সিলেট ও শিলচরে বাংলা ভাষা আন্দোলন
   18 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 19 May 2015 মুক্তিযুদ্ধ  (পঠিত : 2027) 

সিলেট ও শিলচরে বাংলা ভাষা আন্দোলন

সিলেট ও শিলচরে বাংলা ভাষা আন্দোলন
     

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: ভাষা মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রধান বাহন। ভাষার উদ্ভব ও বিকাশ মানব সভ্যতায় বড়ো ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করেছিলো। তাই সভ্যতার ক্রমবিকাশে ভাষাকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নাই। মানুষের জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে তার মাতৃভাষার প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। শিশু এই পৃথিবীতে এসে প্রথম যে ভাষা ও ধ্বনির সঙ্গে পরিচিত হয় তা তার মাতৃভাষা। সবচেয়ে ভালোবাসা আর উষ্ণতা লাভ করে যে মায়ের কাছ থেকে তার ভাষাই তার আপন হয়ে ওঠে। তাই মায়ের ভাষা মানুষের কাছে মহামূল্যবান। সুখে-শোকে-ক্ষোভে-আনন্দে-উচ্ছ¡লতায় মানুষের সব অনুভূতির সত্যিকার প্রকাশ পায় তার মাতৃভাষাতেই। বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলা। তাই সে বাংলায় কথা বলতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্তু দেখা যায় ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাঙালির প্রাণের ভাষাকে দমিয়ে রাখা হয়েছে কিংবা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্র“য়ারি বাংলার দামাল ছেলেরা তাদের মায়ের ভাষার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের মাতৃভাষার অধিকার। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীতে বাংলাদেশের বাঙালিরাই একমাত্র জাতি নয় যারা আপন ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে এবং বুকের রক্ত দিয়েছে। কিন্তু এই রকম উন্নাসিক চিন্তা ও মিথ্যা তথ্যের নজির আমরা পাই আমাদের গল্প ও ইতিহাসের বইগুলোতে যা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে প্রকারন্তরে প্রশ্নবিদ্ধ করে; বাংলাভাষী সংগ্রামী জাতি হিসেবে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত লজ্জিত করে। বাংলার জন্য শুধুমাত্র বাংলাদেশের বাঙালিরাই জীবন উৎসর্গ করেনি, করেছে আসামের জনগণও।
বিভক্ত উপমহাদেশে দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দিকে ভারতীয় জনগণ ও রাষ্ট্রনায়কেরা গ্রহণ করে নেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হিন্দির পক্ষে তার মতামত দিয়ে যান। কিšু— বিপত্তি দেখা দেয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে। সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে হিন্দির বিপরীতে উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের উদ্যোগ নেন তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকবর্গ। কারণ ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভারত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, পাকিস্তান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। ভারতীয় এই দুই প্রধান স¤প্রদায়ের দুই রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। তাদের দুই প্রধান ভাষা হিন্দি ও উর্দু। এ চেতনা থেকে হিন্দিকে ভারতের এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ গৃহীত হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো উর্দু পাকিস্তানের কোনো অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা নয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মাতৃভাষাও উর্দু ছিল না। জিন্নাহর পিতা ছিলেন গুজরাটের আদি বাসিন্দা। তিনি করাচিতে ব্যবসা করতেন। তাদের ভাষা ছিল মূলত গুজরাটি। একমাত্র ইসলামি চেতনা থেকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল। হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ভাবধারায় পুষ্ট