15 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 9 May 2017 অন্য পত্রিকার সংবাদ  (পঠিত : 1623) 

সিলেট রেজিস্ট্রি অফিসে শিপন-রিয়াজ জুটির দাপট

সিলেট রেজিস্ট্রি অফিসে শিপন-রিয়াজ জুটির দাপট
     

চৌধুরী মুমতাজ আহমদ,সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বালাম বই পোড়ানোর মামলায় রেকর্ডকিপার রিনা রানী রায়কে জেলে যেতে হয়েছে। সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ১ম আদালতের নির্দেশে গতকাল তাকে ঢুকতে হয় লাল দালানে। গত ২৫শে এপ্রিল রাতে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে অবস্থিত একটি দোকানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দোকানের মালামালের সঙ্গে পুড়ে যায় একটি রেজিস্ট্রি ভলিউম (বালাম বই)-যার থাকার কথা ছিল রেকর্ড রুম বা মহাফেজখানায়। সংরক্ষিত বইটির বাইরে আসায় মামলা হলে অন্যদের সঙ্গে আসামি হন রেকর্ডকিপার রীনা রানি রায়। ২০১৩ সালের ১৬ই এপ্রিল সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন প্রদীপ কুমার ঘোষ। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ এলে দেড় বছরের মাথায় তাকে গোয়াইনঘাট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। ২০১৪ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর প্রদীপ ঘোষ গোয়াইনঘাট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দেন। ৫ মাসও তর সয়নি। নিজের ‘কঠিন ডায়াবেটিস’ এবং স্ত্রীর ‘বিভিন্ন জটিল রোগ’-এর বাহানায় ২০১৫ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি তিনি নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলির আবেদন করেন। সে আবেদনের প্রেক্ষিতে মানবিক বিবেচনায় ২৫শে মার্চ সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী মো. আবদুর রবকে গোয়াইনঘাটে বদলি করে তার স্থলে প্রদীপ কুমার ঘোষকে পদায়নের আদেশ হয়। কিন্তু প্রদীপ ঘোষ সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দেয়ার আগেই ৩১শে মার্চ নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিচালকের এক টেলিফোন আদেশে বদলির নির্দেশনাটি স্থগিত হয়ে যায়। আবদুর রবই থেকে যান সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। সেই থেকে প্রদীপ কুমার ঘোষের চক্ষুঃশূল হয়ে উঠেন আবদুর রব।
প্রদীপ কুমার ঘোষের শত্রু হয়ে ওঠা মানে দেবাশীষ-রিয়াজ সিন্ডিকেটেরও শত্রু হয়ে ওঠা। কারণ সিলেট রেজিস্ট্রি অফিসের যাবতীয় অনাচারের নিয়ন্ত্রণকারী এ সিন্ডিকেটের এক সক্রিয় সদস্য প্রদীপ কুমার ঘোষ। শক্তিশালী সেই সিন্ডিকেটের সঙ্গে পেরে উঠেননি আবদুর রব। ২০১৬ সালের আগস্টে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী মো. আবদুর রবকে তাজপুরে সরিয়ে প্রদীপ কুমার সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। আবদুর রব সিলেট ছেড়ে গেলেও দেবাশীষ-রিয়াজ সিন্ডিকেটের পুরোপুরি শান্তি মিলছিল না। কারণ রেজিস্ট্রি অফিস পাড়াতেই রয়ে গেছেন আবদুর রবের দুই ভাগ্নে বেলাল আহমদ মুরাদ ও নিজাম আহমদ মান্না। মুরাদ সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নকলনবিশ আর তার ভাই মান্না সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এলাকায় অবস্থিত ‘নাজির স্ট্যাম্প ভেন্ডার’ নামের একটি দোকানের ম্যানেজার। এই দোকানটিতেই ২৫শে এপ্রিল রাতে রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সে অগ্নিকাণ্ডে একটি রেজিস্ট্রি ভলিউমের (বালাম বই) পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয় রেজিস্ট্রি অফিস জুড়ে। সংরক্ষিত বালাম বইটির রেকর্ড রুমের বাইরে আসার বিষয়টির কূল-কিনারা হয়নি এখনো। রহস্য উদ্ধারে তদন্ত চলছে।
