17 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 12 February 2015 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 16892) 

হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু

হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু
     

হারান কান্তি সেন:
এয়ারক্রাফট তখন কলকাতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে অমনি নীচে তাকিয়ে দেখি আকাশের তারার মেলাকে হার মানানোর মত অবস্থা। ওসবই নীচের বাড়ি-ঘরের রাতের বাতি।
কবিগুরুর লেখা “সুন্দরও বটে তব অঙ্গদ খানি তারায় তারায় খচিত” গানটি এ মূহুর্তে বেশ আনন্দ নিয়েই যেন মনে হলো। অন্তত: ১৫হাজার ফুট নীচের এই নয়নাভিরাম দৃশ্য স্ত্রী ও শিশু পুত্রকেও প্রান ভরে দেখতে বললাম।
এয়ারপোর্টের ফর্মালিটি শেষ করে প্রি পেইড ট্যাক্সি কাউন্টারে এসে শুনি এদের ধর্মঘট চলছে। কী আর করা সাধারণ সময়ের চেয়ে ৩ গুন বেশী টাকা দিয়ে অন্য লাইনে একটা কার জোগাড় করে হোটেলে পৌছলাম। কলকাতায় তখন চলছে দু’দিন আগে হওয়া শ্রী শ্রী বিশ্বকর্মা বিসর্জন। পশ্চিম বঙ্গেঁর রাজধানী কলকাতা বাঙ্গাঁলী হিন্দুর বার মাসে তের পার্বনের মূল কেন্দ্র বলেই আমার কাছে মনে হয়। আমি কলকাতা গেলে সবসময় ফ্রী স্কুল ষ্টীট এ (মীর্জাগালিব ষ্ট্রীট) উঠি। এবারও ওখানের ৩৩/৪ ফ্রী স্কুল ষ্টীটের হোটেল প্যারামাউন্ড এ উঠলাম। স্ত্রী পম্পা আর পুত্র তোজোকে রুমে রেখে দ্রুত সামনের একটা ট্রেভেলসে (অবশ্যই হোটেলের রেফারেন্স নিয়ে) ব্যাঙ্গাঁলুরগামী ট্রেনের টিকেট করতে গেলাম। ট্রেবেলস এর মালিক খুব দ্রুত আমাকে একদিন পরের টিকেট বুক্ড করতে পারলেন এবং বললেন ‘কাল সন্ধ্যা ৭টায় এসে ওকে টিকেট নিয়ে যাবেন।
কলকাতায় ‘ফেয়ারলি প্লেস’ নামে রেলওয়ের টিকেট বিক্রয় কেন্দ্র আছে সেখানে গিয়ে নিজেও ভারতের যে কোন গন্তব্যের রেলটিকেটেই ক্রয় করতে পারবেন। কিন্তু ওখানে গেলে দালালরা আপনাকে ছেঁকে ধরতে পারে এবং এরা দিলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সিট কনফার্ম ছাড়াই টিকেট পাবেন। অবশেষে ট্রেনে ওঠে দেখবেন সিট বা স্লিপার বেড কোন কিছুই আপনার জন্য অবশিষ্ট নেই। আর দালাল ছাড়া নিজে কাউন্টারে গেলে যাত্রার ডেট আপনার পছন্দমত না ও পেতে পারেন। অতএব এত ঝামেলায় না জড়িয়ে ট্রেভেস্লের মাধ্যমেই টিকেট করা সবচেয়ে উত্তম।
আমরা হাওড়া ষ্টেশনের ১১নম্বর প্ল্যাটফরমে যে যায়গাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানেই এসে ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ থামলো। ভারতের বিভিন্ন যায়গায় আমি ট্রেনে যাতায়াত করলেও এই ট্রেনের মত এত ‘জাকানাকা’ রং কোনটিরই দেখিনি। পুরো ট্রেনের শরীর জুড়ে জলপাই আর হলুদ রংগের ছোপ ছোপ দাগ দেখেই যেন মনে হয় আসলে এতো ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ এমন হবেই। হাওড়া ষ্টেশনে শতাধিক প্লাটফরম থেকে আমার মনে হয় ১/২ মিনিট পর পরই ট্রেন ছেড়ে যায় নানা গন্তব্যে। তাই এখানে দিন-রাত সব সময়ই একটা হুলস্থুল ব্যাপার থাকে। ঠিক সময় ২১ সেপ্টেম্বর ’১৪ সকাল ১১টায় আমাদের নিয়ে হাওড়া জংশন (কলকাতা) টু জসবন্তপুর জংশন (ব্যাঙ্গালুর) গামী সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ যাত্রা শুরু করলো। আামদের স্লিপার আসন ছিল এসি বি-২ বগির ১৮,১৯,২২ এবং হোটেল বয় মারুফ এসে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে যায়। আমাদের সহযাত্রী হলেন ভেরী স্মার্ট বৃদ্ধ মিঃ দীপক মূখার্জী ও তাঁর স্ত্রী ঊষা মূখাজী। মিঃ মূখার্জী ভারতীয় অর্ডনেন্স ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করতেন এবং এখন তাঁর নেশায় আছে তবলা বাদন ও বেড়ানো। তিনি বর্তমানে পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষায়তন“গীত বিতান’ এর সিনিয়র টিচার। ১৯৫০ খ্রীঃ থেকে তবলা বাজাচ্ছেন এবং বাজিয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যাায়, শ্যামলমিত্র, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, শান্তিদেব ঘোষ, সুমিত্রা সেন, অরুন্ধতি হোম চৌধুরী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রয়াত কলিম শরাফি, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মিতা হক প্রমুখের সাথে। এছাড়া মিঃ মূখার্জী মহানয়াক উত্তম কুমারের একটা সিনেমায় তবলা বাদকের একটা ছোট্র চরিত্রে অভিনয় ও করেছেন তাঁর যৌবনে। তিনি সস্ত্রীক ব্যাঙ্গাঁলুর যাচ্ছেন একমাত্র পুত্রের সাথে পুজো কাটাতে।
শুরুতেই মিঃ দীপক মূখার্জীকে আংকেল সম্বোধন করায় তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আমাদের পুত্র তোজোর সাথে নাতি-নাতনীর মতো ঠাট্টা-মশকরা করতে থাকেন মাঝে মাঝে।
‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ বেশ গতিতেই চলছে। তা ঘন্টায় ১০০-১২৫ কিঃ মিঃ বেগে হয়তো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের পুরু গ্লাস দিয়ে বাইরের সবকিছু দেখা গেলেও ট্রেনের লৌহ চাকার ঘর্ষনের বিকট শব্দ কোন কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। ব্রডগেজ লাইনের ট্রেন এমনিতেই মিটার গেজ রেলের মত দোলে না এবং এজন্যই যত গতিই হোক যাত্রীরা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই চলাফেরা করতে পারেন। দুপুর ১২টায় রেলওয়ের পক্ষ থেকে মানচুরিয়ান ভেজিটেবল স্যুপ, ষ্টীক, আমুল বাটার আর নিমক ও নানা মসলাগুড়ো পরিবেশন করা হলো। কিন্তু নিজেদের একই অসর্তকতার জন্য প্রায় দুই গ্লাস (এক একটিতে ২০০ মিঃ লিঃ) স্যুপ পড়ে গেল যার কিছুটা আমার