18 Jan 2018 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 16 October 2016 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 1435) 

আজিজ নগর এক জনপদ

     

মোঃ আব্দুল হক;
আজিজ নগর গ্রাম শুনেই বাংলাদেশের যে কেউ চিনবে না। তাই পরিচয় পর্বটা দুই লাইন দীর্ঘ করেই উপস্থাপন করছি। বাংলাদেশের মানচিত্রে উত্তর পূর্ব দিকের বিভাগ সিলেট। আর সিলেট বিভাগের হাওর সমৃদ্ধ একটি জেলা হচ্ছে সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারা বাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের এক জনপদ এর নাম আজিজ নগর। তবে সুনামগঞ্জ শহর থেকে আমবাড়ি বাজার গিয়ে নদীর অপর পাড়ে রঙ্গারচর হরিনাপাটি গ্রামের পথে এগিয়ে গেলে যাওয়া যায় উত্তর সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মাঠ গাঁ ক্যাম্প। এই চলার পথেই সহজে পাওয়া যায় আজিজ নগরের দেখা। এই বসতি কিভাবে গড়ে উঠেছে তা জানার মাধ্যমে একজন সমাজসেবক এর কথাও জানা হবে।

হরিনাপাটি গ্রামের হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদার তাঁর সময়ের এলাকার একজন সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগী সম্মানিত মানুষ। নামের সাথে তালুকদার টাইটেল থেকেই বুঝা যায় তিনি প্রচুর ভূ সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তবে তিনি সচেতন ও শিক্ষানুরাগী ছিলেন বলেই সম্পত্তি আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন নি। তিনি সন্তানদের পড়াশুনার পিছনেই তাঁর সম্পদ ব্যয় করেছেন। তিনি ছিলেন বিচক্ষণ এবং মানবিক গুণ সম্পন্ন এক সমাজ সচেতন ও রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। তিনি ১৯৬২ খ্রীষ্টিয় সালে ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। তৎকালীন সময়ে সুদূর কুমিল্লা থেকে প্রতি বছর ধান কাটার সময় অনেকেই কাজের সন্ধানে হরিনাপাটি ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে আসা যাওয়া করতো। এদের অনেকেই ধান কাটা শেষে তাদের প্রাপ্যটুকু নিয়ে আবার চলে যেত। এভাবে প্রতি বছর আসতো। কিন্তু তখন সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলনা। বর্তমানের কুমিল্লা তখন হরিনাপাটির জন্যে সুদূরের ছিলো। খুব কষ্ট করে ট্রেনে কুমিল্লা বা লাকসাম থেকে মজুররা সিলেট আসতো। পরে সিলেট থেকে বাসে চড়ে যেতে হতো পুরো একদিনে সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে অথবা লঞ্চ চড়ে সুরমা নদী দিয়ে যেতে হতো কর্মস্থল হরিনাপাটি। হাজী সাহেব নিজ তত্বাবধানে চাষাদের দিয়ে বিরুন, মালা, গছি, টেফি, কালিজিরা, মধুমাদব, উন্নিশ, পাইজাম ইত্যাদি নানা নামের ধান ফলাতেন। যাই হোক, কুমিল্লা থেকে যারা আসা যাওয়া করতো তাদের কেউ কেউ প্রতি বছর কষ্ট করার ঝামেলা এড়াতে এবং তালুকদার সাহেবের উদারতায় মুগ্ধ হয়ে থেকে যেতে চাইলে হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদার বাড়ীর অদূরে সুরমা নদীর তীরে হরিনাপাটি বাজারের উত্তর পাশে তাদের থাকার জায়গা করে দিলেন। এরা পরবর্তীতে শুধু ধান কাটা নয় বরং বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন ফসল ফলানোর কাজ করে জীবন কাটাতে অভ্যস্থ হয়ে উঠে এবং কালে কালে হরিনাপাটির বাসিন্দা হয়ে যায়। এক সময় তাদের উত্তরসূরীরা কুমিল্লা লাকসাম ভুলে গিয়ে ঐ গ্রামের জীবনাচারে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। হাজী সাহেবের বয়স হয়, ওদের সংসার বড় হতে থাকে। পাশাপাশি নদী তীরবর্তী ঐ বাসিন্দাদের কাছে সুরমা হয়ে উঠে এক আতঙ্কের নাম। নদীর ভাঙ্গনে একে একে তাদের দীর্ঘ দিনের আশ্রয় হারাতে হয়। তারা হাজী সাহেবের স্মরণাপন্ন হলে তিনি তাদেরকে পার্শ্ববর্তী লক্ষীপুর ইউনিয়নের নিজ ভূমিতে আবার বসত গড়ার ব্যবস্থা করে দেন। অনেক গুলো পরিবার আবার আশ্রয় পায় হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদারের মানবীয় এই গুণের কারণেই। তারা সেখানে নতুন বসতি গড়ে তোলে এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকে। আল্লাহর রহমতে আমার বাবা হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদার সাহেবের হলো পনেরো সন্তানের বড় পরিবার। এক সময় সম্পত্তি বন্টনের খেলায় হয়তো উনার মায়ার আশ্রয়ে বেড়ে উঠা মানুষগুলো আবার আশ্রয়হীন হতে পারে, তাই আমার বাবা তাদেরকে জায়গার মালিকানা দিয়ে দেন। ঐ বসতি এলাকার মানুষ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এলাকার নাম আজিজ নগর রাখায় সম্মত হয়। পরবর্তীতে হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদার ধান বিক্রির টাকায় এবং সন্তানদের থেকে যৎ সামান্য নিয়ে ঐ গ্রামে একটি পাকা মসজিদ তৈরী করে দেন, যাতে করে এলাকার মানুষ নামাজ ও অন্যান্য ধর্ম কর্ম সুন্দরভাবে করতে পারে। মসজিদটি আজিজ নগর জামে মসজিদ।

