21 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 2 October 2016 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 1218) 

শাহাদাত আলিমের কবিতা : জীবনবৃত্তের প্রতীকী দৃশ্যায়ন

শাহাদাত আলিমের কবিতা : জীবনবৃত্তের প্রতীকী দৃশ্যায়ন
     

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সংযোজন-বিয়োজন, রোদ-মেঘ, বৃষ্টি-কান্না, জোছনা-অন্ধকার, প্রেম-বিরহ অতঃপর আত্মদর্শন ও আত্মোলব্ধির ইট-সুড়কি-পলেস্তারার পরিপাটি রূপ কবিতা। এবং ব্যক্তি থেকে ব্যষ্টিক, তারপর বৈশ্বিক পদচারণায় অস্তিত্বের জানান দেওয়া; চেতনায়-বিশ্বাসে মুক্ত হাওয়ার সুগন্ধী-শব্দকে ছড়িয়ে দেওয়াই কবির কাজ। কবি অন্তর্বেদনায় দগ্ধসত্তা, সংবেদনশীলতায় সমাজগামী। কবির হাতে প্রমূর্ত জীবনের অবোধ্য পাঠ, দৃশ্যাতীত এবং সুদূরের সুরমূর্ছনা কিংবা ডানাঝাপটানো বন্দির আওয়াজ ইন্দ্রিয়ানুভূত। কাব্যকলার সৌন্দর্যবিলাসই শুধু নয় ভাবান্দোলন, শুদ্ধতায় প্রলুব্ধ করে প্রতিটি যুগের কবিতা। বাংলা কবিতার অপরিমেয় শক্তিসঞ্চয়, অবিরাম বাঁক পরিগ্রহণ, প্রক্ষেপণ, পরীক্ষণ ঘটেছে। হালে Postmodernism তার ডালপালা করেছে বিস্তৃত পাতা, ফুলের আয়েশে।
০২.
নয়ের দশক থেকে লিখছেন শাহাদাত আলিম। কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে জানালায় মেঘ দরজায় ভালোবাসা (২০০৭)। সিলেট মোবাইল পাঠাগারের সাপ্তাহিক সাহিত্যপত্র ছায়ালাপ এ প্রধানত তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। মূলত Classic--ঘরানার এ কবি আত্মপ্রকাশে নিভৃতের অনুসারী। স্বভাবত শান্ত বৈশিষ্ট্য তার কবিতায় প্রভাব ফেলেছে বহুদূর। হিসেবি শব্দ চয়ন, ভাবনা-বাক্যের বিন্যাসশৈলী, শুদ্ধস্বরের অনুগামীতা, ঝরনাদেহের শীতল স্বভাব তাকে দিয়েছে বিশিষ্টতা। বৈসাদৃশ্যে আলোড়িত হন তুমুলভাবে অবক্ষয়ে মর্মজর্জর তার অধিকাংশ পঙ্ক্তি। পঙ্ক্তিকথার চিরায়তনকে অতিক্রমণের দুর্মর সাহস আছে তার। অথচ সরলীকরণকে প্রবিষ্ট করেছেন সচেতনভাবে; তার হৃষ্টপুষ্টে কবিতায়যেনো সমকাল কথা বলে কবিতার মাইক্রোস্কোপে
‘পায়ের কারুকাজ দেখো
না-দেখে হাতের মাতলামি
তোমার এ-চোখজোড়া বদলাও
না-হলে পায়েই ট্রান্সপ্লান্ট করো করতালি।’
সামাজিকভাবে শিষ্টজনের অশিষ্টতায় কবি ব্যঙ্গাত্মক তীর ছুঁড়েছেন। তবুও তো এজরা পাউণ্ডের ভাষায়‘কবিরা পৃথিবীর তাম্রলিপ্ত চেহারাকে হিরন্ময় করে তুলে না।’ তাই সেই হিরন্ময় মায়াছায়া ওদের স্থান দিতে কবির ব্যাকুলতাÑ
‘যে গেছে সে কতদূরে
হাত সমান নাকি পা সমান
অজস্র নাকি অনতি
হাতের ঔরসজাত, পায়ের অজাতশত্র“
নিকট বন্দরে তারে ভিড়াও।’
(হাতের মাতলামি, পায়ের অজাতশত্র“; ছায়ালাপ-১৯৪)
শাহাদাত আলিমের কবিতা প্রধানত প্রতীকী (symbolic)। তার কবিতায় প্রতীক এসেছে নবতর ব্যঞ্জনায়। রূপকল্পকে তিনি সাজাতে জানেন নিজস্ব ঢং অনেকটা উত্তরাধুনিক ধারার বয়ান ও বয়নশৈলীতে। গভীর জীবনবোধের দরিয়ায় কবির মন্থন সহজ প্রতীকে উঠে এসেছে মানবজীবনের অমোঘ অসহায়ত্ব অথচ পরম শক্তিমানের বৈচিত্রময় ক্ষমতার প্রতিভাস
‘খাতার পাতার ফুল
খাতার পাতার নাও
ভাসাও, ভাসি