স্ত্রীর শাড়িতে স্থান করে নিল। সাথে সাথে হ্যান্ড ব্যাগ থেকে টিস্যু পেপার বের করে মুছে নিলাম আর ক্যাটারাররা ট্রেনের মেঝেতে নিউজ পেপার ছড়িয়ে দিল। তারা অবশ্য আমাদের আবারও স্যুপ পরিবেশন করে। বলে রাখা ভাল কলকাতা ব্যাঙ্গালুর জার্নির এই ৩১/৩২ ঘন্টা ব্যাপী সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত সব সময়ের জন্য ট্রেনের পক্ষ থেকে তাদের নির্ধারিত মেন্যুাতে আমাদের নাস্তা খাবার পরিবেশন করা হতো। উল্লেখ্য ভারতের নির্ধারিত কয়েকটি ট্রেনে এভাবে যাত্রীদের খাবার পরিবেশন করা হয়। আমাদের এতকিছুর মাঝে ট্রেন কিন্তু তার গতিতেই এগিয়ে চলছে। আমরা যখন হাওড়া জেলার শেষ প্রান্ত দেউলটি ষ্টেশন পেরুচ্ছি তখন মূখার্জী আংকেল জানালা দিয়ে দেখালেন বাংলা সাহিত্যর অমর কথাশিল্পী শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গ্রাম, লেখকের বেশীরভাগ গল্পের পটভুমি হলো এই গ্রাম ও অঞ্চল।
দুপুর দেড়টায় আমাদের খাবার পরিবেশন করা হলো। মেন্যু ভাত, আটার রুটি, ডাল, চিকেন কাবী, দই আর আইসক্রীম। এদিকে আমার স্ত্রীকে সহযাত্রী আন্টি তাঁর সাথে নিজের জন্য আনা পুস্তু ভর্তা খেতে দেন। পৃথক পৃথক ট্রেতে প্রত্যেককেই এভাবে লাঞ্চ পরিবেশন করা হয়। অবশ্য ট্রেন ছাড়ার পর ক্যাটারাররা এসে নোট করে নেয়। কে আমীষ, কে নিরামিষ খাবেন।
আমরা যখন নিজ নিজ দুপুরের খাবার খেতে ব্যস্ত ঠিক তখনই ভারতীয় সময় দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে উড়িষ্যা প্রদেশে প্রবেশ করে। তার সময়ের এত নিখুঁত হিসেবটা পেলাম আমার মোবাইল সিম ‘এয়ারসেল’ এর সংকেত থেকে।
ভারতের দ্রুতগতির এক্সপ্রেস ট্রেনের অন্যতম ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ একটির পর একটি ষ্টেশনকে পিছনে ফেলে চূড়ান্ত গন্তব্য ‘ জসবন্তপুর (ব্যাঙ্গাঁলুর) এর পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি প্রায়ই চেষ্টা করছি ষ্টেশনের নামগুলো পড়ার-কিন্তু ট্রেনের গতি সেই পড়ার মাঝখানে যেন ইটের দেয়াল হয়ে দাঁড়ালো। কলকাতার প্রখ্যাত কৌতুকাভিনেতা প্রয়াত ভানু বন্দ্যোপাধ্যাায় তাঁর একটা কমেডি রেকর্ডে বলেছিলেন ‘ট্রেনের গতি এত্তো বেশী ছিল যে মাইলপোষ্ট গুলোকে মনে হতো চিরুনীর দারার মত’। তিনি সেই ষাটের দশকেও এতো দ্রুতগতির ট্রেন কল্পনা করেও বেশ মজার কৌতুক নক্সা করতে পেরেছিলেন। তবে ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ ঘন্টায় ১০০/১২৫ কিলোমিটার বেগে চলায় পশ্চিম বঙ্গ প্রদেশের বাংলা ও ইংরেজীতে ষ্টেশনের নাম পড়তে যেখানে বেগ পেতে হয়েছিল সেখানে উড়িষ্যার উড়িয়া ভাষার সাথে ইংলিশ প্রায় অসম্ভব হলো।
আমাদের ‘ কোয়ান্টাম ফানন্ডেশন’র সাথে যারা আছি তাদেরকে সব সময় একটা নিয়ম মানতে হয় আর তা হলো কোন জায়গায় গেলে একজনকে দলনেতা মানতে হয়। দু’জন হলেও কখনো এর ব্যত্যয় ঘটে না। আমি আজ ট্রেনে বয়োজ্যেষ্ঠ দীপক আংকেলকে মনে মনে আমাদের দলনেতা ঠিক করলাম। দুপুর আড়াইটায় আংকেল আমাকে বললেন ‘সেনবাবু এবার আমরা সবাই দুপুরের জন্য ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে নিই’। সাথে সাথেই আমরা সবাই নিজ নিজ বেড রেডি করে শোয়ে নিলাম ঘন্টা খানেক। এদিকে ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ তার গতিতেই একের পর এক ষ্টেশন পিছনে রেখে এগিয়ে চলছে।
বিকেল চারটার দিকে মধ্যাহ্ন নিদ্রা ত্যাগ করে আমরা সবাই (অন্ততঃ এই ক’জন) উঠলাম। জানালার পর্দা সরিয়ে দেবার একটু পর দেখি ট্রেন ‘কটক’ এর মহানদী ক্রস করছে। আমাদের পদ্মা কুষ্টিয়ার হার্ডিজ ব্রীজের কাছে যেমন এখানে মহানদীর অবস্থাও তথৈবচ।‘মহানদী’ প্রস্থে আমাদের পদ্মানদীর মত। তবে নদীটির ৭০-৮০% জুড়ে চর পড়ে একে কেমন বিবর্ণ করে দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে নিশ্চয়ই সুষ্ক মৌসুমে নদীর আর কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
এই ‘কটক’ ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের একটা স্বনামধন্য স্থান। এখানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু জন্ম গ্রহন করেন।
সাড়ে চারটার দিকে ট্রেন ক্যাটারার বিকেলের নাস্তা স্যান্ডউইচ, কচুরী আর চা পরিবেশন করে। এই চা পানের রেশ কাটতে না কাটতেই বিকেল ৫.১৫ মিনিটে উড়িষ্যার রাজধানী ভূবনেশ্বর ষ্টেশনে ‘ দূরন্ত এক্সপ্রেস’ থামে। সকাল ১১টায় (বাংলাদেশে সাড়ে ১১টা) ট্রেনটি হাওড়া থেকে ছাড়ার পর প্রায় ৪৭৫ কিলোমিটার রেলপথ পেরিয়ে ‘ভুবনেশ্বর’ প্রথম বিরতী দিল।
ইতোপূর্বে ২০০৬খ্রিঃ আমি যখন পূরীতে শ্রী শ্রী জগন্নাথ মন্দির দর্শন করতে যাই তখন একদিন এই “ভুবনেশ্বর’ শহরের নানান দর্শনীয় স্থান দেখি। এই শহরকে এক লক্ষ মন্দিরের শহরও বলা হয়। এখানে কয়েক বছর আগে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব অমিতাভ বচ্চন উদ্বোধন করেন বাঁশি সম্রাট পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার ’গুরুকুল বৃন্দাবন’ এর অপর পাঠশালা মুম্বাইতে। বাঁশিসম্রাট হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া বলেন ‘তিনি বাঁশি বাজান না, প্রাথনা করেন। তাঁর প্রার্থনা দর্শকের হৃদয়ে পৌছলে তাদের সাথে যোগাযোগ তৈরী হয়। তার সাথে ১৯৯১/৯২ খ্রীঃ আমাকে পরিচিত করিয়ে দেন কলকাতার প্রখ্যাত শিল্পী সুমন। তাঁর একটি জনপ্রিয় গানের কয়েকটি পংক্তি হলো
“প্রথমত আমি তোমাকে চাই
দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই
তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই
শেষ পর্যন্ত তোমাকেই চাই
...............................
