27 Jul 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 13 February 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 791) 

বুক পকেটে কষ্ট

বুক পকেটে কষ্ট
     

মো: মাহমুদুর রহমান:
ভরশূন্য মানুষের মতো হাঁটছে মুক্তা। চোখে অনিশ্চয়তা, বুকে হাহাকার। বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে আসা যদিও তার এই প্রথম নয়। তবুও এবার অন্যরকম শূন্যতা অনুভব করছে। আগে কখনও তার বাবাকে জ্ঞানশূন্য অবস্থায় নিয়ে আসেনি হাসপাতালে। এবার তাঁর হুশ নেই, হাত পায়ে কোন নড়নচড়ন নেই। শ্বাস-প্রশ্বাসে বুঝা যায় প্রাণ আছে। নাকে তরল খাবারের নল। প্রশ্রাবের রাস্তায়ও নল। নিস্তেজ এক শরীর! ডাক্তারি বক্তব্য বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া সাধারণ চোখেই বুঝা যায় রোগির ভবিষ্যত! মানব জীবন অনিশ্চয়তায় ভরপুর। এ অনিশ্চয়তার মধ্যেও জন্মের পর সবচেয়ে নিশ্চিত পরিণতি মৃত্যু। এটা সবাই জানে, কিন্তু একান্ত অনিচ্ছায় বাধ্য হয়ে মানে বা মানতে হয়। মুক্তার বাবাও আজ জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আবস্থান করছেন। গত কয়েকদিনে অশ্রুতে ঝাপসা দৃষ্টি কিছুটা পরিষ্কার হয়ে আসছে। সে এখন চারপাশ দেখতে পাচ্ছে! না, আগেও দেখেছে না দেখার মতো। সমস্ত চিন্তারাজ্য জুড়ে ছিল বাবার অজানা পরিণতি নিয়ে নির্মম আশংকা। চিকিৎসাশাস্ত্রের সংশ্লিষ্ট সব শাখার বিশেষজ্ঞরা যখন আশাবাদি হতে পারছেন না, তখন তার কী-ইবা করার আছে। তাই আল্লাহর কাছে অসহায় আত্মসমর্পন! সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে মেনে নিয়েই পির্তৃসেবা করে যাচ্ছে সে। এছাড়া আর কী করার আছে!
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে হাসপাতালে যায়। ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটে রোগি। সারাদিন শত ডাকেও কোন সাড়া নেই। কিন্তু ভোরে যখন মুক্তা এসে ডাকে আব্বা! ও আব্বা! তখন পিতা-পুত্রের একধরণের যোগযোগ হয়। রোগি চোখ বন্ধ রাখলেও গলা দিয়ে একটি অস্পষ্ট শব্দ বের করেন উউউউ..। এতে মুক্তা বুঝে তার বাবা ডাক শুনেছেন। বুঝতে পারছেন ছেলে পাশে আছে। এটা মুক্তার কাছে অনেক বড় সান্ত¦না। এ সান্ত¦না সর্বস্ব হারানো মানুষের মতো। যে সব কিছু হারিয়ে বগলে ঝাড়ু নিয়ে ঘর থেকে বের হয়। গাছের তলা বা রাস্তা যেখানে রাত হবে ঝাড়ু দিয়ে শরীর রাখার জায়গাটি পরিষ্কার করে নেবে এই ভরসায়। মুক্তাও ভোরে বিছানা ছেড়ে পাগলের মতো দৌড়ে বাবার কাছে যায় ওই অস্পষ্ট গোঙানোর মতো শব্দটি শুনতে যা আর সারাদিন শোনা যায় না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শব্দটি শোনে, শরীরে হাত বোলায় নিরবে অচেনা এক আকর্ষনে যার সাথে অতীতে তাঁর কোন পরিচয় ছিল না। এক সময় হাতটি বাবার শরীরের উপর থেকে চলে আসে তার পকেটে টিস্যু পেপার খুঁজতে। অশ্রুভেজা টিস্যু ফেলার আগেই নার্স আইসিউ রুম থেকে বের হতে বলে। এখানে বেশি সময় থাকতে নেই। অগত্যা বেরিয়ে পড়ে মুক্তা। তারপর আইসিউ’র পাশের বারান্দায় লক্ষ্যহীন পায়চারি। কেন পায়চারি করছে জানে না সে। এভাবে হঠাৎ যখন খেয়াল হয় অফিসের সময় চলে যাচ্ছে তখন দেরি না করেই অফিসের দিকে যাত্রা। পা সামনের দিকে যেতে না চাইলেও টেনে নিতে হয়। চাকরি বলে কথা! বেঁচে থাকার জন্যে-ই চাকরি। তাই মাথা আইসিউতে বাবার পাশে রেখে শরীরটা নিয়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া। বিকেলে অফিস থেকে বাসা হয়ে আবার হাসপাতাল! আবার বারান্দায় পায়চারি। মাঝে মাঝে আইসিউ রুমে ঢুকে নীরবে বাবাকে দেখা। কোনো কোনো সময় দাদুদের সহায়তায় রোগিকে এপাশ ওপাশ করে দেয়া। যাতে বেডসোর না হয়। তারপর পৃথিবীর সমস্ত শূন্যতা নিয়ে মধ্যরাতে বাসায় ফেরা! এই হলো বাবাকে হাসপাতালে ভর্তির পর মুক্তার দৈনন্দিন রুটিন!

