21 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 6 March 2016 ব্যক্তিত্ব  (পঠিত : 2705) 

ড. রেণু লুুৎফা : এক বিদগ্ধ লেখকের যশোগান

ড. রেণু লুুৎফা : এক বিদগ্ধ লেখকের যশোগান
     

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
রেণু লুুৎফা এক বিদগ্ধ মহীয়সী লেখকের নাম। তিনি সাংবাদিক হিসেবেও সমান খ্যাত। মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে অসংখ্য জাতি-উপজাতির মিলনকেন্দ্র ব্রিটেনের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর অবস্থান সমহিমায় সমুজ্জ্বল। শিক্ষকতা পেশা হলেও সমাজসেবা ও লেখালেখি তাঁর ধ্যানজ্ঞান। সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ রয়েছে এবং কিছুদিন বাংলাদেশের প্রাচীন সাপ্তাহিক যুগভেরীতে পেশাজীবী সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিক পূর্বদেশ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ পেয়েছে। লন্ডনের সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লিখেছেন বিস্তর। গল্প-কবিতা-প্রবন্ধসহ সাহিত্যের প্রায় প্রত্যেক শাখায় তাঁর নিরলস বিচরণ। লন্ডন শহরের কেনজিংটন থেকে টাওয়ার হ্যামলেট পর্যন্ত শিক্ষা, সমাজউন্নয়ন ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। কমিউনিটির সর্বত্র তাঁর অনন্য সাধারণ উপস্থিতি। রেণু লুৎফার জীবনধারণায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আশ্চর্য মিশেল ঘটেছে। কর্মদক্ষতার উজ্জ¦ল দৃষ্টান্ত হয়ে তিনি আমাদের মাঝে সতত প্রবহমান।
বরেণ্য লেখক ড. রেণু লুৎফার জন্ম ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্র“য়ারি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রানাপিং-এ। তাঁর পিতা শরাফত আলী ও মাতা মুহিবুন্নেসা খানম। রেণু লুৎফা ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ থেকে লন্ডনবাসী। বিলেতে সাহিত্য-সাংবাদিকতার সমান্তরালে তিনি অসংখ্য সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার মধ্যে JP for London Magistrates Court, Vice Chair- Muslim Culture & Heritage Centre London, Secretary- Bayswater & Little Venice Bengali Association London, President- The Ethnic Minorities Original History and Research Centre UK এবং বাংলাদেশ সেন্টার ও গোলাপগঞ্জ অ্যাডুকেশন ট্রাস্টসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ চ্যাপ্টার টিআইবি-এর আজীবন সদস্য। সিলেট থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রাচীনতম বাংলা সাপ্তাহিক যুগভেরী (বর্তমান দৈনিক) পত্রিকা থেকে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী সাপ্তাহিক পূর্বদেশ-এর সম্পাদনা ছেড়ে দিলে রেণু লুৎফা তার দায়িত্ব নেন।
সিলেটের প্রথম মহিলা পেশাজীবী সাংবাদিক তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন একজন গল্পকার হিসেবে। তিনি একটি সুশীল ও গতিশীল সমাজের স্বপ্ন দেখেন। তাঁর রচনা পাঠান্তে এ কথা বোঝা যায় তিনি শুধু লেখার জন্য লিখেন না, লেখাগুলো আসে এক নিঃস্বার্থ দায়িত্ববোধের কারণে। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্রিটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বিচ্যুতিগুলো দূরীভূত করার প্রত্যয়ে নতুন আশার আলো জ্বালাতে চেষ্টা করেন। নিন্দুকের কটাক্ষকে তিনি পরোয়া করেন না এবং তোষামোদকারীদের তিনি প্রচণ্ড ঘৃণা করেন। একজন সমাজচিন্তক ড. রেণু লুৎফা সমাজকে উন্নয়নের জন্য গবেষণায় ব্যাপৃত। নিয়েছেন আইনের ডিগ্রিও। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের রয়েছে : ইতরের মতো সত্য (গল্প ১৯৭৭), হে ঈশ্বর তোমার যবনিকা (কবিতা-১৯৯১), যেতে দিতে পারি না (কবিতা-২০১২), জীবন বলাকা (প্রবন্ধ-১৯৯৬), কালের কণ্ঠ ১ম খণ্ড (প্রবন্ধÑ২০০২), কালের কণ্ঠ ২য় খণ্ড (প্রবন্ধ-২০০৫), স্পর্ধিত আত্মবোধ (প্রবন্ধ২০০৭), বৈদগ্ধ অনুলাপ (প্রবন্ধ-), এছাড়া তার একটি ইংরেজি ব্লগ রয়েছে renuluthfa.blogspost.com|।
১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ড. রেণু লুৎফা একটি অলাভজনক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করে অ্যাথনিক মাইনোরিটিজ অরিজিন্যাল হিস্ট্রি অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (ইমোহার্ক)। যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধান এবং ইংল্যান্ড ও বাংলাদেশ থেকে ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক গবেষণামূলক গ্রন্থের পাশাপাশি মননশীল ও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের প্রকাশনার ব্রত নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু। এর প্রথম ফসল হিসেবে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় ফারুক আহমদের গবেষণামূলক গ্রন্থ বিলাতে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা (১৯১৬Ñ২০১১)। তারপর থেকে এ পর্যন্ত ইমোহার্ক থেকে মোট ১৬টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি; তাসাদ্দুক আহমদের জীবন খাতার কুড়ানো পাতা; প্রফেসর আসাদ্দর আলীর রচনাসমগ্র প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড, তৃতীয় খণ্ড ও চতুর্থ খণ্ড; রাগিব হোসেন চৌধুরীর সিলেটের শত বছরের ঐতিহ্য : সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ; কিশোয়ার ইবনে দিলওয়ারের কিশোয়ার রচনাসমগ্র; ড. রেণু লুৎফার কালের কণ্ঠ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, স্পর্ধিত আত্মবোধ (প্রবন্ধ সংকলন) এবং যেতে দিতে পারি না (কবিতা); আব্দুল মুনিমের সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের গোড়ার কথা, ফারুক আহমদের বিলাতে বাংলা সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা (১৯১৬-২০১১) গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ বেঙ্গলি জার্নালস্ অ্যান্ড জার্নালিজম ইন ব্রিটেন (Bengali Journals and Journalism in Britain) এবং ইউসুফ চৌধুরীর অ্যান অ্যালবাম অব ১৯৭১ : বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট (An Album of 1971: Bangladesh Liberation Movement).