হিন্দি ভারতের রাষ্ট্রভাষা হলে ইসলামি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ভাবধারায় লালিত উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। মূলত হিন্দু-মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে এ ধারণা প্রাধান্য পায়। কিন্তু পূর্বপাকিস্তানের জনগণ এককভাবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় ভূষিত করতে আপত্তি জানায়। উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় ভূষিত হোক, এ ইচ্ছা পূর্বপাকিস্তানের জনগণ সার্বিকভাবে পোষণ করতেন। কারণ খণ্ডিত ভারতে নতুন সৃষ্ট পাকিস্তানে বাংলা অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা। এ যুক্তি থেকেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন জাগ্রত হয়। ফলে শাসকদলের সঙ্গে ভাষার প্রশ্নে পূর্বপাকিস্তানের জনগণের মতান্তর ঘটতে থাকে। যার ফলে সাতচল্লিশ থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’-এর নেতৃত্বে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। যার পরিণতিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউরসহ আরও অনেক। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষায় প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে তাদের নাম রক্তের বিনিময়ে সোনালি হরফে লেখা হলো এবং ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। দীর্ঘ সংগ্রামের পর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত।
আসামের বাংলাভাষী অঞ্চলেও ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল। একতরফা অহমীয় ভাষাকে আসামের রাজ্যভাষা করতে গেলে আসামের বাঙালি জনগণ বাংলাকে রাজ্যভাষা করার দাবি তুলেন। এ দাবির প্রেক্ষিতে আন্দোলনে ১১ জন আত্মদান করেন। ভাষার জন্য তাদেরও রক্ত ঝরে সে কথা বাংলাদেশের মানুষ জানতো না। সে খবর সর্বপ্রথম বাংলাদেশে সচেতনভাবে প্রকাশ পায় ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে। ওই বছর শিলচরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে দ্বাষষ্টিতম অধিবেশনে প্রখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ড. আশরাফ সিদ্দিকী যোগদান করেন। শিলচরের ভাষাসংগ্রাম ও ভাষাশহিদদের কথা তাকে জানানো হয়। তিনি দেশে এসে বরাকের রক্তঝরা ভাষাসংগ্রামের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করেন। বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে ভারতের আসামেও ভাষাসংগ্রাম হয়েছিল। আমাদের সংগ্রাম ছিল উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু করা। আর তাদের সংগ্রাম ছিল রাজ্য সরকার কর্তৃক অহমীয় ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষা রাজ্যভাষা হিসেবে চালু রাখা। অহমীয় ভাষাকে একক প্রাদেশিক ভাষায় রূপ দিয়ে আসাম বিধান সভায় ‘রাজ্যভাষা বিল’ উত্থাপিত হলে তাদের সংগ্রাম শুরু হয়। দীর্ঘদিন এ আন্দোলন চলতে থাকে। আন্দোলন তীব্রতর হলে ভাষাসংগ্রামীরা মাতৃভাষার দাবিতে শিলচর রেলস্টেশন অচল করে দিতে জমায়েত হন। পুলিশ জনসমাবেশে গুলি চালায়। ফলে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে ১১ জন ভাষাসংগ্রামী শহিদ হন। রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রাজ্যভাষার মর্যাদা লাভ করে। ভাষাসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আরও তিনজন শহিদ হন।
ভাষা আন্দোলনে সিলেট অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে। সিলেটে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই। বাহান্নর মার্চ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে সিলেট উত্থাল ছিল। ঢাকার বাইরে সিলেটের জনজীবনেই ভাষা আন্দোলন ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, মাসিক আল-ইসলাহ, সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকা বাংলা ভাষার পক্ষে সাহসী ভূমিকা পালন করে। সিলেটের মহিলারাও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এমনকি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষার পক্ষে প্রথম জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় সিলেটে। তাই মাতৃভাষা আন্দোলনে সিলেটের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সিলেটে ভাষা আন্দোলন :
