25 Sep 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 16 July 2017 ব্যক্তিত্ব  (পঠিত : 845) 

স্মৃতির মণিকোঠায় আলহাজ্ব জমির উদ্দিন

স্মৃতির মণিকোঠায় আলহাজ্ব জমির উদ্দিন
     

আব্দুল মালিক:
আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করে ঘোষণা করেছিলেন, ‘তোমরা সৃষ্টির সেরা আশরাফুল মাখলুকাত’ এবং ফেরেশতাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা সৃষ্টির সেরাদের সম্মান করো। কারণ তোমাদের থেকে তারা আমার কাছে বেশী মর্যাদাবান।’ সৃষ্টির পরেই আদম সন্তানের এমন স্বীকৃতি আল্লাহর দয়া এবং করুণারই ফল। আল্লাহ মানুষকে ভালবাসেন। মানুষ হিসেবে আমাদেরও উচিত তাঁর হুকুম আহকাম পালনের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করা। আর এই হুকুম আহকামের অন্যতম হচ্ছে মানুষ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করা অর্থাৎ হক্কুল ইবাদ। কর্মই জীবন আর জীবনই কর্ম। কর্মের মধ্যে যে জীবন পরিচালিত হয় সেই জীবন স্বার্থক ও সফল। আবার স্বার্থক জীবনের অধিকারী সকল সফল হতে পারেন না। যারা মানব কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করেন কেবল তারাই হন সফল ও ধন্য মানুষ।
এ দুনিয়া অনিত্য। নিত্যই মানুষ এ মায়াময় পৃথিবীতে আসছে আর যাচ্ছে। জীবন-মৃত্যুর মধ্যে মানুষের বাস। তবুও জীবন চলমান। আশা নিরাশার দোলনায় দোদুল্যমান অবস্থায় জীবনকে কর্মময় ও আনন্দময় করে তোলে মানুষ। এখানেই জীবন গতিশীল হয়ে উঠে। মানুষ আনন্দময় জগতে বিচরণ করে পরিবেশকে জাগিয়ে তোলে। মানব কল্যাণ, সৎচিন্তা ও সমাজ ভাবনায় নিমজ্জিত থাকে। সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় ন্যায়, সত্য, সাহস ও উদ্দীপনার আলো। কর্মগুণে নিজেকে স্বচ্ছ, পরিছন্ন, গ্রহণযোগ্য ও নন্দিত করে তোলেন সর্বসাধারণের কাছে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর গুণের, কর্মের, সেবার ও ভালবাসার কথা স্বজন পরিজন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। প্রশংসা ও গুনকীর্তন করেন। এমন একজন মানুষ ছিলেন মরহুম আলহাজ্ব জমির উদ্দিন। অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর ব্যক্তি চরিত্র ছিল অমায়িক, বন্ধুসুলভ ও পরহিতে নিবেদিত। মানুষের সেবা ও দান করতেন অতি নিরবে ও গোপনে। একজন প্রচারবিমুখ, পরোপকারী নিভৃতচায়ী মানুষ হিসেবে লোভ লালসা পরিহার করে জনগণের কাতারে অবস্থান করছেন আজীবন। তিনি ছিলেন নির্মল চরিত্রের অধিকারী। নির্লোভ, নির্মোহ, সমাজসেবী, কর্মক্ষম একজন মানুষ। স্বজন পরিজন সহ গরীব মানুষের সেবা করাই ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
মৃত্যু পরম এক সত্যের নাম। মৃত্যু শ্বাশ্বত ও চিরন্তন। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কত মানুষের, আপনজনের মৃত্যুর খবর শুনি কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যুর সংবাদে বুকের ভিতরটা ধড়াস করে ওঠে। তেমনি একটি মৃত্যুর সংবাদ ছিল আমার একান্ত আপন জন আলহাজ্ব জমির উদ্দিনের মৃত্যুর সংবাদ। এতো তাড়াতাড়ি তাঁর মৃত্যু সংবাদ শোনার প্রস্তুতি আমার ছিলনা। এখনো চোখ বুঝলেই তাঁকে দেখতে পাই। তিনি লন্ডন প্রবাসী হলেও ঘন ঘন দেশে আসতেন। দেশে এসে পরিবারের বাইরে বোধ হয় আমাকেই প্রথম খবর পাঠাতেন। লন্ডন থেকেও ফোনে