ছোটোবেলা থেকেই রেণু লুৎফার ভেতরে লেখালেখির বীজ জন্ম নেয়। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বহুল প্রচারিত পত্রিকা চট্টগ্রামের আজাদীতে। তাঁর প্রথম লেখা ছিল গল্প। অর্থাৎ গল্প দিয়ে তিনি লেখক জীবন শুরু করেছেন। গল্প দিয়ে শুরু করা থেকে তিনি কতটা মৌলিক, কতটা সৃজনশীল তা প্রতীয়মান হয়। এভাবে লিখে লিখে তিনি পাঠকের মন জয় করে নিলেন। তিনি মনে করেন পাঠক সমাজই তাঁর মূল ভরসা। পাঠক তাঁকে গ্রহণ করেছে বলে তিনি তাদের জন্য লিখেন, সমাজের জন্য লিখেন, মানুষের জন্য লিখেন। তাঁর প্রতিটি গ্রন্থের নামকরণ একেকটি চমক। পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এটা তাঁর আলাদা বৈশিষ্ট্য। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক লেখক শৈশব নিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। তখন তারা নিজের মধুর শৈশব নিয়ে লিখতে শুরু করেন। ড. রেণু লুৎফাও হয়তো এর ব্যতিক্রম নন। আমরা আশাকরি তাঁর কাছ থেকে শৈশবের অমৃত স্মৃতিকথা জানতে পারব। তাঁর শৈশব বা দুরন্তপনার দিনগুলো কেটেছে সিলেটের গোলাপগঞ্জের রানাপিং-এ। তিনি বেড়ে উঠেছেন গ্রামের সবুজের মধ্যে, জল আর কাদা মাটি ছুঁয়ে সতেজ হয়েছে তাঁর ভিত্তিসত্ত¡া। বিল-হাওর আর সবুজ প্রান্তর দেখে দেখে তাঁর মন ও মগজ সমৃদ্ধ হয়েছে বিশালতার দিকে। যদিও তাঁর কৈশোরের বাকি জীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। তিনি বেশ চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন, এখনও সেই চাঞ্চল্য বোধ করেন। এখনও সবুজের কাছে চলে যেতে চান। প্রকৃতির টান অস্বীকার করতে পারেন না। গ্রামের রাস্তার পাশে ফোটে থাকা অখ্যাত ফুলের জন্য হাহাকার জাগে। বিদেশে থেকেও পড়ে থাকেন অজপাড়াগাঁয়। শৈশবের স্মৃতি মন্থন করতে করতে আত্মতুষ্টি লাভ করেন। তিনি কোনো বৃত্তের ভেতরে থেকে লেখালেখি করেননি। বিষয় নিয়ে কোনো ধরাবাঁধা নেই। যা বিবেককে আঘাত করে, হৃদয়কে নাড়া দেয় তা-ই লিখে ফেলেন অনায়াসে। তবে লিখতে হবে এমন কোনো তাড়া তাঁর ভেতরে কাজ করে না। তিনি একসময় কবিতাও লিখতেন। কবিতায় নিজের কথাগুলো বলতেন। ইচ্ছা বা প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ পেতো। কবিতা ছিল তাঁর ভাবনা ও ভাষা যাচাইয়ের উত্তম ক্ষেত্র।
পাঠক হিসেবে তাঁর পড়াশোনার ব্যাপ্তি বিশাল। বিশেষ কোনো লেখক তাঁকে টেনে ধরেননি। দেশ-বিদেশের বহু লেখকের ভালো বই পড়েন। কেবল সস্তা উপন্যাসে তাঁর আগ্রহ নেই। যে উপন্যাসগুলো বাণিজ্যিক বা ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে তৈরি করা হয়েছে সেগুলো পাঠে মোটেও আগ্রহবোধ করেন না। জীবনের বড়ো প্রাপ্তিগুলোর মধ্যে তাঁর মেয়ের জন্মই সবচেয়ে সুখের, সবচেয়ে মধুর। মেয়েদের জন্ম তাঁর জীবনে পূর্র্ণতা এনে দিয়েছে। তাঁর দুই মেয়েই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এদের নিয়েই স্বপ্ন দেখেন এবং তিনি যা করতে পারবেন না ওই অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেওয়ার সম্ভাবনা মেয়েদের মধ্যে দেখেন। ড. রেণু লুৎফা অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। খেতে ভালোবাসেন সামান্য ডালভাত। পোশাক পরেন স্বাভাবিক। যেখানে যে পোশাক মানায় তা-ই পরেন তিনি। তবে প্রিয় পোশাক হিসেবে শাড়িতেই স্বচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। অপছন্দ করেন দুই শ্রেণির মানুষকে। যারা মিথ্যাবাদী, যারা স্বার্থপর এদের এড়িয়ে চলেন। কারণ মিথ্যা খুবই প্রজননশীল, একটি মিথ্যা অজস্র মিথ্যার জন্ম দেয়। আর যারা স্বার্থের পেছনে দৌড়ায় তারা সবসময় মানুষকে বিপদে ফেলে। এদের উপর নির্ভর করে কোনো কাজে সফল হওয়া সম্ভব নয়। বর্তমানে তাঁর একটাই শখ, নতুন লাইব্রেরি করা। জ্ঞানের সঠিক পাঠের মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্তি দেওয়া। লাইব্রেরিতে যে ঢুকে যায় সে সন্ত্রাসী হয়ে বের হয় না; মানুষ হয়ে বের হয়। তাছাড়া একটা গ্রন্থাগার অনেক লেখকের জন্ম দিতে পারে। সমাজ এবং জাতিকে আলোড়িত করার মতো ব্যক্তির জন্ম দিতে পারে।
