ব দেখার জন্য কোন ছবির প্রয়োজন হয় না, চোখ বন্ধ বন্ধ করলেই আমি বাবাকে দেখতে পাই, কণ্ঠও শুনতে পাই, স্পর্শ করতে পারি। আমার ইচ্ছা হয় বাবাকে জিজ্ঞাসা করি আজো আমাদের কথা উনার মনে আছে কি না। আমাদের কথা ভাবেন কি না, কষ্ট পান কিনা। এমনকি কোনো মাধ্যম আছে কারো জানা, যাতে আমার এ প্রশ্নগুলো বাবাকে পৌঁছাতে পারি? এসব ভাবলে নশ্বর পৃথিবীর সব কিছুকে মনে হয় মায়ার খেলা, যত মায়া তত যন্ত্রণা, কিন্তু এ বেড়াজালের আবর্তেই তো ঘুরছি। মনে পড়ে হাছন রাজার সেই গান-
‘‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়
তাকে ধরতে পারলে
মন বেড়ি দিতাম পাখির পায়
কেমনে আসে যায়।’’
মনে পড়ে পান্না লাল ভট্টাচার্যের গাওয়া সেই কঠিন বা¯Íব শ্যামা সংগীতের লাইন-
‘‘যার জন্য মরো ভেবে
সে কি তোমার সঙ্গে যাবে
সেই প্রেয়সী দেবে ছরা
অমঙ্গল হবে বলে।’’
শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, এত বছর সংসার করার পর মৃত স্বামীর লাশের পাশে বসে ১টি মাত্র রাত কাটাতে স্ত্রীর আতংকের সীমা ছিল না।
এমন যন্ত্রনা, মায়া থেকে মুক্তির উপায় তাহলে কি? হাঁস যেমন দুধ, জল মিশিয়ে দিলে দুধ খেয়ে জলটুকু রেখে দিতে পারে তেমনি সংসারের কর্তব্য করে যতদূর সম্ভব মায়ার বাঁধন থেকে নিজেকে গোপনে দূরে রাখতে হবে এবং সর্বজীবের জন্য, প্রকৃতির জন্য ভালো কাজ করে যেতে হবে। নিজেকে সর্বদা মূল্যবোধ সচেতন থাকতে হবে। মানবতার জয়গান গাইতে হবে। সব ধর্মের মূল বাণী একটাই (সবাই ভালকে ভালো, মন্দ কে মন্দ বলেছে। আরেকটি বিষয়, একই প্রভুর নিকট হতেই সকল সৃষ্টির আগমন, ফিরে যেতে হবে সেই একজনের কাছেই। ধমনীতে একই লাল রক্ত বহমান।

বীথি:প্রত্যেক নারীর কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
পান্না রানী রায়: প্রত্যেক নারীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মমর্যাদাবোধ এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া। আমাদের সমাজের চিরায়ত রীতি নারীর জীবনের ৩টি পর্যায়ে ৩ জনের অধীন থাকতে হয়। শিশু বয়সে বাবা, যৌবনে স্বামী ও বৃদ্ধকালে ছেলে- এ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বলা হয় নারী বিশ্বকে দেখে পুরুষের চোখ দিয়ে। নারী কি ভাববে, কোথায় যাবে, কি খাবে, কি দামের পোশাক ব্যবহার করবে তা ঠিক করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষ, নারীকে বিশ্ব দেখতে হবে নিজের চোখ দিয়ে, এজন্য প্রয়োজন নারীর শিক্ষা। আমাদের সমাজে শিশু জন্ম গ্রহণের পর অল্প কয়দিন ‘শিশু’ হিসাবে থাকে, বড় হবার সাথে সাথে সমাজ তাকে নারী ও পুরুষের আচরণ, অধিকার কর্তব্য, শিক্ষা দিয়ে তার করণীয় ঠিক করে দেয়। তখন সে মানব সন্তান থেকে পরিণত হয় মেয়ে ও ছেলে সন্তান হিসেবে। তাই নারীর জন্য আমার বার্তা থাকবে-
Be strong, but not rude
Be kind, but not weak,
Be bold, but don't bully,
Be humble, but not shy
Be proud, but not arrogant.

মাদার তেরেসা বলেছেন- '''If your Eyes are positive. You hill love the world. But if your Tongue is positive, the world will love you.''

A Woman's love is in action. She looks with her heart and feels with her eyes. A woman is the Bank where her family deposits all anger, worries and hurt. A woman is the cement that keeps her family together and her love lasts a lifetime.''
এম.সি কলেজে আমার সমাজবিজ্ঞান বিভাগ সহ সকল ছাত্রছাত্রীদের আমি মমতা দিয়ে ভালবাসি, আমি চাই সকলেই হয়ে উঠুক এক একটি আলোকবর্তিকা। ওদের কাছ থেকেও আমি সকল কাজে সহযোগিতা ও শ্রদ্ধা পেয়েছি। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আমি মার্টিন লুথার কিং এর কথাগুলো বলব-
‘‘যদি দৌড়াতে না পার তবে হাটো
যদি হাটতে না পার তবে
হামাগুড়ি দাও
যাই কর না কেন মনে রেখো
সামনে এগিয়ে যেতে হবেই।’’


আমি অনেকগুলো সংগঠনের সাথে জড়িত আছি এবং প্রত্যেকটি সংগঠন থেকেই বের হয় ম্যাগাজিন, পত্রিকা ইত্যাদি। এসব সংগঠনে যুক্ত থেকে আমি আনন্দ পাই। যেমন-

বীথি : কোন কোন সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন?
পান্না রানী রায়:
হাকালুকি
বাংলার মুখ
সিলেট বিবেক
Inner Wheel Club of Sylhet
লেখিকা সংঘ
সিলেট নন্দিনী
জাতীয় কবিতা পরিষদ, এম.সি কলেজ, সিলেট
কবি সংসদ বাংলাদেশ
সারদা সংঘ, সিলেট
গীতা মন্দির
আজীবন সদস্য
উপদেষ্টা মন্ডলীর সভাপতি
সিলেট বিভাগের প্রধান প্রেসিডেন্ট
সদস্য
সদস্য ‘হাকালুকি’
বাংলার মুখ
বিবেক
শুচি
ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘জাগরণ’
বিভিন্ন সেমিনারে প্রধান অতিথি ও বক্তার দায়িত্ব পালন
আমি মনে করি, আমি যতটুকু এসেছি, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ আমার প্রভুর কাছে, আমার মা-বাবা, কাকু-কাকীমা, ভাই-বোন, শুভাকাঙ্খী সবার কাছে। আমি কৃতজ্ঞ আমার স্বামীর কাছে, যিনি সকল কাজে আমাকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি আরো বেশি কৃতজ্ঞ আমার সন্তানদ্বয়ের কাছে, ওদের যতটুকু সময় দেয়া দরকরা ততটুকু দিতে পারিনি এখনও পারি না। ওরা আমায় কাজ করার সুযোগ দিয়েছে বলেই আমি লিখতে পারি। সবশেষে আমার কাজ যাদের উদ্দেশেশ্য সেই ছাত্রছাত্রীদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
সবশেষে A.P.J. Abdul Kalam বলেছেন-
''I am not a handsome guy
But I can give my
Hand-To-Some one
Who needs help.
Beauty is in Heart
not in Face.''
আমরা অন্তরের সৌন্দর্যকে সমৃদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবোই- এই হোক আমাদের অঙ্গিকার।

বীথি: সিলেট এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।
পান্না রানী রায়: তোমাকে ও সিলেট এক্সপ্রেসকে ধন্যবাদ।



Free Online Accounts Software