খাতার পাতার প্লেন
খাতার পাতার ঘুড়ি
ওড়াও, উড়ি

ফুলের নায়ের পালে
প্লেনের ঘুড়ির টানে
বিনে-সুতে ওড়ে যে জীবন
কেউ-বা সিঁড়ির পরে
কেউটে সাপের গ্রাসে
সাপলুডু খেলে সারাক্ষণ (সাপলুডু; ছায়ালাপ-১৬৮)
এখানে ‘কেউটে সাপের গ্রাসে’জীবনের পতন অতঃপর উত্থানের চক্রচিত্র করুণরসে ভরে উঠেছে।
স্বদেশভূমি সবচেয়ে প্রিয়। এই মৃত্তিকায় আমরা বুনি স্বপ্নের নীড়, সাজাই বিশ্বাসের বনলতা। কিন্তু সেই মাটি যদি পায়ের তলে না থাকে, তখন বিশ্বাস-ভালোবাসার অস্তিত্বটুকু বিলীন হয়ে যায়। তখন ‘পা কেবল জুতোর বেসাতি জানে’
অনেক দ্রোহের দেশে
দু’খানা পায়ের জন্য বলি, আছি
পাখি যে পাখায় পুরে রেখেছে বিশ্বাস

উড়তে জানি না; কোনও পানি নই
আন্ধার ভান ধরে তবু উড়ি, বুনি পাতার স্বদেশ
পা শুধু জানিয়ে যায় পৃথিবী মানুষ