ড. রেণু লুৎফা ভালোবাসেন সবুজ। ভালোবাসেন নিসর্গ। তাঁর আবাস লন্ডনের বিখ্যাত হাইড পার্কের পাশেই। ওখানে হাঁটতে বের হন। প্রকৃতির কাছে যান। প্রকৃতির সঙ্গে ভীষণ ভাব তাঁর। আড্ডাও ভালোবাসেন খুব। সময় সুযোগে আড্ডা দেন। ফ‚র্তিতে থাকতে ভালোবাসেন। তবু সব আড্ডায়, সব আনন্দে বাংলাদেশকে মিস করেন। ভুলতে পারেন না বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমকে। নেগেটিভ কোনো বিষয় নিয়ে মন খারাপ করার মানুষ তিনি নন। নেগেটিভ বিষয়ই আমাদের পজিটিভ হতে প্রেরণা দেয়।
কবিতা কী? কবিতায় প্রেম কতটা জরুরি এ ব্যাপারে তাঁর ধারণালব্ধ বক্তব্য হলো : কবিতা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে মনের ভাবনাগুলোর শক্তিশালী অনুভূূতি প্রকাশ। কবিতা কাঁদায়, কবিতা হাসায়, মন খারাপ করে। ধরাবাঁধার সীমানা ছাড়িয়ে আকাশে উড়তে দেয়, আবার চুপ করে বসিয়েও রাখে। কবিতায় মানুষের দুঃখ-বেদনা আবেগ ক্ষোভ দর্শন বিরহ সবকিছুই প্রকাশ পায়। কবিতায় প্রিয়জন, শত্র“পক্ষ সবার উপস্থিতি থাকে। ড. রেণু লুৎফা যেতে দিতে পারি না কাব্যের সব কয়টি কবিতাই প্রিয়জনকে নিয়ে লিখেছেন। তিনি প্রিয়জন বা গুরু কারও একক আদর্শে অনুপ্রাণিত নন। কাউকে অনুসরণ করেন না। আল্লাহ তাঁকে যে জ্ঞান-বিবেক দান করেছেন, সেই বিবেক দিয়ে নিজেকে পরিচালনা করেন। যা সঠিক তা-ই গ্রহণ করেন। তা সত্য তা-ই গ্রহণ করেন। পাঠের পরিধির মত তার ভ্রমণের পরিধিও বিস্তৃত। প্রায় পঞ্চাশের বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। কেবল সাউথ আমেরিকার কোন দেশ দেখা হয়নি। তবে ভ্রমণ সাহিত্য নিয়ে তাঁর লেখা খুব চোখে পড়েনি। এত বিশাল ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়েও ভ্রমণ সাহিত্য লেখা আমাদের পীড়া দেয়। প্রবাসীদের কাছে আমরা ভ্রমণ সাহিত্য বেশি বেশি আশা করি। প্রবাস সম্পর্কে তাঁর ধারণা অত্যন্ত স্পষ্টÑতিনি নিজেকে প্রবাসী ভাবেন না, পরবাসী মনে করেন। এটাই নিয়তি। প্রবাসের সাহিত্যচর্চা আশাব্যঞ্জক, অনেক সময় মনে হয় দেশের চেয়ে ভালো চলে। প্রচুর প্রবাসী লেখকদের লেখা ছাপা হচ্ছে, তবে দেশিয় প্রকাশনাগুলো থেকে তারা সঠিক সহায়তা পাচ্ছেন না। দেশিয় প্রকাশনাগুলোর এ ব্যাপারে মনোযোগী হওয়া উচিত। তা না-হলে বিরাট ব্যবসা তাদের হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ড. রেণু লুৎফা ছোটোবেলায় প্রাইমারি স্কুলের সামনের সুইট দোকানের মালিক হতে চেয়েছিলেন। একটু বড়ো হওয়ার পর চেয়েছিলেন মাস্টার হতে। এটা হতেই পারে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন-
‘মা যদি হও রাজি
বড় হলে আমি হব
খেয়াঘাটের মাঝি।’
তিনি কি সত্যিই ছোটোবেলায় খেয়াঘাটের মাঝি হতে চেয়েছিলেন? বালক রবীন্দ্রনাথের এমন স্বপ্ন জেগে উঠতেই পারে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের বদল ঘটেছে। বড়ো হয়ে তিনি বিশ্বসাহিত্যের সোনার তরীর মাঝি হয়েছেন। ভাবনা ও ভাবের রূপান্তর যেকোনো সময় হতে পারে।
রেণু লুৎফা যা হতে চেয়েছিলেন তার চেয়েও বড়ো কিছু হয়েছেন। জীবনের দীর্ঘ সময় পাড়ি দিতে দিতে তাঁর অর্জনের ভাগাড়ে অনেক মূল্যবান সম্পদ জমা হয়েছে। অনেক মধুর ও বেদনাদায়ক স্মৃতি জমা আছে সেখানে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. রেণু লুৎফা বলেন হ্যাঁ অনেক স্মৃতি রয়েছে। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার স্মৃতি, হাজার হাজার শরণার্থীদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য যা এখনও আমার চোখে অশ্র“ বয়ে আনে। আমাদের ছোটো ভাইয়া ও তার বন্ধু মুহিত ভাইকে অজানার উদ্দেশে ঠেলে দেওয়ার স্মৃতি খুবই পীড়া দেয়। আমার আব্বা তখন গোলাপগঞ্জ ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর আত্মগোপনের যন্ত্রণা কখনোই ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। আগস্টের মাঝামঝি পাক-হানাদার বাহিনী তার অবস্থান সম্পর্কে জেনে যায় এবং তাঁকে আত্মসমর্পণ করে আমার সেজো ভাইকে ত্যাজ্য করে রেডিওতে বিবৃতি দিতে বাধ্য করে। আমার সেজো ভাই ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) বীরত্বের সাথে পাক-হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে সিলেট মুক্ত করেছিলেন। তখনকার সময়ে সকল ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানদের শান্তিবাহিনীর চেয়ারম্যান হতে বাধ্য করা হলেও আব্বার ক্ষেত্রে ছিল এর ব্যতিক্রম। আব্বা যেহেতু আত্মগোপনে ছিলেন তখন তাঁর অবর্তমানে একজন প্রভাবশালী মেম্বারকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমাদের দুই ভাই (আজিজুর রহমান ও লুৎফুর রহমান) যেহেতু সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে বেশ কৃতিত্বের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন তাই আত্মসমর্পণের পরও পাক-বাহিনীর সাথে আব্বার কোনো সুসম্পর্ক ছিল না।
ড. রেণু লুৎফা তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সমাজ বদলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থগুলো মননশীলতার উজ্জ্বল প্রতিনিধি। প্রতিটি প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে লুক্কায়িত আছে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর এর থেকে মুক্তির উপায়। সকল অন্ধকার দূর করে আলোর দুয়ার খোলার প্রত্যয় তাঁর রচনায় দেদীপ্যমান। তার কয়েক গ্রন্থের সামান্য আলোকপাত করা যাক :
স্পর্ধিত আত্মবোধ : রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতচিহ্ন
রেণু লুৎফা প্রকৃতপক্ষে একজন সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশ্লেষক। তাঁর বহুমাত্রিক শক্তিস্বত্ত¡ার মধ্য থেকে ‘স্পর্ধিত আত্মবোধ’ গ্রন্থে তিনি বিশ্লেষণী সত্ত¡ার প্রচ্ছন্ন সাক্ষর রেখেছেন। এই গ্রন্থে ধারণ করেছেন ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল, একখণ্ড বাংলাদেশ। স্পর্ধার সঙ্গে বলে দিয়েছেন নিজস্ব বোধের কথা, নিচের দিকে নেমে যাওয়া সমাজ ও সভ্যতার কথা। এমনকি যেখানে যা দেখেছেন, অবলোকন করেছেন অকপটে তার কথাই লিখে ফেলেছেন তিনি। নিজের প্রজাতির ত্র“টিগুলোও তাঁর চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি। প্রথমে নির্ণয় করেছেন দুর্বলতার জায়গা, বিশ্লেষণ করেছেন এর নানাদিক। এরপর ক্ষতভারে দুর্বল রাষ্ট্র হোক বা সমাজ হোক বা নিজের প্রজাতি হোক সূ² ইঙ্গিতে নির্দেশ করেছেন উত্তরণের পথ এবং পাথেয়। ড. রেণু লুৎফার বহু প্রবন্ধে ধরা পড়েছে দুর্নীতিপরায়ণ বাঙালিদের দৌরাত্ম্য। যেমন : ‘বৃটিশ রাজনীতির ধারা ও বাংলাদেশি লিডারদের দুর্নীতি’ প্রবন্ধে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাঙালি শাসকদের শোচনীয় বিবেক-বিচারের অবক্ষয়।
স¤প্রতি লন্ডনের একটি কমিউনিটি পত্রিকার সংবাদ মতে, শেখ হাসিনা দলীয় সভায় তোফায়েল আহমদ ও মো. নাসিমকে লক্ষ করে বলেছেন, ‘একটা ছোট্ট লিফলেট ছাপাতে হলেও আপনারা পার্টি ফান্ড থেকে টাকা চান, পাঁচ বছরে যা বানিয়েছেন তা থেকে খরচ করতে শুরু করুন।’ বিশ্বের অন্যান্য দেশে মন্ত্রীরা এ ধরনের দুর্নীতির সাহস করতে পারবে না। আমেরিকায় পারবে না। ব্রিটেনে পারবে না।
স্পর্ধিত আত্মবোধ গ্রন্থে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হচ্ছেÑ‘হিজাব, ইসলাম ও আমরা’ এ প্রবন্ধে পশ্চিম বিশারদদের বোরকা বিদ্বেষকে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করা হয়েছে। পশ্চিম বিশারদরা মুসলিম মেয়েদের হিজাব না পরতে বাধ্য করছেন। এটা আসলে মুসলমানদের ধর্মপালনে বাধা সৃষ্টি করে অথচ ইসলামে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ যারা হিজাব পরতে চায় তাদের হিজাব পরতে দেওয়া হোক, যারা হিজাব পরতে চায় না তাদেরকে বাধ্য করাও যেন হয় না। যারা ধর্মচর্চা করেন তাদের ধর্মপালনে অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হোক। ড. রেণু লুৎফা মানুষের মুক্তি, স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা নিজের সুরে বলেছেন। তাঁর প্রবন্ধে সমকাল ব্যাপকভাবে ধরা পড়েছে। পশ্চাদমুখর জাতি, সমাজ, ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রের জন্য তাঁর গ্রন্থটি দ্রুত উত্তরণের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
