27 Jun 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 30 January 2017 প্রকৃতি পরিবেশ  (পঠিত : 558) 

প্রযুক্তির আগ্রাসনে ‘রুঙ্গা’, ‘গুই’ ও ‘চাঁই’ মাছ ধরার গ্রামীণ ঐতিহ্য এখন হুমকির সম্মুখীন

     

সাঈদ নোমান;
‘রুঙ্গা’, ‘গুই’ ও ‘চাঁই’। মাছ ধরার ছোট ছোট ফাঁদ। বাঁশ বেতের তৈরী এ যন্ত্রটি সিলেটের হাওরাঞ্চলের মানুষের নিজস্ব আবিষ্কার। একসময় হাওরাঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে এসব যন্ত্র দেখা যেতো। পুরুষদের পাশাপাশি বাড়ির বউ-ঝিরা তৈরী করতেন ‘রুঙ্গা’, ‘গুই’ ও ‘চাঁই’। এখন প্রযুক্তির ঢেউ লেগেছে হাওরাঞ্চলে। হারিয়ে যাচ্ছে হাতে গড়া শৈল্পিক কারুকার্য্যরে গ্রামীণ এসব ঐতিহ্য।
‘রুঙ্গা’, গুই ও চাঁই বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। অঞ্চল ভেদে এগুলোকে বিভিন্ন নামেও ডাকা হয়। যেমন ‘রুঙ্গা’, ‘কুকি’, ‘গুই’, ‘চাঁই’, ‘বাইর’, ‘বাঘা’, ‘মুছনা’, ‘ঘুনি’, ‘দারকি’ ও ‘দিয়াইর’। বাঁশ দিয়ে তৈরী প্রতিটি ফাঁদে থাকে বিভিন্ন আকৃতির খোপ। এসব খোপে সহজে মাছ প্রবেশ করতে পারে কিন্তু আর বের হতে পারেনা।
ভাদ্র-আশি^ন মাস। নদী, হাওর, বিল-ঝিলের পানিতে ভাটার টান পড়ে হাওরাঞ্চলে। অথৈ জলের নীচে ডুবে থাকা জমির পানি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এসময় পানির টানের সাথে শুরু হয় মাছ ধরার মিছিল। পানির সাথে প্রতিযোগিতা করে নামতে না পেরে সমতল জমিনে সামান্য পানিতে আটকে থাকে প্রচুর মাছ। ‘নল’-‘খাগড়া’ আর জলজ উদ্ভিদের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ। খুব সহজেই এসব মাছ ধরা যায়।
ভাদ্র-আশি^ন মাসে সিলেটের হাওরাঞ্চলে মাছ ধরার একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো স্থানীয় ভাষায় ‘ডাক বান্ধা’। আর ‘ডাক বান্ধা’ পদ্ধতির মাধ্যমে মাছ ধরার যন্ত্র হলো সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় ‘রুঙ্গা’ বা ‘কুকি’।
বাঁশের বেত দিয়ে ‘রুঙ্গা’ তৈরী করা হয়। লম্বা গোলাকৃতির এই যন্ত্রটির সামনের অংশ থাকে সরু এবং পেছনের অংশ থাকে অপেক্ষাকৃত চওড়া। পানির টানে পেছনের অংশে গিয়ে মাছ আটকা পড়ে। ‘রুঙ্গা’র উচ্চতা ১ থেকে ২ ফুট। পেছনের চওড়া অংশ দিয়ে থাকে মাছ প্রবেশের ছোট পথ। যা দিয়ে মাছ প্রবেশ করতে পারলেও বেরোনোর কোনো উপায় থাকেনা। ‘রুঙ্গা’র সরু অংশের মুখ লতা-পাতা দিয়ে বন্ধ করে রেখে মাছ আটকাতে হয়।
হাওরাঞ্চলের কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা যায়, ভাদ্র-আশি^ন মাসে যখন হাওরের পানিতে টান পড়ে, তখন জমির পানি কমতে থাকে। এসময় পুঁটি, টেংরা, গুতুম (পুঁইয়া), বাইন,ভ্যাদা (মেনি), কৈ, চেঙ (টাকি), চান্দু (চান্দা), চাটা (খালিশ)সহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ আটকে থাকে। যেসব জমিতে ১ থেকে ২ ফুট পানি থাকে, সেসব জমিতে রাতের বেলা মাছ নীচ থেকে উঠে আসে। রাতের শেষ ভাগে জমির চারদিকের পানি সমান আইল (বাঁধ) কাঁদা মাটি দিয়ে উঁচু করে বাঁধা হয়। ‘রুঙ্গা’র মুখ লতাপাতা দিয়ে বন্ধ করে বাঁধের কয়েক স্থানে পুঁতে রাখা হয়। বাঁধের কারণে জমির পানি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পুঁতে রাখা ‘রুঙ্গা’-এর ভেতর দিয়ে বের হয়। এসময় হালকা ¯্রােতের ধারা সৃষ্টি হয়। স্্েরাতের টানে বের হয়ে যাওয়া মাছ এসে ‘রুঙ্গা’র ভেতর আটকা পড়ে। দুই-তিন ঘন্টা পর পর এক-একটি ‘রুঙ্গা’ তুললে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। তবে মাছের সাথে ‘রুঙ্গা’য় কাঁকড়া, সাপ ও শামুক আটকা পড়ে।
