21 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 7 December 2016 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 1867) 

ধুমপান : প্রয়োজন আত্মোপলব্ধি

ধুমপান : প্রয়োজন আত্মোপলব্ধি
     

মোঃ আব্দুল হক : ধুমপান পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর একথা এখন সবাই জানে। সারা পৃথিবীতে মানুষের সুস্থতার জন্যে ধুমপান অর্থাৎ সিগারেটের ধোঁয়া মুখে টেনে নিয়ে ফুসফুসে প্রেরণ করার বিরোদ্ধে সচেতন মানুষ আন্দোলন করছে। বাংলাদেশে
ধুমপান নিয়ে আলোচনা চলেছিলো এবং হচ্ছে। এক পর্যায়ে এ বিষয়ের উপর কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করে আইন পাশ হয়েছে। স্বাধীন সার্বভৌম এই দেশটিতে দুষ্টের দমন ও আইন অমান্যকারীকে শাস্তি দেয়ার জন্যে রাষ্ট্র স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান আছে। এখন প্রশ্ন
হলো, এই আইন বাস্তবায়ন করবে কে ? হ্যাঁ নিশ্চয় এ জন্যে সরকার আছে, আদালত আছে,
আছে আইন অমান্যকারীর জন্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আমাদের পুলিশ বাহিনী। আর
পাশাপাশি মানুষের মাঝে সচেতনতা অতি জরুরী। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ধুমপান করবে
না। আর সমাজ সচেতন মানুষ আইনের প্রতি থাকে শ্রদ্ধাশীল। সেক্ষেত্রে বিশেষ
দায়িত্বে নিয়োজিত মানুষ হবেন সচ্চরিত্রের অধিকারী এবং সুন্দর রুচিবোধ সম্পন্ন।
সুস্বাস্থ্যই হচ্ছে মানুষের জীবনের অতি সাধনার বস্তু সুখ ' র মূল কথা। এই কথার
গুরুত্ব সর্বকাল ব্যাপী।

ধুমপান করার অর্থ হলো নিজে নিজেকে বিষ পান করানো। ধুমপান করলে দূরারোগ্য এমন
সব ভয়ঙ্কর অসুখ হয় যা শুনতেও ভয় লাগে। প্রিয় পাঠক, ধুমপান প্রসঙ্গ এলে আমরা
খুব সহজে সিগারেটকে বুঝে থাকি। এখানে বুঝতে হবে সিগারেটের উপাদান হলো তামাক।
এই তামাক থেকেই বিড়ি, জর্দা, গুল, সাদা পাতা, চুরুট ইত্যাদি নেশা দ্রব্য তৈরী
হয়। কাজেই ধুমপান নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গ এলে তামাক উৎপাদন, তামাকজাত দ্রব্য
প্রস্তুত এবং এসব পণ্য বাজারজাত করণ নিষিদ্ধ করার গুরুত্ব উঠে আসে। বাংলাদেশ
Framework Convention on Tobacco Control বা FCTC তে ১৬ জুন ২০০৩ সালে সাক্ষর
করে। WHO অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৬তম সম্মেলন মূলত মানুষকে ধূমপান ও
তামাক জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার জন্যেই হয়। তাই বিশ্বের সাথে
সমন্বয় রেখে বাংলাদেশের জন্যেও উক্ত কনভেনশনের বিধিসমূহ মানার বাধ্যবাদকতা এসে
পড়ে। আমরা দেখতে পাই জনস্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর বিধায় আমাদের
সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০০৫ খ্রীষ্টিয় সালে দেশে একটি আইন করে যাতে যে
কোনো পাবলিক প্লেসে ধুমপান এবং তামাক জাতীয় কোন দ্রব্য গ্রহণ বা সেবন করা না
হয় সে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। আইনে পাবলিক প্লেস হিসেবে অনেকগুলো
স্থানকেও চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো শিক্ষার্থী, কিছু আইনজীবী,
পুলিশ ভাইদের কিছু সদস্য সহ সমাজের অনেক জনকে চলতে পথে দেখে মনে হয় যেন সকলেই
এ ব্যাপারে অনেক উদাসীন। আমাদের সচেতনতার স্বার্থে এ বিষয়ে আলোকপাত করা দরকার
মনে করি। যেসব স্থান সমূহে ধুমপান করা যাবে না সেগুলো হলো : সকল ধরনের শিক্ষা
প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা যে কোনো সাস্থ্য সেবা কেন্দ্র, সরকারী বা আধা-সরকারি
কিংবা কোনো স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরী বা গ্রন্থাগার, বেসরকারি
অফিস, লিফট, আদালত, বাস টার্মিনাল, বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর, নৌবন্দর,
রেলওয়ে স্টেশন, প্রদশর্নী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিভিন্ন বিপণী প্রতিষ্ঠান,
মেলা, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক,
পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট স্থান, বহু জনগণের
ব্যবহারের স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণ আদেশ
বলে বা বিশেষ আদেশ দ্বারা ঘোষিত অন্য কোন বিশেষ স্থান প্রভৃতি। এ আইন
অমান্যকারীর জন্যে শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনে অনেক কথার উল্লেখ আছে যা এই
স্বল্প পরিসরে তুলে ধরা অনাবশ্যক। তবে প্রকাশিত পাবলিক প্লেস বা বলা যেতে পারে
জনসমাগম স্থল এর পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ
করা জরুরী মনে করি। আইনে আছে কোন ব্যক্তি অনধিক আঠারো বৎসর বয়সের কোন ব্যক্তির
নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করবেন না, অথবা উক্ত ব্যক্তিকে তামাক বা
তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিতরণ কাজে নিয়োজিত করবেন না বা করাইবেন না। আরও আছে
কোন ব্যক্তি আইনের এ বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে
দণ্ডিত হবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ একই ধরনের অপরাধ সংঘটন
করলে তিনি পর্যায়ক্রমিক ভাবে উক্ত দণ্ডের দ্বিগুণ হারে দণ্ডিত হবেন। এসব
সাধারণ মানুষেরা না জানলেও আমাদের পুলিশ ও আইনজীবীরা নিশ্চয় অবগত।

