জসীম উদ্ দীন কেন আধুনিক
   22 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 3 August 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 637) 

জসীম উদ্ দীন কেন আধুনিক

জসীম উদ্ দীন কেন আধুনিক
     

হুসাইন মুহাম্মদ ফাহিম:
নাগরিক জীবনের অস্থিরতা, ক্লান্তি, অবসাদ, যন্ত্রণা ও বেদনাকে ছাপিয়ে জসীম উদ্ দীনের গ্রামকেন্দ্রীক ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, রাখালী, বালুচর, ধানখেত, রঙিলা নায়ের মাঝি, রূপবতি, মাটির কান্না, এক পয়সার বাঁশী, কাফনের মিছিল ইত্যাদি গ্রন্থগুলো যেন চেনা হৃদয়ের দরদ দিয়ে আঁকা। পাড়া গাঁয়ের মেয়ের ডাগর নয়নযুগল, পল্লী রাখালের চোখ জুড়ানো কালো রূপ, বাঙালির বিবাহ বাসর, গিন্নির ঘরকন্না। এ সকল দৃশ্যে বুক জুড়িয়ে যায়। হারানো জিনিস পাওয়ার যে আনন্দ, কবি তা আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন। আধুনিক শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে লোক কাব্যের ভাণ্ডার থেকে রস সংগ্রহ করে লোকজীবন নিয়ে তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন।
পল্লী তাঁর কাছে শান্তি ও সৌন্দর্যের আশামাত্র নয়- একান্ত সহজ ও স্বাভাবিক পরিবেশ। এ পরিবেশেই কবি লালিত, পালিত ও বর্ধিত। পল্লী যেন কবির আত্মার আত্মীয়। তাঁর কাব্যভাষার ‘নকশী কাঁথা’। তাঁর কবিতা ‘গেঁয়ো মাঠের সজল শীতল বাতাসের স্পর্শ নিয়ে নগরের ঊর্ধ্বশ্বাস জীবনে স্বস্থির বাণী বহন করে এনেছে। বাঙলার নদ-নদী বিধৌত শ্যামল প্রকৃতি যেন ‘অশ্রুত কোন গানের ছন্দে চিরতরঙ্গায়িত। পল্লী নর-নারীর আশা-আকাঙক্ষা, কামনা-বাসনা, ব্যর্থতা, বঞ্চনা, স্নেহ ভালোবাসার অজস্র প্রকাশ সুরময় হয়ে ওঠেছে অফুরন্ত গানের অন্তহীন বৈচিত্রে।

আমার ধারনা, জসিম উদ্দীন পল্লীকবি বলে খ্যাত হলেও তার কবিতাগুলো আধুনিক কবির হৃদয়-ই ধারণ করে। যেহেতু সাময়িকতার উর্ধ্বে তার কবিতা ক্রম সংস্করণে প্রকাশিত এবং অন্তরলোকে প্রবাহিত।

কবির নকশি কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, এক পয়সার বাঁশি, একের পর এক সংস্করণের পর সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। অতএব, কবির কবিতা নির্মাণ কলায় এমন কিছু আছে যা বাঙ্গালি জীবনের সমকালীনতাকে ধারণ করে। পল্লী কবিরা গ্রাম বাংলার মানুষের সংবাদ পিপাসা ও রসতৃষ্ণাকে মেটাতে পারলেও তাতে তাদের চৈতন্যের স্তরের বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়। হৃদয়ে খুব একটা বিকশিত হয় না। এমনি গ্রাম বাংলার মানুষের মাঝে তা পুনঃপ্রচারের উত্তরণ ঘটে না। এখানেই কবি জসীম উদ্ দীনের কবিতা পল্লী কবিতা থেকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা হয়ে আছে। পল্লী কবির কবিতা ঘটনানির্ভর, পুনরাবৃত্তিময়, নিয়ম এবং ছকে বাধা। জসীম উদ্ দীনের কবিতা কি তাই? আমার মতো সবাই এ প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, না। তাহলে জসীম উদ্ দীনকে কোন যুক্তিতে শুধু পল্লী কবি বলবো? কোনো যুক্তি তর্কে জসীম উদ্ দীনকে স্রেফ পল্লী কবির বেষ্টনে রাখা সম্ভব নয়, অতএব বাঙ্গালি এবং বাংলা ভাষাভাষির অন্যতম জসীম উদ্ দীনের কবিতায় রাখালিয়া সুর ও পল্লী জীবনের ভাববস্তু আছে। আরো আছে কথকথার ধরণ ও আখ্যান প্রবণতা! কবি তার কবিতায় দেশ, কাল, সমাজ, মানুষ ও জীবনদৃশ্য চিত্রিত করেছেন তা কেবল সুন্দরই নয়। বলতে হয় কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা সংহত, পরিপাটি ও অনুপম শিল্প আকার লাভ করেছে।
বাংলা সাহিত্যে কবি জসীম উদ্ দীন তাই চিরস্মরণীয় এবং মনোলোকে শীতল অবগাহনের তকমায় চিরভাস্বর।
তার কবিতার দ্যোতি মনের বিষ্ণতা ভেদ করে দোলা দিয়ে যায় অন্তরে।

