আমার একটি স্বপ্নের শ্রেণিকক্ষ
   21 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 6 June 2017 শিক্ষা  (পঠিত : 1223) 

আমার একটি স্বপ্নের শ্রেণিকক্ষ

আমার একটি স্বপ্নের শ্রেণিকক্ষ
     

অধ্যক্ষ মুজম্মিল আলী:এক সময় স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেকটা নগন্য ছিল । আজকাল এর বিপরীত অবস্থা । স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের যেমন উপচে পড়া ভীড় , তেমনি কোন কোন সময় শ্রেণিকক্ষে এতটুকু বসার জায়গা বাকি থাকেনা । প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ না থাকায় আমাদের শিক্ষার মানের ওপর অনেকটা এর বিরুপ প্রভাব ।

লেখাপড়া বিষয়ে সাধারণ মানুষজনের আগ্রহ অনেক বেড়েছে সত্যি । তবে মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে তাদের তেমন মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না । তারা ছেলেমেয়েদের কেবল স্কুলে ভর্তি করাতে উৎসাহি । সরকারের বহুমুখি ইতিবাচক নানা পদক্ষেপের কারণে আজকাল সেটি সম্ভব হয়েছে । বিশেষ করে উপবৃত্তি চালু করায় এবং বিনামুল্যে পাঠ্যপুস্তক দেবার কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে ।

আজকাল একেকটা শ্রেণিতে কাম্য শিক্ষার্থীর পাঁচ-ছয়গুণ গাদাগাদি করে শ্রেণি কক্ষে বসে । একেকটা বেঞ্চে ছয়-সাতজন শিক্ষার্থী । শিক্ষক : শিক্ষার্থী = ১ : ১৫০ তে গিয়ে দাঁড়ায় । শ্রেণি কক্ষের আয়তন মাঝে মাঝে এত বেড়ে যায় যে, সেটি তখন শ্রেণির মর্যাদা হারিয়ে সভা কক্ষের রুপ ধারণ করে । তাতে একজন শিক্ষক পাঠদানে কতটুকু স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন জানিনে । শিক্ষার্থীই বা কতটুকু পাঠ গ্রহণে সক্ষম হয়-সে ও এক বড় প্রশ্ন । এমনিতেই দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা পেছনে বসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নিজেকে আড়াল করে রাখতে পছন্দ তাদের । বড় আয়তনের শ্রেণিকক্ষে পেছনের শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষক ও খুব একটা দৃষ্টি দিতে পারেন না ।

পাঠ্যপুস্তকের বোঝায় ভারাক্রান্ত আজকালের শিক্ষার্থী । পঞ্চম শ্রেণি পেরিয়ে কেবল ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেই মাথার ওপর চৌদ্দটি বিষয় । নোট-গাইড আর কোচিংয়ের যাঁতাকলে পিষ্ঠ তারা। তদুপরি শ্রেণিকক্ষের ভীড় ঠেলাতে ঠেলাতে ক্লান্ত ।

নতুন প্রজন্মকে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলতে সর্বাগ্রে শ্রেণিকক্ষের আকার- আয়তন কমিয়ে সেটিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য আকর্ষণীয় করতে হবে । সকল শিক্ষার্থী যাতে শ্রেণিকক্ষে স্বাচ্ছন্দ্য সহকারে পাঠে মনোনিবেশ করতে পারে সে ব্যবস্থাটা আগে থেকে করে নেয়া প্রয়োজন ।

যে করে হউক শ্রেণিকক্ষে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত কমিয়ে আনতে হবে । পৃথিবীর অনেক দেশে যেখানে শিক্ষক : শিক্ষার্থী= ১ : ৩০ সেখানে আমাদের দেশে না হয় ১ : ৪০ হলো । কিন্তু, এর দ্বিগুণ-তিনগুণ হলে কেমন হয় ?

আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর এতদসংক্রান্ত নির্দেশনাটি প্রতিপালনের তেমন কোন লক্ষণ আজো চোখে পড়ে না । যে করে হউক না কেন আমাদের সেটিই করতে হবে ।

প্রতিটি বেঞ্চে যাতে তিন থেকে সর্বোচ্চ চার জন করে বসে সে ব্যবস্থাটুকু ও নিশ্চিত করা দরকার। বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায় মনোযোগি হবার অবকাশ একেবারে থাকে না । বরং নিজেদের মধ্যে দুষ্টুমি করার অবারিত সুযোগ তাদের মেলে।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এখন সময়ের দাবী । শিক্ষার্থী শিক্ষকের মুখ থেকে শুনে কিংবা নিজে বই পড়ে যেটুকু শিখে তার চেয়ে অনেক বেশী শেখে পর্দায় নিজের চোখে দেখে । এখন প্রযুক্তির যুগ । প্রযুক্তির সাথে লেগে থাকতে বর্তমান প্রজন্মের খুব বেশী পছন্দ । তাই প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর স্থায়ীভাবে প্রতিস্থাপন করা একান্ত অপরিহার্য । এদিকে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের বিনামুল্যে পাঠ্যপুস্তক দেয়া যায় । কিন্তু, মাধ্যমিক স্তরে বিনামুল্যে পাঠ্যপুস্তক না দিয়ে ই-বুক চালু করে বিনামুল্যে ট্যাব দিয়ে দিলে সুফল আরো বেশী আশা করা যায় । শ্রেণিকক্ষে পিরিয়ডের মেয়াদ ৪০-৪৫ মিনিট থেকে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন এক ঘন্টা এবং প্রতিদিনের পিরিয়ডের সংখ্যা কমিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ পিরিয়ড করলে হয়ত সুফল বেশী পাওয়া যেতে পারে । পিরিয়ডের সময় কম থাকায় শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আসতে-যেতে আর কুশল বিনিময় ও বিদায় বার্তা জানিয়ে আসতে অনেকটা সময় পার হয়ে যায় ।শ্রেণিতে পাঠ দান করার সময়টুকু এভাবে অনেকটা কমে আসে ।

প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একটা করে সহায়ক পুস্তকের মিনি লাইব্রেরি এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সামগ্রি সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন । শ্রেণিতে এগুলো যে কোন সময় শিক্ষক যাতে কাছে পান এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন সে বিষয়টি ও নিশ্চিত করা অপরিহার্য ।

আগেই বলেছি আমাদের বর্তমান প্রজন্ম আইসিটি বিষয়ে খুব বেশী আগ্রহী ও পারদর্শী । কেবল তাই নয়, কারিগরি বিষয়ে ও তাদের আগ্রহ লক্ষণীয় । তাই আমাদের শ্রেণির সব কাজে আইসিটি ও কারিগরি বিষয়ে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীগণ হেঁসে খেলে সে শিক্ষাটি সহজে গ্রহণ করবে । সে আলোকে আমাদের কারিকুলাম ও সিলেবাস ঢেলে সাজানো প্রয়োজন ।

সর্বোপরি মেধাবী, দক্ষ, কর্মঠ , দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ন এবং দেশপ্রেমিক একজন শিক্ষকই কেবল পারেন একটি শ্রেণিকে প্রাণবন্ত করার মাধ্যমে ভবিষ্যত প্রজন্মকে সত্যিকারের দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে । তাই, শিক্ষকের ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টি সব কিছুর আগে ভেবে দেখা একান্ত অপরিহার্য । তাই নয় কি ?
মুজম্মিল আলী: অধ্যক্ষ, চরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, কানাইঘাট, সিলেট

লেখক মেলা  এর অন্যান্য লিখাঃ

21 October 2017  অংকে আমি কাঁচা

20 October 2017  প্রিয়তমা

20 October 2017  আমার মা

12 October 2017  পরপারে তুমি উত্তীর্ণ হও

10 October 2017  কেন তুমি চলে গেলে


Free Online Accounts Software