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৯ নভেম্বর কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত আসরের মূল বিষয় ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সেখানে শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক মুসলিম চৌধুরী ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। ওই প্রবন্ধে বিরুদ্ধবাদীদের সম্ভাব্য যুক্তি নাকচ করে দিয়ে তিনি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার পক্ষে জোরালো মত ব্যক্ত করেন। এছাড়া ৩০ নভেম্বর সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা হলে এক সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়। পূর্বপাকিস্তানের ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু হওয়া উচিত’ এ বিষয়ে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত রসসাহিত্যিক-অনুবাদক মতিন উদ্দীন আহমদ। প্রবন্ধ পাঠ করেন হোসেন আহমদ। প্রধান বক্তা ছিলেন ভাষাবিদ ড. সৈয়দ মুজতবা আলী। ঐতিহাসিক এ সমাবেশ সম্পর্কে শহরে রটে যায় যে, ওইদিন বাংলা বনাম উর্দু বিতর্ক হতে যাচ্ছে। তাই লোক সমাগম হয় অপ্রত্যাশিত। বিরোধীরা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে আসে মাদ্রাসা হলে। তাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের জন্য অধিবেশনটি শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়নি। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার বাইরে এসব তৎপরতা ছিল নজিরবিহীন। বাংলা ভাষার পক্ষে এই সমাবেশকে দেশের প্রথম সমাবেশরূপে অভিহিত করা যায়। তারপরও ৮ ডিসেম্বর আরেকটি সভা হয় শিক্ষাবিদ নজমুল হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে। এতে প্রবন্ধ পাঠ করেন জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। বাংলা ভাষা নিয়ে অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবী যখন দ্বিধাদ্ব›েদ্ব ভুগছিলেন তখন মফস্বল শহর সিলেট থেকে সাহসী এসব পদক্ষেপ ছিল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সাপ্তাহিক নওবেলাল যখন বাংলার পক্ষে সাহসী ও জোরালো আওয়াজ তুলে, তখন ঢাকা থেকে কোনো দৈনিক প্রকাশিত হয়নি। ভাষা আন্দোলনে দীর্ঘ পথপরিক্রমা অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-মরমি কবির জন্মভূমি, শাহজালাল (রহ.) ও তিনশ’ ষাট আউলিয়র কর্মভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট প্রতিকৃতের ভূমিকা পালন করে। ভাষা আন্দোলন শুধু সিলেটেই নয়, অনেক সিলেটি ঢাকায় ভাষা আন্দোলনে উজ্জ্বল অবদান রেখেছেন। রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিভিত্তিক উভয় ময়দানে ঢাকাবাসী সিলেটিদের উপস্থিতি ছিল সামনের সারিতে।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর সাংস্কৃতিক সংগঠন পাকিস্ত—ান তমদ্দুন মজলিস ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করে। এ সংগঠনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বহুল আলোচিত এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কথাসাহিত্যিক সিলেটের কৃতিসন্তান অধ্যাপক শাহেদ আলী। তিনি ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