হরিনাপাটি গ্রামের উত্তরে মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে এগিয়ে গেলে পথিমধ্যেই দেখা মিলবে বসতি এলাকা আজিজ নগর। হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদার এর ছিলেন তিন ভাই ও দুই বোন। তাঁর পিতা হাজী আরব উল্লাহ্ এবং মাতা হাজী নছিবা খাতুন। তাঁর দাদা হাজী ইয়াদ উল্লাহ্ হজ্ব পালন করতে গিয়ে আরাফাতের ময়দানে মোনাজাত রত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাজী ইয়াদ উল্লাহর পিতা দবু মোড়ল ছিলেন এলাকার মান্যগণ্য একজন। মানুষ চিরদিন বাঁচেনা। আবার পৃথিবীর আলো, বাতাস, মৃত্তিকায়, প্রকৃতি ও পরিবেশে, মানুষের মাঝে ভালো কর্মের চিহ্ন এঁকে যায় যারা তাঁরা দেহত্যাগ করলেও বাঁচে আরো বহুদিন। হাজী মোঃ আব্দুল আজিজ তালুকদার ২০০৩ খ্রীষ্টিয় সালের ১০ মে সিলেটের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর প্রথম জানাজা নামাজ হয় সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর ষ্টেডিয়ামে এবং দ্বিতীয় জানাজা নামাজ সম্পন্ন হয় তাঁর নিজ গ্রামের বাড়ির সামনে। তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁর প্রিয় গ্রাম হরিনাপাটি ঘেঁসে বয়ে চলা সুরমা নদীর তীরে পারিবারিক কবরস্থানে। ছোট্ট এক টুকরো আজিজ নগর আছে তাঁর সামাজিক অবদানের উদাহরণ হয়ে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্ম গুণে মানুষের মাঝে। আমি মনে করি আজিজ নগর গ্রাম গড়ে উঠার ইতিহাস মানুষকে মানবিক হতে পথ দেখাবে।
# লেখক _ কলামিস্ট, কবি, প্রাবন্ধিক


Free Online Accounts Software