সলিল চৌধুরীর ফেলে আসা গানে
চৌরাসিয়ার বাঁশি মুখরিত প্রানে’
...............................
আর ২০১২খ্রীঃ থেকে প্রতি বছর নভেম্বরের শেষ সপ্তায় ঢাকার বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত “বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সংগীত উৎসব’- এ এই উস্তাদ আসেন।
‘ভূবনেশ্বর’ এ ১০ মিনিটের বিরতীর মাঝে ট্রেনে রাতের খাবার সহ নাস্তা ইত্যাদি উঠানো হলো। এখান থেকে ছাড়ার কিছুক্ষন পরই খুর্দাক্রসিং নামক ষ্টেশন থেকে বামদিকে বেল লাইন পুরীর দিকে চলে যায় এবং ওখানে গিয়ে এ পথ শেষ হয়। আর ডানদিকে আমরা ব্যাঙ্গাঁলুর যাচ্ছি এবং এই রেল লাইন পুরো দক্ষিণ ভারতের দিকে চলে যায়।
সন্ধ্যা ৭টায় হাল্কা নাস্তা-টমেটো স্যুপ আর আমুল বাটার সমেত স্যুপ চিপ্স পরিবেশন করা হয়।
ভারতের সবগুলো প্রদেশের রাজধানী থেকে দিল্লী অভিমুখে চলাচলকারী ট্রেন ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’ এ ও এমন নাস্তা-খাবার লাগাতার ভাবে পরিবেশন করা হয়। আমার মতে যে সব যাত্রীর পেট দূর্বল (হজমে সমস্যা) তাদের জন্য রেলের ঘন ঘন এ খাবার পরিবেশনা আরামদায়ক নাও হতে পারে। যদিও আমার এতে তেমন কোন অসুবিধাই হয়নি।
রাত সাড়ে আটটায় যথারীতি রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়। মেন্যু ছিল যথারীতি এ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়া এক বক্স ভাত, ২টি আটা রুটি, এক বাটি ডাল, এক বাটি চিকেন মাসালা, দই আর আইসক্রিম ইত্যাদি। রাত ৮টা ১৬মিনিটে ট্রেন অন্ধ প্রদেশে প্রবেশ করেছে। প্রায় সাত ঘন্টা উড়িষ্যা প্রদেশে অবস্থান করার পর এখন আমরা ভারতের দক্ষিণের অন্যতম বৃহৎ অন্ধ্র প্রদেশে।
রাত দশটার দিকে আমরা সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিই। আমাাদের তিনজনের সীট নম্বর ১৮,১৯,২২ হওয়ায় সঙ্গত কারনেই নীচের টায়ারে (ঘুমানোর বিছানা) নয় তা হলো মধ্যম এবং উপরের। এখন চিন্তা হলো ৮বছরের শিশুপুত্র তোজোকে কিভাবে মধ্য বা উপরের বেডে ঘুমাতে দিব। কিন্তু আমাদের এই চিন্তাকে মূহুর্তের মাঝে কপূর্বের মত উড়িয়ে দিলেন সহযাত্রী সংগীতবোদ্ধা কলকাতার মিঃ দীপক মূখার্জী। এই বৃদ্ধ ভদ্রলোক তাঁর নিজের নীচের বেড ছেড়ে দিলেন আমার স্ত্রী-পুত্রকে এবং তিনি মধ্যম টায়ারে শোতে গেলেন। আমি নিজে উপরের টায়ারে শোয়ে রাতে কয়েকবার এই আশি বছর বয়সের কোটায় পৌছানো বৃদ্ধকে অনেক কষ্ট করে উঠা-নামা করতে দেখে নিজের খুব খারাপ লাগে। ভাবি তিনি স্যাক্রিফাইস না করলে আমাদের হয়তো সারারাত না ঘুমিয়ে কাটাতে হতো। ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে গায়ে কম্বল পেচিয়ে এই সেপ্টেম্বর মাসের গরমেও বেশ আরামের একটা রাত কাটলো।
ইতো মধ্যে আমাদের ঘুমের মধ্যেই ট্রেন অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তম সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ষ্টেশন পেরিয়ে এসেছে। ২২শে সেপ্টেম্বর ১৪ ভোর ছ’টায় আমাদের প্রতৌককে পৃথক ফ্লাটে গরম পানি, টি ব্যাগ, সুগার ও মিল্ক সেশে সাথে বিস্কুট পরিবেশন করা হয়। আমার স্ত্রী বা আন্টি (মিসেস মূখার্জী) কেউই ঘুম থেকে না ওঠায় আমি মিঃ মূখার্জীকে চা রেডি করে দিলাম এবং শরীরে চাঙ্গা ভাব আনতে আমিও এক কাপ নিলাম। ইতিমধ্যে দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজী দৈনিক DECCAN CHRONICLE হাতে এলো। এর সাথে অন্ধ প্রদেশের আঞ্চলিক দৈনিক হলেও তেলেগু ভাষা না বুঝার কারনে সেটি হাতে নিইনি। সকাল ৭টায় অন্ধ্রের রেলষ্টেশন না ‘সিংড়াইয়াকুন্ডা’ ক্রস করলাম। ষ্টেশনগুলোর নাম বেশ লম্বা লম্বা।
সকাল ৮টায় নাস্তা এলো ব্রেড বাটার, ডিম, জুস আর চা। আমার স্ত্রীকে নিয়ামিত ইডিলি, কচুরী, চা দেয়া হলো। এসির ঠান্ডায় শরীরে কম্বল পেচিয়ে ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতে থাকি অন্ধ্রের সকাল। মাইলের পর মাইল রাস্তার পাশে শালবন আর মাঝে মাঝে ছোট ছোট কিছু পাহাড়। অন্ধ্রের বিশাখাপত্তম সমূদ্রের পাশে এবং ভারতের নৈবাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাটি হলে ও এই সকাল বেলা আমরা সমূদ্র থেকে অনেক দূরে দিয়ে যাচ্ছি। সকালের নাস্তা খাবার সময় উপরের বাংকার থেকে নেমে আসেন কলকাতার প্রিয়া ঘোষ। সদ্য বিবাহিতা এই বাঙ্গালী তরুনী এই প্রথম ব্যাঙ্গালুর যাচ্ছেন স্বামীর কর্মস্থলে। স্বামী দেবাশীষ ঘোষ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরী করেন। তিনিও আমাদের সহযাত্রী এবং প্রায়ই দেবাশীষ আমার পুত্র তোজোর সাথে খাট্টা-তামাশা করছিলেন।
সাড়ে আটটায় ট্রেন না থেমেই গুড্ডুর জংশন অতিক্রম করে। ভারতের প্রত্যেকটি রেলষ্টেশন তা জংশন হোক বা সাধারন হোক বেশ বড় বড় এবং যাত্রীতে যেন সর্বদাই সরগরম।
