30 Apr 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 9 February 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 738) 

নৈতিকতা ও ঘুষ-দুর্নীতি

     

মোঃ আব্দুল হক:
নৈতিকতা শব্দের ইংরেজী প্রতিশব্দ হচ্ছে Morality. ন্যায়-নীতি সংশ্লিষ্ট এই নৈতিকতা শব্দের অর্থ হচ্ছে সহজ ভাষায় সুন্দর চরিত্র বা ভদ্রতা কিংবা সত্য পথের আচরণ। নৈতিকতা ও শিক্ষার মধ্যে গভীর যোগসূত্র আছে। নৈতিকতা বললে যেমন ন্যায়নীতির ভিতরে থেকে কোনো কিছুর অগ্রসরতা বুঝায় তেমনি শিক্ষা
বললে চলমান সু শিক্ষার গুরুত্ব ফুটে উঠে। শিক্ষা অর্জন দ্বারা মানুষ ন্যায়নীতির সন্ধান পায় এবং মানবিক ও অমানবিক গুণের পার্থক্য করতে পারে।
মানবিক গুণ অর্থাৎ সত্য বা সঠিক পথের আচরণই মানব সমাজের সুন্দর আদর্শ যা
যুগে যুগে অনুসরণীয়। নৈতিকতা বিষয়ে কথা বলা এখন আমাদের সমাজে জরুরী হয়ে
উঠেছে।


আজকের এই যে মনুষ্য সমাজ তা অনেক কষ্টের এবং ত্যাগের ফলে পশু পাখির সমাজ
থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের মানব সমাজ হয়েছে। ধর্ম শিক্ষা ও মনীষীদের জ্ঞান
চর্চা এবং সৃজনশীল কৃষক, শ্রমিক, শিল্পী, নাপিত, জেলে, কামার, কুমার,
রাঁধুনী, চলতে চলতে পথ সৃষ্টিকারী পথিকের গতিতেই গতিশীল এই মানব সমাজ।
আমাদের ন্যায়নীতির মানব সমাজে কতো রকমের অন্যায় কাজ প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে।
তবে যে বিষয়টি দিনে দিনে উন্নত মানব সমাজের এক নির্লজ্জ বৈশিষ্ট্য হয়েছে
তা নিয়েই উপস্থাপনা অতীব জরুরী হয়ে উঠেছে মনে করি। বিষয়টি হচ্ছে
ঘুষ-দূর্নীতি যা নৈতিক চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। আমাদের সমাজের মানুষের
নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ ঘুষ। বর্তমানে আমাদের সমাজের স্কুল, কলেজ পাস
করা এক শ্রেণির সরকারী বা ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বেতনভোগী
চাকুরে আকন্ঠ নয় বলা যায় ঘুষ-দূর্নীতিতে পুরোটাই নিমজ্জিত। কখনও কখনও
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ধুমপায়ী বা মাদকাসক্ত মনুষ্য প্রাণীর চেয়েও ভয়ঙ্কর
হচ্ছে ঘুষ-দূর্নীতিতে আসক্ত ব্যক্তি। মাদকাসক্ত ছেলে- মেয়ের জন্যে (
কারণে) মা-বাবা তথা পরিবারের লজ্জায় সমাজে মাথা উঁচু করে চলা সম্ভব হয়না।
তেমনি ঘুষ-দূর্নীতিতে জড়িত পিতার অর্থাৎ ঘুষখোর অভিভাবকের অনেক স্বাধীন
চেতনা সম্পন্ন সন্তানেরা বুক ফুলিয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে সমাজে চলতে পারেনা।
সন্তান যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যায় এবং তার ভিতরে যদি নূন্যতম শিক্ষার আলো
জ্বলতে শুরু করে তাহলে সে সহজেই জেনে যায় তার পিতা কতোটাকা বেতনের চাকুরে
এবং পরিবারে কতো খরচ হয়। তার মধ্যে মনুষ্যত্ব জাগ্রত হলে অবশ্যই সে জেনে
যায় তার পিতা কতোটা সত্য পথের কান্ডারী। তবে কথা হলো, রূপকথার গল্পের '
রত্নভরা কলসি' পাহারা দেয়ার জন্য ( প্রয়োজনে) যেমন কলসির পাশে সাপ রাখা
হতো এবং প্রতিদিন দুধ-কলা দিয়ে তুষ্ট রাখা হতো তেমন মনুষ্য বিবেক বর্জিত
সন্তান হলে নিজে বিলাসিতায় তৃপ্ত হয়ে পিতার যেনতেন প্রকারে অর্জিত সম্পদ
সে পাহারা দিবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এইসব ছেলে মেয়েরা যদি এই লেখার
পাঠক হয় তবে তাদেরকে বলবো, মা-বাবা কিংবা অভিভাবক তোমাদের মানব জন্মের
অধিকার স্বাধীন চিন্তার দ্বার বন্ধ করে দিতে চাইলে তোমরা সেটা মেনে নিবে
কেন?
আমাদের সমাজের অভিভাবক শ্রেণি যে কিছুই বুঝেন না এমন নয়। তারাও বুঝেন এবং
তারা ধর্মেও আছেন। ঐশী মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আছে, 'ধর্ম ও নৈতিকতার শিক্ষা
সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ।' এ কথাটি আমাদের মা-বাবারা বুঝেন এবং
বিশ্বাস করেন বলেই একেবারে শিশুকাল থেকে ধর্ম শিক্ষার জন্য মসজিদের ইমাম
সাহেবের কাছে সন্তানকে শিখতে পাঠান। কিন্তু অবাক হতে হয়, সেই মা-বাবাই
সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষের আগেই সন্তানের চাকরী পেতে যাতে
অসুবিধা না হয় তাই দশ-বারো লক্ষ টাকা 'ঘুষের টাকা' হিসেবে জমা করে ফেলেন।
সহজেই অনুমেয় এতোগুলো টাকা ওই পিতা চাকরী করে খেয়ে জীবন কাটিয়ে বাড়ি গাড়ি
করে বেতনের টাকা থেকে সঞ্চয় করেননি। সেটা যদি করে থাকেন ফাইল আটকিয়ে অন্য
পথে অথবা ঠিকাদারের সাথে যোগ সাজশে। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে কোথায় সেই
শিশুকালে সন্তানকে শিখানো নৈতিকতা। কোন্ পথ ধরবে আপনার সন্তান যাকে
ছোটবেলায় নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন? এখন আপনি নিজেও নিজের পথ কঠিন
করেছেন আবার সন্তানের জন্য আরও কঠিন হলো। কিন্তু হাদিসে আছে, 'তোমরা
তোমাদের কথা গোপনে বলো অথবা প্রকাশ্যে বলো, তিনিতো ( আল্লাহ্) অন্তরের
বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত।'