অবশ্য শুক্র ও শনিবার এ রুটিনের বাইরে। অফিস বন্ধ। ইচ্ছেমতো বাবার পাশে থাকা যায়। বাসায় বিশ্রামের জন্যও যথেষ্ট সময় হাতে থাকে। কিন্তু বাসায় শরীরের সাথে মনটাকে বেঁধে আনা যায় না! তাই কিছু সময় পরই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে হাসপাতালে দৌড়!
হাসপাতালের লিফট উঠানামায় দেরি হবে মনে হলে সিড়ি দিয়েই দৌড়। গন্তব্য পাঁচতলা। সন্ধ্যার পর আজও এভাবেই পঞ্চম তলার আইসিইউ কক্ষে প্রবেশ। দুই নম্বর বেডে শুয়ে থাকা বাবার চেহারার দিকে এক দৃষ্টে কিছু সময় তাকানোর পর কপালে হাত দেয় মুক্তা। কপাল থেকে ধীরে ধীরে হাতটি চলে আসে তার বাবার বাম হাতে। হাতটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মোটা মনে হচ্ছে। কিডনি রোগিদের শরীরে পানি জমে থাকায় হাত, পা ও মুখ অনেক সময় ফোলে যায়। তবে আজ মুখ ও পা স্বাভাবিকই হনে হচ্ছে, শুধু হাতটি একটু বেশি ফোলা। তারপর মুক্তা চলে যায় বাবার পায়ের পেছনে টেবিলে রাখা রক্তচাপ ও ডায়বেটিসের চার্টে। কোনটাই স্বাভাবিক নয়। রক্তচাপ দুইশ বাই একশত বিশের কাছাকাছি। হাই মেডিসিন দিলে একটু কমে আবার চলে যায় আগের জায়গায়। নার্স ও ডাক্তাররা এজন্য বার বার ওষুধ পরিবর্তন করে চেষ্টা করছে উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে। মুক্তা জানে এরকম অস্বাভাবিক রক্তচাপের সাথে অতিরিক্ত ডায়বেটিস যেকোন সময় আরেকটি স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। এরকম স্ট্রোক প্রায়ই মৃত্যুর পথে অনন্ত যাত্রার সূচনা করে। আর কিছু ভাবতে পারে না মুক্তা। চোখ দুটো ছল ছল করে ওঠে। নার্স বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলে।
মুক্তা আইসিইউ রুম থেকে বেরিয়ে আসে ঠিকই তবে একদম বারান্দায় যায়নি। পাশেই সাজানো চেয়ার টেবিলের মধ্যে একটিতে বসে পড়ে। দিনের বেলা এই জায়গায় শিক্ষকরা ক্লাস নেন। রাতে এ জায়গাটি একদম নীরব থাকে। এখানে বসলে দুটো কাজ হয়, একদিকে বাইরের প্রচন্ড গরম থেকে রেহাই পাওয়া যায় এয়ার কন্ডিশনের কারনে। অন্যদিকে বাবার একদম কাছে না হলেও কাছাকাছি থাকা যায়। মন চাইলে রুমের ভেতরে না ঢুকেও দরজার সামনে থেকে দেখা যায় তার অচেতন দেহটি। আজ এখানে বসে মুক্তার ইচ্ছে হচ্ছে হাউ মাউ করে কাঁদতে। মনে হচ্ছে চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভেতরের বোঝাটি একটু হালকা হতে পারে। কিন্তু মুক্তাকে করতে হয় অভিনয়! মায়ের সঙ্গে অভিনয়! ভাই-বোনের সঙ্গে অভিনয়! বাবার সংকটাপন্ন জীবন সম্পর্কে নিজের মন যা বলছে তা তাদেরকে বলা যায় না। তাদের কাছে প্রকৃত সত্য গোপন করে বলতে হয় বাবা ভাল হয়ে যাবেন! এ কথা বলার সময় গলা ভারি হয়ে আসে। ভেতর থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো নোনা জল বেরিয়ে আসতে চায়। তাও সামলাতে হয়। মুক্তা যে পরিবারের বড় ছেলে! তাকে ভেঙ্গে পড়লে হবে না। আগুনের লেলিহান শিখাকে লোকদৃষ্টির আড়ালে রাখা আর নিজের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। বাবার রোগশোকের সঙ্গে এই অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা যে কত কঠিন ও কষ্টকর তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মুক্তা।