গত রাত সাড়ে আটটায় অন্ধ প্রদেশে ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ প্রবেশ করে এখনও এগিয়ে চলছে। সাড়ে দশটায় ‘রেনিগুন্টা’ জংশন এ বিরতী দিয়ে দুপুরের খাবার উঠানো হয়। এখান থেকে ছাড়ার কিছু পর ডানদিক দিয়ে চেন্নাইর (তামিল নাড়–) দিকে পৃথক রেল লাইন চলে যায়। এবার চোখে পড়ে মাইলের পর মাইল পাথুরে পাহাড়। এ যেন টিভিতে দেখা আরব্য রজনীর একদম সেই পাথর যা সিন্দাবাদের দৈত্যেরা অনায়াসে মাথায় তুলে আঘাত করতো।
আনুমানিক ১০kg থেকে ১ টন ওজনের পাথরগুলো রেল লাইনের দিকে মুখ করে আছে। এ যেন দৌড়বিদদের মতো বাঁশী বাজলেই দে হানা। আবার এইসব পাথরের নীচে ঘর করে মানুষও বাস করে।
সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় যেখানে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এসেছি সেখানে দক্ষিণ ভারতে সে অনুপাতে বৃষ্টি কম হয়। দক্ষিণ ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশের আবহাওয়া অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের মত। অন্ধ্র প্রদেশে খুব গরম, কেরালা ও কর্ণাটক এ গরম আবহাওয়া। আর পুরো দক্ষিণ ভারত জোড়ে গরম আবহাওয়ার জন্য মানুষের খাদ্যাভ্যাাসে টক যেন অপরিহার্য। এই টক হওয়ার জন্য নিমপাতার মত দেখতে “কারিপাতা’ প্রতিটি খাবারে দেয়া হয় এবং নারকেল ও থাকে।
দুপুর ১২টায় আমাদেরকে টমেটো স্যুপ পরিবেশন করা হয়। সাথে দেয়া নানান মসলারগুড়ো আর সস মিশিয়ে স্যুপ খেতে বেশ ভালই লাগলো। আসলে সকাল ৮টা সাড়ে ৮টায় নাস্তা খাবার পর স্যুপটা খারাপ হলো না। ঠিক এই সময়টায় ট্রেন একটু গতি কমিয়ে একটা ষ্টেশন পেরুবার সময় এর নাম পড়লাম Chittiriএটি অন্ধ্র ও তামিলনাড়– রাজ্যের একদম মধ্যবর্তী স্থান। লাঞ্চ পরিবেশন করা হলে দেখা যায় চিকেন মাসালা ছাড়া আর সব কিছুতেই কারিপাতার ফ্লেভার, টক আর নারকেলের উপস্থিতি। দই কৌটা থেকে এক চামচ মুখে দিয়েই আমার ছেলে তোজো মুখ ভেংচে দেবার মত অবস্থা করে বললো-“বাবা চুকা দই তুমি খাও”। টক দই আমার খুব পছন্দ তাই লাঞ্চের এক সাথে তিন কৌটার স্বাদ নিলাম, কারণ আমার স্ত্রী পম্পাও টক দই খায়নি।
২১শে সেপ্টেম্বর রাত ৮.১৬ মিনিট অন্ধ প্রদেশে প্রবেশ করে মাঝখানে ২/৩ (৩ বার অল্প অল্প সময়ের জন্য) তামিলনাড়–র উপর কিছু কিছু পথ অতিক্রম করলেও ২২ সেপ্টেম্বর দুপুর পৌনে ২টায় আমরা কাঠপটি জংশন ষ্টেশনে থামলাম। এই যায়গাটা চেন্নাই মানে তামিলনাড়–র রাজ্যে। কাঠপটি (KATPATI) থেকে ৫০/৬০ কিলোমিটার দূর বিশ্বখ্যাত বিশেষায়িত ভেলুড় খ্রীষ্টান মিশনারী হাসপাতাল (CMC)। এই হাসপাতালে ক্যান্সার, অর্থোপেডিক্স, নিওরো, মেডিসিন, হার্ট ইত্যাদির বিশ্বমানের চিকিৎসা হয়।
দুপুর ৩টায় আমরা যখন ব্যাংগারপেট ষ্টেশন ক্রস করছি তখন আমাদের রিসিভ করতে আসা টেক্সি ড্রাইভার মল্লিকা জানতে চাইল কোন ষ্টেশনে আছি-আমিও তাকে জানালাম আমরা কর্ণাটক প্রদেশে যে কখন প্রবেশ করি তা বুঝতেই পারিনি। সেই সিন্দাবাদের দৈত্যদের বিশালাকৃতির পাথুরে পাহাড় এখনও আমার চোখে পড়ছে রেলপথের দু’দিকেই। ব্যাঙ্গালরের পাশে এমনই এক রামগড় পাহাড়ে সেই বিখ্যাত ‘সোলে’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল। এর মধ্যে আমরা টাইয়াকাল (TYAKAL) ও মালুর(MALUR)ষ্টেশন পেরিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টায় হোয়াইট ফিল্ড (White Field) পৌছি।
দক্ষিণ ভারত সহ পুরো ভারত জুড়েই পরম পূজনীয় ধর্মগুরু সাঁই বাবার আশ্রম এই হোয়াইট ফিল্ড। কর্নাটকের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু পৌছাতে আর বেশী দেরী নেই। ও আরেক কথা আমরা কিন্তু ব্যাঙ্গালুরু পৌছে গেছি মানে শহর দিয়েই যাচ্ছি এবং শেষ ষ্টেশন জসবন্তপুর পৌছাতে কিছু সময় আরও লাগবে। এরপর একে একে কেয়ারপুরম, বায়ানপল্লী, বনসফরী, হেভেল ষ্টেশন হয়ে বিকেল সাড়ে চারটায় কলকাতা থেকে সাড়ে একত্রিশ ঘন্টার ‘দূরন্ত এক্সপ্রেস’ এ চড়ে আমরা ব্যাঙ্গালুরু পৌছলাম।
ট্রেক্সি ড্রাইভার মল্লিকা ফোনে তার অবস্থান ও গাড়ীর নাম্বার বললে আমরা ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে সেই গাড়ীতে উঠলাম। অবশ্য এর আগে দু’দিনের ট্রেন জার্নির সহযাত্রী মিঃ ও মিসেস মূখার্জীর কাছে থেকে বিদায় নিলাম। নাম শুনে বেশ হ্যান্ডসাম পুরুষ হবে সে রকম ভাবলেও সাক্ষাৎ হলো কুচ্ কুচে কালো চেহারার মল্লিকা ও ড্রাইভার হিসেবে বেশ ভালো। তার আচার ব্যবহার ও যে কারো বিরক্তির কারণ হবে না। আমরা এখন ব্যাঙ্গালুর থুক্কু ব্যাঙ্গালুরু শহরের কেন্দ্রস্থলের একটির পর একটি ট্রাফিক সিগন্যাল পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ষ্টেশন থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্বের বমাসান্দ্রা এলাকায়। সেপ্টেম্বর মাসের পড়ন্ত বিকেলে সপ্তাহের প্রথম কর্মব্যস্ত দিন (সোমবার) শেষে চাকুরীজীবিরা ঘরে ফিরছেন তাই সঙ্গত কারণেই রাস্তায় বেশ জ্যাম। তবে এই ট্রাফিক সিগন্যাল গুলোতে গাড়ী থামছে প্রায় এক মিনিট করে প্রতিটিতে। সময়ের এই হিসাবটা ডিজিটাল সিগন্যালিং এর জন্য খুব সহজে বুঝা যায়। ব্যাঙ্গালুরুর একটা না দুইটা বিশেষত্ব হলো এই শহরের (আমি