17 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 29 May 2017 ইসলাম ও জীবন  (পঠিত : 793) 

রহমত লাভের দশকের দ্বিতীয় দিন আজ

     

শাহ নজরুল ইসলাম:

‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (কুরআন মাজীদ, সূরা বাকারা ২/১৮৩)
জ ২ রমযান ১৪৩৮ হিজরি, সোমবার। মুসলিম উম্মাহর নৈতিক চারিত্রিক ও আধ্যাতিœক মানোন্নয়নের মাস মাহে রমযানের রহমতের দশকের দ্বিতীয় দিন। মহান আলøাহর অপার দয়া করুণা ও রহমত লাভের দশকের দ্বিতীয় দিন। এজন্য নিজেদের উপযোগী করা আমাদের সকলের কর্তব্য। এবারো রোযা শুরু হয়েছে আর মানুষ খাদ্যদ্রব্য নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত। ফরমালিন আতঙ্ক এখনো আছে। আম লিচু কলা আনারস জামসহ মৌসুমী ফলমূলে ফরমালিন কারবাইড। মাছে গোসত দুধে তরকারীতে ফরমালিন। সুটকীতে কীটনাশক। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল। মানুষ যাবে কোথায়। যে কোনভাবে পয়সা কামাই করার প্রবনতা মানুষকে পেয়ে বসেছে। আমরা আতঙ্কগ্র¯Í।
দেশে কোন প্রকার খাদ্য সংকট না থাকা সত্তেও রমযান মাস আসলেই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া যেন এ দেশের একটা স্থায়ী নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ পৃথিবীর বহু দেশে জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে দেয়ার একটা প্রশংসনীয় রেওয়াজ আছে। আমাদের ব্যবসায়ীরা তা অনুসরণ করলে সকলেই উপকৃত হতো। রমযানের মত একটি ইবাদতের মাসও তাদের কাছে মুনাফা লাভের সুবর্ণ সুযোগ হয়ে আসে। জ্ঞান হবার পর থেকে তাই দেখে আসছি। এমনিতেই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেশি। এর মধ্যে রমযানের আগে যে সব জিনিষের দাম মোটামোটি ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল তা এখন উর্ধ্বমুখী। রোজাদারদের ইফতার ও সাহরিতে ব্যবহৃত খাদ্য সামগ্রির দাম বাড়ানোর একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে শহরের নির্ধারিত আয়ের মানুষের জীবনও কষ্টকর হয়ে পড়ে। পরিবারের কর্তারা বিপাকে, বিব্রত-বিষন্ন। সরকার অবস্থার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন কিন্তু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে কাঙ্খিত পরিবর্তন না এলে কেবল আইন করে মানুষকে সম্পূর্ণরূপে অপরাধমুক্ত করা যাবে না।
যাদের একেবারেই আয় নেই তাদের চলছে কষ্টের দিন গুজরান। গ্রামের মানুষের অবস্থা আরো সংগীন। ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা আছেন বিপদে; নিম্ন আয়ের মানুষদের সম্ভ্রম রক্ষা করে চলা কঠিন। তারা না পারছেন কিনতে, না পারছেন হাত পাততে। রমযান আসলেই একটা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ে । কিন্তু পূর্বে স্বাভাবিক মূল্যে যারা খাদ্যশস্য ও অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করেছিলেন তারা তো স্বাভাবিক মূল্যে তা বাজারে সরবরাহ করেন না । ফলে বাজার হয়ে পড়ে আরো অস্থিতিশীল। ব্যবসায়ীরাও অধিক লাভের আশায় মালামাল মজুদ করে রাখেন । এ অবস্থায় দেশের সিংহভাগ দরিদ্র মানুষের অবস্থা কোন পর্যায়ে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। এ প্রবণতা কখনোই মানবিক হতে পারে না। লোভ লালসা মোহ আর অধিক চাহিদার লাগাম টানার শিক্ষা নিয়ে যে রমযান এলো সেই মাসে আমরা যদি এই প্রতিযোগিতা করি তবে তা হবে দুঃখজনক।
যে মজুদে মানুষ ও পশু পাখির কষ্ট হয় এমন মজুদ ইসলামে নিষিদ্ধ । দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লে খুশি হওয়া কবীরা গুনাহ্ । এ প্রসঙ্গে আমরা ইসলামী শরীয়তের কিছু বিধান এখানে উলেøখ করতে চাই।
মানুষ ও পশুর নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য খরিদ করে অস্বাভাবিক ও অধিক মূল্যে বিক্রি করার জন্য তা আটক রাখাকে শরীয়াতের পরিভাষায় ইহ্তিকার বলে। (কাওয়াইদুল ফিকহ পৃ: ১৬২)। ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. এর মতে যে সব জিনিস আটক রাখলে বা মজূদ রাখলে সর্বসাধারণের কষ্ট ও ক্ষতি হয় তাকে ইহ্তিকার বা মজুদদারী বলে।
মজুদদারী কারণে যদি দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে দেশে দূর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয় আর এতে যদি সর্বসাধাণের কষ্ট ও ক্ষতি হয় তবে এ অবস্থায় মজুদদারী নাজায়েয । উপরোক্ত উদ্দেশ্যে চলিøশ দিন পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য আটক রাখলেই কেবল ইহ্তিকার-সাব্য¯Í হবে; অন্যথায় নয়। রাসূলুলøাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি চলিøশ দিন পর্যন্ত খাদ্যশস্য মজুদ করে রাখে সে ব্যক্তি আলøাহর দায়িত্ব থেকে মুক্ত এবং তার প্রতি আলøাহ অসন্তুষ্ট হন ।’ (মিশকাত শরীফ /২৫১)।
রাসূলুলøাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘ন্যায্যমূল্যে জিনিস সরবরাহকারী রিযিকপ্রাপ্ত আর মজুদ করে সংকট সৃষ্টিকারী অভিশপ্ত ।’ (মিশকাত শরীফ ) অপর এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি (সংকট তৈরির জন্য) মজুদ করে সে পাপী।’ (মিশকাত শরীফ - ২৫০) অপর এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে, ‘মজুদদার ব্যক্তি খুবই নিকৃষ্টতম ব্যক্তি যদি জিনিসপত্রের দাম হ্রাস পায় তবে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। আর যদি দর বেড়ে যায় তবে আনন্দিত হয়।’ (মিশকাত শরীফ /২৫১) তবে মজুদদারীর কারণে যদি দেশের মানুষের ক্ষতি ও কষ্ট না হয়। তাহলে এতে কোনো অন্যায় নেই । (হিদায়া ৩য় খÐ )
নিজের জমির উৎপাদিত ফসল যদি কোনো কৃষক জমা করে রাখেন তবে তা মজুদদারী হবে না। কিন্তু দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণ বিক্রয় করে দেয়া উত্তম । মজুদদারীর কারণে যদি মানবজীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা দেখা দেয় তবে সকরার মজুদদারকে তার প্রয়োজনাতিরিক্ত মালামাল বিক্রি করার ব্যাপারে বাধ্য করতে পারবেন। এমন কি প্রয়োজনে সরকার অসাধু মজুদদারদের থেকে মালামাল জব্দ করে অভাবী মানুষের মধ্যে বন্টন করে দিতে পারবেন। যদি সাধারণ মানুষের কাছে টাকা পয়সা থাকে তবে তারা এর ন্যায্যমূল্য পরিশোধ করবে। আর না থাকলে বাকীতে নিতে পারবে। (ফাতাওয়া-ই আলমগীরী ৩য় খÐ,ফাতহুল কারীম ও ফাতওয়া ও মাসাইল ৬/৮৯, ইফা প্রকাশনা)।
শরীয়ার বিধান মতে দুর্ভিক্ষের সময় যদি কোনো মজুদদারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয় তবে আদালত প্রমাণ সাপেক্ষে তার পরিবার-পরিজনের প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্য রেখে অবশিষ্ট সব খাদ্য দ্রব্য বিক্রি করে দেয়ার আদেশ জারী করতে পারবেন এবং মালামাল মজুদ করা নিষেধ করে দিতে পারবেন। এতে কাজ না হলে আদালত তার বিরুদ্ধে শা¯িÍমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন। (ফাতাওয়া-ই আলমগীরী /৩ ফাতাওয়া ও মাসাইল ৬/৯০)
শুধু তাই নয় দেশে খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ব্যবসায়ী, সরকার ও আদালত ছাড়াও বিত্তবানদের দায়িত্ব রয়েছে। কুরআন মজীদে দেশে দুর্ভিক্ষকালীন সময়ে মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দানের জন্য বিত্তবানদের প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদ মানুষের কল্যাণে দান করে দিতে বলা হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে ‘ তোমাকে তারা প্রশ্ন করে কী খরচ (দান) করবে ; তুমি বলে দাও, ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত দান খয়রাত করতে।’ এ আয়াত দুর্ভিক্ষকালীন সময়ের জন্য; এখনো কার্যকর । সরকারী কোষাগার ও অন্যান্য কর্মসূচী দিয়েও যদি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দেয়া না যায় তখন সম্পদশালীদেরকে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে। সুতরাং দেশের যে সব এলাকার ফসল, মাছ, হাস মোড়গ ও গবাদি পশু ধ্বংস হয়েছে সে সব কৃষক ও গরীব মেহনতি মানুষের কল্যাণে সকল দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, বিত্তবান মানুষ ব্যবসায়ীসহ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সকল মানুষের করণীয় আছে। জন-মানুষের কষ্ট লগবে সবাইকে নিজ নিজ পাড়া-মহলøা ও গ্রামের গরীব আতœীয়-স্বজন, বিপন্ন প্রতিবেশি ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতি দয়া ও দান খয়রাতের আহবান জানাই। আসুন! মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য একযোগে কাজ করি। এখন অধিক মুনাফা অর্জনের সময় নয়, মানুষকে সাহায্যের সময়। যে কোন মানুষের ক্ষতি করার ব্যাপারে মহান আরøাহকে ভয় করুন। রাসুল সা. বলেছেন, শ্রেষ্ঠ মানুষ সে যে মানুষের কল্যাণ সাধন করে। আর নিকৃষ্ট মানুষ সে যে মানুষের ক্ষতি করে। তিনি আরো বলেছেন,‘যারা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়াপরবস হয় না আকশের অধিবাবসী তাদের দয়া করেন না।’ তাই আসুন! মানুষের প্রতি দয়পরবস হই, তাদের সেবা ও কল্যাণে কাজ করি। মহান মালিক আমাদের তাওফীক দিন। আমিন।


Free Online Accounts Software