26 Sep 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 24 September 2015 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 2622) 

কাছাড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা : ভ্রমণপিপাসু পাঠকদের সুখাদ্য

কাছাড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা : ভ্রমণপিপাসু পাঠকদের সুখাদ্য
     

বায়জীদ মাহমুদ ফয়সল:

‘বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/বহু ব্যয় করে বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর থেকে শুধু দুু পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপর/একটি শিশির বিন্দু।’

ভ্রমণ শিক্ষার একটি অংশ। শিক্ষা অর্জনের জন্য বিদেশ ভ্রমণের গুরুত্ব স্বীকৃত। দেশকে যেমন প্রাণভরে দেখতে হয় তেমনই কাছের এমন দেশ আছে যেখানে শিক্ষা অথবা চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা যায়। শৈশব-কৈশোর থেকেই আমাদের মধ্যে বেড়ানোর একটা মনোবৃত্তি কাজ করে। আমরা আমাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে পছন্দ করি অথবা কাছের কোনো বিনোদন কেন্দ্র অথবা প্রকৃতিক দৃশ্য সমন্বিত কোনো এলাকায় বনভোজনে যাই। এসবই আমাদের মনের খোরাক হিসেবে চিত্তের প্রশান্তি দেয়। আমারও সে রকমের মনোবৃত্তি ছিল শৈশব থেকেই। আর ভ্রমণের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম সে রকম সময় থেকেই। সাহিত্যের কাছাকাছি নিয়ে আসার অনুপ্রেরণা যোগায়। ভ্রমণের প্রতি একধরনের অজানিত পুলক ছিল বিরাজমান থাকে। ভ্রমণ আর দেখার সৌন্দর্য আমাকে এখনও ঘিরে রেখেছে। ভ্রমণ এক আনন্দযাত্রা। এ যাত্রায় আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কও প্রেরণা যোগায়। সিলেট-কাছাড় আর করিমগঞ্জ-বদরপুর-শিলচর-হাইলাকান্দি একসময় অঙ্গাঙ্গিভাবে একই দেশের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু সময়ের এক নিষ্ঠুর পরিণতিতে আজ এই দুই অংশ দুই দেশের ভিন্ন ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সিলেট পূর্বপাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের সাথে চলে আসে আর করিমগঞ্জ-বদরপুর-শিলচর-হাইলাকান্দি-কাছাড় ভারতের ভূখণ্ডে পরিণত হয়। দুই ভূখণ্ড দুই দেশের অংশ হলেও তাদের মধ্যে আত্মীয়তা ও সামাজিকতার বন্ধন এখনও বিরাজমান। সিলেটের অনেকের আত্মীয়স্বজন এখনও করিমগঞ্জ-বদরপুর-শিলচর-হাইলাকান্দি-কাছাড়ের ব্যাপক এলাকা জুড়ে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে ওই সমস্ত এলাকার মানুষের অনেকের নাড়ির টান রয়েছে সিলেটের মাটি ও মানুষের সাথে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত দিক থেকে সিলেট-করিমগঞ্জ-বদরপুর-শিলচর-হাইলাকান্দি-কাছাড় একই উত্তরাধিকার বহন করছে। আর সাংস্কৃতির সেতুবন্ধন যে ভাষা সেই ভাষাগত দিক থেকে এক ও অভিন্ন উচ্চারণের মানুষ তারা। ভাষা আন্দোলনে করিমগঞ্জ-বদরপুর-শিলচর-হাইলাকান্দি-কাছাড়ের মানুষেরও আত্মদানের ইতিহাস রয়েছে। এখনও সিলেট তাদের আদি আবাসভূমি এ কথা তারা অন্তরে লালন করেন। অভিন্ন ভাষা, অভিন্ন জীবনাচার, অভিন্ন সংস্কৃতি দুই দেশের ভূখণ্ডগত ভিন্নতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে অন্তরে এখনও তারা এক ও অভিন্ন।