মানুষ মাত্রই সম্মানের কথা ভাবে। কাল পাল্টেছে, পরিবর্তন এসেছে অনেক
কিছুতে। তবে একথা সত্য সেকাল কিংবা একাল সকল কালেই প্রকৃত সম্মান কারো
কাছ থেকে জোড় করে আদায় করা যায় না। আমাদের কিশোর বয়সে কোনো এক গ্রামে বা
ছোট শহরে চৌধুরী, তালুকদার, মহাজন, মোড়ল মিলিয়ে অল্প কয়েক সম্পদশালী
পরিবারের দেখা মিলতো। তবে উনারা শুধুই ধনীক বা বড়লোক ছিলেন না; বরং
নৈতিকতা সম্পন্ন বড় মানুষ ছিলেন। তাই আজও তারা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয় এবং
বরণীয়। আর বর্তমান ২০১৭ খ্রীষ্টিয় সালে এসে দেখি আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং
একাধিক বাড়ি গাড়ি ওয়ালার সংখ্যা বেশী অর্থাৎ ধনী বা বড়লোক চোখে পড়ে বেশী
; কিন্তু সে তুলনায় বড় মানুষ ততোটা নাই। এও বুঝি একালের অধিকাংশ ধনী
মানুষকে সাধারণে ভয় পায়, সম্মান বা শ্রদ্ধা বুকের গভীর থেকে করেনা। মরে
গেলে পরে কি হবে বলা যাচ্ছেনা। তবে যারা নির্লোভ এবং উদার দানশীল
ব্যক্তিত্ব তাঁদেরকে মানুষ যুগে যুগে মনে রাখে। সিলেটে এম সি কলেজ
প্রতিষ্ঠাতা রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়কে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
তেমনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দাতা ভোগী নয় বরং ত্যাগী দানবীর রাগীব আলী
মানুষের অন্তরেই ঠাঁই করে নিয়েছেন। আজিজ নগর গ্রামের দাতা হাজী মোঃ
আব্দুল আজিজ তালুকদার গ্রামবাসীর ভালোবাসায় আজও বেঁচে আছেন সমাজ সেবক
হিসেবে। সেই অতীত থেকেই ভালো কাজের পিছনে কূপমণ্ডূক স্বার্থান্বেষী মহলের
বাধা ও ষড়যন্ত্রের জাল এনম ভাবে ছড়ানো হয় যাতে ভালো মানুষের ভালো কাজ
গুলো আলো না পায়। তাই বলি বিত্ত হলেই হবেনা। নিজের বর্তমান মান মর্যাদা
এবং পরিবারের সম্মান প্রকৃত অর্থে চাইলে দুষ্ট লোকের ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ
করে এক সময় সত্যের পথ প্রদর্শক মানব কল্যাণের কর্মী মর্যাদার আসনে
থাকবেই।