যেটুকু চলেছি) বেশীর ভাগ পথই ফ্লাইওভার আর সব রাস্তার পাশেই ফুলের বাগান চোখে পড়ে। শুনেছি ভারতের মুম্বাইর পর নাকি দ্বিতীয় সুন্দর শহর এই ব্যাঙ্গালুরু। এই শহরকে গার্ডেন সিটি ও বলা হয়ে থাকে। জসবন্তপুর ট্রেন থেকে নেমে প্রায় পুরু শহর (৪০ কিঃ মিঃ) পেরিয়ে আমরা ভারতের ১নম্বর সায়েন্স সিটি বা আইটি ক্যাপিট্যাল দেখতে পাই। এই সিটিতেই-গুগল, ইনফোসিস, এসিয়ার, স্যামসং সহ এই ধরনের কোম্পানীগুলোর সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় অফিস অবস্থিত। পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানীগুলো থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠানের সফ্টওয়ার এখান থেকে সরবরাহ করা হয়। এসব প্রতিটি কোম্পানীতেই কর্মসংস্থান হাজার হাজার। সায়েন্স সিটি পেরিয়েই বমাসান্দ্রা শিল্প এলাকায় নারায়ণা হেল্থ সিটির সামনে পৌছি। নিজেদের গন্তব্য চলে এসেছি ভেবে মনে বেশ আনন্দ হয় এদিকে আমার পুত্র ক্ষুধার্ত হয়ে আছে সেই ট্রেন থেকে নামার পরই-তার কাছে এখন পুরো পৃথিবীটাই গদ্যময়। নারায়ণা হেল্থ সিটি থেকে এক কিলোমিটার পেরিয়েই হেনাগারা গেট এর কাছে কিওাগান্না হাল্লি রোড এর সিরিডি সাঁই গেষ্ঠ হাউসে পৌছি। তখন সন্ধ্যা রাতের দিকে এগিয়ে চলছে। গাড়ী থেকে নামতেই রেষ্ট হাউস মালিক পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালী দেবাশীষ পাল আমাদের রিসিভ করেন। তখন তার শিশু পুত্র ঋষভকে নিয়ে তিনি সামনেই ছিলেন। ড্রাইভার মল্লিকা লাগেজগুলো নামিয়ে দিতেই আমরা দু’তলার নির্ধারিত রুমে চলে গেলাম। এরপর চাল, ডাল, তৈল, লবন, মসলাপাতি ইত্যাদি নীচের দোকান থেকে মূহুর্তের মাঝেই কিনে আনলাম আর আমার স্ত্রী ম্যাগীনুডুল্স করে পুত্র পিদিমকে (তোজো) সার্ভ করলে সে আপাতত ক্ষুধা নিবারন করে। ওদিকে সিলিন্ডার অন করে গ্যাসের চুলার রান্না করতে লাগলে স্ত্রী পম্পা আর আমি ব্যাগ খুলে ঘর গুছতে ব্যস্ত হলাম। শুরু হলো ব্যাঙ্গালুরের অস্থায়ী ফ্যামিলী লাইফ। অবশ্য আমাদের পাশের রুমেই আছেন নবীগঞ্জের ইসকন ভক্ত জ্যেতিষ দাশ। এক বছর বয়সের নাতি শ্রী জগন্নাথকে অপেন হার্ট সার্জারী করাতে স্ত্রী-পুত্রবধু নিয়ে ব্যাঙ্গালুর এসেছেন।
ব্যাঙ্গালুরুর দিনগুলোঃ
২৩ শে সেপ্টেম্বর ’১৪ সকালে সাড়ে ৭টার দিকে ঘুম ভাঙ্গলো। জানালা দিয়ে তাকাতেই রোদ ঝলমালে দিন স্বাগত জানায়। হাফ কিলোমিটার অদূরের সাদা রংয়ের দশতলা নারায়না হেল্থ সিটির ‘মজুমদার সাউ মেডিকেল সেন্টার’ এবং এর কাছ দিয়ে আরেকটু ওপাশে ‘নারায়না হৃদয়ালয়’ চোখে পড়ে। দেবাশীষদা সাড়ে আটটায় রেডি হতে বললেও আমরা যখন ‘নারায়না হৃদয়ালয়- এ পৌছি তখন ঘড়ি দশটার ঘরে পৌছে গেছে। দশতলা মূল ভবনের সামনেই দেখি দৃষ্টি নন্দন স্থাপনা প্রার্থনার জায়গা। একই ছঅদের নীচে চারদিকে মুখ করে মন্দির, মসজিদ, গীর্জা ও মঠ। এই স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতির এমন চমৎকার পরিবেশ রোগীকে অর্ধেক ভাল করে দেয় নিশ্চয়। শুনেছি নারায়না হেলথ্ সিটির চেয়ারম্যান ও পৃথিবীর সেরা ১০জনের ১জন (আমার মতে ১ নম্বর) হৃদরোগ চিকিৎসক ডাঃ দেবী প্রসাদ শেঠী রোজ হাসপাতালে এসে গাড়ী থেকে নেমেই এই চার ধর্মের উপাসনালয় এক চক্কর দিয়ে তারপর নিজের চেম্বারে যান।
মূল ভবনে ঢুকতেই একদম মুখোমুখি শ্রী শ্রী তিরুপতি মন্দির এবং সামনে পানিতে ভাসমান রাশী রাশী ফুল। আমরা বাংলাদেশী ডেক্স-এ গিয়ে বাঙ্গালী মিস সহেলীকে পাই এবং তিনি ফরম পূরন করে পরবর্তী কাউন্টারে পাঠান। এখানে ১৯০০/= টাকা জমা দিলাম যার মধ্যে এক্সরে, ইসজি, ইকো কালার ডপলার করা এবং দুইজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও সর্বোপরি ডাঃ দেবী শেঠীর ভিজিট ও সংযু্িক্ত। এখানে অনেক বাংলাদেশী রোগী দেখতে পাই এবং এই ইউনিট পুরোটাই শিশু হৃদরোগীদের জন্য। দেখা হয় নেহারীপাড়ার জনৈক এনাম আহমেদের সঙ্গে-তিনি অসুস্থ মামাতো ভাইকে নিয়ে এসেছেন। এখানে দুপুর ১২টার মধ্যে আমার পুত্র পিদিম’র সব পরীক্ষা হয়ে যায় এবং সেসব রিপোর্ট নিয়ে একজন ডাক্তারের কাছে আমাদের পাঠানো হয়। ডাক্তার প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি হিন্দি বলতে পারি কি? আমি হ্যাঁ বাচক মাথা নাড়লাম। নারায়ণার কোন রোগী হিন্দি বা ইংরেজী বলতে না পারলে তারা দোভাষীর মাধ্যমে সেবার ব্যবস্থা করেন। ফলে ওখানে গিয়ে শুধু বাংলা বলতে পারা রোগী বা তার আত্মীয়দের চিকিৎসা সেবা পেতে কোন অসুবিধা হয় না। প্রথম ডাক্তারের রোগ র্নির্ণয় পত্র নিয়ে এর চেয়ে সিনিয়র আরেকজন ডাক্তারের কক্ষে যাই। এরপর দুপুর ২টায় আমি ও স্ত্রী পম্পা পুত্র পিদিমকে নিয়ে ডাঃ দেবী শোঠী’র রিসিপশনে যাই এবং ওখানের দায়িত্বরতরা বলেন ফাইল জমা রাখুন বিকেল ৩টার দিকে ডাক পড়তে পারে। এদিকে আমরা শুধু স্র্যাত্র আর কফি খেয়ে দিন পার করে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় মোক্ষম সময় আসে। আরও জনা দশেক রোগীর সাথে আমরা ডাঃ দেবী শোঠীর