28 May 2017 : Sylhet, Bangladesh :

9 February 2017 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 1388) 

একজন যুবতীর কথা...

একজন যুবতীর কথা...
     

তাসলিমা খানম বীথি:
১. যে মেয়েটিকে কোলে নিয়ে জাঁকিয়ে জাঁকিয়ে আল্লা, আল্লা জপতে ভালোবাসতো তার মা। দুপুরবেলা সারা শরীর তেলে জবজবা করে গোসল করাতো যে মেয়েকে তার মা। সেই মেয়েটিকে এখন ঘিরে আছে বেশ ক’জন সাংবাদিক। মেয়েটির নাম ফুলবানু। শাদা ফরশা রংয়ের চামড়া। নাদুস-নুুদুস না হলেও শরীরে এক ধরনের চেকনাই আছে। দেখলে ভাল্লাগে।

২.আবছা আবছা করে ওর কি যেন মনে পড়ছে। হ্যাঁ ক’দিন আগে সারা আসমানটা কালো মুরগীর রংগে ছেয়ে গিয়েছিলো। তারপর আগুনের ফুলকির মতো বিরাট একটা ফুলকি দেখা দেয় আসমানে। এরপরই এলো ঝড়। বাতি জ্বেলে বসেছিলো ওরা-ফুলবানু, ওর মা, বাবা, দুটো ছোট ভাইবোন। হঠাৎ পুবদিক থেকে ঘরের চাল সমান পানি ঢুকে পড়লে বাতি নিভে যায়, চালা ছিড়ে যায় থাম আর ঘরের খুটি থেকে। পানির তোড় ধাক্কা দিয়ে ওদেরকে চালার উপরে ফেলে, আচমতা দেখা যায় মা ও ভাই চালের নীচে চলে গেছে। ফুলবানু পা দিয়ে ঘরের খুটি আঁকড়ে এক হাতে চালা, আরেক হাতে বোনকে ধরে রেখেছিলো চালের ওপর। বাবাও এক হাতে মেয়ে আরেক হাতে চালা ধরেছিলো। ফুলবানু কাহিল হবার পর বোনকে বাবার হাতে তুলে দেয়। তারপর পানির আরেক মোচড়ে খুঁটি থেকে পা ছুটে যায়, ভালো করে আঁকড়ে ধরে চাল। বাবাও বোনসহ চাল ছুটতে থাকে উল্কার বেগে। শুধু মনে পড়ে বাপ চিৎকার করে বলছিলো-‘আলøার হাওলা, চাল দরি ভাসান দি থাইকো। ‘কিন্তু হঠাৎ চাল হাত থেকে ফসকে যায়। নিমিষেই বাবা-বোন হারিয়ে যায়, চোখের সামনে থেকে।

এভাবেই হারিয়ে যায় ফুলবানু জীবন থেকে আপনজনরা। তারপর থেকে শুরু হয় ফুলবানু নষ্ট সময় কষ্ট জীবন। ফুলবানু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়নি কখনো। বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে চায় না বলে সরল মনে বিশ্বাস করেছিলো শিকদারকে। বেঁচে থাকার জন্য এক চিমটি ভালোবাসা চেয়েছিলো। যাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকবে ফুলবানু। প্রবল জলোচ্ছ¡াসে একদিন ভেসে যাওয়া সমুদ্র উপকূলবর্তী উরির চর কতিপয় গ্রামের একটি যুবতীকে কেন্দ্র করে ‘যুবতী লাশ’ উপন্যাসটি চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠে।
৩. ‘যুবতী লাশ’ যত পড়ছিলাম ততই আবিষ্কার করছিলাম নিজেকে। বইটি প্রথমবার যখন পড়ি বুঝতে পারিনি বলে আরো একবার পড়ি। তারপর উপন্যাসটি মাথার ভেতরে এমনভাবে বন্দি হলো যে, প্রতিদিন সকালে অফিসে যাবার পথে দেখি একজন ভরা-যুবতী না ঠিক মধ্য বয়সী একজন নারীকে কয়েক মুহুর্তের জন্য। তার মাথা ভর্তি এলোমেলো চুল, জীর্ণর্শীণ দেহ, কিছু কাপড় থাকলোও সম্পূর্ন খালি গায়ে থাকে সবসময়ই। তাকে দেখলে ‘যুবতী লাশের’ কথা মনে পড়ে। মনে মনে ভাবি এই নারী জীবনে ফুলবানু মত কোন ঘটনা আছে কী?