ন্যায়-নীতি, নৈতিকতা, নৈতিকতার অবক্ষয়, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদি নিয়ে অনেক
কথা কাগজে কিংবা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় আসে। এখন যুব সমাজেই ভরসা রাখি।
তন্দ্রাচ্ছন্ন মা-বাবা, শিক্ষক, সমাজের অভিভাবকদের জাগানোর দায়িত্ব নিতে
হবে আঠারো পেরোনো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে। কবি কাজী নজরুল
ইসলামকে ইব্রাহীম খাঁ সমাজের প্রয়োজনে লিখেছিলেন, " সমাজ মরতে বসেছে।
তাকে বাঁচাতে হলে চাই সঞ্জীবনী সুধা।" ইব্রাহীম খাঁ লেখালেখির দ্বারা
অর্থাৎ সাহিত্য চর্চাকে পুঁজি করেই সমাজ বদলের চিন্তা করেছিলেন। আজ
আমাদের সমাজে যে অনৈতিকতার বীজ মহীরুহ হয়েছে তার বিনাশ ঘটাতে নতুন এবং
ব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল তরুণ তরুণীদের এগিয়ে এসে ঘরে ঘরে অন্যায়কে অন্যায়
বলা শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে মা-বাবাই শেষ কথা নয় এবং সত্য ও
ন্যায়-নীতির উর্ধে কিছু নেই। সত্যই সুন্দর আর এমন সুন্দরের জন্য তপস্যা
চালিয়ে যেতে হবে রক্ত মাংসের চেতনায় জাগ্রত মানুষকে। বলি হে নতুন তোমরা
টাকা প্রেমিক হয়োনা, তোমরা হও মানব প্রেমিক প্রকৃতি প্রেমিক।


মনে রাখতে হবে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে অন্যায়কে দূরে ঠেলতে পারলেই
মানুষের প্রথম বিজয় আসবে। ন্যায়-নীতির মধ্যে থেকে জীবনকে উপভোগ করতে
পারলেই একটি মনুষ্য প্রাণী প্রকৃত মানুষ হবে। এখন সময়ের প্রয়োজনে সমাজ
থেকে মাদকাসক্তি নির্মূল করার আন্দোলনের পাশাপাশি ঘুষ-আসক্তি দূর করার
জন্য সমাজের সৃজনশীল ও মননশীল ভালো চরিত্রের মানুষের নেতৃত্বে পথ চলা
দরকার। একজন মাদকাসক্তের বিরোদ্ধে যেমন পরিবারের সবাই ঘৃণা প্রকাশ করে
ভালো হতে বলে, তেমনি ঘুষের ব্যাপারে প্রকাশ হোক ঘর থেকেই। তবেই আসবে
সুন্দর আগামী দিন।।
# লেখক _ মোঃ আব্দুল হক
কলামিস্ট, কবি, প্রাবন্ধিক

|

   অন্য পত্রিকার সংবাদ  অভিজ্ঞতা  আইন-অপরাধ  আত্মজীবনি  আলোকিত মুখ  ইসলাম ও জীবন  ঈদ কেনাকাটা  উপন্যাস  এক্সপ্রেস লাইফ স্টাইল  কবিতা  খেলাধুলা  গল্প  ছড়া  দিবস  দূর্ঘটনা  নির্বাচন  প্রকৃতি পরিবেশ  প্রবাস  প্রশাসন  বিবিধ  বিশ্ববিদ্যালয়  ব্যক্তিত্ব  ব্যবসা-বাণিজ্য  মনের জানালা  মিডিয়া ওয়াচ  মুক্তিযুদ্ধ  যে কথা হয়নি বলা  রাজনীতি  শিক্ষা  সমসাময়ীক বিষয়  সমসাময়ীক লেখা  সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  সাইক্লিং  সাক্ষাৎকার  সাফল্য  সার্ভিস ক্লাব  সাহিত্য-সংস্কৃতি  সিটি কর্পোরেশন  স্বাস্থ্য  স্মৃতি  হ য ব র ল  হরতাল-অবরোধ