24 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 19 December 2016 সাক্ষাৎকার  (পঠিত : 6099) 

বিশ্বযুদ্ধে হারানো এক চাচাকে খোঁজার আগ্রহই রেহানা রহমানকে গবেষণায় আগ্রহী করে তুলে

বিশ্বযুদ্ধে হারানো এক চাচাকে খোঁজার আগ্রহই
রেহানা রহমানকে গবেষণায় আগ্রহী করে তুলে
     

তাসলিমা খানম বীথি: গবেষক রেহানা খানম রহমানের জন্ম সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার শ্রীধরা গ্রামে একটি শিক্ষক পরিবারে। নিজের গ্রাম শ্রীধরার একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ঢাকায় আজিমপুর গালর্স হাই স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করে তিনি সিলেট চলে আসেন। এখানে ভর্তি হন গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলে। সিলেট গভর্নমেন্ট গালর্স হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি সিলেট গার্লস স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। তারপর সিলেট মহিলা কলেজ ও এম.সি কলেজে পড়াশুনা করেন।
১৯৭৭ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্যে ইংল্যান্ড যান। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব গ্রীনিজ থেকে ¯স্নাতক সম্মান ডিগ্রী লাভ করেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধীনে ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন থেকে তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েশন ও এফ.ই.টি.সি ডিগ্রী লাভ করেন। রেহানা খানম রহমান বিলাতে বসবাসরত এক প্রগতিশীল বাঙালি নারী। শিক্ষায়, সাহিত্যে, জনসেবায় ও মিডিয়া তার অনেক অবদান রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। বিলাতের একটি Further Education কলেজে তিনি ইনফরমেশন টেকনোলজি’র লেকচারার হিসেবে নিয়োজিত আছেন। ব্রিটেনের মুলধারার শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অবদান রেখেছেন, তেমনি নিজের সম্প্রদায়ের শিক্ষা ক্ষেত্রেও তাঁর দান অতুলনীয়। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনে বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বাংলা ভাষা, আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শিক্ষাদানে অকাতরে কাজ করে গেছেন। তিনি লন্ডনের একটি আর্ট গ্যালারিতেও কাজ করেছেন। নিজের দেশ ও দেশ বিদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতা চর্চার প্রতি রয়েছে তাঁর বিশেষ অনুরাগ। তিনি আমেরিকা, কানাডা, ইন্ডিয়া, মিশর, মরক্কো, তুরস্ক, তিউনিসিয়া, আরব, জর্ডান, প্যালেস্টাইন, ইসরাইল ও ইউরোপের বেশীর ভাগ দেশ ভ্রমণ করেছেন। ২০০৬ সালে তিনি হজ্জ্ব পালন করেন। ২০১০ সালে তিনি চ্যানেল এস-এর সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করেন। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে ইংরেজি চর্চা করলেও বাংলা ভাষাকে তিনি নীরবে নিভৃতে লালন করছেন। সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে সুদূরে বসেও তিনি বাংলা ভাষার সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ রচনা।

কিছুদিন পূর্বে রেহানা খানম রহমানকে নিয়ে প্রফেসর নজরুল ইসলাম হাবীবীর লেখা প্রবন্ধটি যারা sylhetexpress.com এ পড়েছেন, তাদের কাছে রেহানা রহমানকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। ঐ প্রবন্ধটি যাদের পড়ার সুযোগ হয়নি তাঁদেরকে প্রফেসর হাবীবীর উদ্ধৃতি দিয়ে রেহানা রহমানকে পরিচয় করিয়ে দিই।

‘সাহিত্য স্রষ্টার দান। সাহিত্যিক স্রষ্টার প্রতিনিধি। এই প্রতিনিধির মধ্যে রেহানা খানম রহমান একজন। তাঁর সাহিত্যচর্চা, গবেষণা, শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা, শেখার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, দেশ, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে কিছু দিতে পারার ইচ্ছার প্রতি লক্ষ করলে সে কথা বিনাবাক্যে বিশ্বাস করতে হয়, তখন মনটা শ্রদ্ধায় ভরে উঠে রেহানা রহমানের প্রতি।’

প্রফেসর হাবীবী অন্যত্র লিখেছেন, ‘রেহানা রহমান একজন উঁচু মাপের লেখিকা এবং উন্নত মনের ও মানের মানুষ। আমি তাঁর চোখে দেখেছি, বিপুল সৃষ্টির সম্ভাবনা। তাঁর লেখায় আছে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, অজানা তথ্যের বিপুল সমাবেশ।আছে সমাজ সংসারের অন্যান্য অসংখ্য তথ্য ও তত্ত্ব। তাঁর গবেষনালব্ধ সহজ সরল ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলো পাঠকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। গবেষক রেহানা খানম রহমান বিলাতের একটি কলেজে বহুদিন শিক্ষকতা করে ইদানিং অবসর গ্রহণ করেছেন লেখালেখি ও ভ্রমণে সময় অতিবাহিত করার জন্য। তিনি একাধারে শিক্ষক, লেখক, গবেষক, মাতা, মাতামহি, টিভি উপস্থাপিকা, ভ্রমণকারী ও ছাত্রী। জীবনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে সামান্য অবসরকেও তিনি লেখালেখি ও ভ্রমণের কাজে ব্যয় করেন। ভ্রমণ কাহিনীর ছলে তাঁর লেখায় থাকে বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও শিল্পের জানা ও অজানা তথ্যের বিপুল সমাহার। তাঁর রচিত ‘প্যালেস্টাইনীরা কেন গৃহহারা’ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে এক অনবদ্য সংযোজন। তাছাড়া ‘টাওয়ার ও হ্যামলেটস’-এ তিনি গল্পের ছলে তুলে ধরেছেন ব্রিটিশ ইতিহাস।