বৈদগ্ধ অনুলাপ : অভিবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিচ্ছবি
ড. রেণু লুৎফার স্বপ্নের মধ্যে প্রবাসী বাঙালিরা সবসময় বিচরণ করেন। তিনি নিজের জাতিকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তাঁর লিখিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের মধ্যে ঘুরেফিরেই উঠে এসেছে অভিবাসী স্বজাতির কথা, তাদের দুঃখ দুর্দশা ও অপ্রাপ্তির গল্প। রেণু লুৎফা সর্বদাই জ্ঞানমুখী সচেতনা তৈরি করতে চান।
প্রবাসী বাঙালিদের তিনি শ্রমিক হিসেবে দেখতে চাননি; তিনি চেয়েছেন বাঙালিরা শিক্ষিত, সম্মানজনক আসনে পল্লবিত হোক নিজেদের সৃজনশীলতায়। অতএব যারা এই নীতিদর্শন নিয়ে প্রবাসে কাজ করেন তিনি তাদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। অন্যের পরিশ্রমে নিজের স্বপ্নের প্রতিফল দেখে আনন্দ পান। এজন্য তাঁর বৈদগ্ধ অনুলাপ গ্রন্থটি এমন মানুষকেই উৎসর্গ করলেন যিনি লন্ডনের বাংলাদেশি সমাজকে শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করার একনিষ্ঠ কর্মী। নাম মোহাম্মদ শফিক মিয়া। এটা হলো সমস্ত প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে স্বপ্নের প্রতিমূর্তি। এছাড়া ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য তাঁর আলাদা দরদ ফুটে উঠেছেÑ‘ব্রিটিশ মুসলমানরা কেমন আছেন’ এই লেখাটির আলোচনায়। ড. রেণু লুৎফা অন্ধের মতো একরৈখিক আলোকপাত করেননি। ইসলাম আর ইসলামের নামে সন্ত্রাস জঙ্গীবাদ এক জিনিস নয়। ইসলাম ত্রাস সৃষ্টি করে না; ত্রাণ তৈরি করে। কিন্তু বিশ্বে প্রকৃত ইসলাম ধিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
স¤প্রতি ব্রিটেনের পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন ও বিভিন্ন ওয়েবসহ অন্যান্য প্রচার মধ্যমে চোখ রাখলেই যে সংবাদটি বিস্ময় জাগায়, তা হচ্ছে ইসলামি সন্ত্রাসীদের ভয়। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ইসলাম শব্দটি যোগ করার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের প্রচার মাধ্যমগুলো দায়ী। অথচ যারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে ইসলামের সঙ্গে এদের কোনো যোগসূত্র নেই। এই প্রবন্ধের আলোচনা কেবল বৈদগ্ধ অনুলাপ নয়, বরং বৈদগ্ধ উচ্চালাপ। রেণু লুৎফার কণ্ঠস্বরে শক্তি যোগান দেওয়ার জন্য সচেতন মুসলিমদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। লেখকের ভাষায় আরেকটি অনুলাপ : ‘সমাজ ও আপনার সন্তান’ এখানে তিনি যে বিষয়ের অবতারণা করেছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সন্তানদের বেশিরভাগ সময় সমাজের বাহিরে রেখে নিজেরা সমাজ নিয়ে লাফালাফি করছি। যে ছেলেমেয়েদের পরিবার কোনো নিয়মকানুন দিতে পারছে না, সে ছেলেমেয়েরা রাস্তার কালচারে বড়ো হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা নার্সারি ক্লাস থেকে শুরু করে প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত বাবা-মার আয়ত্তে¡ থাকলেও সেকেন্ডারি স্কুলে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গেই বাবা-মার সঙ্গে গ্যাপ তৈরি হয়। আলোচ্য বিষয়কে শক্তিশালী করতে তিনি ইবনে মাজাহ থেকে একটি হাদিস উদ্ধৃত করেছেনÑ‘তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ অন্য হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘সন্তানসন্ততি আল্লাহর ফুল’ (হাদিস শরিফ : ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরিফ) বৈদগ্ধ অনুলাপ ৭৯ পৃষ্ঠা। সমাজে আমরা যত বড়ো নেতা হই না কেন, যতই পদক ঝুলুক আমাদের গলায়। ড. রেণু লুৎফার লেখার ফাঁকে ফাঁকে অঞ্চলপ্রেম উঁকি দিয়ে ওঠে। সিলেটি বিভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন সময়ে সময়ে। তাঁর আরেকটি অনুলাপ : ‘বাংলাভাষা ও সাহিত্যে সিলেটি নাগরীর অবদান।’ উল্লিখিত প্রবন্ধে নাগরী যে সিলেটি আদি ভাষা, এর ইতিহাস দলিল এবং অবদান সময়কাল টেনে টেনে আলোচনা করেছেন। সিলেটি নাগরী বর্ণ কেবল সিলেটি মুসলমানরা ব্যবহার করতেন এমন নয় হিন্দুরাও ব্যবহার করতেন। আইসিএস গুরুসদয়-এর সংগৃহীত ‘শ্রীহট্টের লোকসংগীত’ নামের বিরাট গ্রন্থখানি ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করেছে। শ্রীহট্ট সম্মিলনী কলকাতা থেকে ১৭০৬ প্রবাদের ‘শ্রীহট্টীয় প্রবাদ প্রবচন’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে। সিলেটের অমর কৃতিসন্তান ড. শ্রী যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য-এর সংগ্রহ থেকে কতগুলো সিলেটি নাগরী ভাষার পুঁথি নিয়ে মণীন্দ্র কুমার ঘোষ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি করতে গিয়ে কবি সঞ্জয়-এর আদি মহাভারতখানা সম্পাদনা করেন। মধ্যযুগের সাহিত্যে সিলেটের মুসলিমগণ বিশেষ অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছেন। তাই কোনোভাবেই সিলেটি আদিভাষা নাগরীর বর্ণ ও বর্ণনাকে অস্বীকার করা যাবে না। ড. রেণু লুৎফা-এর পরিমাণে বিপুল, আকারে সংহত আলোচনাগুলো মানুষের চিন্তার খোরাক হয়ে কালের পর কাল বেঁচে থাকুক।
কালের কণ্ঠ : সময়ের সাহসী উচ্চারণ
ড. রেণু লুৎফা-এর কালের কণ্ঠ ১ম খণ্ড প্রকাশের পর পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। যে কথাগুলো মানুষ বলতে পারে না, সমাজের যেসব ক্রটি মানুষের চোখে পড়ে না। লেখক নিজের ভেতর দিয়ে অন্যের কথাগুলো বলেন; সূ² ইঙ্গিতে সমাজের ত্র“টিগুলো নির্ণয় করেন। আর এজন্য তাঁরা সাধারণ মানুষ থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারেন। ড. রেণু লুৎফা আপন কলমে তুলে আনলেন জনমানুষের কণ্ঠস্বর, গণমানুষের হৃদয়ের অব্যক্ত কথামালা। কালের কণ্ঠ ২য় খণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হচ্ছে : ‘ইসলামের নামে আপনাদের অর্থ এদের হাতে দিবেন না’। উল্লিখিত প্রবন্ধে বর্তমান সমাজের একটি বড়ো ব্যাধি ধরা পড়েছে, যা প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে ঘটছে। সাধারণ মানুষেরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। দুর্নীতিবাজরা কৌশলে এসব কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। প্রবন্ধের কিছু অংশ পড়ে দেখা যাকÑ‘আমি তাকে বললাম, চলুন রেল পুলিশের কাছে নালিশ করে আসুন। এখানে ক্যামেরা রয়েছে তারা সহজেই আপনার পকেট চোরকে ধরতে পারবে। তাছাড়া আমার কাছে থেকে ধার করার চেয়ে তাদের কাছেই বলুন তারা আপনাকে সাহায্য করবে এমন কি ওরা আপনাকে একটি নতুন টিকিট দিয়ে দিবে। কিন্তু ভদ্রলোক কিছুতেই নালিশ করবেন না, রেল পুলিশের কাছেও যাবেন না। বললেন, ওসব করে সময় নষ্ট করার সময় তার নেই। নালিশ করলেই তাকে কোর্ট কাছারী করতে হবে। তিনি বৃদ্ধ ধর্মপরায়ণ মানুষ, কোর্টে গিয়ে সত্য-মিথ্যা কথা বলতে পারবেন না। মেয়েটিকে আবারও ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার নাম কী? ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই মেয়েটি জবাব দিল ফাতিমা। সঙ্গের ভদ্রলোক তোমার কী হন জিজ্ঞেস করতেই ভদ্রলোক মেয়েটিকে ধমক দিয়ে কথা বলতে বারণ করলেন। আমার দিকে ফিরে ভাঙা হিন্দি ও ইংরেজিতে বললেন, আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না কেন? বৃদ্ধ মানুষ দু’ দুবার আল্লাহর বাড়ি ঘুরে এসেছি, আমাকে দেখে কি আপনার চোর মনে হয়? কত বড়ো আবদার তাকে আমার বিশ্বাস করতে হবে! বললাম, চেহারা দেখে তো কেউ কাউকে বিচার করতে পারবে না, আপনাকে আমি কিছুই মনে করছি না। কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে, আপনি রেল পুলিশের কাছে নালিশ করতে রাজি হচ্ছেন না কেন? ভদ্রলোক এবার তার গলার স্বর বদলিয়ে বেশ জোর গলায় বললেন, যদি পারেন টাকা দিন, ঝামেলা করবেন না। বললাম, ঝামেলা কোথায় আপনাকে তিরিশ পাউন্ড দিব সুতরাং আপনার নাম ঠিকানাসহ সত্যি সত্যি আপনার পাউন্ড চুরি হয়েছে কি না জানতে চাইছি। আপনি পাউন্ড চাইলে আপনাকে আমার সাথে রেল পুলিশের কাছে যেতে হবে। আমাকে জবাব না দিয়ে ভদ্রলোক হনহনিয়ে সঙ্গের মেয়েটিকে হাত ধরে প্রায় টেনে হেঁচড়ে নিয়ে গেলেন।’