সাক্ষাতের জন্য এই ভবনের দু’তলায় তাঁর চেম্বারের পাশের রুমে বসলাম। মিনিট পনেরো বসার পর আমাদের ডাক পড়ে ডাক্তারের রুমে। হাজার বর্গফুটের আয়তনের রুমটিতে নানান পেইন্টিং ও অনেকগুলো সোফা দ্বারা সাজানো। তখন হালকা ভল্যুমে মীরার ভজন বাজছে। আমরা সার্জিকেল পোষাক পরিহিত ডাঃ দেবী শোঠীর সামনে গিয়ে বসতেই আমার ৮ বছরের পুত্র পিদিমকে তিনি কাছে বসিয়ে একটা ক্যাডভেরী লজেন্স হাতে দিলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে এ যেন একুশ শতকে ডাক্তারের বেশে বসা এক অবতার। তাঁর পরনে তখন অপারেশন থিয়েটারের পোষাক। শুনেছি তিনি নাকি অপারেশনের ফাঁকে ফাঁকে সারাদিনই রোগী দেখেন তাই ওই পোষাকেই থাকেন সব সময়। এবার ফাইলে চোখ বুলিয়ে আমার স্ত্রী পম্পার দিকে তাকিয়ে বললেন কি অসুবিধা বল? পম্পা তখন শুধু বাংলার সাথে সিলেটি আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রনে বেশ আবেগ নিয়েই নিজের পুত্রের অসুবিধাগুলো বললেন এবং আমিও বাদ পড়া পয়েন্ট যোগ করলাম। ডাঃ দেবী শেঠী বেশ মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন এবং শুধু বাংলায় বললেন - “তোমাদের ছেলের হার্টে ঔষধ খাওয়ার মত কোন রোগ নেই। আমি লিখে দিয়েছি তোমরা শিশু নিত্তরোলজিষ্ট ডাঃ মিনাল কিকাটপুরে ও জেনেটিক্স ডাক্তার এস জে পাতিল এবং চোখের জন্য নারায়ণা নেত্রালয়ে যাও।” আমরা তখন অবতারের মত হৃদয়ের রাজা খ্যাত ডাঃ দেবী শেঠীর পায়ের ধূলা মাথায় নিয়ে তাঁর চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম। নারায়ণা থেকে বেরিয়ে এসে দেখি আলো ঝলমলে রাতের হসুর রোড (চেন্নাই মহাসড়ক) যেন সন্ধ্যা কালীন ব্যস্ত সময় পার করছে। একটা বেবী টেক্সি ডেকে রেষ্ট হাউসের দিকে যাত্রা করলাম।
২৪শে সেপ্টেম্বর সকাল বেলা নাস্তা খেয়েই আমরা চলে গেলাম‘নারায়ণা হেল্থ সিটি’র মজুমদার সার্উ মেডিকেল সেন্টার। ওখানেও বাংলাদেশী ইনফরমেশন সেন্টার আছে এবং আছেন বাঙ্গালী ষ্টাফ। এই মেডিকেল সেন্টারে-ক্যান্সার, নিত্তবো, ডেন্টাল থেকে শুরু করে সব ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। আমি সরাসরি কাউন্টার থেকে চাইল্ড নিওরোলজিষ্ট ডাঃ মিলান কি কাটপুরের এপয়েনমেন্ট নিয়ে অপেক্ষায় থাকলাম। ডাঃ মিনাল অনেকগুলো পরীক্ষা করতে দিলেন সাথে সাথে জেনেটিক্স ডাক্তার কে ও দেখাতে বললেন। এরপর আমরা জেনেটিক্সস ডাক্তার এস জে পাতিলের কক্ষে গেলে তিনি পুলিশ যেভাবে আসামীকে শুধূই সন্দেহের চোখে দেখে সেভাবেই আমার শিশু পুত্রকে দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে। এবার ডাক্তার আমরা মানে আমি ও আমার স্ত্রীর কয় ভাই বোন তা লিখেলেন এবং কার কি রোগ আছে সে সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েও কাজে লিখলেন। তিনি আমার পুত্রের বিষয়ে ২ পৃষ্টা লিপিবদ্ধ করে তারপর বিদায় দিলেন। এবার জেনেটিক্স ডাক্তারের প্রতিবেদন ও সব রিপোর্ট নিয়ে ডাঃ মিনাল কি কাটপুরের কাছে গেলে তিনি আমার স্ত্রীকে কিছু বলতে বলেন। পম্পা তখন শুধু বাংলা সিলেটে মিশলে যা বললো তাই খুব সুন্দরী এবং সবসময় হাসিখুশী থাকা ডাক্তার মিনাল কিকাটপুরে বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। এখানে অবশ্য আমাকে হিন্দি ও ইংরেজী দোভাষীর ভূমিকায় থাকতে হয়। অতঃপর ডাঃ মিনাল বললেন-তোমার ছেলের মস্তিস্কে এপিলেপ্সি বা কোন জটিল রোগ নেই। এক ধরনের এলার্জি থেকে তার খিচুনী হয় এবং পৃথিবীর ৩০% শিশু জন্মের সময় এই এলার্জি নিয়ে জন্মায়। তিনি দু’টি ঔষধ ও একটি ¯েপ্র দিয়ে বললেন দুবছর ঔষধ খেলে এই সমস্যা আর থাকবে না।
ইতিমধ্যে ২৫শে সেপ্টেম্বর ১৪ আমরা ‘নারায়না নেত্রালয়ে’ গেলাম, এখানে আমার পুত্র পিদিমের চোখ বিভিন্ন ভাবে প্রায় দশজন ডাক্তার দেখলেন এবং সবশেষে সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ জ্যোতি এইচ মাথালিয়া ব্যবস্থাপত্র দেন। এদিন বিকেল বেলা আমরা হাসপাতাল থেকে বেরুতেই পুত্র পিদিম বললো ‘বাবা কিছু খাব’ । আমরা তখন হেনা গারা রোডের ম্যাজিক সেফ রেষ্টুরেন্টে ঢুকে দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ø্যাক্স ‘দোসা’ অর্ডার দিলাম। মিনিট দশেক পর দু’জনের জন্য ২টি বড় প্লেটে একেকটা প্রায় এক হাত লম্বা (পাটিসাপ্টার মত) গরম গরম দোসা দুই ধরনের সস দিয়ে আমাদের পরিবেশন করা হয়। আমরা বাপ-ব্যাটা বেশ সময় নিয়ে গরম গরম দোসা আর দু মগ কফি পান করে ঘরে ফিরি।
হৃদয়ের রাজা দেবী শেঠী ও নারায়ণা হৃদয়ালয়ঃ
ডাঃ দেবী প্রসাদ শেঠী পৃথিবীর ১০ জনের একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও আমার মতে তিনি ১নম্বর। আমার এই মতামতের পিছনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো এই ক্ষণজন্মা মানুষটি রোগীকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দেবার সাথে সাথে তার অর্থনৈতিক অবস্থা অর্থাৎ ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চান এবং সে মতে পদক্ষেপ নেন। নিশ্চয়ই বাকী ৯জন ডাক্তার কারো অর্থনৈতিক অবস্থা জানতে চান না।