এছাড়া সিলেট থেকে ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন আব্দুস সামাদ আজাদ (সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী), কথাশিল্পী সৈয়দ শাহাদাত হোসেন, সাহিত্যিক চৌধুরী গোলাম আকবর, শাহ এএমএস কিবরিয়া (সাবেক অর্থমন্ত্রী), এম সাইফুর রহমান (সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী) জাকারিয়া খান চৌধুরী, কুলাউড়ার রওশন আরা বাচ্চু, আহমদ কবির চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ ড. আখলাকুর রহমান, এসএম আলী (ডেইলি স্টারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক), মাহবুবুল বারী, মোয়াজ্জেম আহমেদ চৌধুরী, সদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী (শাবিপ্রবির প্রথম ভিসি), আবুল মাল আব্দুল মুহিত (বর্তমান অর্থমন্ত্রী), মোঃ ইলিয়াসুর রহমান প্রমুখ। ভাষা আন্দোলনে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত আল-ইসলাহ এবং রাজনীতিবিদ মাহমুদ আলী পরিচালনাধীন ও দেওয়ান মুহম্মদ আজরফ সম্পাদিত সাপ্তাহিক নওবেলাল অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকেই বাংলা ভাষার বিতর্কটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১১ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকারের যানবাহন ও যোগযোগমন্ত্রী আব্দুর রব নিশতার সিলেটে সফরে আসেন। এ সুযোগে সিলেট মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের আবদুস সামাদের নেতৃত্বে এবং মহিলা মুসলিম লীগের জেলা শাখার সভানেত্রী জোবেদা খাতুন চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মহিলা প্রতিনিধিদল মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এর পরপরই বাংলার বিপক্ষে এবং উর্দুর পক্ষে শহরে একটি প্রচারপত্র বিলি করা হয়। তমদ্দুন মজলিস এবং সিলেট জেলা ছাত্র ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মার্চ স্থানীয় গোবিন্দ পার্কে (বর্তমানে হাসান মার্কেট) এক জনসভা আহŸান করা হয়। এতে সভাপতি ছিলেন মাহমুদ আলী। সভা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে বাংলা ভাষা-বিরোধী পক্ষ লাঠি নিয়ে হামলা চালিয়ে সভাপতির চেয়ার দখল করে নেয়। এতে মাহমুদ আলী, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, তমুদ্দিন মজলিসের সম্পাদক আব্দুস সামাদ, মকসুদ আহমদ ইটপাটকেলের শিকার হন। ফলে সভাটি পণ্ড হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে ১০ মার্চ গোবিন্দ পার্কে সভা আহŸান করলে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দু-মাসের জন্য ভাষা সম্পর্কিত সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেন। এ নিষেধাজ্ঞা সত্তে¡ও জনসভার পক্ষে জনমত প্রবল দেখে ডেপুটি কমিশনার এম মুর্শেদকে দিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করানো হয়। বিষয়টি শুধু জেলা পর্যায়ে নয়, পাকিস্তান সরকারের উর্ধ্বতন মহলেও চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছিল। উর্দু সমর্থকরা বাংলা সমর্থকদের কোনঠাসা করার জন্য ‘ওরা পাকিস্তানের দুশমন, সদ্য স্বাধীন দেশে ওরা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে শিশু রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে চায়’ এ ধরনের প্রচারণার জবাবে ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি বিবৃতিতে দেন। এই বিবৃতিটি তৈরির উদ্যোক্তা ছিলেন ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত রেফারেন্ডাম বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ এডভোকেট।
শহরের জিন্দাবাজারে সাপ্তাহিক নওবেলাল অফিস বাংলা ভাষার পক্ষের কর্মীদের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ভাষাসৈনিক সা’দত খানের স্মৃতি অনুযায়ী এ পর্যায়ে সংগঠক হিসেবে তরুণদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পীর হবিবুর রহমান, আসাদ্দর আলী, শাহজালাল দরগাহ’র মোতাওয়াল্লী এজেড আব্দুল্লাহ, সাবেক মন্ত্রী গোলাপগঞ্জের নুরুর রহমান, হাজেরা মাহমুদ, ব্যবসায়ী আব্দুর রহীম, মতচ্ছির আলী, মুুনির উদ্দিন, সৈয়দ মোতাহির আলী, কদমতলীর আব্দুল হামিদ, ছাত্রদের মধ্যে আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সৈয়দ সুহরাব বখত, উবেদ জায়গীরদার, নজির উদ্দিন আহমদ, সোনাহর আলী, ইসহাক মিয়া, সৈয়দ আকমল হোসেন, আব্দুল মজিদ, দেওয়ান ফরিদ গাজী, কমরেড তারা মিয়া, সফাত আহমদ চৌধুরী, মুহিবুর রহমান (ছন্দু মিয়া), কবির চৌধুরী, বরুণ রায়, অনিমেশ ভট্টাচার্য, মো. আব্দুল আজিজ, মোহাম্মদ মসউদ খান প্রমুখ।