এসব গবেষণা গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে এক মূল্যবান সংযোজন। বিদেশে হাজারো কাজের মধ্যেও তিনি বাংলা সাহিত্যকে ভুলে যাননি। বাংলা সাহিত্যে আরো অবদান রাখার জন্য তিনি সিলেটে একটি ঐতিহ্য গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন অদূর ভবিষ্যতে।

রেহানা খানম রহমানের স্বামী একজন আইনবিদ। লন্ডনের স্থানীয় সরকারের একজন দায়িত্বশীল অফিসার হিসাবে নিয়োজিত আছেন। তাদের তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ডাক্তার, দ্বিতীয়জন ব্যাংক ডাইরেক্টর ও ছোট মেয়ে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী রোসউড হোটেলের ডেপুটি ডাইরেক্টর। আর তাদের একমাত্র ছেলে একটি ব্যাংকের কর্পোরেট ডাইরেক্টর হিসেবে নিয়োজিত আছেন। তাঁর পরিবার একটি সুশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবার। বলা যায় ইংল্যান্ডের একটি আদর্শ বাঙালী পরিবার।

সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে গবেষক রেহানা খানম রহমানের সাক্ষাতকার ইন্টারনেটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। ১ জানুয়ারী ২০১৬। সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি।

বীথি: আপনি কখন থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন ? এ পর্যন্ত আপনার কয়টি বই বের হয়েছে? বই গুলো কী কী?
রেহানা রহমান: ILEA অর্থাৎ ইনার লন্ডন এডুকেশন অথোরিটির জন্য শিশু সাহিত্য লিখেছিলাম ৮০র দশকে। তারপর সুদীর্ঘ ২০ বছর পর লেখা শুরু করি ‘টাওয়ার ও হ্যামলেটস’ দিয়ে। জীবন সংগ্রামে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে নিজের যে একটা প্রতিভা আছে, তা বিকাশের সময় পাইনি। লেখাপড়া, শিক্ষকতা, সমাজ, সন্তান, সংসার সব নিয়ে জীবন এত ব্যস্ত ছিল যে বহুবছর সাহিত্য চর্চার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তবে এর মধ্যে যে লেখেনি তা নয়, মাঝে মাঝে পত্র পত্রিকায় লিখেছি। ২০০০ সাল থেকে কিছু কিছু লেখে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা হল ৬টি। এগুলো হচ্ছে ১. টাওয়ার ও হ্যামলেটস, ২. প্যালেস্টাইনীরা কেন গৃহহারা, ৩. ঘুরে এলাম আন্দালুশিয়া, ৪. ঘুরে এলাম স্ক্যান্ডেনেভিয়া এবং দুটো শিশু সাহিত্য হচ্ছে ১. বাংলাদেশের বেদে ৬. এক রানীর দুঃখের কাহিনী শুন।

বীথি: নতুন কোন বই বের করার পরিকল্পনা আছে কি?
রেহানা রহমান: হ্যাঁ। এর মধ্যে অনেকগুলো দেশ ঘুরে এসেছি। সেগুলো নিয়ে লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