কষ্টকাতর চোখ তোলে মুক্তা তাকিয়ে দেখে অনেকগুলো ফ্যাকাশে চেহারা তার চারপাশে। নারী, পুরুষ ও শিশু সবার চেহারায় শোক ও আতঙ্কের ছাপ। শুধু দুটো চোখে জল টলমল করছে। ভদ্রলোকের প্রকৃত বয়সের চেয়ে চেহারার বয়স অনেক বেশি। ঠিক মুক্তার সামনে টেবিলের অপর পাশে বসে আছে। লোকটির বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে অনেকদিন পর মুক্তার মনে হলো সম্ভবত এই মুহুর্তে লোকটি মুক্তার চেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। খুব মায়া হলো। চোখে চোখ রাখতেই প্রশ্ন- আপনার কে রোগি? লোকটির জবাব- আমার স্ত্রী। তারপর বলতে থাকেন- বিয়ের দুবছর হয়েছে। ছোট্র একটি মেয়ে রয়েছে। তিন মাস আগে ধরা পড়েছে ওর গলায় ক্যান্সার। তারপর ধীরে ধীরে কথা বলতে পারছে না। ঠিকমত কিছু খেতে পারছে না। এইটুকু বলেই চোখের জলস্রোত আটকানোর জন্য হাত দিয়ে চোখ মোছা শুরু। মুক্তার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু বাবার উপর থেকে ক্ষণিকের জন্য সরে এসে লোকটির দুঃখের উপর ভর করে।
একটু আগে আইসিউতে তার বাবার পাশের বেডে যে মেয়েটির শারীরিক অবস্থা সংক্রান্ত ইন্ডিকেটর স্ক্রিনে লালবাতি জ্বলছিল, লোকটি ওই মহিলার স্বামী। ডাক্তার নার্স সবাই ওই রোগির পাশে জড়ো হয়ে ছিল। নার্স মিনু রোগির বুকে হাতের তালু দিয়ে একটানা চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। এই রোগি যে বেশি সময় বাঁচবে না তা মুক্তা তখনই অনুমান করেছে। রসিকজনেরা বলে বউ মরলে কপাল খুলে। ভুক্তভোগিরা জানে বউবিয়োগে কপাল পুড়ে। এই ভদ্রলোকের মৃতপ্রায় বউশোকের চাপ ও তাপে শুধু কপাল নয় পুরো মুখমন্ডলই জ্বলসানো মনে হচ্ছে। সমাজে বউ মরা নিয়ে এ নিষ্ঠুর রসিকতা কিভাবে ঠাই পেল! মুক্তার খুব ইচ্ছে করছে এ সমাজকে লোকটির দগ্ধ চেহারা দেখাতে। যাতে কারো মনে আর এমন নির্মম যৌন ইঙ্গিতময় রসিকতা না আসে। ভাবনার এ ফাঁকে লোকটি তার বুকপকেট থেকে একটি শক্ত কাগজ বের করে মুক্তার হাতে দেয়। কাগজে আইব্রু দিয়ে লিখা ’অত কষ্ট কেনে খাইতে’। এটা পড়া শেষ করার আগেই লোকটি এ লেখা প্রসঙ্গে বলে ”ভাই, কথা বলতে পারে না সে। মুখে কিছু দিলেও গিলতে পারে না। তার কেমন কষ্ট হচ্ছে জানতে চাইলে সে লিখে দিতে চায়। কাগজ কলম কিছুই ছিল না তখন পাশে। তাই ওষুধের বোতলের কাগজের প্যাকেট ছিঁড়ে ব্যাগ থেকে আইব্রু বের করে এ কথা লিখে”। এরপর লোকটি হাউমাউ করে কান্না শুরু করে। এরকম বুকফাটা কান্নার সামনে যে কেউ অসহায়! তবুও কিছু বলতে হয়। ’ধৈর্য্য ধরেন ভাই, আল্লাহ আপনাকে সাহয্য করবেন”- একথা বলে মুক্তা লোকটিকে সান্ত্বনা দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। শোকের ঢেউ যখন মনসমুদ্রের তটে আছড়ে পড়তে শুরু করে তখন উত্তাল সেই মনকে শান্ত করা কঠিন।
