মাস্টার ও কাঁটাতারের গল্প: বিচূর্ণ আয়নার চিত্রগ্রাফ
   23 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 6 April 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 1261) 

মাস্টার ও কাঁটাতারের গল্প: বিচূর্ণ আয়নার চিত্রগ্রাফ

মাস্টার ও কাঁটাতারের গল্প: বিচূর্ণ আয়নার চিত্রগ্রাফ
     

হুসাইন মোহাম্মদ ফাহিম; বাশিরুল আমিনের প্রথমগ্রন্থ মাস্টার কাঁটাতারের গল্প আমাদেরকে গল্প ও গল্পভাষার বৈচিত্রময়তা দেখায় এগারোটি গল্পের আন্ত-ভিন্নতার ভেতর দিয়ে। গ্রন্থের প্রতিটি গল্পই একটি অন্যটির চেয়ে আলাদা যেমনটি ভাষায় তেমনটি আখ্যানেও। প্রথম গল্পের সাথে দ্বিতীয়টির, তৃতীয়টির সাথে চতুর্থটির তফাত পাঠককে একটি চলমান পরিবর্তনকামীতার দিকে নিয়ে যায়।

প্রথমেই কাঁটাতার গল্পটি নিয়ে আলোচনা করা যাক, কাঁটাতার ভৌগলিক সীমারেখার নিষ্ঠুরতার বয়ান পেশ করে। একজন চিরকুমার শিক্ষক বাংলাদেশের শেষ সীমান্তে একটি স্কুল তৈরি করেন। যে স্কুলে বাঙালি বাচ্ছাদের সাথে পড়াশুনা করে ভারতীয় বাংলা জানা আধিবাসী বাচ্ছারাও, যাদের কাছে সীমান্ত বলে কিছু ছিল না। যারা তেমন করে জানতো না ভারত ও বাংলাদেশের বিভেদরেখা সম্পর্কে। এরইমধ্যে সীমান্তে কাঁটাতার বসে... কিন্তু এই কাঁটাতারও ভারতীয় বাচ্ছাদের ¯কুল যাতায়তকে থামাতে পারে না। তাদের শিক্ষক আলম মাস্টার ও স্থানীয় মানুষের প্রচেষ্টার কারণে। এরপর তারা কাঁটতারের নিচের বিপজ্জনক চোঙ্গা (কালভার্ট) দিয়ে স্কুলে যাতায়ত শুরু করে... এরইমধ্যে চোঙ্গা অতিক্রম করার সময় জোসেফনামী এক ছাত্রের মৃত্যু ঘটেÑ পাহাড়ী ঢলে তৈরি হওয়া ¯্রােতে। জোসেফের লাশ নিয়ে মাস্টার সীমান্তে অতিক্রম করতে চান...। এভাবেই তাঁর গল্প পাঠককে খুব আবেগহীন কন্ঠে মৃত্যু সংবাদ শোনায় কিন্তু পাঠককে আলম মাস্টারের সাথে নিয়ে যায় সীমান্তে। এই গল্পে বিভক্ত মানুষের মাল্যতা দৃশ্যমান হয়। যা ব্যক্তি ও মানবিক উন্নয়নের ব্যঘাত সৃষ্টি করে। আলম মাস্টারের নিঃস্বার্থ শ্রমের বিপরীতে কাঁটাতারের নিষ্ঠুরতা দুঃখজনক হয়ে দাড়ায় ভাবুক মেধায়।

গল্প যে কখনো কবিতা হয়ে উঠতে পারে এর একটি প্রোজ্জল উদাহারণ হতে পারে বাশিরুল আমিনের গল্প। তাঁর গল্পের কাহিনী খুবই অদ্ভুদ ও তাঁর ভাষা প্রচলিত গদ্যের ব্যাকরণ ভাঙ্গা নতুন এক কথাভঙ্গি। যা পাঠককে একই সাথে কাহিনীর বিষাদ ও হর্ষতা শোনায়, সেই সাথে দেখায় বাক্যের আঙ্গিক ভেঙ্গে নতুন আঙ্গিকের কুশলতা। বাশিরুল আমিনের প্রতিটি গল্পই আসলে একটি দীর্ঘ আখ্যান। পরাবাস্তবতার মিশেলে বিশাল ঘটনাকে সীমিত বাক্য ব্যায় করে তিনি ফুটিয়ে তোলেন, নির্মোহ জীবনের যাপনকথা। সহজ শব্দের কারুকাজে নিটোল বাক্য বুনন এবং চেনা-অচেনার মাঝখানে কুয়াশার জাল বিস্তার করেন তিনি। সিদ্ধান্তহীন বাউ-ুলের দুঃসহ জীবন বর্ণনায় অনবদ্যতা ছড়িয়ে দেন জটিল ও যৌগিক বাক্যের ফাঁকে ফোকরে। ফলে পাঠকের কাছে ‘না আলো, না অন্ধকার’ ঘোরলাগা ভাব সৃষ্টি হয়।

