24 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 9 December 2015 ব্যক্তিত্ব  (পঠিত : 2338) 

কবি লাভলী চৌধুরী : বাংলাসাহিত্যে সুবাস ছড়ানো এক পুষ্পের নাম

কবি লাভলী চৌধুরী : বাংলাসাহিত্যে সুবাস ছড়ানো এক পুষ্পের নাম
     

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল:
লাভলী চৌধুরী একজন নিভৃতচারী কথাশিল্পীর নাম। সত্য ইতিহাস, তীক্ষè পর্যবেক্ষণ আর প্রবল স্মৃতিকাতর তাঁর লেখাগুলো পাঠককে মোহিত করে; তাঁর লেখাগুলো নদীর স্রোতের মতো প্রবহমান। কিন্তু আড়াল প্রয়াসী চরিত্র তাঁর আরও সৃষ্টিসম্ভার পাঠ থেকে আমাদের বঞ্চিত করছে। তিনি সিলেটের লেখিকাদের মধ্যে অগ্রসরমান একজন। তিনি একজন সৃজনশীল লেখিকা। কোনো বলয় বা পরিমণ্ডলে বেষ্টিত নয়। তাঁর লেখাগুলো নানা ধরণের প্রাচুর্যে ভরা সুবাস বিলাসী লেখা। সৃষ্টিশীলতার সৌন্দর্যে লাভলী চৌধুরী একজন সৌন্দর্যের কবি। নিঃসন্দেহে তিনি একজন আধুনিক মানসের পরিচায়ক। মূলত কবি হলেও বহুমাত্রিক। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর বিচরণ লক্ষণীয়। দীর্ঘ সময়ের সাধনা ও পরিশ্রমে বাংলাসাহিত্যে নিজেকে আলাদা পরিচয়ে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
বরেণ্য এ লেখিকার জন্ম ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১১ মে (২৫ বৈশাখ)। পৈতৃক নিবাস সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার সিকন্দরপুর। তাঁর বাবা শিক্ষাবিদ মরহুম লতিফুর রহমান চৌধুরী ও মা সিতারা বেগমও ছিলেন একজন লেখিকা, সমাজ সংস্কারক। তাঁর আরো একটা বড় পরিচয়, তিনি এদেশের লোকসাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম প্রতিকৃত মরহুম আশরাফ হোসেন সাহিত্যরতেœর মেয়ে পক্ষের নাতনী। লাভলী চৌধুরী ছয়-এর দশকের জনপ্রিয় কবি ও কথাশিল্পী। তিনি তাঁর সৃজনশীলতার মাধ্যমে উভয় বাংলায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। সাহিত্যের মধ্যে তাঁর কর্ম স্বাক্ষর হিসেবে আমরা দেখতে পাই-১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ‘শিখা’ নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেন। আর এর ভেতর দিয়েই সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। সাহিত্যের কাগজ এই ‘শিখাটি’ অনেক সময় পর্যন্ত লাভা ছড়িয়েছিল। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা সতেরোটি এবং যৌথ গ্রন্থের সংখ্যা আটটি। তিনি বেতার ও টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার ও নাট্যকার। স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে একসময় তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল। কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য তিনি অনেকগুলো জাতীয়, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছেন। তন্মধ্যে নারী গ্রন্থ ও প্রবর্তনা (১৯৯৯ খ্রি.), শেকড়ের সন্ধানে অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৯ খ্রি.) স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্মাননা (২০০৩ খ্রি.), আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন, ঢাকা (২০০০ খ্রি.), মৌলানা ইয়াসীন শাহ (রহ.) এ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ (২০০১ খ্রি.), বেগম সাজিদুন্নেসা খাতুন চৌধুরী রাজী, বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা, ঢাকা (২০০৬ খ্রি.), জাতীয় সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, ঢাকা, কালচারাল ফাউন্ডেশন, সিলেট (২০০৮), অতন্দ্রপদক (ঢালিগঞ্জ অতন্দ্র সাংস্কৃতিক সংসদ), কলকাতা, ভারত (২০১২ খ্রি.), রাগীব-রাবেয়া একুশে সম্মাননা পদক (২০১০ খ্রি.), বাংলাদেশ কবিতা সংসদ পাবনা (১৪০৮ বঙ্গাব্দ), ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগ (২০১১ খ্রি.), নন্দিনী সাহিত্য পাঠচক্র-সাহিত্য পদক (২০০৫ খ্রি.), গঙানন্দিনী, কলিকাতা, বরেন্দ্র নন্দিনী-রাজশাহী, রোটারী ক্লাব অব সিলেট সুরমা, রোটারী ক্লাব অব মেট্রোপলিটন, লায়ন্স প্রেসিডেন্ট এ্যাওয়ার্ড প্রভৃতি। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও গুণগত মানে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে আছে-গীতিগুচ্ছ, এই গ্রন্থটিতে সংকলিত হয়েছে তাঁর হৃদয়ের সুর; প্রেম-বিচ্ছেদের গতিময় অনুরণন। কবিতার বইয়ের মধ্যে আছে-পুষ্পিতা,আনন্দ কারাগার, যখন একা বসে থাকি, তোড়া ইত্যাদি।
শৈশবে হাতের লেখা লিখতে গিয়ে লেখা শুরু। তাঁর বাসায় অনেকগুলো পত্রপত্রিকা রাখা হতো। ছোটদের পাতা ‘মুকুলের মহফিল’ ‘কচিকাঁচার আসর’ ইত্যাদি তাঁকে অনুপ্রাণিত করত খুব। লিখে আনন্দ পান। অচেনাকে চেনার অজানাকে জানার আনন্দে তিনি আলোড়িত হন। হয়তো সে কারণে লোকচক্ষুর সম্মুখেও নিজেকে নিয়ে আসেন যদিও তিনি আড়াল প্রিয় লেখক। কবিতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা-কাব্য আপন মহিমায় স্বপ্রতিভ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, প্রাকৃতিক সবক্ষেত্রেই-এর ব্যঞ্জনা দ্যুতিময়। এর ব্যাখ্যা সম্ভবত হুট করে দেওয়া যায় না বলে তিনি মনে করেন। কবিতার বিষয়বস্তুতে কবিদের সচেতন থাকতে হবে। তা যত সাদামাটা বা জোরালো, যা কিছুই হোক। তারপর দরকার সুসংহত আবেগের পরিবেশনা। নতুবা সম্ভাবনার দিগন্ত ধূলিধূসরিত হয়ে যাবে। আমরা তাঁর পরিচ্ছন্ন কাব্যচিন্তা থেকে অনেক কিছু জানতে পারি। তিনি খুব সহজেই বলে দেন কবিতার গতিপথ, কীভাবে লিখতে হবে, ভাব এবং পরিবেশন কেমন হবে ইত্যাদি। কবিতা একটি একক সত্বা। একে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস রয়েছে। যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা নিয়েও মতভেদ হবে। মেধার অনুশীলন থেকেই বড় কিছুর জন্ম। একে নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলার অবকাশ নেই। কবিতায় শব্দের উৎকৃষ্ট