দোয়েল পাখি প্রিয় পাখি
   21 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 13 August 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 553) 

দোয়েল পাখি প্রিয় পাখি

 দোয়েল পাখি প্রিয় পাখি
     

মোহাম্মদ আব্দুল হক:
পাখি শব্দটির সাথে মিশে আছে পাখাদুটো। মানুষের স্বাভাবিক বসবাস আছে অথচ পাখি নেই এমন কোনো অঞ্চল বা মানুষের দেশ বায়ুমন্ডলের কোথাও আছে এমনটি জানা নেই। সারা পৃথিবীজুড়ে কতো রকমের পাখি যে আছে তার সবগুলোর দেখা পাওয়া আমাদের কারো পক্ষেই কখনওই সম্ভব হবে কি না বলা না গেলেও আমাদের নানান জাতের পাখির দেশ বাংলাদেশের পাখি আমরা ইচ্ছে করলে দেখতে পারি। এখানে আমরা বাংলাদেশের এক অতি সুন্দর পাখির সাথে কিছু সময় কাটাবো এবং শব্দ আর বাক্যে জানবো তার কথা। পাখিটি আমাদের সকলের খুবই প্রিয় পাখি দোয়েল পাখি।

সকল প্রাণীর মতো দোয়েল পাখিও পুরুষ দোয়েল ও স্ত্রী দোয়েল হয়। তবে এদের স্ত্রী ও পুরুষ দোয়েলের মধ্যে রঙের খুব সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। এই পাখি সাধারনত মাঝারি আকারের অর্থাৎ লম্বায় প্রায় ৬ ইঞ্চি বা প্রায় ১৫ সেন্টিমিটারের চেয়ে কিছুটা বেশী হয়। পুরুষটির পেটের রঙ সাদা হলেও তার উপরে এবং গলার নিচে গাঢ় কালো রঙ হয়। দুই ডানায় লম্বা সাদা রঙ পাখিটির শারীরিক সৌন্দর্যকে আরো আকর্ষণীয় করেছে। ঠোঁট, মাথা, বুক, পা, লেজ সব মিলিয়ে দেখলে পুরুষ পাখিটিকে সুঠাম দেহী বলতে হয়। দোয়েল পাখি মাঝে মাঝে রাগত আচরণে তার লেজ উপরের দিকে খাড়াভাবে রাখে আর ব্যস্ততার ভঙ্গীতে উপরে নীচে নাচিয়ে চলে। তবে খেয়াল করলে সহজে বুঝা যায় স্ত্রী পাখির উপর ও গলায় গাঢ় কালো নয় বরং কিছুটা হালকা হয়ে ছাই রঙ ধারণ করেছে। তাই স্ত্রী দোয়েল দেখতে পুরুষ পাখিটির মতো অতোটা সুন্দর হয়না। ওদের চোখ স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে লালছে বর্ণের হয়। এটুকু বর্ননা থেকেই আমরা পুরুষ ও স্ত্রী পাখি চিহ্নিত করতে পারি। আর দোয়েল পাখি না চিনলে কিছুতেই মানা যায়না। এটি যে আমাদের জাতীয় পাখি। এদের স্বভাবে দারুন অস্থিরতা চোখে পড়ে সহজেই।

