২০ বছরে কেবল সিলেটে ৭হাজার ৪৪১টি বজ্রপাত বজ্রপাতকে পৃথক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিতকরণের অভিমত বিশেষজ্ঞদের
   22 Oct 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 6 May 2015 প্রকৃতি পরিবেশ  (পঠিত : 2809) 

২০ বছরে কেবল সিলেটে ৭হাজার ৪৪১টি বজ্রপাত বজ্রপাতকে পৃথক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিতকরণের অভিমত বিশেষজ্ঞদের

২০ বছরে কেবল সিলেটে ৭হাজার ৪৪১টি বজ্রপাত বজ্রপাতকে পৃথক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিতকরণের অভিমত বিশেষজ্ঞদের
     

সাঈদ নোমান: সিলেট অঞ্চলে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু আশংকাজনক হারে বেড়েছে। গত ২০ বছরে শুধু সিলেটে ৭হাজার ৪শ’ ৪১বার বজ্রপাত হয়েছে। এর মধ্যে গত ১মাসে শুধু সিলেট অঞ্চলেই বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ২০জনের। আহত হয়েছেন আরো অনেকে। আহত ও নিহতদের অধিকাংশই সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার কৃষক। সাম্প্রতিককালে সারা দেশের তুলনায় সিলেটের সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বেশী ঘটছে। এ নিয়ে হাওর এলাকার কৃষকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বজ্রপাতকে পৃথক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করে গুরুত্ব সহকারে এ বিষয়ে গবেষনার প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছেন। সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে এই তিন মাসকে প্রি-মনসুন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই তিন মাসে ঝড়, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত বেশী হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বজ্রপাত এর ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়ার ফলে বাষ্পীভবনের পরিমাণও বেড়েছে। এর ফলে তৈরি মেঘে মেঘে সংঘর্ষও অনিবার্যভাবে বাড়ছে, যা বজ্রপাত আকারে আঘাত হানছে। এ ছাড়া মোবাইলফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, গ্রামে অধিকাংশ বাড়ি টিনের তৈরি হওয়ায় বজ্রপাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। ইদানীং ভবন নির্মাণের সময় বজ্রপাত নিরোধক স্থাপনার ব্যবহারও কমে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ বছর সারা দেশে ১৮০ জনের বেশী মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছে। গত তিন বছরের মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা এবার সর্বোচ্চ। শুধু সিলেট অঞ্চলে গত ২৯ মার্চ থেকে ২ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে মারা গেছেন ২০জন লোক। এদের অধিকাংশই সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নিহত এসব ব্যক্তি হাওরে কাজে ছিলেন। তারা অনেকেই ধান কাটা শ্রমিক ও কৃষক। গত ২ মে বজ্রপাতে মারা যান সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার হরিভক্ত দাস (৪৫), আব্দুল কাদির (২০), রাজু (২০) ও ধর্মপাশা উপজেলার আব্দুল জলিল (৬৫)। ২১ এপ্রিল মারা যান সুনামগঞ্জ পৌর শহরের আজিজুর রহমান (৪০) ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের গিয়াস উদ্দিন (২০)। ১৩ এপ্রিল মারা যান দিরাই উপজেলার জ্ঞানান্দ্রে দাস (৬১), মিলাদ মিয়া (১৭), শামসুল হক (২৭), জমসেদ মিয়া (৪৫), দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জুয়েল মিয়া (১৭) ও জামালগঞ্জের বাধন (১৮)। ১২ এপ্রিল মারা যান মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার দুলভী বিবি (৫৫) ও ছইদা বেগম (৩৬)। ৬ এপ্রিল মারা যান সিলেটের কানাই ঘাটের মিনহাজ উদ্দিন (১৩) ও ইমরান আহমদ ( ১৬)। ৫ এপ্রিল মারা যান সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সুমন মিয়া (১৬), শাল্লা উপজেলার নিবাস চন্দ্র দাস ( ১৭) ও ছাতকের ফয়জুল মিয়া ( ৫০)। ২৯ মার্চ মারা যান ধর্মপাশার আলি হোসেন (১৮)। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে নিহত এসব ব্যক্তিরা এসময় হাওরে ছিলেন। তাদের অনেকই ধান কাটা শ্রমিক ও কৃষক। বজ্রপাতের সময় হাওরে ধান কাটা অবস্থায়ই তাদের মৃত্যু হয়। হাওর এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি বজ্রপাতজনিত মৃত্যু সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার কৃষকদের মধ্যে আতংক হয়ে দাড়িয়েছে। বজ্রপাত হলেই হাওরে কাজে থাকা কৃষকরা মারা যাচ্ছেন। এর আগে এরকম বজ্রপাতে হাওর এলাকায় এত মানুষ মারা যায়নি। সুনামগঞ্জে বজ্রপাতের কারণ সম্পর্কে সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী জানান, সাধারণত যে সকল অঞ্চলে উচু ভুমির পাশাপাশি নীচু সমতল ভুমি রয়েছে এসব স্থানের নীচু সমতল ভুমিতে বজ্রপাত বেশী হয়। সিলেটে একদিকে অসংখ্য পাহাড় ও টিলা রয়েছে এবং অন্যদিকে হাওর এলাকা রয়েছে। এ কারণে হাওর এলাকায় বজ্রপাত বেশী হচ্ছে বলে ধারণা করছেন তিনি। তিনি আরো জানান, বজ্রপাতের ঘটনা খোলা প্রান্তরে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া, আগে কৃষিতে ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। কৃষকের কাছে বড়জোর কাস্তে থাকত। কিন্তু এখন ট্রাক্টরসহ নানা কৃষি যন্ত্রাংশ বা মুঠোফোনের মতো ধাতব যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে গেছে। এসব ধাতব বস্তুর ব্যবহার বজ্রপাতে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে। দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, বট গাছের অভাব বজ্রপাতে মৃত্যুর একটা কারণ হতে পারে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে ঘরবাড়ি বেশি হলেও সেখানে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বজ্রপাতের ঘটনা কম। কিন্তু গ্রামের এই বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করতো যে বট গাছ, তার সংখ্যা কমে গেছে । ফলে বজ্রপাতে শহরের তুলনায় গ্রামে প্রাণহানি বেশি হচ্ছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. মো. আকতারুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির বিষয়টি উদ্বেগজনক। এর আগে বজ্রপাতে এতো মানুষ মারা যায়নি। সম্প্রতি বজ্রপাতের কারণে মৃত্যু অধিকহারে বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বায়ুদূষণ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনকে উল্লেখ করেন। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পেলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এখনো বজ্রপাতকে পৃথক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। গুরুত্ব সহকারে এ বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। কিন্তু বজ্রপাতে বছরে মাত্র দেড়শর মতো লোকের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ সংখ্যা আরও বেশি তা ৫শ’ থেকে ১হাজার, যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি। বজ্রপাতের ভয়াবহতা ও প্রতিকারে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গবেষণার জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সার্ক মিটিওরোলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টার (এসএমআরসি)’এর গবেষণায় জানা যায়, দেশে বজ্রপাতের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বজ্রপাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১০ ও ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘটনা অধিক হারে বেড়েছে। সাধারণত দিনের শেষভাগে বিকেলে এবং রাতের শেষ ভাগে ভোরে বজ্রপাত হয়। গত ২০ বছরে শুধু সিলেটে ৭ হাজার ৪শ’ ৪১ বার বজ্রপাত হয়েছে। এই ২০ বছরের শুধু মে মাসে বজ্রপাত হয়েছে ১ হাজার ২শ‘ ৮৯ বার। চলতি মে মাসেও বজ্রপাত হওয়ার আশংকা রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মার্চ, এপ্রিল মে মাসের পরেও বজ্রপাত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। গত বছর জুলাই মাসে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় তারাবির নামাজ পড়ার সময় বজ্রপাতে বহু লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের একটি প্রকাশনায় বজ্রপাত থেকে বাঁচার জন্য কিছু সতর্কতা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বজ্রপাতের সময় বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। আর বাইরে যারা থাকে তারা যেন বিজলী চমকানোর পরই দৌড়ে কোথাও আশ্রয় নেয়। কোথাও যেতে না পারলে উচু জায়গা থেকে যেন দূরে থাকে। এসময় নিচু হয়ে অল্প মাটিতে বসার কথা বলা হয়েছে। তবে মাটিতে কখনও শুয়া যাবেনা বলা হয়েছে। এ ছাড়া, বলা হয়েছে বজ্রপাত লম্বা কোন জিনিষ বা বস্তু, বড় উচু আকারের গাছ ও ইলেক্ট্রিক পুলসহ লম্বা যে কোন ধরনের খুটিতে আঘাত হানে। বজ্রপাতের সময় এসব থেকে ৮ মিটার দূরে অবস্থান করতে বলা হয়েছে।


Free Online Accounts Software