পা তলে মৃত্তিকা নেই
পায়ের চপ্পল গেছে ছিঁড়ে
পা কেবল জুতোর বেসাতি জানে।’
(পা কেবল জুতোর বেসাতি জানে, ছায়ালাপÑ১৬৬)
০৩.
এষড়নধষ ঠরষষধমব দর্শন; দর্শন থেকে প্রযুক্তির যান্ত্রিক ‘ডানা ঝাপটানো’এই অস্থির পৃথিবীকে দিয়েছে অনেক। বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে হৃদয়ের উষ্ণ নিঃশ্বাস; ভালোবাসার শালিকগুলো বহুদূর-বিচ্ছিন্ন। স্বকীয়তার নানান রঙ, সৌন্দর্যের কারু-মানুষগুলো হারিয়েছে প্রেম। এখন তারা কেমন ফ্যাকাশে। তাই কোকিলার প্রেমিক-কণ্ঠে কবি শুনতে পান ‘এটমিক গান’। বিশ্বায়নের দাপটে ‘জুরাসিক, ট্রায়াসিক’ এর লম্ফনচিত্রÑ
‘পাতা প্রসারিণী বসন্তে এলেন ডালে
গানের পাখির একী ভাটিয়ালি তাল
শুনে সুর পিয়াসীর ‘আহা-আহা’ রব
জুরাসিক, ট্রায়াসিক...
বহুকাল লম্ফ দিলো এভাবে বনসাই এল
‘ডাল কাটো পাতা ছেঁড়ো’ খাদ্যের সংহার
বামন হলেন বৃক্ষজান
ডানা ঝাপটানো কণ্ঠে এটমিক গানে কোকিলা
আরও তলে মাইক্রোস্কাপিক মরালিটি
নিরাকার নিশ্চুপ
দূর থেকে গালিশব্দ গ্লোবাল ভিলেজ,
(বৃক্ষজান কোকিলা ও মানুষ; ছায়ালাপÑ৯৯)
কবি এখানে দেখেন গ্লোবাল-প্রতিক্রিয়াজাত নৈতিক অবক্ষয়; যা আজ সমাজ-বাস্তবতার করুণ চিত্র দিকে দিকে।
শাহাদাত আলিমের কবিতা শুধু প্রতীকী চিত্র নয়; একেকটি শব্দকেও তিনি খণ্ড প্রতীক-কবিতার আদলরূপ দিয়েছেন। এখানেই তার সফলতা, মুন্সিয়ানাও বলা চলে। যদিও প্রতীকবাদীরা অনেকাংশেই দুর্বোধ্যতার অভিযোগ-তাড়িত।
শাহাদাত আলিম নিরীক্ষা চালিয়েছেন কবিতার অধুনা অবয়ব নিয়ে। প্রাচীন ফর্মের কবিতা যা ছয়ের দশকে বিশ্বসাহিত্যে ‘কনক্রিট পোয়েট্রি’ নামে পরিচিতি লাভ করেÑএমনি কবিতার সুডৌল নির্মাণে এ কবি পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। অবশ্য এর আগে কবি সৈয়দ শামসুল হক এবং অনেকেই এ বিষয়ে সফল কাব্যব্রতচারী। শাহাদাত আলিমের এমতো একটি কবিতা ‘জানালায় মেঘ দরজায় ভালোবাসা’। এখানে অনেক উপর থেকে বৃষ্টির ফোঁটা নদীতে পড়ার মতো একটি নন্দন-দৃশ্য কল্পনায় ভেসে উঠে। কল্পচিত্রের সাথে দোল খায় কবিতার অঙ্গবিন্যাস; ভালোবাসার ‘শব্দহীন’ ঝরে পড়া অতঃপর ‘নয়া সূর্যে সিদ্ধি’ হয়ে ‘দরজায় ভালোবাসা’র মেঘহীন উপস্থিতিঅনেকটা দ্বা›িদ্বক সৃষ্টিরহস্য
‘জানালায় মেঘ দেখে দরজায় ভালোবাসা নেই
চশমার নিচে থাকা আকাশের
দু’টো ধারা থেকে আসা
মেঘগুলো বৃষ্টি হয়ে
ঝরে পড়ে
শব্দহীন
শব্দহীন
উড়ে যায়
জলগুলো মেঘলোকে
নয়া সূর্যে সিদ্ধ হয়ে
চশমার নিচে থাকা সাগরের
জানালায় মেঘ নেই দরজায় ভালোবাসা দেখে’
(‘জানালায় মেঘ দরজায় ভালোবাসা; ছায়ালাপ৬০)
এখানে শুধু প্রতীকী ব্যঞ্জনা নয়এক-একটি শব্দই যেনো আলাদা আলাদা চিত্রকল্প। ফরাসী প্রতীকবাদী কবিরা এমন চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছেন। আট-এর দশকের কল্যাণবোধের কবি শারিক শামসুল কিবরিয়ার কবিতায় এ রকম বৃষ্টি ভেঙে-ভেঙে ‘ঝরে/ ঝরে’ পড়ার দৃশ্য দেখা যায়।
শাহাদাত আলিম চিরচেনা প্রতীকের অধুনা ব্যবহারে স্বভাব-পটু। ফলে পাঠকের বোধে রেখাপাত করে ‘মেঘ’, ‘জল’, ‘জলের কান্না’, ‘কান্নার সমুদ্র’। ‘আমাদের বোন যারা’তারা তার কবিতায় সমুদ্রের মতো অতল দুঃখা জাগানিয়া; তারপর সৃষ্টির দ্যোতকÑ
‘আকাশে ভাসানো মেঘ
সে মেঘের জল এনে
আমাদের বোন যারা
জলের কান্না কিনে
কান্নার সমুদ্র দিয়ে
সমুদ্রের মিনিয়েচার বানা।’
(দ্বৈরথ; ছায়ালাপ২০১)
০৪.
কবি শাহাদাত আলিমের জন্ম ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের গহরপুর গ্রামে। শাহাদাত আলিম নামে লেখালেখি করলেও তার পিতৃপ্রদত্ত নাম মোহাম্মদ শাহাদৎ হোসেন। তিনি ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে øাতক সম্মান এবং ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে øাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পর তিনি ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিশ্বনাথ ডিগ্রি কলেজে শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছেন। তার পিতা মোহাম্মদ আলিম এবং মাতা সামছুন্নাহার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক।
০৫.
শাহাদাত আলিম আত্মপ্রচারে বিশ্বাসী নন। তাই আড়ালে থাকতেই ভালোবাসেন বেশি, লেখনি চালিয়ে গেলেও খুব একটা ছড়াছড়ি নেই। পরিমাণগত দিক থেকে অল্প লিখলে স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় প্রত্যয়ী। নতুনত্ব আবিষ্কারে আগ্রহী এ তরুণ কবিতায় বহুদূর-পথ মাড়াবেন এমন আত্মোপলব্ধি আছে। তার ‘দরজায় ভালোবাসা’ দেখতে চাই তাই ‘জানালায় মেঘ’ কেটে যাক।


Free Online Accounts Software