বীথি: গবেষণা জগতে কীভাবে আসলেন?
রেহানা রহমান: জীবনের বিশেষ কিছু ঘটনা ও অভিজ্ঞতা অনুপ্রেরনা যুগিয়েছে গবেষণার জগতে আসতে। সব বলতে গেলে উত্তর অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তবে একদিনের ঘটনা না বললে আপনার প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়া হবে না। সে ঘটনা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। বলতে গেলে সেটিই ছিল আমার জীবনে গবেষণার প্রথম সোপান। সালটি ছিল ১৯৮১ আর মাসটি ছিল আগস্ট। গ্রীষ্মকালীন লম্বা দিন। টেমস নদীর পারে তখন বাস করতাম। গ্রীষ্মের লম্বা দিনে বিকালে নদীর পারে হাঁটতাম বাচ্চাদের নিয়ে। হিম শীতল আবহাওয়া নয়, মৃদু উষ্মবায়ূ। ভাল লাগত। সন্ধ্যার পূর্বে বাড়ি ফেরার পথে ট্রিনিটি গার্ডেনে একটু বসতাম। টাওয়ার হিল স্টেশন সংলগ্ন ট্রিনিটি গার্ডেন, চারদিকে চিরহরিৎ বৃক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত। সবুজ ঘাসের মাঝে মাঝে গোলাকার বৃত্তে লাগানো ফুলে ফুলে যেন আলোকিত হয়ে উঠেছে বাগানটি। রাস্তার ওপারে হাজার বছরের বৃটিশ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টেমসের পারে দাঁড়িয়ে আছে The Tower of London। ট্রিনিটি গার্ডেনে অবস্থান করছে টাওয়ার হিল মেমোরিয়াল। দ্বিতীয় মেমোরিয়ালের গা ঘেষে পশ্চিমে অবস্থান করছে নরবলির মঞ্চ বা ‘টাওয়ার হিল স্কাফোল্ড’। মানুষ নামের জীবদের বলি দেয়া হত এখানে। জল্লাদদের শানিত কুঠার বারবার এখানে পড়েছে মানুষ নামের জীবের গর্দানে। সবাই যে রাজ-অপরাধী ছিল, তা নয়। কেউ কেউ তাদের মতবাদ ও ধর্মবিশ্বাস অটুট রেখে ‘ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান’ও গেয়ে গেছেন। জ্ঞানের আধার মনিষী স্যার টমাস মোর এর মধ্যে একজন। টাওয়ার হিল মোমোরিয়ালের প্রথমটি বহন করছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত নাবিকদের নাম। দুটো মেমোরিয়াল ৩৯ হাজার বীর নাবিকদের নাম বহন করছে। এর মধ্যে আছে বহু বীর বাঙালী নাবিকের নাম। তাঁরা প্রায় সকলেই সিলেট থেকে এসেছেন। তারা জাহাজে বা সাবমেরিনে কাজ করতেন। ধরণীমাতার কোলে শোবার সৌভাগ্য তাদের হয়নি। সাগরের অথৈ জলের তলে তারা শুয়ে আছেন। আর তাদের নাম বহন করছে এ মেমোরিয়ালের দেয়ালগুলো। দ্বিতীয় মেমোরিয়ালটি ট্রিনিটি গার্ডেনের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। একটু নিচু থেকে নির্মাণ করা হয়েছে। চার পাঁচটি সিঁড়ি ভেঙ্গে নীচে নামতে হয়। গোলাকার দেয়ালে ধাতুর উপর খোদাই করা আছে ২৪ হাজার নাবিকের নাম। নামগুলো পড়তে পড়তে কখন যে ধরণীতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে বুঝিনি। যে দু’একজন পরিদর্শক ছিল, তারা কখন চলে গেছে জানিনা। এ গোলাকার দেয়ালে ২৪ হাজার মৃতের নামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি তিনটি শিশু নিয়ে। আমি শিহরে উঠলাম। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে বাগানে উঠে এলাম। মনে হল ২৪ হাজার মৃতের সমাধি থেকে উঠে এলাম। পরদিন ছুটলাম ট্রিনিটি স্কোয়ারে অবস্থিত নেভী অফিসে। টাওয়ার হিল দ্বিতীয় মেমোরিয়ালের প্রবেশ পথে লেখা আছে কোন নাবিক সম্পর্কে তথ্য নিতে হলে অথবা নাম খুঁজে পেতে হলে নেভী অফিসে যোগাযোগ করতে। আমার সাহায্যে এগিয়ে এলেন একজন মধ্য বয়সী মহিলা। আমি খুঁজছি আজির উদ্দিন নাম। বড় বিনয়ী মহিলা। তিনি উদ্দিন নামের যত নাবিক ছিল, বই থেকে সে নামগুলো আমাকে ফটোকপি করে দিলেন। আজির উদ্দিন খুঁজে পেলাম না। তিনি আমার নৈরাশ্য দেখে বুঝিয়ে বললেন, হয়ত আজির উদ্দিন অন্য নামে জাহাজে বা সাবমেরিনে চাকরী নিয়েছিলেন। ঐ নাম না জানা পর্যন্ত আসল তথ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ কোন জাহাজে বা সাবমেরিনে কাজ করতেন, কবে, কোথায় ও কীভাবে সে জলযানের অবসান হল এসব তথ্য জানতে হলে ঐ নামের একান্ত প্রয়োজন। আমার নিরাশ দুটো আঁখির সামনে ভেসে উঠল ছবি দাদীর ছবি। ছোটবেলায় আমার বাড়ির ছবি দাদীকে পুত্র হারানোর ব্যথায় ব্যথিত দেখেছি। তাঁর সর্ব কনিষ্ঠ অবিবাহিত ছেলে ছিলেন আজির উদ্দিন। বড় ছেলে ইন্তাজ আলী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জাহাজের কাজ বাদ দিয়ে লন্ডনে চাকরী নিয়েছিলেন। আমার জন্মের কয়েক বছর পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোন এক জাহাজে বা সাবমেরিনে কর্মরত অবস্থায় আজির উদ্দিন নিখোঁজ অর্থাৎ নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ? নিহত? কোন জাহাজে বা সাবমেরিনে? কোথায়? কোন সাগরে? কী ভাবে? আমার কোন প্রশ্নের উত্তর পেলাম না। ছবি দাদীও সেই কবে (খুব সম্ভব ১৯৬৪) মারা গেছেন। সব তথ্য জানলেও তাঁকে জানানো যেত না। তবে হয়ত ইতিহাসে কিছু তথ্য রেখে যেতে পারতাম যা পরবর্তী গবেষকদের কাজে লাগত। আজির উদ্দিন চাচার মৃত্যু শোকে (বা নিখোঁজ সংবাদে) তাঁর মা ছবি বিবি এত শোকাহত ছিলেন যে তিনি ছেলে ফিরে আসার ক্ষীণ আশা নিয়ে পীর আউলিয়ার দরবারে যাওয়া শুরু করলেন। ছোটবেলায় তাঁকে আজমীরের মইনুদ্দীন চিশতি ও দিলøীর খাজা নিজাম উদ্দিনের দরবারে যেতে দেখেছি। হয়ত আশা ছিল পীর আউলিয়ার দোয়ায় একদিন যদি ছেলে ফিরে আসে! তিনি বাগদাদের আব্দুল কাদের জিলানীর মাজারেও যেতে চেয়েছিলেন। তবে তা হয়ে উঠেনি। ছেলেহারা কত মায়ের অশ্রু এভাবে সিলেটে গড়িয়েছে, আমাদের কেউতো সে ইতিহাস লেখে রাখেনি। তাই বলি আমাদের সঞ্চয়ের ভান্ডার বড় দৈন্য। চিত্তের শান্তির জন্য অথবা আশা নিয়ে বৃদ্ধা মা পীর আউলিয়ার এক দরবার থেকে আরেক দরবার ঘুরছেন। ছেলে তো আর ফিরে এলো না মায়ের কোলে। আজির উদ্দিন চাচা সম্পর্কে জানার জন্য পরে আমার আব্বা, মামা ও চাচাদের জিজ্ঞাসা করে জেনেছি যে, তিনি সুদর্শন সুপুরুষ ছিলেন। বিয়ানীবাজারের প্রসিদ্ধ ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন এবং কলকাতায় মোহামেডান না কোন দলের জন্যও খেলেছেন। কলকাতার কোন এক ইংরেজ সাহেব তাঁর ছেলের ফুটবলের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করেছিলেন। তারপর তিনি পৃথিবীর মোহে অথবা উন্নত জীবনের সন্ধানে কলকাতার খিদিরপুর থেকে জাহাজে আরোহন করেন। সাগর তাঁকে ডাক দিয়েছিল। কোন সাগরে তাঁর সমাধি কেউ জানে না। এই যে এসব মূল্যবান তথ্য কেউ যদি না লেখে রাখে, তাহলে কালের গর্ভে সব বিলীন হয়ে যাবে। তাই বলি সবাইকে লেখতে হবে তবে তো আমাদের সঞ্চয়ের ভান্ডার পূর্ণ হবে।
বলতে গেলে এ ছিল আমার গবেষণার প্রথম যাত্রা। যদিও বিফল হয়েছি- এর থেকে জন্ম নিয়েছে আমার ‘টাওয়ার ও হ্যামলেটস’ গ্রন্থ। সে গ্রন্থে উলেøখিত প্রায় সব স্থানই আমি সরজমিনে পরিদর্শন করেছি। ‘টাওয়ার ও হ্যামলেটস’ বইয়ের গবেষণার কাজে আমার পাঁচ বছর লেগেছে। তাছাড়া গবেষণায় অনুপ্রাণিত হলাম বৃটেনে ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালে। বৃটেনের শিক্ষা ব্যবস্থা ছোট থেকে বড় সকলকে অনুসন্ধিৎসু করে তুলে। আমাকেও করে তুলেছে। ইউনিভার্সিটিতে Research Methods বা গবেষণা পদ্ধতি বিষয়ের উপর পড়াশোনাও করতে হয়। তাই গবেষণার নিয়মাকানুনের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরেছি। ব্রিটেনের একটি আর্ট গ্যালারীতে কয়েক বছর পার্ট-টাইম কাজ করেছিলাম। ঐ সময় ইউরোপের সাংস্কৃতিক জগতকে জানার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। উন্নত জাতিরা তাদের উচ্চতার প্রমাণ হিসাবে অতীত ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। আর আমাদের গৌরবময় ও আলোকময় অতীত থাকা সত্তেও সঞ্চয়ের অভাবে সব অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। অতীতের জীবন যাত্রার মান নির্ণয় করার মাপকাঠি না থাকায় নতুন প্রজন্ম ভাবে যে আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন ও জীবনকাল নগন্য ছিল। তাই তারা অতীতকে মূল্যায়ন করতে শিখেনা। অতীতের সফলতার উপর আমাদের ভবিষ্যত রচিত হয় না বলেই আমাদের ঐতিহ্যের ভান্ডার অপূর্ন। সর্বোপরি ব্রিটেন হল গবেষণার উত্তম স্থান। গবেষণার উপকরণের অভাব নেই এখানে। ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও গবেষণার উপাদানের প্রাচুর্যতাও আমাকে গবেষণা ও সাহিত্য চর্চায় অনুপ্রাণিত করেছে।