ডাঃ দেবী শেঠী একদিন একটি শিশুর জটিল অপেনহার্ট সার্জারী করছেন। এমন সময় তাঁর বিশেষ সহকারী অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করে বলেন- ‘স্যার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ফোন করে লাইনে আছেন এবং আপনার সাথে জরুরী একটা আলাপ আছে বলেছেন’। ডাঃ শেঠি দেখলেন এই শিশুটির অস্ত্রোপচার এ দেরী হলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা তাই তিনি নিজের সহকারীকে বললেন-‘পিএম-কে বলো আমি ওটিতে আছি এক ঘন্টা পর ফোন করার জন্য’। অবশ্যই এক ঘন্টা পর প্রধানমন্ত্রী ফের ফোন করেন।
দক্ষিণ ভারতে জন্ম নেয়া দেবী শেঠী ১৯৮২ খ্রীঃ কস্তুরবা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারী বিদ্যায় গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে সার্জারী বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী নেন। ১৯৮৯ খ্রিঃ লন্ডনের উচ্চাভিলাষী চাকরীর লোভ ত্যাগ করে দেশে ফিরে আসেন। এখানে ডাঃ রায়ের সাথে তিনি কলকাতার গড়ে তোলেন ভারতের প্রথম হৃদরোগ চিকিৎসা হাসপাতাল বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার। কিন্তু ভারতীয়দের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ইউরোপিয়ানদের তুলনায় তিনগুন বেশী হওয়ায় এই একটি হাসপাতাল যথেষ্ট ছিল না। এজন্য ডাঃ দেবী শেঠী ও ডাঃ রায় মিলে আরো তিনটি হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলেন, বি এম বিড়লা হার্ট সেন্টার যাত্রা শুরুর অল্প দিনের মধ্যে ভারতের শ্রেষ্ঠ হার্ট হাসপাতালের একটিতে পরিণত হয। ডাঃ দেবী শেঠী নামক এই মহাগুনী ব্যাক্তিটি ১৯৯৭খ্রীঃ এর এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার হাজার শিশুর সফল হার্ট সার্জারী সম্পন্ন করেন। লন্ডনের গাইস হাসপাতলে হার্ট সার্জন হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেয়া ডাঃ দেবী শেঠী কে বন্ধুরা বলতেন ‘অপারেটিং মেশিন’। বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার স্থাপনের পরই উদ্যেক্তারা শিশুদের জন্য পেডিয়াট্রিক সার্জিক্যালের ব্যবস্থা করেন এবং অল্প দিনের মধ্যে ৭দিন বয়সী এক সদ্যজাত শিশুর সফল অপেন হার্ট সার্জারী সম্পন্ন হয়। ভারতে সে সময় হৃদপিন্ডে সাফল্যজনকভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া শিশুদের মধ্যে তার বয়সই ছিল সবচেয়ে কম।
মাদার তেরেসা তখন ডাঃ দেবী শেঠীর তত্ত¡াবধানে হাসপাতালের ইন-টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ক্রমে ক্রমে সেরে উঠছিলেন। একদিন তিনি দেখেন ডাঃ দেবী শেঠী একটি ‘ব্লু বেবি’ বা নীল শিশুকে বেশ যতœ করে পরীক্ষা করছেন। বেশ কয়েক মিনিট ধরে চুপচাপ ওই দৃশ্য দেখার পর মাদার তেরেসা ডাঃ শেঠীকে বললেন “আমি এখন বুঝতে পারছি কেন তুমি এখানে আছো। হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের যন্ত্রনা দূর করার জন্যই ঈশ্বর তোমাকে এখানে পাঠিয়েছেন।” ডাঃ শেঠীর ভাষায় তার জীবনে যতো প্রশংসা পেয়েছেন এর মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ প্রশংসা। এছাড়া অপেন হার্ট সার্জারীর পর একটি শিশু যখন হাসপাতাল থেকে মা-বাবার কোলে ঘরে ফিরে তখন তাদের চোখে যে আনন্দের অশ্র“ ধারা ঝরতে থাকে এবং মনে মনে স্র্ষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ডাঃ দেবী শেঠির (সামনে না পেয়েও) প্রতি ধন্যবাদ জানান তাও তাঁকে বেশ আত্মপ্রসাদ দেয়।
ডাঃ দেবী শেঠি নিজের মা-বাবার বরাবরের অসুস্থতার কারনে একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ডায়বেটিক রোগী। ডায়াবেটিকস বাড়ার কারণে পিতাকে তিনি অনেকবার অজ্ঞান হয়ে পড়তে দেখেছেন। এই পরিবারের কাছে তখন ডাক্তারের চেহারাটাই ছিল যেন এক ঈশ্বরের মূর্তি। কারণ চরম মূহুর্তে ওই ডাক্তারই ডাঃ দেবী শেঠির মা-বাবার জীবন বাঁচাতেন।
ছোটবেলায় একটা ঘটনা তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। কোন এক শনিবার বিকেল বেলা মুম্বাই থেকে আসা দূর সম্পর্কের আত্মীয় দেবী শেঠির মা কে বলছিলেন “ ডাঃ ........... নামে একজন সার্জন আমার সন্তানের জীবন বাঁচিয়েছেন এবং একটা টাকাও নেননি। ’ একথা শুনে ডাঃ দেবী শেঠির মা ওই সার্জনের মাকে বার বার আশীর্বাদ করে বলছিলেন, ‘এরকম ভালো মানুষের কারণেই এখনও পৃথিবীটা এতো সুন্দর।
১৯৯৭খ্রিঃ এপ্রিল মাস পর্যন্ত ডাঃ দেবী শেঠি যে ৪০০০ শিশুর হার্ট সার্জারী সম্পন্ন করেন তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবার থেকৈ আসা এবং এদের সবাইকেই তিনি বিনা মূল্যে চিকিৎসা করেছেন। উল্লেখ্য এখনো ডাঃ দেবী শেঠি এবং তাঁর নারায়ণা হৃদয়ালয় একদিকে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে অপেন হার্ট সার্জারীর মত ব্যয়বহুল চিকিৎসা দেয় অন্যদিকে এই হাসপাতালে এসে যে কোন বয়সের হৃদরোগী যেন অর্থাভাবে চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়। এখনও ডাঃ দেবী শেঠি একজন অপেন হার্ট সার্জারীর রোগী বা তার এটেন্ডেন্টকে জিজ্ঞেস করেন ‘আপনার কি কি অসুবিধা আছে বলুন, এবং তখন রোগীর অর্থনৈতিক অবস্থা শুনে তিনিই পঁচিশ হাজার থেকে দেড়লাখ রুপি পর্যন্ত মূল্য ছাড় লিখে দেন। এছাড়াও এই হাসপাতলে দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য অনেক আসন বিনামূল্যে সংরক্ষিত আছে।