ধুমপান বিষয়ক উপরোক্ত আলোচনায় উঠে এসেছে ধুমপান ও তামাক থেকে তৈরী নেশা দ্রব্য
মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্যে মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। আর তাইতো সারা বিশ্বের
জ্ঞানী জনের পরামর্শে দেশে দেশে চলছে ধুমপান বিরোধী অভিযান। আমাদের মনে রাখতে
হবে এই বিশ্বে বাংলাদেশের তরুণদের উদ্যোগেই সর্ব প্রথম ধূমপান ও নেশা বিরোধী
ছাত্র সংগঠন ' সাস্ক ' গড়ে উঠে ১৯৮৬ খ্রীষ্টিয় সালের মহান ২১ শে ফেব্রয়ারি
থেকে। সাস্ক অর্থাৎ স্টুডেন্টস্ এ্যান্টি স্মোকিং কমিটি। আর প্রতিষ্ঠার
শুরুতেই একই বছরের ডিসেম্বরে সাস্ক জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার
স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে এই সাস্ক এর চেতনাকে ধারণ করে ১৯৮৭ সালে আমাদের
দেশে জাতীয় ধূমপান বিরোধি সংস্থা-আধুনিক প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সাথে স্মরণীয় যে
১৯৮৬ খ্রীষ্টিয় সাল থেকে জাতিসংঘ বিশ্ব জুড়ে প্রত্যেক বছর ৩১ মে বিশ্ব ধূমপান
মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের মঙ্গলের জন্যে মানুষ
ভাবছে, সরকার ভাবছে। তাই আইন তৈরীর পাশাপাশি চলছে জনগণকে সচেতন করে তোলার কাজ।
এখন আমি, আপনি, পুলিশ, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, রাজনীতিক, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়
পড়ুয়া আঠারো পেরোনো আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভরতার শক্তি তেজোদীপ্ত এক গুচ্ছ
শিক্ষার্থী সহ সকলের নিজের প্রতি ভালোবাসা আর আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে আমরা
পারবো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি আমাদের মহান জাতীয় সংসদে ধুমপান ও
নেশা জাতীয় দ্রব্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। দুষ্ট ও অসচেতন মানুষকে
নিয়ন্ত্রণে আইন হয়েছে। কেউ আইন অমান্য করলে তা বাস্তবায়নের জন্যে আছে আদালত,
আছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। মনে রাখতে হবে আপনার ও আমার সন্তান আছে, আইনজীবীর
সন্তান আছে, পুলিশের সন্তান আছে, ব্যবসায়ীর সন্তান আছে, সর্বোপরি আমাদের সকলের
আছে সন্তানদের জন্যে সুন্দর স্বপ্ন।

পাঠক এখানে আমি চেষ্টা করেছি মানুষ যাতে অজ্ঞতার কারণে অসচেতন ভাবে নিষিদ্ধ
স্থান সমূহে ধুমপান না করে, আর অধুমপায়ী নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের ক্ষতি না
করি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যাতে আমাদের লোভ ও ভুলের জন্যে সারা জীবনের
ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয় সে ব্যাপারে সজাগ রাখতে। এইটুকু সচেতনতা গড়ে উঠলে
একদিন আমরা ঠিকই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে একটি সুস্থ সুন্দর সবুজ দেশ
উপহার দিতে পারবো। যে মাটির মানুষ আমাদেরকে এক খন্ড স্বাধীন ভূমি এনে দিতে
জীবন উৎসর্গ করতে পারে সেই মাটির মানুষ আমরা কেন আমাদের সন্তানদের নিরাপদ
ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিজেদেরকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকার সংগ্রাম করে জয়ী হতে
পারবোনা। প্রয়োজন আত্মোপলব্ধি। আমাদের সকলের মননের বিকাশ ঘটুক।।

লেখক কলামিস্ট,কবি


Free Online Accounts Software