মোহাম্মদ মোশতাক চৌধুরী ভ্রমণপ্রিয় ব্যক্তিসত্তা। আমার মনে হয় তাঁর ভ্রমণ মানস সবসময় কোনো না কোনো দেশে ভ্রমণে পড়ে থাকে। তিনি তাঁর হাসির মতোই সহজ সারল্যে ভ্রমণের আনন্দ ঢুকিয়ে দেন পাঠকের মন ও মননে। স¤প্রতি তিনি ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন, কাছাড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা এতে উঠে এসেছে ভারত ভ্রমণের আনন্দ ইতিহাস ও আখ্যানের কথা। তিনি শুধু কাহিনি বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, প্রাসঙ্গিক অবতারণায় তুলে এনেছেন জানা অজানা বহু ঘটনার বর্ণনাÑকৃষ্ণচন্দ্রের রাজত্বকালীন মুসলমান পীরের আবির্ভাব : রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সিংহাসনে বসার পর ইতোমধ্যে দুইবার দুইজন মুসলমান পীরের কাছাড়ে আবির্ভাব ঘটে। প্রথমে ফেরুঢুপি নামক একজন ফকির বহু লোকজন সহ রাজ্যের পশ্চিম সীমানায় উপস্থিত হন। কাছাড়ী রাজার সৈন্যবল কম থাকায় কোন উপায়ান্তর না দেখে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র উত্তর কাছাড়ে পলায়ন করেন। এ সময় বহু হিন্দু প্রজা ধর্মলোপের ভয়ে শ্রীহট্ট (সিলেট) ও জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকেন। তৎসময়ে ফকিরের এ কেরামতি দেখে অনেক বিধর্মী লোক মুসলিম ধর্মগ্রহণ করে। তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ব্রিটিশ সরকারের শরণাপন্ন হলে কল্যাণ সিংহ নামক একজন সৈনিক, অনেক সৈন্যসহ ফকিরকে দমন করবার জন্য প্রাচীন শ্রীহট্ট হতে প্রেরিত হয়। ফকিরকে বিতাড়িত করার পর কল্যাণ সিংহ নিজে কাছাড় দখল করতে লোভ করায় ব্রিটিশ নিয়োজিত শ্রীহট্টের কালেক্টর সাহেব, বদরপুরের পুরাতন কাছাড়ী দুর্গ সংস্কার করে কল্যাণ সিংহকে ১৭৯৯-১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পরাস্ত করেন।
জনশ্র“তি রয়েছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মুসলিম পীর ফেরুঢুপি পীর সাহেবের ভয়ে উত্তর কাছাড়ে পলাতক অবস্থায় থাকাকালে অনেক গীত বা গান রচনা করেন।
আরেকবার একজন মুসলিম পীর ভূবন পাহাড় হইতে অবতরণ করে আলি! আলি! এই রণ শব্দে সমস্ত দেশকে ভড়কিয়ে দেন এবং তাঁর সাথে অনেক মুসলমান যোগদান করেন। হিন্দুগণ আগের মত এবারও জঙ্গলে ও শ্রীহট্টে পলায়ন করে স্বধর্ম রক্ষা করে। পীর সাহেব হাইলাকান্দি হয়ে ত্রিপুরা চলে যাওয়ায় হিন্দুরা আবার স্বস্থানে চলে আসে।
ঋণ ও অন্যান্য উপায়ে ৮০,০০০ (আশি হাজার) টাকা সংগ্রহ করে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তীর্থযাত্রা করেছিলেন। প্রত্যাবর্তনকালে তিনি লক্ষ্য করেন যে, শ্রীহট্ট রাজ্য (বর্তমান সিলেট), জৈয়ন্তিয়া রাজ্য প্রকাশ জৈন্তা রাজ্য (জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট) এসব স্থানে চৌধুরী, মজুমদার প্রভৃতি উপাধি ভূষিত লোক প্রত্যেক পরগণায় বাস করতেছে। তিনিও চিন্তা করছিলেন অর্থ গ্রহণপূর্বক উপযুক্ত হিন্দু এবং মুসলমান প্রজাদিগকে নতুন নতুন উপাধি প্রদান করলে রাজকোষ যথেষ্ট ধন পরিপূর্ণ হবে, এ ভেবে প্রজাদিগকে কয়েকবার আহŸানও করেছিলেন। কিন্তু ১৮১৩ খ্রি. উপাধি দানের পূর্বেই রাজা পরলোক গমন করেন। ‘পরে রাজা গোবিন্দ চন্দ্র জৈষ্ঠভ্রাতার সিংহাসনে আরোহণ করে কৃষ্ণ চন্দ্র প্রস্তাবিত উপাধি প্রদান বিষয় সুসম্পন্ন করেন। ১৮১৭ (এক হাজার আটশত সতের) খ্রিস্টাব্দ বাংলা ২১শে শ্রাবণ ১৭৩৯ শকাব্দ উপাধি দান কাজ শুরু হয়। অভিনব এ উপায়ে রাজকোষে বিশাল অর্থ সঞ্চিত হয়েছিল। হিন্দুদের জন্য ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, হীদলা, পাটনী, নাথ প্রভৃতি এবং মুসলমানদের জন্য চৌধুরী, মজুমদার, লস্কর এবং ভুঁইয়া এই ৪ চারি প্রকার উপাধি প্রদান করেন।
উপাধিগুলোর মূল্য যথাক্রমে নিæে উল্লেখ করা হল :
পদবী মূল্য মান/ টাকা
চৌধুরী ১০০
মজুমদার ৫০
লস্কর ২৫
ভূঁইয়া ১৫
প্রত্যেক বিভাগের উপাধি প্রাপ্ত ব্যক্তিগণের নাম উল্লেখ করে রাজা এক একটি ফরমান জারি করেন। এই ফরমান ১৫২৫ ইঞ্চি আকারের ভুটিয়া কাগজে লিখিত হয়। এরপর দুই বৎসর পর্যন্ত আরো বহু লোক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এক এক খণ্ড ভুটিয়া কাগজে লিখিত উপাধি লাভ করেন।’ ইহার পূর্বেও সময় সময় কাছাড়ে উপাধি দান হত। একখানা দানপত্রে কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমানের নাম উল্লেখ আছেÑ১৭১৩ শকাব্দ ১১ আষাঢ় সোমবার উপাধি প্রদান করা হয়।
সিলেট-কাছাড়ের সম্পর্ক : সিলেটের সাথে কাছাড়ের সম্পর্ক সেই আদিকাল থেকেই। সিলেটের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত করিমগঞ্জ-বদরপুর-শিলচর-হাইলাকান্দি-কাছাড় ভারত বিভক্তি পূর্বে সিলেটের সাথে একই দেশের অংশ ছিল। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের রেফারেন্ডামের মাধ্যমে তারা পৃথক হয়েছিল। রেফারেন্ডামে পৃথক হলেও সে অঞ্চল বিশেষত কাছাড়ের সাথে সিলেটের এক আলাদা সম্পর্ক এখনও বিরাজমান। কাছাড় জেলা আসাম প্রদেশের বরাক তীরবর্তী একটি বড় শহর। মনোরম পরিবেশের এই জেলার মানুষের সাথে সিলেটে মানুষের যোগাযোগ ঘটে প্রতিনিয়ত। হিন্দু-মুসলিম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কাছাড়ের মানুষের সাথে সিলেটের মানুষের ধর্মীয়-সামাজিক সম্পর্কের বিনিময় হয় নিত্যনৈমিত্তিক। বিশেষ করে সাহিত্য-সাংস্কৃতি ক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের সম্পর্ক বিনিময় ও যোগাযোগ একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিলেটের কোনো সাহিত্য অনুষ্ঠানে যেমন কাছাড় থেকে অনেক কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক এসে শরিক হন তেমনই সিলেটের কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকরাও কাছাড়ের কোনো সাহিত্য-সংস্কৃতিসভার দাওয়াত পেলে সেখানে অংশগ্রহণ করে থাকেন। সিলেটের প্রাচীনতম সাহিত্য প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ও সুরমা নন্দিনীর অনুষ্ঠানে বরাক নন্দিনী ও কাছাড়ের অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনেক কবি-সাহিত্যিক যোগদান করেন। অন্যদিকে কাছাড়ের আমন্ত্রণে অনেক অনুষ্ঠানে সিলেটের অনেক কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-প্রকাশক-সংগঠক অংশগ্রহণ করে থাকেন।