নাজির স্ট্যাম্প ভেন্ডারে আগুনের পিছু পিছু আলোচনায় উঠে আসা সিলেট জেলা রেজিস্ট্রারের উচ্চমান সহকারী দেবাশীষ দাস শিপন ও সিলেট সদর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহকারী রিয়াজ আলীর নেতৃত্বে পরিচালিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। দেবাশীষ দাস শিপন ২০০৩ সালে নিম্নমান সহকারী হিসেবে সিলেট সাব- রেজিস্ট্রি অফিসে ঢুকেছিলেন, দীর্ঘদিনের সাধনার পর অনেক ঘাটের জল খেয়ে এখন তিনি উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত আছেন। এই শিপনের সঙ্গে জোট বেঁধে সিলেট রেজিস্ট্রি অফিসে সকল অপকর্মের নিয়ন্ত্রণ করছেন সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহকারী রিয়াজ আলী। ৫ বছর আগে অবসর নিলেও রেজিস্ট্রি অফিসে তার দাপট দিন দিন বেড়েই চলেছে। সিলেট রেজিস্ট্রি অফিসের আওতাধীন সকল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চাঁদাবাজি, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের অন্যতম এক সওদাগর তিনি। টাকার ভাগ-বাটোয়ারা হয় তার হাত দিয়েই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেট চাইলেই বিভিন্ন ছোটখাট পদে যে কাউকেই নিয়োগ দিতে পারেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে এ সিন্ডিকেটের কল্যাণে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ইতিমধ্যে পিয়ন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৪ জন। পদ ছোট হলেও এ ক্ষেত্রে টাকার লেনদেন কম ছিল না। ১৫ লাখ টাকায় সিলেট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার (দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে নিয়োজিত পিয়ন) মান্নাকে স্থায়ী পিয়ন হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৩ লাখ করে টাকার বিনিময়ে জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ঝাড়ুদার হিসেবে নিয়োগ পান হামিদ ও মফিজ, ১২ লাখ টাকায় ঢাকা দক্ষিণ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঝাড়ুদার হিসেবে নিয়োগ পান মিজু। শুধু নিয়োগ নয় বদলি বাণিজ্যেও নাম কামিয়েছে শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেট। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে আন ডিউ ট্রান্সফার হয়ে কোম্পানীগঞ্জ থেকে বিশ্বনাথে আসেন অফিস সহকারী দিলীপ কুমার দেব।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ সিন্ডিকেট নিজেদের মানুষদেরও ছাড় দেয় না। সিন্ডিকেট সদস্য প্রদীপ কুমার ঘোষকেও দক্ষিণ সুরমা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে টি সি মোহরার (স্থানীয় সরকারের ট্যাক্স আদায়কারী) পদে তার ছেলেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়াতে ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। মোহরার প্রদীপকে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতি পেতে। অথচ এই প্রদীপ দামই এর আগে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে দায়িত্বরত থাকা অবস্থায় শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেটের হয়ে ৩০ থেকে ৩৫টি বালাম বইয়ের পাতা ছেঁড়া ও নতুন পাতা সংযোজন, ওভার রাইটিং, ঘষামাজাসহ সম্পাদন করেছিলেন। যে কারণে তাকে বদলিও হতে হয়েছিলো।