ভাষা আন্দোলনে মহিলাদের মধ্যে যারা নেতৃত্ব দেন তার হলেন, মহিলা মুসলিম লীগ জেলা শাখার সভানেত্রী গোলাপগঞ্জের ঢাকা-দক্ষিণ শীলঘাটের খান বাহাদুর শরাফত আলীর কন্যা জোবেদা খাতুন চৌধুরী, সহ-সভানেত্রী সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলীর বোন সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাহমুদ আলীর সহধর্মিনী হাজেরা মাহমুদ, রাবেয়া খাতুন আলী। এছাড়া সৈয়দা লুৎফুন্নেছা, শরিফুন্নেছা খানম চৌধুরী, সামসি খানম চৌধুরী, জাহানারা মতিন, রোকেয়া বেগম, নূরজাহান বেগম, সৈয়দা খাতুন, মাহমুদা খাতুন প্রমুখ ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অবদান রেখেছেন। স্কুলে কালো পতাকা তোলার জন্য স্কুলছাত্রী সালেহা বেগমকে জেলা প্রশাসকের আদেশক্রমে তিন বছরের জন্য বহিস্কার করা হয়েছিল।
সিলেট ছিল ভাষা আন্দোলনের উর্বর ক্ষেত্র। এখানে বিরোধিতাও ছিল প্রবল। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো সিলেটেও মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতারা ছিলেন উর্দুর পক্ষে। এসময় পরিষদের সদস্য ছিলেন আব্দুল হামিদ (শিক্ষামন্ত্রী), দেওয়ান তৈমুর রাজা (পার্লামেন্টারিয়ান সেক্রেটারি), দেওয়ান আবদুল বাসিত, দেওয়ান আবদুর রব চৌধুরী ও মঈনুদ্দিন চৌধুরী। এছাড়া আজমল আলী চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন এটিএম মাসুদ, মাওলানা রজিউর রহমান, বসু মিয়া, ময়না মিয়া, মদব্বির হোসেন চৌধুরী, শহীদ আলী, ডা. আবদুল মজিদ প্রমুখ নেতারাও নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে উর্দুকে সমর্থন করেন। পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মাওলানা ইব্রাহিম চতুলী ও মাওলানা আবদুর রশীদ বাংলার পক্ষে হলেও প্রকোশ্যে সামনে আসতে পারেননি। ফলে সিলেটে প্রবল প্রতিক‚লতা মোকাবিলা করেই আন্দোলন চালাতে হয়েছে। সিলেটের আলেম সমাজের একটি বিরাট অংশ ছিলেন বাংলার পক্ষে। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্র“য়ারি মাসের মাঝামাঝি সিলেটের কয়েকজন বিশিষ্ট মহিলা পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন মহিলা মুসলিম লীগের জেলা কমিটির সভানেত্রী জুবেদা খাতুন চৌধুরী, সহ-সভানেত্রী সৈয়দা শাহার বানু, সম্পাদিকা সৈয়দা লুৎফুন্নেছা খাতুন, সৈয়দা নজিবুন্নেছা খাতুন প্রমুখ।
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ ফেব্র“য়ারি ভোর থেকেই সারা দেশের মতো, সিলেট ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। সকাল থেকেই ছাত্র জনতা মিছিল করে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করতে থাকে। সকাল ১০টায় সিলেট রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সদস্যরা এক জরুরি সভায় মিলিত হয়ে পরবর্তী কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সারা শহরের দেয়াল পোস্টারে ছেয়ে যায়। স্কুল কলেজের ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হয়। সিলেটের মেয়েরাও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। সেই মিছিলের স্লোগান ছিল খুনের বদলা খুন চাই, নুরুল আমিনের ফাসি চাই, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। গোবিন্দ পার্কের ভিতরের লাইট পোস্টের নিচে গোল করে মেয়েরা বসে পরে। ছেলেরা দূরত্ব বজায় রেখে মেয়েদের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন বাংলার বিরোধীরা নীরব ছিল। ভাষাসৈনিকরা নেমে পড়েন রাস্তায় জমজমাট হয়ে উঠে সিলেটের গোবিন্দ পার্ক। সভার পর সভা চলতে থাকে। বিকাল ৪টায় বার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ বিএলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল সমাবেশ। সমাবেশ থেকে হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করে পরদিন আবার পূর্ণ দিবস হরতালের ঘোষণা দিয়ে সভা শেষ হয়। সভার গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী সভা শেষে একটি প্রতিনধি দল স্থানীয় এমএলএ ও মুসলিম লীগ সরকারের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি তৈমুর রাজা চৌধুরীর বাসভবনে গিয়ে তার পদত্যাগ দাবি করেন। সভা শেষে এক দীর্ঘ মিছিল রাত ৮টা পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। পরদিন শহর ও শহরতলীতে পালিত হয় পূর্ণ দিবস হরতাল। অফিস আদালত বন্ধ থাকে। শাহজালাল দরগাহ মসজিদে শহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
সিলেটে ২২ থেকে ২৫ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত একটানা হরতাল, শোভাযাত্রা ও সমাবেশ হয়েছে। গোবিন্দ পার্কে ২২ ফেব্র“য়ারি মো. আব্দুল্লাহ’র সভাপতিত্বে, ২৩ ফেব্র“য়ারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক আব্দুল মালিকের সভাপতিত্বে, ২৪ ফেব্র“য়ারি মুক্তার দবিরুদ্দিন চৌধুরী সভাপতিত্বে ও ২৫ ফেব্র“য়ারি মনির উদ্দিন এডভোকেটের সভাপতিত্বে বিলাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে ৫ মার্চ গোবিন্দ পার্কের সমাবেশটি ছিল সবচেয়ে বড়ো। এতে সভাপতিত্ব করেন আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ এডভোকেট।


আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলন :
১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্র“য়ারিতে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার ও সফিউর। বাহান্নর চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিবাদে ভারতের রাজ্য আসামের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন ভাষাশহিদ। আসাম রাজ্যর প্রধান ভাষা অহমীয়া হলেও বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ, কাছাড় ও শিলচর হলো বাঙালি অধ্যুষিত। দেশবিভাগের একবছর পর ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সুরমা ভ্যালি (বর্তমান সিলেট বিভাগ) পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের তিন-চতুর্থাংশ নিয়ে বরাক ভ্যালি থেকে যায় আসামে। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে আসাম প্রাদেশিক সরকার শুধু অহমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা দিলে ক্ষোভ দানা বাঁধে বাঙালিদের ভেতর। ক্রমশ তা রূপ নেয় আন্দোলনে। প্রথমে সত্যাগ্রহ, পরে সহিংসতাপূর্ণ আন্দোলন হয়।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বে এদিন শিলচরে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ধর্মঘট পালন করা হয়। বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ভাষাবিপ্লবীরা যখন স্থানীয় রেলওয়ে স্টেশনে রেলপথ অবরোধ পালন করছিল তখন নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত আসাম রাইফেলসের একটি ব্যাটালিয়ান তাদের বাধা দেয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আসাম রাইফেলস গুলিবর্ষণ করলে ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাবিপ্লবী। আহত হন অর্ধশতাধিক ভাষাসৈনিক। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর আসামে বাংলাকে দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। সেদিন মাতৃভাষার জন্য যে ১১ জন বীর আত্মদান করেন তাদের মধ্যে ছিলেন পৃথিবীর প্রথম নারী ভাষাশহিদ সতের বছরের তরুণী কমলা ভট্টাচার্য। পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র দুজন নারী মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, প্রথম জন কমলা ভট্টাচার্য, দ্বিতীয় জন সুদেষ্ণা সিংহ যিনি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলনে আত্মদান করেন।