বীথি: এতকিছু বিষয় থাকতে গবেষণামূলক লেখালেখিতে আগ্রহী হলেন কেন?
রেহানা রহমান: গবেষণামূলক লেখা সাধারণত জ্ঞানে পরিপূর্ণ থাকে। জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞান বিতরণ শিক্ষকদের কাজ। তাই মনে হয় গবেষণার দিকে আগ্রহী হয়ে পড়েছি। গবেষণা মানে সত্যের সন্ধান। সত্যকে জানার অভিপ্রায় আমার শিশুকাল থেকেই ছিল। জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য গবেষণা অপরিহার্য। একটি বিষয় সম্বন্ধে পুংখানুপুুঙ্খভাবে জানতে হলে গবেষণা বা অনুসন্ধান করতে হয়। নতুন তথ্যের আবিস্কার বা পুরোনো লুকিয়ে থাকা তথ্যের উন্মোচন করা যায় গবেষণা দ্বারা। তথ্যই পর্যায়ক্রমে জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। গবেষণালব্ধ জ্ঞান সাহিত্য ভান্ডারে অমূল্য সম্পদ ও পরবর্তী গবেষকদের গবেষণার উপাদান। পৃথিবীকে দিতে পারার আনন্দ আছে। তাই গবেষণায় আনন্দ পাই।