৪. বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে। একজন ছেলে হয়ে জন্ম নেওয়া মধ্যে কখনো তার জীবনে ধর্ষিত হবার ভয় থাকে না। অথচ একজন মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার মাঝে তাকে প্রতিটি মুহূর্ত অন্ধকারে রাস্তায় ধর্ষিত হবার ভয় থাকে। নারীদের জীবনটা এমন কেনো! ফুলবানুর মত আমাদের সমাজে অনেক নারীই আছে শিকদারের মত পুরুষদের বিশ্বাস করে প্রতারিত হচ্ছে। শিকদার এর দৃষ্টিকোন যদি ভালো হত। তাহলে পাল্টে যেতো ফুলবানু জীবন চিত্র। একজন নারী পরিবার ও প্রিয় মানুষ ছাড়া কতটুকু অসহায় তাই প্রমানিত হয় এই উপন্যাসে। উপন্যাসের যে অংশটুকু আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে তা হলো ফুলবানুর কোন সন্তানকে জীবিত রাখা হয়নি। জীবিত থাকলে হয়তো তাদেরও ক্ষুধা, দারিদ্র, অপমান আর বঞ্চনা মধ্যে দিয়ে মায়ের মত জীবন নিয়ে পৃথিবীতে বাঁচতে হত। জীবন এটি একটি যুদ্ধÿেত্রে, প্রতিদিনের প্রতিমুহুর্তের জন্য। প্রতিটি বিন্দু আনন্দের হলোও এখানে জীবনকে কঠোর মূল্য দিতে হয়। তাই এই উপন্যাসের প্রতিটি পরতে পরতে লেখকের কলমে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটের বাস্তবতা।
যুবতী লাশ বইটি পড়লে কারো কাছে মনে হতে পারে অশøীল। হয়তো বা কিছু কথা অশ্লীল মনে হবে, কিন্তু আমার কাছে বইটিকে তেমন অশøীল মনে হয়নি। মনে হয়েছে কঠিন বাস্তবতা একজন নারীর করুন জীবনের কথা। উপন্যাসের নায়িকা ফুলবানু পথ খুঁজেছিলো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু পারেনি। জীবনের যুদ্ধক্ষেত্রে তাকে প্রতিদিন, প্রতিমূর্হুত কঠোর মূল্য দিতে হয়েছে। জীবন তাকে অপমানিত করেছে। যুবতীর লাশ পড়ে আমার মনে হয়েছে কোথায় কোন অশ্লীলতার ছোঁয়া নেই। জীবনের পরিণতি টানতে গিয়েই সে এসেছে নিরবে, নিঃশব্দে।