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ যে ১১ জন শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান করেন তারা হলেন, ১. কমলা ভট্টাচার্য, ২. শচীন্দ্র পাল, ৩. বীরেন্দ্র সূত্রধর, ৪. কানাইলাল নিয়োগী, ৫. চণ্ডিচরণ সূত্রধর, ৬. সত্যেন্দ্র দেব, ৭. হীতেশ বিশ্বাস, ৮. কুমুদরঞ্জন দাস, ৯. তারিণী দেবনাথ, ১০. সুনীল সরকার ও ১১. সুকুমার পুরকায়স্থ। এখন প্রতি বছর আসামে ১৯ মে ভাষাদিবস পালন করা হয়। শিলচরে ১১ ভাষাশহিদের আত্মদান ও মাতৃভাষার চেতনাকে জাগ্রত রাখার উদ্দেশ্যে তাদের স্মরণে প্রতি বছর বইমেলা উদ্যাপিত হয়। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শিলচর সার্কিট হাউস রোডের বিপিন পাল সভাস্থলে একুশতম শিলচর বইমেলায় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। উক্ত মেলায় সিলেট থেকে ছয়জন লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, সংগঠক আমন্ত্রিত হন। এদের মধ্যে আমরা চারজন যোগদান করি। বইমেলার পৃষ্ঠপোষক ‘ইন্দো-বাংলা মৈত্রী, শিলচর’ লেখকদের পৃথক পৃথক পত্রে আমন্ত্রণ জানায়। আমরা শিলচর থাকা অবস্থায় শহিদ বেদি ঘুরে আসার নিমন্ত্রণ জানান ভাষাসৈনিক পরিতোষ পালচৌধুরী। ২৭ ডিসেম্বর ভোরে হোটেল থেকে শিলচরে আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী সাহিত্যিক এডভোকেট ইমাদ উদ্দিন বুলবুল ও ইন্দো-বাংলা মৈত্রীর শিলচরের সেক্রেটারি শুভদ্বীপ দত্ত মলয় আমাদেরকে শহিদ বেদিতে নিয়ে যান। ১১ ভাষাশহিদের স্মরণে গান্ধীবাগে শহিদ বেদি নির্মিত হয়েছে। গান্ধীবাগের ভেতরেই শহিদ বেদি। তখনও ফটক খোলা হয়নি। আমাদেরকে বাইরেই দাঁড়াতে হলো। এডভোকেট মজম্মিল আলি লস্কর দারোয়ানকে ডেকে এনে ফটক খুলে সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। ফটকের ভেতরে বসার মতো সেড ও পাকা বেঞ্চ আছে। দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ-এর সম্পাদক তৈমুর রাজা চৌধুরী আসার কথা। তার অপেক্ষায় থাকতে হলো। প্রায় আধা ঘণ্টা পর ক্যামেরাম্যান ও একজন সহযোগী নিয়ে তিনি এলেন। সঙ্গে ফুলের তোড়াও নিয়ে আসলেন। আমরা সবাই মিলে শহিদ বেদির দিকে রওয়ানা দিলাম। গান্ধীবাগের মধ্য দিয়ে একটি খাল। খালের অন্য পারে শহিদ বেদি। ওই পারে যাওয়ার জন্য আছে অত্যন্ত সুন্দর অথচ ছোট্ট একটি সেতু। সেতু দিয়ে আমরা সবাই ধীরে ধীরে বেদিতে পৌঁছে গেলাম। বেদিটি গোলাকার। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ের স্থাপত্যরীতি অনুসরণে নির্মিত। ভিতরে গোলাকার ছোট্ট চত্বর। আমরা এর চারপাশে দাঁড়িয়ে শহিদের বেদিতে ফুল ছিটিয়ে দিলাম। কিছু সময় শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এভাবেই আমরা শিলচরের ভাষাসৈনিকদের শ্রদ্ধা জানালাম।
ভাষা মানুষের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং স্রষ্টার অনন্য দান। মানুষ জন্মমাত্র তার মায়ের ভাষা শুনে এবং শিখতে থাকে। মাতৃভাষা তাই মানুষের খুবই প্রিয় এবং এই ভাষায় কথা বলতে সে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই অধিকার কেউ কেড়ে নিলে তার বিরুদ্ধে মানুষ ফুঁসে ওঠে। তারই বহিঃপ্রকাশ ভাষা আন্দোলন। ভিন্ন সময়ে হলেও সিলেটসহ বাংলাদেশ এবং আসামের শিলচরের ভাষা আন্দোলন একই দাবিতে। মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার্থে। আত্মদানের মাধ্যমে অর্জিত মাতৃভাষার অধিকার তাই দু-দেশেই সমান অর্থবহ। আমাদের ভাষা আন্দোলন এখন শুধু আমাদেরই নয়; আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সকল মাতৃভাষার প্রেরণার উৎস। সিলেট ও শিলচর সম্পর্ক মাতৃভাষার দিক থেকে আরও অনন্য। দু-দেশের দু-অংশের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও একই। ভাষা আন্দোলন দুই ভূ-খণ্ডের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। বাংলাদেশের একুশ ফেব্র“য়ারি আর আসামের শিলচরের ঊনিশে মে তাই একীভূত। এই সম্পর্ক চিরকাল জাগরুক থাকুক; এই আত্মার বন্ধন অটুঁট থাকুক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, প্রকাশক- পাণ্ডুলিপি প্রকাশন, সিলেট



Free Online Accounts Software