মোহাম্মদ মোশ্তাক চৌধুরী রচিত কাছাড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা বইটি চার অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায় ভারত ভ্রমণ ভাবনা, এখানে বর্ণনা করেছেন ভ্রমণের জন্য তিনি কেন ভারতকে বেছে নিলেন। শিলচর ভ্রমণের আনন্দ স্মৃতি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এসে তিনি নতুন করে আবিষ্কার করেন শিলচর হাইলাকান্দি এবং কাছাড়কে, তখনই তাঁর ভেতরে ভারত ভ্রমণের প্রেরণা জাগে। ২০১৪ সালে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর আকাক্সক্ষার কিছুটা পূরণ করেন। শিলচরের দিনলিপিতে বেশ মজার স্মৃতিকথার প্রাঞ্জল বিবরণ দেখতে পাই-ভ্রমণে গিয়ে কী পরিমাণ আনন্দে মেতে ছিলেন এটা তার কৌতুকপ্রবণ পরিকল্পনা থেকে বুঝা যায়। শিলচরে গিয়ে দাঁতের ডাক্তার দেখানোর ইচ্ছে হয়। এই ইচ্ছাটি আসলে রোগ যন্ত্রণা থেকে তৈরি হয়নি বরং আনন্দ ভ্রমণের এক ব্যতিক্রম চিন্তা ভাবনা। দিনলিপির একটি চুম্বক অংশ‘আমি হেঁটে হেঁটে শহরটি দেখার চেষ্টা করলাম খুবই ভালো লাগলো। শহরটিকে খুব বিশাল বড় মনে হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল আমাদের সিলেট শহরের মতোই একটা সাদামাটা শহর। তবে এবং ময়লার সংখ্যা বেশিই মনে হল। আমাকে যা অনেক আকর্ষণ করেছিল তা হল যত হাঁটি ততই ভালো লাগে, মনে হয় আমার অনেক পূর্বে থেকে চেনা হৃদয় জুড়ানো একটি শহর। কারণ সকল মানুষের হাঁটা চলা বলা ফেরা সকল কিছুই আমাদের প্রিয় সিলেটের মতোই।’ লেখকের এই যে বর্ণনাভঙ্গি এত্থেকে স্পষ্টত প্রমাণিত হয় যে ভূমি ভাগ করলেও হৃদয় ভাগ হয় না। তিনি যেন নিজেরই সবকিছু দেখতে পেলেন ওখানে। এখানে মানুষ তো স্বজন,ভূমি তো আপন, পরিবেশ বৈচিত্র এ তো আমাদের শহর। কখনও বিদেশ মনে হয় না, বিভাজন মনে পড়ে না। দ্বিতীয় অধ্যায়ে চারজন গুণী মানুষের সংস্পর্শের কথা : সাংবাদিক তৈমুর রাজা চৌধুরী তিনি শিলচর এর বহুল প্রচারিত পত্রিকা ‘দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ’ এর সম্পাদক। অধ্যাপক রামেন্দু ভট্টাচার্য : তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি। ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জলিল : তিনি একজন সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। মিলন উদ্দিন লস্কর : তিনি সাংবাদিক, সমাজসেবক, এবং বিশিষ্ট সংগঠক। ঈদ সম্মিলনী উদ্যাপন কমিটি শিলচর ২০১৪ এর সভাপতি । এই চার গুণী ব্যক্তির পরিচয়ের উদ্দেশ্য হল, আমাদের অস্থি কোথায় আছে আমরা তা জানি, বিদেশীরা জানে না। কবি দিলওয়ার লিখেছেন,
পদ্মা সুরমা মেঘনা যমুনা...