কত অভিনব পদ্ধতিতে আমরা প্রতারিত হচ্ছি এর কোনো হিসাব নেই। ইসলামের নাম ব্যবহার করে, ইসলামের পোশাক ব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ ধার্মিক লোকের সরল বিশ্বাস ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির পুঁজিবাদের দোসররা এসব ব্যবসা করে যাচ্ছে। সত্য বোঝার জন্য একটু খেয়াল করে দেখবেন, এই ধরনের ভঙ্গিমা পোশাকে কেউ আবির্ভূত হলে; তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে প্রশ্ন করুন, কোথা থেকে এসেছে? বাড়ি কোথায়? ইত্যাদি প্রশ্নের পর মূল ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে শুরু করুন, দেখবেন, লোকটি তখন আপনার কাছ থেকে কেটে পড়তে চাইছে। যার কাছে যুক্তি দিয়ে তারা টিকে থাকতে পারে না। যখন তাদের ব্যবহৃত কৌশলগুলো অকেজো হয়ে পড়ে ঠিক তখনই তারা কেটে পড়তে চায়। ওই সমস্ত লোকেরা অনেক সময় তাদের কৌশলগুলো গুছিয়ে বলতে না-পারায় ধরা পড়েন। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষই সহজ সরল। তারা এতকিছু যাচাই-বাছাই করতে চান না। যার ফলে এদের ব্যবসা ভালোই চলছে। ড. রেণু লুৎফা তাঁর প্রবন্ধে বাংলাদেশের কথা না বললেও এই ব্যাধিটা বাংলাদেশেও প্রবল। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে লেবাসধারীর কোনো স্থান নেই। ইসলাম কারও কাছে হাত পাততে পছন্দ করে না। বিপদে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ‘ওয়াস্তায়িনু বিস সাবরি ওয়াস সালাহ’ অর্থাৎ তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। মহাবিপদেও মানুষের কাছে চাওয়া অনুমোদন দেয়নি ইসলাম। অভাব বা ‘করজে হাসানা’ উত্তম পন্থায় ঋণ গ্রহণের অবকাশ ইসলামে আছে। অতএব গোড়াতেই ধোঁকাবাজির পথ বন্ধ হয়ে গেল। কী সুন্দর ব্যবস্থাপনা দিয়েছে ইসলাম; আর অসৎ লোকেরা নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ধর্মকেই কলঙ্কিত করে চলছে। ড. রেণু লুৎফা এই প্রবন্ধে সত্য উচ্চারিত হয়েছে। এই সত্যগুলো যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হবে। এরপর কালের কণ্ঠ ২য় খণ্ডতে আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হচ্ছে ‘ট্রাফালগার স্কোয়ারে মুসলমানদের জামাত’। ইসলামে জৌলুসপূর্ণ বিশাল জনতার সমাবেশের অনুমোদনের অনেকগুলি কারণের মধ্যে একটি কারণ হলো, দুনিয়ার ইসলাম বিদ্বেষীরা দেখুকÑএত মানুষ একসঙ্গে বিভ্রান্ত হতে পারে না। এত মানুষের মগজ বিকার হতে পারে না। বিরোধীদের হক বা সত্যের বৈধতা প্রমাণের জন্য ইসলামে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক জামাতের অনুমোদন হয়েছে। ড. রেণু লুৎফার প্রবন্ধের চুম্বক অংশÑমুসলমানদের উপর এত অন্যায়-অবিচারের পরও ট্রাফালগার স্কোয়ারে মাগরিবের নামাজের বিশাল জামাত দেখে আমার মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে যে, ইসলামের বিরুদ্ধে দুনিয়ার কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হতে পারবে না। টেরোরিস্ট নিধনের নামে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা আর আফগানিস্তানে আমেরিকার এই নগ্ন আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে সমগ্র মুসলিম স¤প্রদায়ের জাগরণ এবং উত্থান বোধ হয় অনিবার্য হয়ে উঠলো।
এই লেখায় ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি লেখকের দরদ ফুটে উঠেছে এবং তাঁর ভেতরের সহজাত বৈশিষ্ট্যের ন্যায় সত্য কথাটি বেরিয়ে এসেছে। আমরা এই সত্যান্বেষী লেখকের কাছ থেকে এ ধরনের লেখা বেশি বেশি আশা করি। মুসলমানদের দুর্দিনের যে কথাটি ব্রিটেনে বলার কেউ নেই। লেখার কেউ নেই। বহির্বিশ্বের অবস্থান ইসলামের বিপরীত মেরুতে। তখন নিখাদ নিষ্ঠার সঙ্গে মুসলমানদের দুর্ভাগ্যের কথাটি লিখলেন রেণু লুৎফা। মানুষকে সব সময় বড়ো করে দেখছেন তিনি।
টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনা নিয়ে যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, এটি সকল মানুষের পাঠ করা উচিত। মানুষ হিসেবে তিনি সকলকে সমান চোখে দেখেছেন। জাত বর্ণ হিসেবে তারতম্য করেননি। প্রবন্ধটা একটু পড়ে দেখা যাকÑ
সকল প্রাণই দামী, সব মৃত্যুর মূল্যও এক হওয়া উচিত।
১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার হামলার বর্ষপূতিতে নিহতদের নাম করে আমেরিকা ও ব্রিটেনের প্রচারমাধ্যগুলোতে যে ধরনের ইমোশনাল হোলি খেলা হলো তা দেখে পৃথিবীর প্রতিটি শান্তিকামী মানুষের কাছে মনে হয়েছে ক্ষমতাশালী দেশগুলোর মানুষের জীবনের যে মূল্য রয়েছে তার কানাকড়িও মূল্য নেই গরিব দেশের মানুষজনের। মুসলমানদের জীবনের মূল্য তো আরো কম। ১১ সেপ্টেম্বরের সূত্র ধরে আমেরিকা সরকারের সরাসরি আক্রমণে আফগানিস্তানে যে কয়েক হাজার নিরীহ সাধারণ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে তার হিসেব করার কোনো প্রয়োজন রয়েছে বলে আমেরিকা মনে করছে না। দেশের আভ্যন্তরীণ জাতি-উপজাতির রেশারেশির কারণে প্রতিদিনই দেশে দেশে নিহত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আমেরিকার ‘অতি সতর্ক’ সৈন্যদের বিভ্রান্ত হামলায়ও নিহত হচ্ছে অসহায় মানুষ। বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠনের হিসাব মতে আমেরিকার সন্ত্রাস বিরোধী আক্রমণে আফগানিস্তানে এ পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। সন্ত্রাস দমনের নাম করে আমেরিকা ও ব্রিটেনে যে ধরনের হিংস্র প্রতিশোধের উম্মাদনায় মেতে উঠেছে, তাতে শান্তিকামী মানুষেরা উৎকণ্ঠিত হয়ে জোর গলায় প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
অত্যন্ত সত্য কথা বিশ্বের অন্য কোথাও মানুষ মারা গেলে এ নিয়ে আমেরিকার কোনো মাথা ব্যথা নেই। এটা আসলে আমেরিকার পক্ষপাতদুষ্ট রীতি। পৃথিবীর সকল নিহত মানুষের প্রতি সমবেদনা জানানো উচিত। জাত এবং দেশ হিসাবে তারতম্য করা নিচু মানসিকতার পরিচয় বহন করে। এইতো ক’দিন আগে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের প্রোফাইল পরিবর্তনের সিস্টেম চালু করেন। ফ্রান্সের পতাকার ভেতরে নিজের আবছা ছবি দিয়ে অনেকেই সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। সবকিছুর পর জুকারের এই সিস্টেমটা একচেটিয়া রীতির মধ্যেই পড়ে। অথচ গাজা ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন নির্বিচারে নারী পুরুষ শিশুদের হত্যা করা হলো তখন জুকারবার্গ কোথায় ছিলেন? তখন তার সমবেদনার ভাষা কোথায় ছিল? ড. রেণু লুৎফার প্রবন্ধে সত্য ঝলক দিয়ে উঠেছে। তিনি সকল মানুষকে মানবসন্তান হিসেবে দেখেছেন। আর এভাবেই দেখা উচিত।
ড. রেণু লুৎফা নিজেকে জাহির করার জন্য সাহিত্যচর্চা করেন না। তাঁর লেখায় স্বদেশ এবং বিদেশ প্রায় সমানভাবে উপস্থাপিত। তিনি নিজের দেশ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেন, ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিয়েও সেই একই স্বপ্ন দেখেন। তাঁর রচনায় সেখানে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যার কথা এবং দেশের নতুন প্রজন্মের অশেষ সম্ভাবনার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তাঁর সমগ্র রচনা পাঠে এ কথাই বোঝা যায় যেÑতিনি নাম বিস্তারের জন্য লিখেন না, প্রকৃত অর্থে সমাজের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে লিখে চলেছেন। বন্ধু বাড়ানো কোনো প্রবণতা তাঁর মধ্যে নেই; এমনকি শত্র“দের ছিদ্রান্বেষণের ভয়েও তিনি শষ্কিত নন। ব্রিটেনের বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষা-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বোদ্ধাদের তিনি পরম বন্ধু এবং নতুনদের প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। আর এ পরিচয়েই তিনি আভির্ভূত হবেন চিরকাল।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক।








Free Online Accounts Software