লাল মোরগের পাখার মত ওড়ে তাহার শাড়ি
ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ি।
জালি লাউ-এর ডগার মত বাহু দু’খান সরু
গাখানি তার শাওন ঘাসের যেমন তমাল তরু।
(সোজন বাদিয়ার ঘাট)

এখানে ছন্দের ঢেউয়ে মেতে উঠে গ্রাম বালিকার রূপের অপরুপ সমাহার। আর উপমার সুষমায় মণ্ডিত হয়ে উঠে কবিতার দেহ।
জসীম উদ্ দীনের কবিতায় যেমন আছে জীবনের সুখের মধুমাখা কথা, তেমনি আছে ট্রাজেডির বর্ণনা। দুঃখে ভারাক্রান্ত করার অপূর্ব নিদর্শন পাওয়া যায় তার কবর কবিতায়-

‘আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবরের দেশে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝ্ঝুম্ নিরালায়।’

জসীম উদ্ দীনের কাব্য-সাহিত্য অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ (১৯৭২)-এর দৃষ্টান্ত। পল্লীবাসীদের বিচিত্র দুঃখ-বেদনাকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে, যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এসব বিষয়। প্রেম-ভালোবাসা-বিরহ-মিলন পূর্ণ কাব্য ভাষা রূপ পেয়েছে এ কাব্যে। একজন রাখালের দৈনন্দিন কাজের বর্ণনা দিয়েছেন চমৎকারভাবে।

‘খেলা মোদের গান গাওয়া ভাই
খেলা লাঙ্গল চষা
সারাটা দিন খেলতে জানি
জানিনাকো বসা।’
(রাখাল ছেলে)

আবার অভাবগ্রস্ত গ্রামীণ মানুষের চালচিত্র অঙ্কন করেছেন এবং বিস্ময়কর পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

‘কত কথা আজ মনে পড়ে মা’র, গরিবের ঘর তার,
ছোটখাট কতো বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
আরঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই,
বলেছে আমরা মুসলমানের আরঙ দেখিতে নাই।

এবং- আসমানী কবিতাও দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের করুণ চিত্র ফুটে ওঠে।

আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
(আসমানী)

প্রায়োগিক আলেখ্যে যার ব্যাপ্তি অব্যাহত প্রকাশে দুর্লভ হয়ে সাময়িকতাকে পরাজিত করে। এখানেই কবির সফলতা এবং আধুনিক কবিতার প্রবাহ।

এছাড়াও বাংলা সাহিত্যে ব্যালাড বা গীতি কবিতার যে শূণ্যস্থান ছিলো তা কিছুটা হলেও পূরণে স্বার্থক হয়েছেন জসীম উদ্ দীন।

এবং রবীন্দ্রপরবর্তী সময়ে রাবীন্দ্রিক রীতিতে বাংলা সাহিত্যে যে গড্ডালিকা প্রবাহ শুরু হয়েছিল এই প্রবাহ ভেঙে কবিতায় নতুন স্র্রোত তৈরি করেছিলেন তিনি। কাহিনীকাব্যেও তাঁর কবিতা বিশাল অবদান রেখেছে বাংলা সাহিত্যে। তাঁর কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর মন্তব্য করেন, জসীম উদ্ দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে লিখতে পারে না।

তিনি, জসীম উদ্দীনের নকশি কাঁথার মাঠ কবিতাকে সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা বলে মন্তব্য করে বলেছিলেন, আমি এটাকে আদরের চোখে দেখেছি, কেনো না এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লী জীবন আমার কাছে চমৎকার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।

সর্বোপরি তিনি চিন্তায়, প্রকরণে, ছন্দের অঙ্গসজ্জায়, শিল্পের বৃহত্তর কারুকার্যে কবিতায় আধুনিকতার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন।

লেখক মেলা  এর অন্যান্য লিখাঃ

21 October 2017  অংকে আমি কাঁচা

20 October 2017  প্রিয়তমা

20 October 2017  আমার মা

12 October 2017  পরপারে তুমি উত্তীর্ণ হও

10 October 2017  কেন তুমি চলে গেলে


Free Online Accounts Software