চড়ুই, কাক কিংবা টুনটুনি সকল পাখির আলাদা ডাক আছে যেসব আওয়াজ শুনে আমাদের সকালবেলার ঘুম ভাঙে। তাই বলে আমরা সব পাখিকে এক কথায় গানের পাখি বলিনা। যেসব পাখির সুমিষ্ঠ কন্ঠ শুনে আমাদের কবি মন আন্দোলিত হয় আর যে পাখির সুর প্রেমিক মনে মুগ্ধতা জাগায় সে পাখি গানের পাখি। আমাদের যতো গানের পাখি আছে, তাদের মধ্যে সেরা পাখি হচ্ছে আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েল। ইংরেজিনাম Oriental Magpie Robin যা আমাদের গায়কী পাখি দোয়েল। চমৎকার সি-উ-ই-ই, সি-উ-ই-ই শব্দে শিস দিয়ে সে আমাদের মন কাড়ে। দোয়েল পাখি চড়ুই পাখির মতো সাধারণত লোকালয়ে আসতে চায়না। দোয়েল পাখি বুলবুলি পাখির মতো বা ততোধিক কোলাহলময়ী নয়। বাগানে, বনের ঝোপে, পাতার ফাঁকে, মাঝে মাঝে ঘরের টিনের চালে বা পাকা বাড়ির কার্নিসে এদের দেখা মিলে। এরা একাকী ঘুরে বেড়ায়, আবার দুটি একসাথে চলতেও দেখা যায়। খাবারের প্রয়োজনে এদেরকে মাঠে ও নদীর কিনারায় লাফিয়ে চলতে দেখা যায়। এদের খাদ্য তালিকায় অন্যান্য ছোট পাখিদের মতোই পোকা, মাকড়, ফড়িঙ, নানা জাতের কীট, কেঁচো, ফুল ও ফলের রস ইত্যাদি থাকে। শহরের বড় বড় দালানের ফাঁকে ফাঁকে এরা পোকা সংগ্রহ করে বেড়ায়। এই দোয়েলকে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন আঞ্চলিক নামেও ডাকতে শোনা যায়। আমাদের সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা নদী তীরবর্তী হরিনাপাটি, রঙ্গারচর, বিরামপুর ও আশপাশের গ্রামের লোকজন দোয়েল পাখিকে 'দইওল' নামে ডাকেন। এক কথায় বলা যায় রাজধানী শহর ঢাকা থেকে একেবারে বাংলাদেশের গ্রামের পুকুর পাড়ে, হাওরের ধানক্ষেতের আলে সর্বত্রই আছে আমাদের জাতীয় পাখি সুদর্শন দোয়েল।

দোয়েল পাখি প্রজনন মৌসুমে বাসা বাঁধে। ওই সময়ে পুরুষ পাখিটি শিস দিয়ে স্ত্রী পাখিটিকে কাছে টানে। তাদের মাঝে প্রাকৃতিক নিয়মে ভাব বিনিময় হয়। প্রকৃত প্রজনন প্রক্রিয়া শেষে পুরুষ পাখিটির নির্বাচিত স্থানে স্ত্রী পাখিটি বাসা বানায়। সাধারণত গাছের গর্তে বা কোনো বাড়ির লুকানো ফাঁক-ফোকরে এরা লতা-পাতা, ছোট ডাল, ঘাস ইত্যাদি দিয়ে অস্থায়ী বাসা তৈরী করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় মার্চ - জুলাই মাস এদের প্রজনন ঋতু। এই সময়েই আমাদের ' বসন্ত - গ্রীষ্ম - বর্ষা ' ঋতু। প্রজনন মৌসুমে দোয়েলের সুরেলা কন্ঠ খুব বেশী শুনতে পাওয়া যায়। স্ত্রী পাখি নীলচে-সবুজ রঙের ৪টি বা ৫টি ডিম পাড়ে এবং ১২ - ১৪ দিন তা দেয়ার পর বাচ্চা বের হয়। ছানাগুলো দুই সপ্তাহে বড় হয়ে উঠে এবং এক সময় নিজের ডানায় ভর করে আত্মবিশ্বাসী নতুন দোয়েল তার স্বজাতি প্রবীন দোয়েল ও নানা জাতের পাখিদের সাথে মিশে যায়।

পাখিরা আমাদের পরম বন্ধু। এদের জন্যে আমাদের পরিবেশ সুন্দর ও সুখকর হয়ে উঠে। এই পাখিরা মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে আবাস সংকট ও খাদ্য সংকটে পড়ে অস্তিত্বের হুমকিতে যেন পড়ে না যায় সেদিকটি খেয়াল রাখাই হবে আসল মানবিক গুণের প্রকাশ। টিকে থাকুক আমাদের পাখি বক, শালিক, চিল, ফিঙে, কোকিল, ডাহুক, বুলবুলি, ঘুঘু , মাছরাঙা সহ সব পাখি। টিকে থাকুক আর শিস দিয়ে মন মুগ্ধ করে লাফিয়ে চলুক, উড়ে চলুক দোয়েল পাখি প্রিয় পাখি ।।
# লেখক _ কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক


Free Online Accounts Software