বীথি: গবেষণামূলক লেখালেখি করতে হলে প্রথমে কী জানতে হবে?
রেহানা রহমান: প্রথমেই আমি বলব, যে বিষয়েই গবেষণা করেন না কেন সে বিষয়ে আগ্রহ ও মনের আবেগ জড়িত থাকতে হবে। তাহলে সে গবেষণার কাজ ক্লান্তিকর হবে না। গবেষণার কাজ অনেক সময় সহজ হয় না। যেমন, গবেষণার কাজে অতি প্রয়োজনীয় একটি বই পেতে হলে হয়ত সময়ের প্রয়োজন। অথবা একটা প্রয়োজনীয় জিনিস স্বচক্ষে দেখতে হলে অনেক ব্যয় ও সময় সাপেক্ষ হতে পারে। মন থেকে সে কাজ করলে ক্লান্তির বদলে মনে অনুপ্রেরণা আসে। দ্বিতীয়তঃ সাহিত্যিকরা সাধারণত যে গবেষণা করে থাকেন সে গবেষণা কঠোর নিয়মাবলীর বৈজ্ঞানিক গবেষণা নয়। তবে সাহিত্যিকদেরও গবেষণার নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হয়। গবেষনায় ‘এই যেন সেই’ নয়, ‘এই ই সেই’ বলতে হবে। তাই প্রামাণিক সত্যের প্রয়োজন। যে বিষয়ে লেখা হবে সে বিষয়ে পূর্ববর্তী লেখকরা কী লেখেছেন জানতে হবে। অলীক বা কল্পিত তথ্য ও সত্য তথ্যের পার্থক্য বুঝতে হবে। তথ্য সূত্র নির্ভরযোগ্য হতে হবে। একক সূত্রের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন সূত্র পর্যালোচনা করতে হবে ও প্রামাণিক সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। লুকানো সত্যকে যেভাবে উদ্ধার করা হয়, সে মৌলিক চিত্রটি বজায় রাখতে হবে।
উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করছি। একজন তরুণ গায়কের গলায় টেলিভিশনে একদিন হাসন রাজার গান শুনে আশ্চর্য হয়েছি। ‘কই রইল রামপাশা আর কই লক্ষণছিরি’র বদলে গায়কটি গায়ছিল ‘কোথায় রইল রামপাশা আর কোথায় লক্ষনছিরি’। ভাবলাম তাকে কে অধিকার দিল শব্দটি পরিবর্তন করার। শব্দটাকে ’কই থেকে কোথায়’ পরিবর্তন করে তার বিশুদ্ধ রূপকে কলুষিত করা হয়েছে। গবেষণায় এ পরিবর্তন নিষিদ্ধ। গবেষণার কাজে সত্য তথ্যের আদিরূপ প্রকাশ করা একান্ত প্রয়োজন, বিকৃত করা গবেষকদের কাজ নয়। আবার অনেক লেখকের দৈন্যতা এখানে যে, তারা সূত্র উল্লেখ না করে তা নিজেদের বলে চালিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। সাহিত্যকর্মে এরকম চেষ্টা নৈতিকতা বিরোধী। এই সাধারণ নিয়মগুলি মানলেই গবেষণামূলক লেখালেখি করা যাবে।