অথবা বাশিরুল আমিনের গল্প পড়তে গিয়ে মনে হবে, আপনি একটি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আয়নাটি বিচুর্ণ, তদুপরি অদ্ভুদ স্ক্রীনে চলচ্চিত্রের কায়দায় তাতে এমন কিছু দেখাচ্ছে, যা আমাদের দৃষ্টির অতীত। চলমান বন্ধ্যা এবং হৃদয়হীন সমাজের চিত্র আয়নাটিতে একাকার। গ্রামীণ সরল জীবনের ব্যাক্তি ও সীমান্তিক রাজনীতির সাথে ইট-পাটকেলের শহরে দেয়ালের ভেতরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বেদনা ও পথে-পথে মানুষের অথর্ব কোলাহলও পাঠকের মেজাজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর গল্প পাঠককে দ্বিধায় ফেলে। গল্পের এই দিক যতটুকু দুঃখজনক তারচে’ও অধিক দ্বন্ধমুখর। তার গল্পের পরিসীমাপ্তি ঘটে আচমকা, যে কারণে পাঠক একটা ঘোরের ভেতর ঢুকে যেতে যেতে আবিষ্কার করেন তিনি আর গল্পে নেই। তাঁর বাসায় গিয়ে পড়াতে চাই গল্পের নায়ক ইমু মাস্টর যিনি একপর্যায়ে পাঠকের সামনে ভেসে উঠেন বাস্তব হয়ে চরিত্রে, সংলাপে। কিন্তু যখনই তিনি পাঠকদের একান্ত আপন হয়ে উঠেন, পাঠকরাও তার সাথে টিউশনি পড়াতে যান ঠিক তখনি তিনি একটি অপরিণত প্রেমের বেদনা নিয়ে হুট করেই উঠে পড়েন প্লাটফর্ম হতে “এইমাত্র ছেড়ে যাওয়া ট্রেনটিতে”। মনে হবে, আপনিও দ্রুতগামী এমন একটি ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন, যা অগত্যাই থেমে গেছে। ট্রেনের হঠাৎ এই থেমে যাওয়াতে যদিও আপনার মন খারাপ করবে, তবুও ঘোর কাটবে না।

আমার অপরিপক্ক মেধার বিচারে এই গ্রন্থটির সবচে’ সেরা গল্প হলো, লাল ঠ্যাং কালো ঠ্যাং। বাশিরুল আমিন এই গল্পে দায়সারা রাষ্ট্রের মুখোশ উন্মোচন করেন। এবং তারুণ্যের শক্তির বিপরীতে বিকলাঙ্গ মনোভাব যে রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকা-ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে, তাও দৃশ্যত হয়। আত্মহনন অথবা একজন খুনী কবির কথাসহ এই গ্রন্থটির প্রতিটি গল্পই বাশিরুল আমিনের কবিতার মতো চমৎকার। এসব গল্পের ব্যাপ্তি ও পরিধি ছোট হলেও একেকটি গল্প যেন একেকটি জীবনের অন্তর্কথা। যাপনের সমষ্টিকলা ও আত্মদহনের বিমূর্ত ইতিহাস।

অদিতি ফাল্গুনীরভাষায় বাশিরুল আমিনের গল্পের আঙ্গিক ছোট হলেও তার ভেতর বসবাস করে বিস্তর আখ্যান ও কথামালা। আঙ্গিক ও প্রকরণ নিয়ে বেশ নিরীক্ষায় আছেন লেখক পড়লেই বোঝা যায়। তার গল্পে কবিতার মতো একটা ঘোর আছে। আছে ভিন্নমাত্রিকতাও। কথাসাহিত্যে তার তার একটি ভালো অবস্থান তৈরি হচ্ছে এমনটিই দেখছি। কথাগুলো গ্রন্থের ফ্ল্যাপে বলেছিলেন অদিতি। গল্পলেখায় বাশিরুল আমিনের নৈর্ব্যক্তিক চেতনা বাংলা সাহিত্যকে নতুন রুচির নতুন স্বাদ দেবে। আধুনিক গল্পসাহিত্যে বাশিরুল আমিন উর্বর ভ’মিতে অবস্থান করছেন, এ কথাটি পরিপূর্ণ নিশ্চয়তার সাথেই বলা যায়। তাঁর অন্যান্য গল্পগুলি হলো শরাফত মুয়াজ্জিন্নের বেহেশত গমন, গারো মেয়েটির গল্প, ড. মাহমুদ ইকবালের পিএস, লজিং, ভিক্ষুক, রুমমেট আবশ্যক, চাদর।

নিভর্’ল মুদ্রণে ও উন্নত প্রোডাকশনে বইটি বাজারে এনেছে প্রকাশনা সংস্থা চৈতন্য। প্রচ্ছদ করেছেন, কাজী যুবাইর মাহমুদ। ও স্কেচের মাধ্যমে বইটির শোভাবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন রাজীব দত্ত। হার্ডকভারে আটচল্লিশ পৃষ্ঠার এই বইটির গায়ের মূল্য ধরা হয়েছে ১২০ টাকা মাত্র।

আরোও ছবি

মাস্টার ও কাঁটাতারের গল্প: বিচূর্ণ আয়নার চিত্রগ্রাফ

লেখক মেলা  এর অন্যান্য লিখাঃ

22 October 2017  ঘর পালানো মেয়ে

21 October 2017  অংকে আমি কাঁচা

20 October 2017  প্রিয়তমা

20 October 2017  আমার মা

12 October 2017  পরপারে তুমি উত্তীর্ণ হও


Free Online Accounts Software