কথা বলতেন। ২০০২ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন এবং লন্ডনে তাঁকে সমাহিত করা হয়। এরপর থেকে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্তে¡ও নানা প্রতিকূলতার কারণে লেখা হয়ে উঠেনি। স্মৃতি পুরোনো হলে নাকি গীতিকা হয়। স্মৃতিতে চাপ পড়লে তাঁর আলগা সুতোগুলো অনেক ছড়িয়ে যায়। দেরীতে হলেও আজ তাঁকে নিয়ে কিছু লিখতে বসলাম। অন্যকথায় মনের তাড়নায় বসতে বাধ্য হলাম। আলহাজ্ব জমির উদ্দিন সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার বহরগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মাঝরবাড়িতে ১৯৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব এবং যৌবন কাটে গ্রামে। তিনি ১৯৫৬ সালে লন্ডন যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে সংসার পরিচালনা করলেও তাঁর মধ্যে এক ধরণের আত্মমর্যাদা বোধ ছিল। তিনি কখনোই ফাঁকিবাজি, মিথ্যা, শঠতার আশ্রয় নিতেন না। লন্ডনে যাওয়ার পরও তিনি সততা আন্তরিকতার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে কর্মস্থল সহ সর্ব¯Íরের মানুষ তাঁকে ভাল বাসতেন। তাঁর সমসাময়িক অনেকের চাইতে তিনি কয়েকগুন বেশী আয় রোজগার করতেন। তাঁর রোজগারের টাকা দিয়ে একদিকে তিনি কয়েক বিঘা জমি কিনে বিরাট বাড়ি ও ঘর নির্মাণ করেন। অন্যদিকে নিজের দরিদ্র আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রামের উন্নয়নে অকাতরে অর্থ ব্যয় করেন। কুরআন হাদীসে আছে দানে সম্পদ কমে না বরং বাড়ে। এই সত্য আলহাজ্ব জমির উদ্দিনের বেলায় দিবালোকের মত স্পষ্ট। ‘এমন কে আছো যে আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দেবে, উত্তম ঋণ ? যেন আল্লাহ তা কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দিতে পারেন এবং তার জন্য অতীব উত্তম সওয়াব রয়েছে’ (সুরা হাদীদ- আয়াত ১১)। ‘তোমরা তোমাদের দান সদকা যদি প্রকাশ্যভাবে দাও তবে তাও ভাল। আর যদি গোপনে অভাবী লোকদের দাও তবে তা তোমাদের পক্ষে বেশী ভাল। এরূপ কাজের ফলে তোমাদের বহু সংখ্যক পাপ মিটে যায়’ (সূরা বাকারা আয়াত ২৭১)। ‘আত্মীয়কে তার অধিকার দাও এবং মিসকিনকেও মুসাফিরকেও তাদের অধিকার দাও। বাজে খরচ করো না। যারা বাজে খরচ করে তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ।’ (সূরা বণি ইসরাইল, আয়াত-২৬)। রাসূল (সাঃ) আসমা (রাঃ) কে বলেন, ‘তুমি দান করতে থাকো, তুমি যত দান করবে আল্লাহ তোমাকে তত বাড়িয়ে দেবেন’ (বুখারী ও মুসলিম)। এভাবে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দানের মাহাত্ম সম্পর্কে অনেক বর্ণনা রয়েছে।
আলহাজ্ব জমির উদ্দিন তাঁর নিকটাত্মীয়, গ্রামের, এলাকার দরিদ্র মানুষকে সাধ্যনুযায়ী নিয়মিত সাহায্য সহযোগিতা করতেন। শুধু দরিদ্র মানুষকে নয় এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ও তিনি সাধ্যানুযায়ী দান করে গেছেন। ১৯৬৬ সালে বহর গ্রামের কতিপয় যুবক বহর গ্রাম জনমঙ্গল সমিতি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ও বহর গ্রাম ডাকঘর স্থাপনের জন্য বহর গ্রাম বাজারের তাঁর অত্যন্ত মূল্যবান ভূমি তিনি দান করেন। পরবর্তীতে বহরগ্রাম বাজার জামে মসজিদেও কিছু ভূমি দান করেন। যুব সমাজের মধ্যে একটি অপ্রীতিকর ঘটনায় জনমঙ্গল সমিতির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৬৯ সালে জনমঙ্গল সমিতির পাকা কার্যালয় ভবনে বহর গ্রাম হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এই হাফিজিয়া মাদ্রাসা ‘জামেয়া ইসলামিয়া বহর গ্রাম’ নামে অত্যন্ত সুনামের সাথে মেশকাত পর্যন্ত পড়ানো হচ্ছে এবং নিকট ভবিষ্যতে টাইটেল জামাত খোলা হবে। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা ২৭ জন এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ এর উপরে। তন্মধ্যে ২৫০ এর উপরে মাদ্রাসার বোডিং-এ ফ্রি থাকা খাওয়া করে লেখাপড়া করেন ও এ পর্যন্ত ৫১৮জন কোরআনে হাফেজ বের হয়েছেন। ১৯৭৭ সালে বহর গ্রাম জনমঙ্গল সমিতি পূণঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে বর্তমানেও রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত হয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আলহাজ্ব জমির উদ্দিন বহর গ্রাম মধ্যম মহল্লা জামে মসজিদ নির্মাণ ও পূণঃনির্মাণ, বহর গ্রাম, বায়তুল আমান জামে মসজিদ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এমনকি সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে তিনি অর্থ সাহায্য করেছেন। গ্রামের বড় রা¯Íা নির্মাণে ও তাঁর অবদান প্রশংসনীয়। গ্রাম ও এলাকার রা¯Íা, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুলের উন্নয়নে, অসহায় ও গরীব মানুষের সাহায্যার্থে যখনই যারা সাহায্য প্রার্থী হয়েছেন তখনই তাদেরকে সাধ্যানুযায়ী সাহায্য করেছেন। আলহাজ্ব জমির উদ্দিন অত্যন্ত সমাজ সচেতন এবং শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নতুন বাড়িটি বড়গোপাটের পাশে অবস্থিত। এই বাড়িতে যাওয়ার জন্য একটি খাল পাড়ি দিতে হয়। সেই খালের উপরে একটি দৃষ্টিনন্দন বড় ব্রীজ তিনি নির্মাণ করেন। যাতে গ্রামের পানি নিষ্কাশন এবং নৌ চলাচলের বিঘœ না ঘটে। পরবর্তীকালে অনেকেই এই খালের উপরে ছোট ছোট কালভার্ট নির্মাণ করায় গ্রামের পানি নিষ্কাশনের ব্যাঘাত ঘটছে ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সরকারি গোপাটের পাশে যাদের জমি ছিল তারা সবাই গোপাটের জমি নিজের জমির মধ্যে ঢুকিয়েছেন। আলহাজ্ব জমির উদ্দিন ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু কিছুদিন পর তাঁর ভুল বুঝতে পেরে ১৯৯৮ সালে কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাড়ির গেইট ও দৃষ্টিনন্দন ওয়াল ভেঙ্গে তিনি সরকারি জমি ছেড়ে দিয়ে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যা তৎকালীন দৈনিক ভোরের কাগজ, দৈনিক বাংলা বাজার ও সিলেটের ডাক পত্রিকায় ফলাও করে প্রচারিত হয়।
মরহুমের ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ের সবাই লন্ডন প্রবাসী ও স্বস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আলহাজ্ব জমির উদ্দিনের ছেলেরা লন্ডনে ‘বিলাস তান্দুরী’ ও ‘দিল তান্দুরী’ নামে দুটি রেস্টুরেন্ট অত্যন্ত সুনামের সাথে আজ প্রায় ২৮ বছর যাবৎ পরিচালনা করে আসছেন। ২০০২ সালে ‘দিল তান্দুরী’ বিক্রি করে দিয়ে ‘কারি পট’ নামে আরেকটি রেস্টুরেন্ট ৫ বৎসর যাবৎ পরিচালনা করছেন।
আমি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।-আমিন।

শিক্ষক ও কলামিস্ট
জালালাবাদ ক্যান্টনম্যান্ট বোর্ড হাই স্কুল
মোবাইলঃ ০১৭৪৯-৭৫০৫৩৫