বীথি: গবেষণামূলক গ্রন্থের প্রসারের জন্য আমাদের সাহিত্যিক সমাজকে কী করার প্রয়োজন বা কী করতে হবে? রেহানা রহমান: সাহিত্যিক সমাজের উর্ধ্বে আমাদের বৃহত্তর সমাজকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে প্রথমে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে, বিশেষ করে বৃটেনে গবেষণার খাতে ছোটবড় অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার জন্য আর্থিক অনুদান দিয়ে থাকে। তারা জানে খালি পেটে গবেষকরা সমাজকে উপযুক্ত গবেষণালব্ধ সম্পদ দিতে পারবে না। বাংলাদেশেও সামর্থশালী ব্যক্তিবর্গ ও ব্যবসায়ীদের এ পথ অনুসরণ করা প্রয়োজন যেন মেধাবী গবেষক ও সাহিত্যিকদের মেধা নষ্ট না হয়। দানের এ গুণটি আমাদের দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে অনুপ্রবেশ করানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে সরকারের সহযোগিতারও প্রয়োজন আছে। বৃটেনে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ মহৎ কাজের জন্য যে অর্থ দান করে থাকে, এর উপর সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয় না। সরকার সে ট্যাক্স মওকুফ করে দেয়। আমাদের সরকারেরও এদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এরকম মহৎ রীতিনীতি আমাদের সমাজে অনুপ্রবেশ করানো প্রয়োজন। তবেই সমাজে জ্ঞান ও শিক্ষা আরো প্রসারিত হবে। অনুকরণে আমাদের সমাজের কিছু অংশ বানরকেও হার মানায়। Valentine’s Day, New Year’s Day ইত্যাদি সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি যদি অনুকরণ করতে পারে, তবে উত্তম রীতিনীতিগুলো কেন অনুকরণ করতে পারবে না? তাছাড়া আমাদের প্রকাশকদেরও বিশাল দায়িত্ব আছে। প্রকাশকরা যেন গবেষক সাহিত্যিকদের উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে তাঁদের গ্রন্থ প্রকাশ করেন। গবেষক সাহিত্যিক যতই মেধাবী হোন না কেন, তাদের মেধার ফসল যদি প্রকাশ না হয়, তবে সমাজ বঞ্চিত হবে। সমাজের উন্নতি ও অগ্রগতির কথা বিবেচনা করে প্রকাশকদের মহৎ হতে হবে। তবেই আমাদের নতুন গবেষকদের পথ উন্মুক্ত হবে। আমাদের সঞ্চয়ের ভান্ডার পূর্ণ করতে হবে। তবে তো নতুন গবেষকরা গবেষণার উপাদান খুঁজে পাবেন। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলির সঞ্চয়ের ভান্ডার এত পরিপূর্ণ যে কেউ যদি সারাজীবন গবেষণা করতে চায় তার গবেষণার উপকরণের কোন অভাব হবেনা। সর্বোপরী, গবেষক সাহিত্যিকদেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তাঁরা যদি এগিয়ে না আসেন তবে ভবিষ্যতে গবেষকদের উপকরণ তৈরী হবে না। জ্ঞান বিতরণের জন্য ভাষাবিদ হওয়ার প্রয়োজন নেই, যেভাবে পারা যায় তথ্য দান করা প্রয়োজন। তথ্যই পর্যায়ক্রমে জ্ঞানে রূপান্তরিত হবে। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাতকুমার মূখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘যারা মনে করে নিভর্‚ল তথ্য ও তত্ত¡ যতদিন প্রস্তুত না হবে ততদিন কিছু লিখবেন না, তাঁরা কোনকালেই কিছু করতে পাবেন না। (ফিরে ফিরে চাই, পৃষ্টা ২৭৮)।’ তাই সবাই লিখুন, সাহিত্যের ভান্ডার পূর্ণ করুন।

বীথি: বর্তমানে কী নিয়ে লিখছেন? রেহানা রহমান: বর্তমানে একটি ডকুমেন্টারির কাজে ব্যস্ত আছি। তারপর হয়ত কোন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্পকলা নিয়ে লেখা শুরু করব। পৃথিবীর বিশাল জনপদকে আমার জানতে ও জানাতে ইচ্ছে করে।

বীথি: কীসের তাড়নায় লেখতে বাধ্য হন? রেহানা রহমান: পেশায় শিক্ষক। জ্ঞান আহরণ ও বিতরণ শিক্ষকের ধর্ম। এ দু’টোর তাড়নায়ই লেখতে বাধ্য হই।

বীথি: কোন বিষয় নিয়ে লেখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন? রেহানা রহমান: যা মনকে নাড়া দেয়, তা নিয়েই লেখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘স্পেইনের মুসলিম সভ্যতা’, ‘প্যালেস্টাইনবাসীর জীবনের করুন পরাজয়, টাওয়ারহিল মেমোরিয়ালের গায়ে খোদাই করা আমাদের পূর্ব পুরুষের নাম ইত্যাদি। মনের এই আবেগ থেকেই জন্ম নিয়েছে টাওয়ার ও হ্যামলেটস, ঘুরে এলাম আন্দালুশিয়া ও প্যালেস্টাইনীরা কেন গৃহহারা।

বীথি: পরিবারের আর কেউ কী লেখালেখির সাথে জড়িত আছেন? রেহানা রহমান: বর্তমানে কেউ জড়িত নয়, তবে আমার আব্বা ছিলেন। তিনি লিখতেন পাঠ্যপুস্তক।

বীথি: প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে চাকরী, সংসার, গবেষণা ও লেখালেখি কীভাবে সামলাচ্ছেন? রেহানা রহমান: ইদানিং চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেছি। তাই হাতে অনেক সময় এসেছে। যখন জীবন সংগ্রামে নিমজ্জিত ছিলাম তখনও লেখালেখির জন্য সময় করে নিতাম। সব দায়-দায়িত্ব শেষ করে রাতে বসতাম লেখালেখি নিয়ে। তাতে নিজের ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে। তবে নেশায় মত্ত থাকলে কষ্ট কাছে আসে না।