বেশি সময় এভাবে কাটাতে হয়নি। আইসিউ রুম থেকে একজন ডাক্তার বের হয়ে যখন মেয়েটির মৃত্যুর খবরটি শোনান তখন একসাথে সবাই কান্নাকাটি শুরু করে। ঘুর্ণিঝড়ের মতো মুহুর্তের মধ্যেই পরিবেশ উলটপালট হয়ে যায়। আবার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সবই শান্ত। রুটিন কাজ শেষ করে লাশ বের করে দেয়ার পর কেউ ভাবতেই পারবে না একটু আগে এখানে কী হয়েছিল। কীভাবে একটি পরিবারের স্বপ্ন প্রচন্ড শব্দে ভেঙ্গে গিয়েছিল! কীভাবে ওই পরিবার তাদের স্বপ্নের নিস্তেজ নিস্তব্ধ শবদেহ নিয়ে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে হাসপাতাল চত্বর পাড়ি দিয়েছিল। এ এক নিত্যদিনের দৃশ্য! আবার অনেকেই রোগমুক্তির আনন্দে হাসিমাখা মুখে বিদায় নেন হাসপাতাল থেকে।
মুক্তার বাবাও ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এরকম তৃপ্ত চেহারায় হাসপাতাল ত্যাগ করেছিলেন। তখন অবস্থা আজকের ঠিক বিপরীত ছিল। আজ বাবা হাসপাতালের বিছানায়, ছেলে উদ্বিগ্ন চেহারায় পায়চারিরত! প্রায় ২৯ বছর আগে ওই সময়ে ছেলে রোগি হিসেবে হাসপাতালের বিছানায় আর বাবা পৃথিবীসম দুশ্চিন্তা নিয়ে ছেলের শিয়রের পাশে দাড়ানো ছিলেন। তফাৎ টা অন্য জায়গায়। মুক্তার বাবা মুক্তাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তার পক্ষে আর বাবাকে সুস্থ করা সম্ভব নয়! ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তার মামা মুক্তাকে বলেন, ’আমার সর্বস্ব দিয়ে হলেও ছেলেকে সুস্থ করব’- এই ছিল তোমার বাবার পণ। আল্লাহ সেদিন তোমার বাবার এ কামনা মঞ্জুর করেছিলেন।
এলোমেলো এসব ভাবনার সাথে এ দু’সময়ের আরও একটি মিল খুঁজে পায়। মুক্তার বিছানার পাশে ¯স্নেহময়ি বড়বোনের মত দাড়িয়ে থাকত একটি মেয়ে। শ্যামলা চেহারার লম্বা লিকলিকে স্বাস্থ্যের মেয়েটি কর্তব্যরত নার্স হলেও মুক্তার পাশে কর্তব্যের চেয়েও বেশি কোন আকর্ষণে দাড়িয়ে থাকত। মেয়েটির সেবা ও আপনজনের মত পাশে থাকার স্মৃতি আজও মুক্তার পরিবারের সবার মনে আছে। তবে মেয়েটির নাম আজ আর কারো মনে নেই। শুধু মনে আছে ওর বাড়ি ছিল রাজশাহী বিভাগের কোথাও। মুক্তার মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। কেন তার মামা ও চাচা মেয়েটির নাম ঠিকানা রাখলেন না বা যোগাযোগ রাখলেন না! সাধারণের মধ্যেও লুকিয়ে থাকা অসাধারণ মানুষগুলোর সেবা ও ভালোবাসার মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল। না, মুক্তা এ ভুল করবে না মিনুর বেলায়।
মিনু আইসিউ’র নার্স। বাবাকে ভর্তি করার পর প্রথম দিনই ওর সাথে কথা হয় মুক্তার। শ্যামলবর্ণের মায়াবি চেহারার মেয়েটি। মৃত্যুপুরিতে বসেও খিলখিল করে উচ্চ শব্দে হাসতে পারে। মিনুর গ্রামের বাড়ি খুলনা। মুক্তার বাবাকে দেখে তার খুবই মায়া হয়। কর্তব্যের চেয়েও অধিক কোন আকর্ষণবোধ করে। অথবা হয়তো সে সবাইকেই এরকম সেবা দিয়ে অভ্যস্থ। ডিউটি শেষ করে যাওয়ার সময় মুক্তাকে বলে যায়- ভাইয়া, আপনি দাদুদেরকে বলে কিছু সময় পর পর এপাশ ওপাশ করে দেবেন। নতুবা আংকেলের বেডসোর হয়ে যাবে। দাদুরা অনেক সময় এগুলো খেয়াল করেনা। কোন কোন সময় মুক্তার মন খারাপ দেখলে বলবে- ভাইয়া, মন খারাপ করেন কেন? আল্লাহকে বলেন! আসলে আমাদের কারো কিছু করার নেই। সবাই আংকেলের জন্য দোয়া করেন। মুক্তাও মিনুকে আর অন্য নার্সের মতো ভাবে না। একান্ত আপনজনই মনে হয়। মুক্তা তার মাকেও মিনুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় বোন হিসেবে। একে একে মুক্তার পরিবারের সবার সাথেই মিনুর পরিচয় হয়। ছোটবেলায় হারানো বোনকে খুঁজে পাওয়ার মতো মুক্তা ও তার ভাইবোনেরা মিনুকে গ্রহণ করে। মিনুকে যত দেখে ততই মনে পড়ে ২৯ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ওই নার্সের কথা। নিজেকে কেমন অপরাধি অপরাধি লাগে।