অশেষ নদী ও ঢেউ
রক্তে আমার অনাদি অস্থি
বিদেশে জানে না কেউ
আমাদের রক্তে একই জল, একই স্রোত আর অশেষ ঢেউ এটা আমরা জানি, শিলচর জানে; বিদেশিরা জানে না। তৃতীয় অধ্যায়ে উঠে এসেছে কাছাড় রাজ্যের ইতিহাস। কাছাড় একটি প্রাচীন রাজ্য। কাছাড়ের সমতলভাগ বরাক নদীর উপত্যকা এবং ভূগোলের হিসাব অনুসারে সুরমা উপত্যকার পূর্বের অংশ। কাছাড়ের ঐতিহাসিক তথ্য দু®প্রাপ্য হলেও প্রচলিত জনশ্র“তি, লোককাহিনি ও গীতিকাব্যের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। মহাভারতের কাহিনি অনুযায়ী অর্জুন পূর্বাঞ্চলের স্ত্রী রাজ্যের রাজকন্যা প্রমিলা, ভীম হৈড়ম্ব দুহিতা হিড়িম্বার পানি গ্রহণ করেছিলেন। তাই পণ্ডিতেরা স্ত্রী রাজ্য হিসাবে জৈন্তা বা জয়ন্তিয়া এবং হৈড়ম্ব রাজ্য হিসাবে কাছাড়কেই আবিষ্কার করেন। চতুর্থ অধ্যায়ে ব্রিটিশ শাসনের আলোচনা : ভারতবর্ষের ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসনের অবতারণা আসলেই ইতিহাসেরই অংশ। মোশতাক চৌধুরী গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে ব্রিটিশ শাসনের আলোচনা করে বইটি সমাপ্ত করেছেন।
বইটির উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো প্রথম অধ্যায় : ভারত ভ্রমণ ভাবনা, শিলচর ভ্রমণের দিনলিপি, ১৮ আগস্ট ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, রক্ত দিয়ে লেখা অভিন্ন ভাষা‘বাংলা’ বাংলাদেশ ও ভারতে, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্র“য়ারী বাংলা ভাষার জন্য শহীদ, ১৯৬১ সালের ১৯শে মে বাংলা ভাষার জন্য শহীদ, সিলটি ভাষা : বাংলাদেশ- ভারতে এক অভিন্ন ও অনবদ্য সংযোজন। দ্বিতীয় অধ্যায় : ভ্রমণকালীন সময়ে চারজন গুণী মানুষের সংস্পর্শ, সাংবাদিক তৈমুর রাজা চৌধুরী, অধ্যাপক রামেন্দু ভট্টচার্য, ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জলিল লস্কর, সাহিত্য সংগঠক মিলন উদ্দিন লস্কর। তৃতীয় অধ্যায় : কাছাড়ের ইতিহাস ছোঁয়া, কাছাড় রাজ্য, রাজা লক্ষীচন্দ্র, নবাব গুলু মিয়া, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রাজা গোবিন্দচন্দ্র, কাছাড়ে মনিপুরী জাতির বিবরণ, দুধ-পাতিল মৌজা, বিচারকার্য্য। চতুর্থ অধ্যায় : ব্রিটিশ শাসন, কাছাড়ে ব্রিটিশ শাসনের আলোকপাত, উপাধি দান সম্বন্ধে একখানা আদেশপত্রের নকল, ব্রিটিশ রাজত্বের প্রারম্ভে বিভিন্ন উপাধির মূল্যমান, Assam Lagislative Assembly–MLA 1937–1946, Assam Lagislative Assembly–MLA 1946–1952। ভ্রমণ কাহিনির পাঠক মাত্রই খোঁজেন নির্দিষ্ট স্থানের স্বচ্ছ ছবি, স্থান সম্পর্কে তত্ব ও তথ্য আর চটকদার নতুন অভিজ্ঞতা। মোহাম্মদ মোশ্তাক চৌধুরী মাত্র চারদিনের অভিজ্ঞতা যখন বইয়ের মলাটে রূপ নেয়, তখন আমরা বিস্মিত হই না। কারণ তিনি একজন সফল ব্যাংকারও। কিন্তু এটাতো লিখতেই হবে, ব্যাংকার হলেই লেখায় শক্তি থাকে না। মোশ্তাক চৌধুরীর সেটা রয়েছে। তাঁর প্রমাণ কাছাড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নান্দনিকতা। এক বসাতেই পঠনীয় বইটি কাছাড়ের মানুষ, প্রতিবেশ ও তাদের আতিথেয়তার প্রতিচ্ছবি পাঠকের সম্মুখে তুলে ধরতে সক্ষম। বইটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন আসাদ-উজ-জামান। প্রকাশ করেছে পাণ্ডুলিপি প্রকাশন, সিলেট। মূল্য রাখা হয়েছে একশত পঞ্চাশ টাকা। সবমিলিয়ে ভ্রমণ পিপাসু পাঠকদের জন্য তাঁর বইটি সুখপাঠ্য হবে তবে পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাঁকে আরও গোছালো হতে হবে। কাছাড়ের ইতিহাস ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার সাফল্য কামনা করছি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক-পাণ্ডুলিপি প্রকাশন