ব্যবহারই মূলকথা। কেননা কবিতায় শব্দ বাক্যের পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত জরুরি। জীবন ও জগতকে নিজের মধ্যে ধারণ করে গুছিয়ে বলার কৃতিত্বেই কবি মহিমান্বিত। একে নির্দিষ্ট কোন ছকে ধরে রাখার প্রয়াস নেয়া যায় না। কবিতা সাগরের বিশাল তরঙ্গ। তার গতিবিধি দুর্বোধ্য। সেই দুর্বোধ্যতাকে, সমাজের মূক মনোভাবকে ভাষায় মধুর করে ব্যক্ত করাই কবির সার্থকতা। অন্তরের সঙ্গে কাব্যের অনির্বাচনীয় সম্পর্ক। কবিতা বিষয়ক কথা শুনে, লাভলী চৌধুরী এর পাণ্ডিত্য দেখে আমরা আসলেই মুগ্ধ না হয়ে পারি না। তিনি কতটা গভীরে বসবাস করেন তাঁর সঙ্গে কথা না বললে বুঝার উপায় নেই। লাভলী চৌধুরী একজন নীরব সাধক ও স্থির পাণ্ডিত্যের অধিকারী। তিনি মনে করেন, শুধু গদ্য ও আধুনিক কবিতা কোনটার মধ্যেই মূলত পার্থক্য নেই। আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনবোধ; আনন্দ হতাশা আবেগ সবটুকুর বর্হিপ্রকাশ ঘটে কবিতায়।
কবি লাভলী চৌধুরীকে নিয়ে কবি কামাল তৈয়ব এর মূল্যায়ন : কবি লাভলী চৌধুরী নিশ্চয় একজন সৃজনশীল সাহিত্যের নির্মাতা; কিন্তু আমাদের সাহিত্য তাত্তি¡কগণ যে তিনটি সৃজনশীল সাহিত্যের প্রবাহ সনাক্ত করে রেখেছেন, তাঁকে সেগুলোর বিশেষ কোনো একটিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। ঐহিত্য, সমাজ কিংবা কৈবল্যবাদী সৌন্দর্য মনস্কতার কোন একক জালে তিনি পরিবেষ্টিত নন। তিনি সবগুলোর বৈচিত্রের রূপকার, সবগুলোর সংমিশ্রণে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে বৈচিত্রময়। তবে বৈচিত্র্য ও যেহেতু মনোহারিণী তাই তাঁকে সুন্দরের কবিই বলা যেতে পারে।
লাভলী চৌধুরীকে আমরা সীমাবদ্ধ থাকতে দেখিনি। তাঁর সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে আমরা যাদের দেখতে পাই, তারা হচ্ছেনÑমোহম্মদ আবদুল হামিদ, আবদুল কাদের মাহমুদ, আহমেদ হুসেন মারুফ, শামিম আজাদ, নুরুল ইসলাম, নিবেদিতা দাস পুরকায়স্থ, মোহাম্মদ আবদুল বাসিত, সুলতানা বেগম ইলা সহ আরো অনেকে। মিসেস নূরুনন্নেসা হক, মোস্তফা কামাল, বেলা দে-ও তাঁর সমকালীন লেখকদের মধ্যে পড়েন।
খুব ছোটবেলায় তাঁর মাথায় লেখার খেয়াল চাপে। অলৌকিক এক সত্ত¡া শক্তির অস্তিত্ব টের পান নিজের ভেতরে। আর সেই অলৌকিক সত্ত¡া ক্রমশ লৌকিক হতে শুরু করে, পড়তে পড়তে লিখতে শুরু করেন আর লিখার মধ্যেই পুলকবোধ করেন কবি লাভলী চৌধুরী। পৃথিবীকে জানার আনন্দ তাঁকে ডাকে; তাই গভীর মনোযোগ দিয়ে লেখা শুরু করেন। নিজের ভাব-ও চিন্তাকে অন্যের ভেতরে প্রবাহিত করতে আপন সৃষ্টিকে লোকচক্ষুর সম্মুখে নিয়ে আসেন। কবিতা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ বক্তব্য হলো : কবিতা তাঁর নিজস্ব গতিতেই সুন্দর, বহুমাত্রিক ইঙ্গিতের সমষ্টি। কবিতা হতে পারে সামাজিক, কবিতা হতে পারে প্রাকৃতিক, ভাব-আবেগ ও শব্দের ব্যঞ্জনায় যে কোনো বক্তব্যই কবিতা হয়ে উঠতে পারে। কবিতায় ধর্ম থাকতে পারে, দর্শন