শনিবার দুপুর। হাসপাতাল থেকে বাসায় যাবে মুক্তা। আইসিউ’র পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে রেকর্ড রুম। সাথে সাথে সে ঢুকে পড়ে ওই রুমে। রেকর্ড অফিসার জানতে চান মুক্তা কী চায়। মুক্তার জবাব, একজন নার্সের পরিচয় এবং বর্তমান অবস্থান বের করতে চাই। ১৯৮৭ সালে ডিসেম্বরে মেডিসিন ওয়ার্ডে কর্তব্যরত ছিলেন এরকম একজন নার্সের নাম ঠিকানা কেন চাই জানতে চাইলেন অফিসার। মুক্তা সবকিছু বলার পর অফিসার খুবই খুশি হলেন। তিনি বলেন, এ রেকর্ড রুমে শুধু রোগির তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। এছাড়া তাদের আরেকটি রেকর্ড রুম রয়েছে যেখানে চাকরিজীবিদের তথ্যও আছে। কিন্তু এত পুরনো তথ্য নেই। তাছাড়া ওই সময়ের একজন নার্স এখন হয়তো অবসরে অথবা চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে অবস্থান করছেন। শেষ বয়সে সবাই যার যার এলাকায় ট্রান্সফার হয়ে যান। সেই হিসেবে ওই নার্সও হয়তো এখন চাকরিতে থাকলে রাজশাহী বিভাগের কোন হাসপাতালে আছেন। তা খোঁজে বের করা সম্ভব নয়।তবে ধন্যবাদ আপনাকে একজন নার্সের ১৯৮৭ সালের সেবার জন্য তাকে ২০১৬ সালে খুঁজে বের করার প্রচেষ্টার জন্য। মুক্তা এতে কিছুটা লজ্জা পায়। হ্যাঁ, সত্যিই ওই নার্সকে তার তো আরও আগেই খুঁজে বের করা উচিত ছিল। মুক্তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মধ্যবয়সি অফিসার বললেন, আপনি লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। আপনি তো অন্তত তাঁকে মনে রেখেছেন। অনেকেই ভুলে যায়। এর চেয়েও বেশি ভুলে যারা সেবা দিয়ে যায়। কারণ প্রতিদিনই তাদের এরকম সেবা দিয়ে যেতে হয়।
সত্যিই মানুষ অনেক কিছুই ভুলে যায়। আবার অনেক স্মৃতি ভুলতে পারে না। কিছু কিছু স্মৃতি ভুলে থাকার চেষ্টা করতে হয়। যত চেষ্টা করা হয় ততই স্মৃতিগুলো অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরে। মুক্তার বাবার জীবনের শেষ দিনগুলোর বিবর্ণ স্মৃতি যত ভুলে থাকার আয়োজন তত বেশি মনে পড়ে। হাসপাতালের বিছানা থেকে ঘরের সোফা চেয়ার কোথায় কেমন করে কীভাবে সময় কাটাতেন তা যেন চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় মুক্তার। এই স্মৃতি না দেখার জন্য চোখ বন্ধ করলেও আরও বেশি দেখে। চারপাশে এখন বাবার অস্তিত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। নিজ হাতে বাবাকে কবরে শোয়ানোর পরও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বাবা চলে গেছেন! আর আব্বা! আব্বা! বলে ডাকলেও কেউ উউউ.. বলে জবাব দেবে না, একথা মনে হলেই মুক্তার বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা করে! চোখে আসে পানি! মুক্তা তখন কোন হাত বুকে নেবে, কোন হাত চোখে দেবে তা ঠিক করতে পারে না। বুকের আগুন চোখের পানিতে নিভে না!!

ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৭
কুমারপাড়া, সিলেট।



লেখক মেলা  এর অন্যান্য লিখাঃ

19 July 2017     দুঃখ বিভুর

18 July 2017     পরশমনি

14 July 2017  
স্মৃতির মণিকোঠায় আলহাজ্ব জমির উদ্দিন
  ভরা নদী

6 July 2017  
অপেক্ষায়
  অপেক্ষায়


   অন্য পত্রিকার সংবাদ  অভিজ্ঞতা  আইন-অপরাধ  আত্মজীবনি  আলোকিত মুখ  ইসলাম ও জীবন  ঈদ কেনাকাটা  উপন্যাস  এক্সপ্রেস লাইফ স্টাইল  কবিতা  খেলাধুলা  গল্প  ছড়া  দিবস  দূর্ঘটনা  নির্বাচন  প্রকৃতি পরিবেশ  প্রবাস  প্রশাসন  বিবিধ  বিশ্ববিদ্যালয়  ব্যক্তিত্ব  ব্যবসা-বাণিজ্য  মনের জানালা  মিডিয়া ওয়াচ  মুক্তিযুদ্ধ  যে কথা হয়নি বলা  রাজনীতি  শিক্ষা  সমসাময়ীক বিষয়  সমসাময়ীক লেখা  সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  সাইক্লিং  সাক্ষাৎকার  সাফল্য  সার্ভিস ক্লাব  সাহিত্য-সংস্কৃতি  সিটি কর্পোরেশন  স্বাস্থ্য  স্মৃতি  হ য ব র ল  হরতাল-অবরোধ