সাইদুরের শেষ স্ট্যাটাসই তার জীবনে সত্যি হয়ে গেলো
   24 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 4 June 2015 দূর্ঘটনা  (পঠিত : 2097) 

সাইদুরের শেষ স্ট্যাটাসই তার জীবনে সত্যি হয়ে গেলো

     

সাঈদ নোমান: নিজের ফেইসবুকে তার শেষ স্ট্যাটাস ছিল- ‘লাইফ ইজ এ ভেরী নাইস স্টোরী, উই ক্যান নট কমপ্লিট, বাট ডাই’, সেই স্ট্যাটাসই নিজের জীবনেও এতো তাড়াতাড়ি এমনি মিলে যাবে হয়তো ভাবতেই পারেননি সাইদুর। সত্যি সত্যি জীবনের রঙিন গল্পের সেই পাঠ সমাপ্ত হয়ে গেলো সাইদুরের। যুদ্ধের শেষ পর্বে স্বপ্নকে ছুঁবার সময় এসেছিল বিজয়ী সৈনিকের। তবে স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়ে তছনছ হয়ে গেছে সব। সাইদুর রহমান। সিলেট এমসি কলেজের গণিত বিভাগের মাস্টার্স প্রথম বর্ষের মেধাবী মুখ। একই বিষয়ে ২য় বিভাগ পেয়ে অনার্স (সম্মান) উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। গত শুক্রবার ঢাকায় আয়োজিত এক্সিম ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে সিলেট থেকে ঢাকার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাইদুর। যাবার আগে স্বাপ্নিক সাইদুর নিজের ফেইসবুকে পোস্ট দেন ওপরের স্ট্যাটাসটি। এরপর ঢাকায় গাড়িতে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। তারপর বিভিন্ন গাড়ীর সাথে বার কয়েক ধাক্কা। এইভাবে একসময় হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালে ৫দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানেন সাইদুর। সম্ভাবনাময় এই তরুণের মৃত্যুর সাথে ভেঙ্গে গেছে হাওর পাড়ের একটি কৃষক পরিবারের স্বপ্ন। যাদের চোখে ভাসছিলো একটি সুন্দর আগামীÑÑহাওরপারের সেই মা বাবা আর ভাই বোনের হৃদয় ফাটা আর্তনাদে বিষাদের সুর হাওরের জোসনা জলে, ভেসে যাওয়া হাওয়ায়। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার সহদেবপাশা গ্রামের কৃষক ছিদ্দিকুর রহমানের পুত্র সাইদুর রহমান। ৩ ভাই ৪ বোনের মধ্যে ছিলেন ৬ষ্ঠ। হাওরের রোদ বৃষ্টি আর ঝড়ের সাথে লড়াই করে বেড়ে উঠা সাইদুর, সফলতার সোনার চাবি ছিনিয়ে আনার সংগ্রামে ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ লড়াকু এক সৈনিক। কৃষক বাবা মা, ভাইবোনদের মুখে হাসি ফোটাতে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে মেধাবী সাইদুরের ছিল নিরন্তর পথচলা। তাইতো নিজেরে মেধা শ্রমের বিনিময়ে হাওরের কাদা মাটি মাড়িয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন নগরীতে। গণিত বিষয় নিয়ে এমসি কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেন। ছিলেন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত। হাওর এলাকা শাল্লা থেকে সিলেট নগরীতে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের সুখ দুখে এক সাথে থাকার অঙ্গীকারে গঠন করেছিলেন শাল্লা স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন-সিলেট। প্রতিষ্ঠা থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। সাইদুরের বড় ভাই লুৎফুর রহমান জানান, সিলেটে শাহজালাল উপশহরে একটি মেসে থেকে পড়ালেখা করতেন সাইদুর। ঢাকা গিয়ে এক্সিম ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেবার জন্যে গত বুধবার রাতে এনপি পরিবহনের বাসে উঠেন তিনি। লুৎফুর রহমান জানান, মৃত্যুর আগে হাসপাতালে জ্ঞান ফিরলে তার ভাই খুব কষ্টে টুকরো টুকরো করে সেই ঘটনা বলেছেন। বাসে উঠা এক যাত্রী তাকে কি যেন শুকিয়ে তাকে নিস্তেজ করে ফেলে। তারা তার সবকিছু নিয়ে যায়। এরপর বাসের চালক ও হেলপার তাকে সিলেট ঢাকা মহাসড়কের ডেমরা এলাকায় ফেলে যায়। সকালে জ্ঞান ফিরলে সাইদুর উঠে হাটা শুরু করেন। কিন্তু হাটতে না পেরে রাস্তায় পড়ে যান। এরপরও হাটতে থাকেন। এভাবে ভারসাম্যহীন অবস্থায় রাস্তায় হাটতে গিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন গাড়ীর সাথে ধাক্কা খেয়ে হাত পা মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। এভাবে একপর্যায়ে রাস্তায় একটি গাড়ীর সাথে ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হলে বিষয়টি কর্তব্যরত একজন পুলিশের নজরে আসে। পুলিশ বাহিনীর সেই মানবিকতাপূর্ণ সদস্যটি সাইদুরকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। লুৎফুর রহমান জানান, হাসপাতালে একদিন থাকার পর সাইদুরের জ্ঞান ফিরলে পাশে থাকা এক রোগী তার ঠিকানা বা মোবাইল নাম্বার জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু সাইদুর কথা বলতে না পারায় কিছু বলতে পারেননি। পরে ঔ ব্যক্তি সাইদুরের হাতে নিজের মোবাইল ফোনটি তুলে দেন। অনেকবার চেষ্টার পর সাইদুর সেই ফোন দিয়ে তার বড় ভাই লুৎফুরের মোবাইল ফোনে কল দিতে সক্ষম হন। কিন্তু কথা বলতে পারছিলেন না। তখন ফোনসেটের মালিক লূৎফুরকে সাইদুরের অবস্থা জানান। লুৎফুর রহমান আরো জানান, খবর পেয়ে তিনি ঢাকায় হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, তার ভাইয়ের হাত পা মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন। মাঝে মধ্যে জ্ঞান ফিরলে একটু একটু করে সাইদুর তাকে এসব ঘটনা বলেন। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাইদুরের মৃত্যু হয়। ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখ সাইদুরের অনাকাক্স্খিত মৃত্যুর খবর শুনে এমসি কলেজের শিক্ষক শিক্ষার্থী বন্ধু ও শুভাকাঙ্খি মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। শেষবারের মত প্রিয় বন্ধুকে দেখতে অনেকেই ছুটে যান তার গ্রামের বাড়ি শাল্লাতে। এদিকে আমাদের শাল্লা সংবাদদাতা হাবিুবর রহমান জানান, এলাকার মেধাবী ও প্রিয় মুখ সাইদুরের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের আশার আলো ছেলেটিকে হারিয়ে মা বাবা ও ভাই বোন যেন পাগলপারা। ঢাকা থেকে এম্বুলেন্স যোগে গতকাল বুধবার লাশ বাড়িতে আনা হয়। শাল্লা ধামপুর খেয়াঘাট মাঠে তার প্রথম জানাযার নামাজ ও পরে নিজ গ্রাম সহদেবপাশা জামে মসজিদের মাঠে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।


Free Online Accounts Software