৫. একজন নারী হিসেবে বলব- উপন্যাসটি আমার হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। জীবনের একটি সময় বুঝি সবকিছুই ¯স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু কোন লেখকের লেখা ¯স্তিমিত হয়ে যায় না বলে আমার বিশ্বাস। নিজের ভেতরে যতই গুটিয়ে থাকে না কেন সে আলোয় বেরিয়ে আসবেই। যুবতীর লাশ উপন্যাসের লেখকের কাছে আমার অনুরোধ আপনি লিখুন....লিখুন এবং লিখে যান। লিখতে লিখতে হাত ব্যথা করবে, কলম ক্লান্ত হয়ে যাবে তবুও আপনি থেমে যাবেন না। হৃদয়ের কথা কবিতা হয়ে ঝরবে-গল্প হয়ে দশজনকে মোহিত করবে আপনার অজ্ঞাতে অগোচরে।
৬. চকচকে ঝকঝকে ‘যুবতী লাশ’ উপন্যাসটি হাতে নিলেই যে কাউকে আকর্ষন করবে। ইয়াহইয়া ফজলের নিখুঁতভাবে করা চমৎকার এই প্রচ্ছদটি খুললেই উৎসর্গ কথামালা গুলো যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। লেখক বইটি উৎসর্গ করেছেন রত্মাগর্ভা মা-বাবা ও তার প্রিয়তমাকে। তিনি লিখেছেন, মধ্যরাত পেরিয়ে শেষরাত ভোরের আলো ফুটবে খানিক পর জানালার নক করতেই শব্দ ফুরোবার আগে জেগে উঠেন যিনি। তিনি আমার আম্মা মিরযা সমর-উন-নিসা। আমাদের নিয়ে ছিলো যার স্বপ্নে বিস্তার তিনি আমার পিতা মরহুম মো: আবদুল ওয়াহিদ, কোন প্রতিকূলতা-প্রলোভন তাকে স্বপ্নচ্যুত করতে পারেনি। আমি পারিনি পিতার স্বপ্নের বাস্তবায়ন, কিন্তু অ-মানুষ হইনি।
এখানেই শেষ নয়-লেখক বইটিতে গুছিয়ে লিখেছেন, সবচেয়ে প্রিয় সবচেয়ে কাছের তার প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা- এবং ভোরের পাখিরা দিনের আলো ঝেড়ে সাঁঝের বেলায় নীড়ে ফিরলেও আমার ফেরা হয় না, যখন ফিরি- নীড় ছাড়ার আােজনে ব্যস্ত পাখি সব। এইভাবে কাটছে দিনের পর রাত, এর পর দিন মুখ বুঁজে সব সয়ে চলে যে- সেই মেয়েটি, আমার বধুয়া আফিয়া সুলতানা।

পরিশেষে বলতে চাই- ‘যুবতীর লাশ- কেউ বলে অশ্লীল, কেউ বলেন জীবনঘনিষ্ট আর আমি বলব একজন নারীর বাস্তব জীবনচিত্র। উপন্যাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাকে আলোড়িত করেছে। সবশেষে লেখকের দীর্ঘায়ু কামনা করে নতুন কোন উপন্যাসের প্রত্যাশায় অপেক্ষা রইলাম।

একনজরে যুবতী লাশ-
বই : যুবতী লাশ
লেখক- সেলিম আউয়াল
প্রথম প্রকাশ- একুশে বইমেলা ফেব্রæয়ারী ২০০২
দ্বিতীয় সংস্করন- কেমুসাস বইমেলা, মার্চ ২০১২
প্রচ্ছদ- ইয়াহইয়া ফজল
প্রকাশক - পানশী প্রকাশন
মূল্য - ৮০ টাকা
পৃষ্টা- ৫৯


|

   অন্য পত্রিকার সংবাদ  অভিজ্ঞতা  আইন-অপরাধ  আত্মজীবনি  আলোকিত মুখ  ইসলাম ও জীবন  ঈদ কেনাকাটা  উপন্যাস  এক্সপ্রেস লাইফ স্টাইল  কবিতা  খেলাধুলা  গল্প  ছড়া  দিবস  দূর্ঘটনা  নির্বাচন  প্রকৃতি পরিবেশ  প্রবাস  প্রশাসন  বিবিধ  বিশ্ববিদ্যালয়  ব্যক্তিত্ব  ব্যবসা-বাণিজ্য  মনের জানালা  মিডিয়া ওয়াচ  মুক্তিযুদ্ধ  যে কথা হয়নি বলা  রাজনীতি  শিক্ষা  সমসাময়ীক বিষয়  সমসাময়ীক লেখা  সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  সাইক্লিং  সাক্ষাৎকার  সাফল্য  সার্ভিস ক্লাব  সাহিত্য-সংস্কৃতি  সিটি কর্পোরেশন  স্বাস্থ্য  স্মৃতি  হ য ব র ল  হরতাল-অবরোধ