থাকতে পারে, ইতিহাস থাকতে পারে, ঐতিহ্য থাকতে পারে। এমনকি বিজ্ঞানের ভাষা নিয়েও আজকাল কবিতা লিখা হচ্ছে। কবি লাভলী চৌধুরীর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল সিলেটের প্রাচীনতম দৈনিক যুগভেরীতে। এই দৈনিকে সিলেটের বহু লেখক সাহিত্যিকের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই দিক থেকে পত্রিকাটির বিশেষ গৌরব আছে, গৌরবের অংশে লেখকদের ভূমিকাও অনেক। লেখালেখির আবির্ভাবকালে লাভলী চৌধুরীর হাঁকডাক থাকলেও দিনে দিনে তিনি মলিন হয়ে যাচ্ছেন। হয়ত নানা ধরনের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছেন। এখন সংসার আছে, সন্তানাদি আছে ,আমরা জানি লেখার জন্য অবকাশ দরকার, সময় দরকার অন্তত কিছুক্ষণ নিরিবিলি তো লেখকের দরকার পড়ে। তা ছাড়া চিন্তা সাধনারও একটা ব্যাপার আছে। এতসব ঝঞ্ঝাট কাটিয়ে ওঠা একজন লেখকের পক্ষে অনেক কঠিন। জীবনের বহুদিকে ব্যাপৃত হওয়ার পরও লাভলী চৌধুরী এখনও স্বপ্রতিভ। তিনি বাঙালি মেয়েদের মধ্যে নিজের চেয়েও বড় প্রতিকৃতি দেখতে চান। তবে ইদানীং অনেক মেয়েপ্রতিভার দ্যোতিতে আশার আলো দেখছেনÑএ প্রজন্মের মেয়েরা ভবিষ্যতে অনেকদূর এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশে নারী লেখকদের প্রসঙ্গ এসে পড়ায় সাংবাদিক গোলাম রব্বানী চৌধুরী তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বিতর্কিত লেখিকা তাসলিমা নাসরিনের লেখা পড়েছেন কি? তার লেখায় ধর্ম ও পুরুষ সম্পর্কে বিষোদগারের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী? তখন তিনি বলেছিলেন, পড়েছি। প্রত্যেক মানুষের জীবন, বেঁচে থাকা, চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাস তার নিজের আলাদা আলাদা। আমাদের ব্যাপার হচ্ছে বুঝে না বুঝে তালি টুকা। ও নিয়ে কিছু বলতে গেলে অনেক কিছুই এসে যায়। অবাক লাগে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের নাচ ও নাচানো দেখে। সীমা অতিক্রম করলে কি ফলাফল হয় সে তো সবাই দেখতে পাচ্ছেন। এ নিয়ে কিছু না বলাই বোধ হয় ভালো। অত্যন্ত চমৎকার ও বিচক্ষণতার সঙ্গে উত্তর প্রদান করলেন কবি লাভলী চৌধুরী। তাঁর একেকটি ইঙ্গিত একেকটি বিদ্যুৎ চমকানো দিগন্ত।
সত্যি কি তাই? সাহসিকতা
বাচালতা কি কাব্য?
সাহিত্য?
এ কেমন সাধুতা।
সাহিত্যের নাম ভাঙ্গিয়ে
অনুপম নারী দেহের নিখুঁত উপমা
সর্বত্র খোলামেলা পুঁতিগন্ধময় অসার বর্ণনা
হে কবি অলীক সুখ স্বপ্নের বিলাস ছেড়ে
চোখ ফেরাওনা ধুলির ধরায়
আদমের প্রাচীন সংসদের নতুন সদস্য নাইবা হলে।