বীথি: আপনি কতদিন থেকে প্রবাসে আছেন? রেহানা রহমান: প্রবাস বলতে কী, ওখানেই আমাদের বাস। প্রায় চল্লিশ বছর থেকে আছি। ১৯৭৭ এর প্রথম দিকে গিয়েছিলাম।

বীথি: প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চা সর্ম্পকে কিছু বলুন? রেহানা রহমান: সাহিত্যচর্চা হলো মনের খোরাক। সাহিত্য প্রবাস ও স্বদেশের দূরত্ব কমিয়ে দেয়। সাহিত্যের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে জ্ঞানের আদান প্রদান হয়। সমমনা সৃজনশীলদের কাছে টেনে আনে। তাই সাহিত্যিকরা যেখানেই বাস করেন না কেন, সাহিত্য চর্চা চালু রাখা কর্তব্য।

বীথি: আপনার শৈশব ও কৈশোর কোথায় কেটেছে? শৈশবের কোন স্মৃতি আপনাকে এখনো নাড়া দেয়? রেহানা রহমান: আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে প্রকৃতির কোলে। কি যে আনন্দে মুক্ত হরিণের মত দিন কাটিয়েছি শৈশব কাল। দাদী ছিলেন। দুষ্টুমী যা করতাম পার পেয়ে যেতাম। তারপর প্রাইমারী স্কুল শেষ হয়ে গেল। চির সুখের নীড় ছেড়ে পাড়ি দিতে হল ঢাকায়। তারপর সিলেট। তবে শৈশবের সে আনন্দঘন দিনগুলি আজও ভুলিনি। বসন্তে ফড়িং ও প্রজাপতির পিছনে ঘুরে ঘুরে বাগানে বাগানে কাটানো, গাছে উঠে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার দেওয়ার মত আনন্দ বুঝি আর কিছুতেই নেই।

বীথি: আপনি কার আদর্শে অনুপ্রাণিত হন? রেহানা রহমান: বেগম রোকেয়ার আদর্শে।

বীথি: প্রিয় লেখক?
রেহানা রহমান: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

বীথি: কী ধরণের বই পড়তে ভালোবাসেন?
রেহানা রহমান: সব ধরণের বই আমি পড়ি। গল্প, জীবনী, আত্মজীবনী, ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ। বিভিন্ন দেশের সভ্যতা ও ঐতিহ্য, শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ ইত্যাদি ইত্যাদি।
বীথি: প্রিয় পোষাক?
রেহানা রহমান: শাড়ী।
বীথি: কী খেতে ভালবাসেন?
রেহানা রহমান: ছোট মাছের তরকারী ও ভাত।
বীথি: কী খেতে অপছন্দ করেন?
রেহানা রহমান: তিতা করলা।
বীথি: কাকে সবচেয়ে বেশী মিস করেন?
রেহানা রহমান: আব্বাকে।
বীথি: আপনার শখ কী?
রেহানা রহমান: নিজের দেশকে ঘুরে দেখার খুব শখ। একা পৃথিবী ঘুরে দেখা যায়। কিন্তু নিজের দেশকে ঘুরে দেখা যায়না, সেটাই বড় দু:খ।
বীথি: দেশে কিছু করার ইচ্ছা আছে কী?
রেহানা রহমান: হ্যাঁ আছে। সিলেটের ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার আশা আছে। আশা করি বর্তমান ও ভবিষ্যত গবেষকদের গবেষণার সামগ্রী তিলে তিলে সঞ্চয় হবে এ গবেষণাগারে। আপনাদের দোয়া কামনা করছি।

বীথি: অবসরে কী করেন?
রেহানা রহমান: টেলিভিশন দেখি, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলি বা দেখা করতে যাই, মিউজিয়াম গ্যালারী পরিদর্শন করি, বাগান করি, বাড়িঘর পরিষ্কার করি, বই পড়ি অথবা শপিং করতে যাই।

বীথি: আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন, এরমধ্যে কোন দেশটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
রেহানা রহমান: সব দেশেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে। সব দেশই সুন্দর। ইটালীর ভেনিস পানির উপর একটি শহর, এর এক ধরনের সৌন্দর্য। নরওয়ের পাহাড় ও ফিওর্ড। এরও আলাদা ধরণের সৌন্দর্য্য। শিল্পে, ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে ও ইতিহাসেপূর্ন তুরস্ক। তুরস্কই মনে হয় সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। ভাল লেগেছে। কারণ কোন দেশ একবার দেখা হয়ে গেলে আবার যেতে ইচ্ছা করেনা। কিন্তু তুরস্কে দুইবার গিয়েছি, আবারও হয়ত যাব।
বীথি: বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্নের কথা বলেন? রেহানা রহমান: বাংলাদেশ আমাদের রক্ত দিয়ে গড়া। আমাদের ত্যাগের দানে গড়া। জীবনের মূল্যবান সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি পরোক্ষভাবে। এদেশ নিয়ে বহু স্বপ্ন। বাংলাদেশ একটি সুন্দর দেশ হয়ে উঠুক। একটি আদর্শ দেশে পরিণত হোক। দেশবাসী আদর্শবান হোক। এখানে যেন কোন অপরাধ স্থান না পায়, এর নাগরিকরা, বিশেষ করে মেয়েরা যেন দিনরাত নির্ভিগ্নে এর রাজপথ দিয়ে চলাফেরা করতে পারে। এই আমার স্বপ্ন।