২০১২ সালের বিধি মোতাবেক দলিল লেখকদের সনদ পেতে এসএসসি পাসের শর্ত রাখা হয়। এটিও সুযোগ হয়ে ধরা দেয় শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেটের সামনে। টাকা দিয়ে জাল সার্টিফিকেট দিয়ে তারা সনদ ইস্যু করান। এ জন্য প্রতি সনদ বাবদ শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে দেড় লাখ করে টাকা। এছাড়া প্রতি দলিলের নকল বাবদ এ সিন্ডিকেটের তহবিলে ৫০ টাকা করে জমা দিতে হয়। সিলেট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তথ্য মতে, প্রতিদিন এ অফিস থেকে সাড়ে ৩ থেকে ৪ শ’ দলিলের নকল সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সে হিসেবে শুধু এ খাত থেকে শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেটের মাসিক আয় সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেট আরো বিভিন্ন খাত থেকে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নিজেদের সম্পদ বাড়িয়ে তুলছেন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সাব- রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী জামাল উদ্দিনই প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে দিচ্ছেন এ সিন্ডিকেটকে। এক দফায় একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি থাকার বিধান না থাকলেও চাঁদার বিনিময়ে তিনি ৯ বছর ধরে একই কর্মস্থলে আছেন।
শিপন-রিয়াজের শক্তিশালী এ সিন্ডিকেটের চক্ষুঃশূল হয়ে পড়ায় নানা রকম ভোগান্তিতে পড়তে হয় বেলাল আহমদ মুরাদ ও নিজাম আহমদ মান্নাকে। দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধেই উঠে পড়ে নামে এ সিন্ডিকেট। ‘নাজির স্ট্যাম্প ভেন্ডার’ নামের দোকানটি ভেঙে ফেলতে নোটিশ যায় মুরাদের কাছে। যদিও দোকানকোঠার মালিকানা মুরাদ-মান্না এ দুই ভাইয়ের কারোরই নয়। সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে বিষয়টি জানিয়ে জবাব দেন মুরাদ। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, নোটিশে কাজ না হওয়ায় বিকল্প পথের সন্ধান করে শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেট। ২৫শে এপ্রিল রাতে রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে নাজির স্ট্যাম্প ভেন্ডারে। পুড়ে যায় সব কিছু। শুধু আধপোড়া পাওয়া যায় রেকর্ডরুমে সংরক্ষিত একটি বালাম বই। অনেকেরই সন্দেহ, মুরাদ-মান্নাকে ফাঁসাতেই দোকানটিতে বালাম বইয়ের এ উপস্থিতি।
অগ্নিকাণ্ডের রহস্য তদন্তকারীদের হাতে নানা আলামতের পাশাপাশি রয়েছে রেজিস্ট্রি অফিসের ক্লোজ সার্কিটে ধরা পড়া কিছু ফুটেজ। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এর বাইরেও কিছু ফুটেজ রয়ে গেছে যার যোগ রয়েছে বালাম বইয়ের বাইরে বেরোনোর রহস্যের সঙ্গে। ঐ সূত্রটি বলছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ১৩ দিন আগে ১২ই এপ্রিল ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়া একটি ফুটেজ হয়তো হতে পারে সে রহস্য উদ্ধারের চাবিকাঠি। ঐ সূত্রের বর্ণনামতে, ১২ই এপ্রিলের ফুটেজটিতে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুম থেকে বেরিয়ে আসছেন একজন। তাকে তালা খুলে দিচ্ছেন রেকর্ড রুমের নাইট গার্ড মাখন মিয়া। রেজিস্ট্রি অফিস সংশ্লিষ্টরা ভালো করে দেখলে চিনে নিতে পারবেন অফিস সময়ের পর সুনসান নীরবতার মধ্যে যিনি রেকর্ড রুম থেকে বেরিয়ে আসছেন তিনি অস্থায়ী নকলনবিশ আতিকুর রহমান। নামে নকলনবিশ হলে অফিস সময়েও রেকর্ডরুমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না আতিকুর রহমানের। কারণ শিপন-রিয়াজ সিন্ডিকেটের সদস্য আতিকুর রহমানকে অফিসিয়াল কাজ না করলেও চলে। রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা গেছে, তার সময় কাটে মূলত রাতের আঁধারে আন-অফিসিয়াল কাজেই।মানবজমিন ৯ মে ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩৭


Free Online Accounts Software