গুই বা চাঁই দিয়ে মাছ ধরার মওসুম হলো বর্ষাকাল। গুই ও চাঁই বাঁশের শলা দিয়ে তৈরি করা হয়। কৌণিক নলাকৃতির গুই। গুইয়ের মুখ পাট বা নাইলনের সূতা দিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধতে হয়। আর চাঁইয়ের আকৃতি অনেকটা বর্গাকৃতির। চাঁইয়ের উচ্চতা ২ থেকে ৪ ফুট। দৈর্ঘ ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত হয়। গুই ও চাঁইয়ের ভেতর শামুক ভেঙ্গে রাখা হয়। সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে বা হাওরের কিনারে পানির নিচে পুঁতে রাখা হয়। পরদিন ভোরে তোলা হয়।
গুই বা চাঁই দিয়ে মাছ ধরার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাওর পাড়ের প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, বর্ষায় হাওরের আশপাশের যেসব স্থানে পানি কম থাকে সেসব স্থানে সারিবদ্ধভাবে গুই পাতা হয়। তবে ভাসমান পানিতে গুই পুঁতার সময় সতর্ক থাকতে হয়। পরদিন যাতে গুই পুঁতে রাখার স্থানটি খোঁজে পেতে ভুল না হয়। এ জন্য পানির নীচে ছোট ছোট খুঁটি দিয়ে পুঁতে রাখলে গুই হারানোর ভয় থাকেনা। খুঁটি দেখে গুইগুলো উত্তোলন করা সহজ হয়। গুইয়ের ভেতরে শামুক ভেঙে রাখার কারণে তা খেতে ছোট ছোট মাছ এসে প্রবেশ করে। গুইয়ের ভেতরে এমনভাবে ফাঁদ থাকে, যাতে প্রবেশ করলে মাছ বের হতে পারেনা। পরদিন সকালে গুই তুললে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।
এক সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আশপাশ জুড়ে বুনোঘাস, লতাপাতার ঝোঁপ-ঝাঁড় ছিলো। এসব জঙ্গলে পোকা, মাকড়, ছোট-বড় নানা রঙের প্রজাপতি, ফড়িং, ঘাসফড়িং এর বাস ছিলো। আর বড় বড় লাল, কালো পিঁপড়ে লতাপাতা জড়ানো ঝোঁপের ভিতরে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়তো। পাশাপাশি গোয়াল ঘরের পাশে গোবর ফেলার স্থানে ছিল কেঁচোর কারখানা। শামুক ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করে এসব স্থানে পানির নীচে সন্ধ্যা বেলা পুঁতে রাখা হতো গুই ও চাঁই। তারপর শক্ত কোনো গাছে বা মাটিতে খুঁটি পুঁতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। যাতে জলের তোড়ে ভেসে চলে না যায়। শামুক খাওয়ার লোভে রাতের বেলা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ গুইয়ের ভেতর ঢুকে পড়তো। বাইন, টেংরা, পুঁটি, মেনি (ভ্যাদা), পাবদা, কাঙলা, কৈ, মাগুর, শিং, বেলে, গুতুম (পুঁইয়া), চিংড়িসহ নানা প্রকার মাছ আটকা পড়তো। মাছের সাথে কাঁকড়া, সাপ ঢুকতো। কিন্তু বেরোতে পারত না। তাই, দড়ি ধরে টেনে টেনে সাবধানে পানির নীচ থেকে তুলতে হতো।
আবহমান কাল থেকে কৃষি কাজের পাশাপাশি হাওর এলাকার কৃষকরা মাছ ধরার সাথে জড়িত। বিভিন্ন পদ্ধতিতে মাছ ধরা গ্রামীণ সংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে। তবে প্রযুক্তির আগ্রাসনে মাছ ধরার গ্রামীণ এসব ঐতিহ্য এখন হুমকির সম্মুখীন। যারা এসব যন্ত্র তৈরীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা এখন ছেড়ে দিয়েছেন।
হাওরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে এখন আর এসব যন্ত্র প্রস্তুত হয়না। তবে শখের বসে এখনও যারা তৈরী করেন, তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বড় সাইজের ১টা বাঁশ দিয়ে ৩০টার মতো ফাঁদ তৈরি করা যায়। প্রতি জোড়া ৮০ থেকে ১শ’ টাকায় বিক্রি করা যায়।

|

   অন্য পত্রিকার সংবাদ  অভিজ্ঞতা  আইন-অপরাধ  আত্মজীবনি  আলোকিত মুখ  ইসলাম ও জীবন  ঈদ কেনাকাটা  উপন্যাস  এক্সপ্রেস লাইফ স্টাইল  কবিতা  খেলাধুলা  গল্প  ছড়া  দিবস  দূর্ঘটনা  নির্বাচন  প্রকৃতি পরিবেশ  প্রবাস  প্রশাসন  বিবিধ  বিশ্ববিদ্যালয়  ব্যক্তিত্ব  ব্যবসা-বাণিজ্য  মনের জানালা  মিডিয়া ওয়াচ  মুক্তিযুদ্ধ  যে কথা হয়নি বলা  রাজনীতি  শিক্ষা  সমসাময়ীক বিষয়  সমসাময়ীক লেখা  সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  সাইক্লিং  সাক্ষাৎকার  সাফল্য  সার্ভিস ক্লাব  সাহিত্য-সংস্কৃতি  সিটি কর্পোরেশন  স্বাস্থ্য  স্মৃতি  হ য ব র ল  হরতাল-অবরোধ