তাঁর কাব্যের ভাষা সরল আর বাক্যের গাঁথুনি অত্যন্ত শক্তিশালী। উচ্চারণ স্পষ্ট, বক্তব্য সংহত। ‘বাচালতা কি কাব্য’ এই প্রশ্নের প্রভাব অনেক প্রসারিত। যারা কবিতার নামে শব্দের অপব্যবহার করছেন, তারা তো কাব্য সৃষ্টিতে ব্যর্থ আর অযথাই আবর্জনা তৈরি করছেন। ড. হুমায়ুন আজাদ একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ কবিই কবি নয়। অধিকাংশ কবিতাই কবিতা নয়। কবি লাভলী চৌধুরী তাঁর কবিতায় সু² ইঙ্গিত করলেন-সৃজনশীলতায় বাচালতার কোনো স্থান নেই। স্থূলতার কোনো মূল্য নেই। তাছাড়া ‘সত্যের নামে নগ্ন নাচন এ কেমন সাধুতা’ এখানে একশ্রেণির লেখকদের আবরণ খোলে দিয়েছেন। তারা নগ্নতাকে অবলম্বন করে অনবরত লিখে চলছেন অথচ শিল্পসাহিত্য বলতে নগ্নতাকে নির্দেশ করে না। শিল্প হলো উৎকৃষ্ট রুচিবোধের নাম আর সাহিত্য হলো ভাষার উন্নত শব্দের উত্তম ব্যবহার। অতএব সত্যের কথা বলে সমাজের ভেতরে নগ্নতা ও অবাধ নৃত্যের বৈধতা ঘোষণা করা কেবলমাত্র মুখোশধারী সাধুতার পোশাক। অতি আধুনিক কবিদের প্রতি তাঁর যেমন উষ্মা আছে ঠিক এর বিপরীতে তিনি তাঁর কবিতায় আধ্যাত্মিকতা ধারণ করেন, আপন মহিমায় তা লালন করেন। কবিতার অংশবিশেষ পড়ে দেখা যাক-‘হে কবি অলীক সুখ স্বপ্নের বিলাস ছেড়ে/ চোখ ফেরাওনা ধুলির ধরায়/ আদমের প্রাচীন সংসদের নতুন সদস্য।’ এখানে পৃথিবীকে তুলনা দেওয়া হয়েছে আদম (আ.) এর সংসদের সঙ্গে। এর আগের পঙ্ক্তিতে কবিদের অলীক পৃথিবীর সুখবিলাস পরিত্যাগের কথা বলা হয়েছে। বলেছেন, চোখ ফেরাও ধূলির ধরায়। পৃথিবী মাটির তৈরি, একে স্বপ্নের রঙিন প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া উচিত হবে না। ‘পুষ্পিতা’ বইটিতে ফুটেছে রঙ বেরঙের ফুল। তাঁর এ কাব্যটি বহু সুবাসের সমাহার, অজস্র রঙের বাগান। আসলে কবিতারা কখনও ফুল হয়ে ফুটে, কখনও সুবাস হয়ে ছড়ায়।
‘আনন্দ কারাগার’ আক্ষরিক অর্থেই এক আধুনিক কাব্যের নাম। প্রথমে নামটি শুনলে হয়তো বুঝা যাবে না যে, আনন্দের সঙ্গে কারাগারের কী সম্পর্ক? লাভলী চৌধুরীর চিন্তাশক্তি অনেক অগ্রসর। আনন্দের ঘোরে মানুষ বেদনা অনুভবের দিক থেকে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর সীমাবদ্ধতা হচ্ছে একধরণের কারাগার। আনন্দের সঙ্গে কারাগারের উপমা মিশ্রণ আধুনিক কাব্য ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে। ‘যখন একা বসে থাকি’ কাব্যের নামটিই ইঙ্গিত করছে বইটি তাঁর একান্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। প্রত্যক মানুষের নৈঃসঙ্গের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এটা একদম মানানসই হবে। আর এটাই তো সৃষ্টিশীলতার রহস্য। ‘তোড়া’ এটাও মানবজীবনের খণ্ডকালীন রঙিন মুহূর্তের সূচক। জীবনে ফুল থাকে, আবার বিপরীতে কাটাও থাকে। ঠিক একইভাবে কারো জন্য লাঞ্চনা আর কারো জন্য অবমাননা, কারো জন্য ফুলের তোড়া। লাভলী চৌধুরীর এই কাব্যটি মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশের সূচক বলেই মনে হচ্ছে। উপন্যাস : ‘ভালো থেকো’ ‘চোখের জলে অন্ধ আঁখি’ ‘স্মৃতিরা পোহায় রোদ্দুর’ ‘সহেনা যাতনা’ ‘তোমাদের লেগেছে এত যে ভালো।’ ‘ভালো থেকো’ : সরল কথা, অনেক বড় প্রত্যাশা। এই ভালো থাকার প্রত্যাশা পৃথিবীর জন্য হতে পারে, হতে পারে প্রিয়জনদের জন্যও। পৃথিবীর সকল ভালো মানুষেরা মন থেকে অন্যের ভালো থাকার প্রত্যাশা করতে পারেন। পাপ-পঙ্কিলতায় আচ্ছন্ন মানসিকতা থেকে এ ধরণের সরল কামনা, মহান প্রত্যাশা বের হবে না। কবি লাভলী চৌধুরী নিজের ভেতরে একটি সুন্দর পৃথিবী লালন করেন, একটি সুন্দর স্বপ্ন লালন করেন। পৃথিবী সমাজ ও সভ্যতাকে ভালোবাসেন বিধায় লিখে ফেলেছেন ভালো থেকো উপন্যাস। ‘চোখের জলে অন্ধ আঁখি’ : উপন্যাসটি এমন উপাখ্যানের ইঙ্গিত করছে যা থরোথরো বেদনায় ভরা, চোখের সামনে যেন অন্ধকার নেমে আসছে। আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে উজ্জ্বল সম্মুখ পথ। ‘স্মৃতিরা পোহায় রোদ্দুর’ : কী চমৎকার নামকরণ! স্মৃতিরা যে সুখে থাকতে পারে তখনকার সময়ে এটা নতুন বিষয়। মানুষের জীবনে এমন সময়ও আসে যখন মানুষেরা সুখের সময়ের স্মৃতিগুলো চর্বণ করে আনন্দ লাভ করে থাকেন। ‘সহেনা যাতনা’ : দুঃসহ এক যন্ত্রণার বার্তা। কবি লাভলী চৌধুরী আনন্দ বেদনার স্পর্শে সব সময়ই সৃষ্টিমুখর হয়েছেন। ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো’ : বর্তমান সময়ের ভালোলাগা, ভালোবাসা, ভালোবাসা প্রেম বড় টুন্কে, কখনো একতরফা। কখনো শূন্যতা-মেকী, সাময়িক ব্যাপার। সমাজে যথেষ্ট জটিলতা তৈরি করছে ক্ষণিকের চাওয়া এবং পাওয়ার ইচ্ছাকে। তছনছ হচ্ছে জীবন, পরিবার, পরিবেশ। তাতে বাড়ে শুধুই তিক্ততা প্রবঞ্চণা। প্রকৃত শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় ফেলনা দ্রব্যও মূল্যবান হয়ে ওঠে। ছোটদের জন্য তাঁর বইগুলো হচ্ছে-ইমু ও পাগলা হাতি, গল্পে ছড়ায় ইরাম। ছোটগল্প : ‘আকাশ প্রদীপ।’ ‘গবেষণা’ : তিরিশ বছর পর, মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ও তাঁর গীতি । জীবনী : ‘উম্মাহাতুল মুমিনা রাসুল (সা.)’-এর জীবন সঙ্গিনীদের পরিচিতি। সম্পাদনা : ‘অনিয়মিত সাহিত্যপত্র শিখা ও অন্যান্য।’ চলচিত্র কাহিনি : ‘কলঙ্কিত চাঁদ (করিমুনন্নেসা)।’
ষাট দশকের সিলেটের এই কবি একসময় প্রচুর লিখেছেন, পত্রপত্রিকায় তখনই আমরা তাঁকে আবিষ্কার করি। লাভলী চৌধুরী সে সময় থেকে পাঠকের মনে স্থান করে নেন। দেশের জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক, আজাদ, পয়গাম ও সাপ্তাহিক সাময়িক পত্রেও তিনি নিয়মিত লেখেন। কবিতা ছাড়াও লিখেছেন প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও গান। স্বাধীনতাত্তোর সিলেট থেকে ‘শিখা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ও প্রকাশ করেছেন। প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে চালিয়ে গেছেন বেশ ক’সংখ্যা। একসময় প্রচুর লিখলেও এই কবি এখন লেখালেখি কম করছেন। পাঠকের মন থেকে বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছেন। ক্রমে ক্রমে অপরিচিত হয়ে পড়ছেন নতুন প্রজন্মের কাছে। সিলেটী নারী স্বাপ্নিকদের অন্যতম অগ্রসরমান এই লেখিকার সুন্দর ও সুস্থ জীবন প্রত্যাশা করছি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক ও সংগঠক


Free Online Accounts Software