22 Nov 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 19 May 2015 আইন-অপরাধ  (পঠিত : 13440) 

ইবরাহিমের বুকে উঠে গলায় ছুরি চালান স্ত্রী ফাতেহা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি

ইবরাহিমের বুকে উঠে গলায় ছুরি চালান স্ত্রী ফাতেহা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি
     

কাউসার চৌধুরী‘ঘুমন্ত স্বামী ইবরাহিম আবু খলিলের মাথায় রেলওয়ের পাত দিয়ে আঘাত করেন স্ত্রী ফাতেহা মাশরুকা। স্ত্রীর আঘাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে প্রাণ রক্ষায় ইবরাহিম ছটফট করলেও মাশরুকা থেমে থাকেননি। পাটের রশি দিয়ে স্বামীর হাত দুটো বেঁধে বুকের উপর বসে প্রিয়তম স্বামীর গলায় ছুরি চালান। ভোর রাতে জবাই করে স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন তিনি।’ নগরীর সওদাগরটুলায় তাবলীগ জামায়াতের আমীর বধনাঢ্য ইবরাহিম আল খলিল হত্যাকান্ডের ঘটনায় তার সহধর্মিনী ফাতেহা মাশরুকা এভাবেই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে হত্যার কারণ ও জানিয়েছেন এই মহিলা। গতকাল সোমবার সকালে নিজ বাসা থেকে ইবরাহিমের জবাই কারা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি সওদারগরটুলার (১নং বাসা) মৃত সাদ উদ্দিন আল হাবীবের পুত্র। তার গ্রামের বাড়ী মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগরে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নগরীর সওদাগরটুলার ১নং বাসার বাসিন্দা স্থানীয় তাবলীগ জামায়াতের আমীর ইবরাহিম আল খলিল (৫৫) খাওয়া দাওয়া শেষে গত রোববার দিবাগত রাতে নিজ শয়ন কক্ষে ঘুমিয়ে পরেন। পাশের কক্ষে ঘুমান স্ত্রী ফাতেহা মাশরুকা। কনিষ্টপুত্র হাফেজ সাজিদ উদ্দিন নিজ কক্ষেই ঘুমাতে যান। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় হাফেজ সাজিদ ঘুম থেকে উঠে দেখতে পান বিছানার নীচে পিতা ইবরাহিমের রক্তাক্ত লাশ পড়ে রয়েছে। ইবরাহিমের হাত পাটের রশি দিয়ে বাধা ও গলা জবাই করা। মুখে বালিশ চাপা দেয়া। এসময় সাজিদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন সেখানে ছুটে যান। খবর পেয়ে কোতোয়ালী থানার ওসি সোহেল আহমদ সহ পুলিশ সদস্যরা ও সি.আই.ডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সুরতহাল শেষে সকাল পৌণে ১১টার দিকে নিহতের লাশ ওসমানী হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়। ঘটনার খবর পেয়ে তাবলীগ জামায়াতের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নিহতের স্ত্রী মোছাঃ ফাতেহা মাশরুকা (৪০) ও কনিষ্ট পুত্র হাফেজ সাজিদকে (১৬) কোতোয়ালী থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। নিহত ইবরাহিম ৩ পুত্র সন্তানের জনক। এর মধ্যে প্রথমপুত্র মাওলানা উজায়ফা ও দ্বিতীয় পুত্র মাওলানা তানজিম ঘটনার সময় বরিশালের পিরোজপুর জেলায় তাবলীগ জামায়াতে ছিলেন। পুলিশ সূত্র জানায়, কোতোয়ালী থানায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গৃহবধূ ফাতেহা মাশরুকা প্রিয়তম স্বামীকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা করেন। কারো সহযোগিতা ছাড়াই কিভাবে একা স্বামীকে খুন করলেন তার আদ্যোপান্ত পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। ১৬১ ধারায় পুলিশ ফাতেহার জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে ফাতেহা জানান, স্বামী ইবরাহিম মোট ৩টি বিয়ে করেন। ফাতেহা হলেন প্রথম স্ত্রী। ২য় স্ত্রী বড়লেখার সুজানগরে থাকেন। ৩য় বিয়ে করেন দিনাজপুর জেলায়। তাবলীগ জামায়াতে বেশী সময় কাটানো, একাধিক বিয়েসহ নানা কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মনোমালিন্য চলছিল। এ অবস্থায় ফাতেহা সম্পত্তির ভাগ ভাটোয়ারা করে সন্তানদের ভবিষ্যত ঝামেলা থেকে মুক্ত করার জন্যে বার বার বললেও এতে ইবরাহিম কর্ণপাত করেননি। ঘটনার রাতে নিজ নিজ কক্ষে তারা ঘুমিয়েছিলেন। রাত প্রায় ৩টার দিকে রেলওয়ের পাত হাতে নিয়ে ফাতেহা স্বামীর কক্ষে যান। তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন স্বামীর মাথায় আঘাত করলে ইবরাহিম প্রাণরক্ষায় ধস্তাধস্তির চেষ্টা করলে স্বামীর পেটের ডান দিকে ৩টি ঘাই মারেন। এসময় স্বামীর দু’হাত রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে ছোরা দিয়ে স্বামীকে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। ঘটনার পর রক্তমাখা ছোরা নিজ বাসায় রাখেন। স্বামীকে জবাই করে নিজে বাসায় ছিলেন তিনি। তবে, হত্যাকা-টি একাই ঘটান বলে পুলিশের নিকট দাবী করেন ফাতেহা মাশরুকা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার বর্ণনা দেয়ার পর আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে আগ্রহ প্রকাশ করলে বিকেল সাড়ে ৫টায় মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেদুল করিমের আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখবর পেয়ে সাংবাদিকরা আদালত পাড়ায় ভীড় করেন। আদালতে ফাতেহাকে নিয়ে আসা হলেও এজন্যে আদালতে অগ্রবর্তী (ফরওয়ার্ডিং) কাগজ দেয়নি পুলিশ। এটি দেয়ার দায়িত্ব ছিল কোতোয়ালী থানার ওসি (তদন্ত) মোশারফ হোসেনের। পরে রাত সাড়ে ৭টায় আদালত থেকে ফাতেহাকে কোতোয়ালী থানায় নেয়া হয়। গতরাত ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফাতেহা থানায় ৩ মহিলা কনস্টেবরে প্রহরায় ছিলেন। ফৌজধারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ডের জন্যে আজ মঙ্গলবার পুনরায় ফাতেহা মাশরুকাকে আদালতে নিয়ে আসা হবে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, ফাতেহা মাশরুকা ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল কাটালের ডা. মফিজ উদ্দিনের কন্যা। তবে ফাতেহার বেড়ে উঠা রাজধানী ঢাকায়। পিতামাতার ৬ পুত্র ও ৫ কন্যা সন্তানের মধ্যে ফাতেহা হলেন ৮ম। ছোট বেলা থেকে ধর্মভীরু ফাতেহা এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। ১৯৯০ দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করা ইবরাহিম আল খলিলের সাথে তার বিয়ে হয়। জানা গেছে, পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত ইবরাহিম ৩ ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ। তাদের আদি নিবাস পাকিস্তানের করাচি। তার বড়ভাই মারা গেছেন। ২য় জন দুবাই প্রবাসী। তিনি বসবাস করতেন সওদাগরটুলায়। কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে সিলেট নগরীতে। এ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে সংসার চালাতেন ও দেশ বিদেশে তাবলীগ জামায়াতে যেতেন। তাবলীগ জামায়াত থেকে গত কয়েক দিন আগে ভারতের দিল্লী থেকে ঢাকায় ফেরে ২ পুত্রকে দেখতে পিরোজপুরে চলে যান। পিরোজপুর থেকে ঢাকায় আসার পর গত শনিবার রাত পৌণে ১২টায় এনা পরিবহনের বাসে করে সিলেটের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়েন। শ্যালক মঈন উদ্দিন তাকে এই বাসে তুলে দেন। যে রাতে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন ঢাকা থেকে ঠিক এর পরের রাতেই প্রিয়তমা স্ত্রীর হাতে নিজ বাসায় খুন হন ইবরাহিম আল খলিল। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় গতকাল সোমবার একটি হত্যা মামলা রেকর্ড দেখানো হয়। কোতোয়ালী থানার মামলা নং ২২। মামলায় কেবলমাত্র ফাতেহা মাশরুকাকে আসামী করা হয়েছে। পুলিশের অপর সূত্র জানায়, এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা কে বাদী হবেন এ নিয়ে নিহতের স্বজনদের মাঝে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। স্বজনদের কেউ এ মামলার বাদী হতে চাচ্ছেন না। আবার নিহতের পুত্রদেরকে এ মামলার বাদী হতে দিচ্ছে না পুলিশ। অবশ্য, এ বিষয়ে পুলিশের নিকট বেশ বাস্তবসম্মত যুক্তিও রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত স্বজনদের কেউ বাদী না হলে পুলিশ মামলার বাদী হবে সূত্র জানিয়েছে। এদিকে, ঘটনার খবর পেয়ে ঘাতক ফাতেহার স্বজনরা ঢাকা থেকে সিলেট এসেছেন। নিহতের ২ পুত্র গতরাতেই সিলেট পৌঁছার কথা। কোতোয়ালী থানার ওসি সোহেল আহমদ জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। নিহতের স্ত্রী ফাতেহা নিজে তার স্বামীকে জবাই করে খুন করেছেন বলে পুলিশের নিকট জবানবন্দী দিয়েছেন। আদালতে ফাতেহা ঘটনার স্বীকারোক্তি দিবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবুও পুরো বিষয়টি পুলিশ গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে।


Free Online Accounts Software