বীথি: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন স্মৃতি আছে কি?
রেহানা রহমান: মুক্তিযুদ্ধের হাজারো স্মৃতি হৃদয়কে বেদানাতুর করে তুলে। তার মধ্যে বিশিষ্ট ছিল পাকিস্তানী আর্মি কর্তৃক আমার আব্বাকে ধরে নিয়ে যাওয়া। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের লোক ও গাজী সাহেবের (দেওয়ান ফরিদ গাজী) ছেলেমেয়েদের শিক্ষক। ২৫শে মার্চের পরে আমরা তখন আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছি। চাকুরীর খাতিরে আব্বাকে সিলেট ফিরে আসতে হয় কিছুদিন পরে। একদিন খবর পেলাম আব্বাকে পাকিস্তানী আর্মিরা ধরে নিয়ে গেছে সালুটিকর ঘাটিতে। তারপর কোন খবর নাই, জীবিত না মৃত কিছুই জানিনা। তিনমাস পরে মুক্তি পেয়ে তিনি বাড়িতে তাঁর মুক্তি সংবাদ পাঠান। আব্বার মুখে পরে শুনতে পেরেছি তাঁর সঙ্গে ঐদিন শহর থেকে যাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সবাইকে গুলি করে হত্যা করেছে। শুধু তাঁকে জীবিত রেখেছিল তাঁর ভাষায় দক্ষতা দেখে। তিনি ভারতের দেওবন্দে লেখাপড়া করেছিলেন, এজন্যে উর্দূ, আরবী ও ফার্সীতে দক্ষ ছিলেন। সেই ভাষা দক্ষতাই তাঁকে সেদিন বাঁচিয়েছিল। পাকিস্তানী আর্মিরা আব্বাকে ইমাম বানিয়ে সালুটিকর ব্যারাকে রেখে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে দোভাষী হিসাবে ব্যবহার করত। একদিন সে ব্যারাকে শহরের মুসলিম লীগের একজন নেতা যান, যিনি ছিলেন আব্বার সুপরিচিত। তিনি আর্মিদের নাকি বলেছিলেন, কেন এই নিরাপরাধ মানুষটিকে তোমরা আটকে রেখেছো? তাঁকে ছেড়ে দাও। ঐ দিনই আব্বাকে তারা মুক্তি দেয় এই শর্তে, যেন শহর থেকে তিনি কোথাও না যান, আর প্রতিদিন যেন স্কুল খুলে শহরে স্বাভাবিক অবস্থা দেখানোর জন্য সহযোগিতা করেন। তিন মাস পরে যখন জানলাম আব্বা জীবিত আছেন তখন আমাদেরও প্রাণ ফিরে এল। কিন্তু একদিন আমাদের পাশের গ্রাম কসবা থেকে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেল। তার মধ্যে ছিলেন বড়বাড়ির আব্দুল মান্নান। তাঁর স্ত্রী তখন ছিলেন অন্তঃসত্তা। তিনি আমার প্রাইমারী স্কুলের এক সহপাঠীর বাবা কি চাচা ছিলেন। সেদিন বিকালেই আছরের পর বাড়ি থেকে গুলির আওয়াজ শুনলাম। পরে শুনলাম তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। খুব সম্ভব ঐ দিনই মাথিউরার প্রবাসী বাউল ক্বারী আমীর উদ্দিনকেও হত্যা করা হয়। তাঁকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানী আর্মিরা। এই নিরপরাধ নাগরিকদের হত্যায় পুরো এলাকাবাসী ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছিল। সে এক ভয়ানক সময় ছিল। গভীর রাতে সুতারকান্দি বর্ডার থেকে গুলাগুলির আওয়াজ আসত। তখন লেপের নীচে রেডিও রেখে স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর ও গান শুনতাম। পাশের বিছানায় আমার চাচী শুতেন। চাচা লন্ডনে। চাচী রেডিও শুনতে বারণ করতেন। বলতেন ‘দেয়ালেরও কান আছে। রাজাকাররা খবর পৌঁছে দিলে ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে‘। মরা থেকে ইজ্জতের ভয় ছিল অধিক। কি যে দুঃস্বপ্নে কেটেছে দিনগুলি তা শুধু আমরাই জানি। বিশেষ করে কলেজে পড়ুয়া মেয়েরা জানে। ঐ সময় কলেজে পড়ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের ঐ সময় নিয়ে বিশাল গ্রন্থ লেখা যাবে। যদি সময় পাই লিখব।

বীথি: সিলেট এক্সপ্রেস এর পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
রেহানা রহমান: ধন্যবাদ আপনাকেও।


Free Online Accounts Software