২০১২খ্রীঃ আগষ্ট মাস। সুনামগঞ্জের জনৈক তারেক কে অপেন হার্ট সার্জারীর জন্য ‘নারায়ণা হৃদয়ালয়’ এর অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়েছে। চিকিৎসকরা রোগীকে অজ্ঞান করে অপারেশন শুরু করে সার্জিকেল করাত দিয়ে বুকও চেরা হয়ে যায়; এখন শুধু হৃদপিন্ড শরীর থেকে বের করে নিয়ে কাটা ছেঁড়া করার পালা। এমনি সময় ডাক্তার দেখলেন রোগীর রক্তচাপ হঠাৎ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে গেছে। এ পর্যায়ে আর এগুলে মানে হার্ট অপেন করলে রোগীকে বাঁচানো যাবেনা এবং তখনই বুক জোড়া লাগিয়ে রোগীকে আই সি ইউ তে নেয়া হয়। রোগীর এই পর্যায়েও অপারেশন (হার্ট অপেন না করে) শেষ করতে প্রায় তিন ঘন্টা সময় লেগে যায়। তারেক কে ২০দিন হাসপাতলে রেখে সব চিকিৎসা দেয়া হয় এবং তার আত্মীয় স্বজনকে পুরো ব্যাপারটা জানিয়ে দেয়া হয়। জীবনের বাকী সময়ের জন্য ঔষধ খেতে বলা হয়। তারেক নিজে জানে তার অপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে। এদিকে অপেন হার্ট সার্জারী না হওয়ায় ‘নারায়না হৃদয়ালয়’ কর্তৃপক্ষ এবাবত জমা নেওয়া ২,৬২,০০০/= (দুই লক্ষ বাষট্টি হাজার) রুপি পুরো ফেরত দিয়ে দেন।
২০০১ সালে আমার বন্ধু রনবীর দত্ত চৌধুরীর পিতাকে এমনি অপেন হার্ট সার্জারী করার সময় রোগীর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গত কারনেই অস্ত্রোপচার বন্ধ করা যায়নি। ফলে একমাস আই সি ইউতে থেকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন ডাঃ দেবী শেঠি রোগীর পুত্রকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন-এ ধরনের ঘটনা প্রতি এক হাজারের একজন রোগীর ঘটে।
ডাঃ দেবী শেঠি জানতেন ভারতের ২০ ভাগ মানুষ অর্থাভাবে হৃদরোগ চিকিৎসা করাতে পারেন না। তাই তিনি এদের সাহায্য করার উপায় নিয়ে প্রথম থেকেই ভাবতেন এবং দুস্থ মানুষের সেবায় তাঁর গৃহিত সবচেয়ে বড় উদ্যোগটি নি:সন্দেহে টেলিমেডিসিন। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি ও ডাঃ রায় যখন ছুটর দিনগুলোতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগী দেখতে যেতেন তখন সময় স্বল্পতার কারণে অনেক রোগীকেই সঠিক সেবা দেয়া সম্ভব হতো না । এ সমস্যার সমাধান কল্পেই প্রথমে ফ্যাক্সে এবং পরে ভিডিও কনফারেন্সিং এর মাধ্যমে রোগী দেখা শুরু করেন ডাঃ দেবী শেঠি। প্রথমদিকে টেলিমেডিসিন প্রকল্পে যে কোন লাইন ব্যবহার করা হতো তা ছিল বেশ ব্যয় বহুল। এছাড়া নেটওয়ার্কও বেশ অসুবিধা করতো এবং ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে ‘ইমেজ’ পাওয়ার সমস্যাও ছিল। অতঃপর ডাঃ দেবী শেঠি যোগাযোগ করেন ভারতের মহাকাশ (আই এস আর ও) সংস্থার সঙ্গে। এরপর আই এস আরও তাদের যোগাযোগ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে একই ধরণের বেশকিছু কমিউনিকেশন ডিশ স্থাপন করে ডাঃ দেবী শেঠির চেম্বার ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের করোনারি কেয়ার ইউনিটগুলোতে। আগে যেখানে ভারতের জেলা হাসপাতালগুলোতে শতকরা ৫০ভাগ রোগী বিশেষজ্ঞ পরামর্শের অভাবে মারা যেত এখন তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ শতাংশে।
কলকাতায় ডাঃ দেবী শেঠির হাসপাতালের নাম-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়িন্সেস। এই হাসপাতাল লটিতে ব্যাঙ্গালুর থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে ডাঃ দেবী শেঠি জটিল রোগী দেখে থাকেন। এটি কলকাতার -১২৪ মুকুন্দপুর ই এম বাইপাস (সন্তোষপুর কানেক্টরের পাশে) অবস্থিত। এখানে শুধু সরাসরি ডাঃ দেবী শেঠি কে পাওয়া যাবে না। তবে ব্যাঙ্গালুরুর মত সব সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান আছে। কেউ কলকাতা থেকে ২০০০ কিলোমিটার দূরত্বে ব্যাঙ্গালুরু যেতে না চাইলে কলকাতার এই হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে পারেন।
বিশ্বের বৃহত্তম হৃদরোগ হাসপাতাল ‘নারায়না ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়িন্সেস’ ব্যাঙ্গালুরুতে বর্তমানে আছে ১০০০ শয্যা, ১০৭ জন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, ৫টি ক্যাথ ল্যাব, ১৫টি অপারেশন থিয়েটার এবং প্রতিদিন কমপক্ষে ৩৫জন ছোট –বড় রোগীর অপেন হার্ট সার্জারী হয়। ডাঃ দেবী শেঠির ফোন নং ০০-৯১-৮০-২৭৮৩-৫০০৬-০১৮ তিনি রোগী বা তার আত্বীয়কে এই নম্বরে ফোন করতে বলেন। Email id: devishetty@nhhospitals এছাড়া ঢাকার মিসেস নাহিদা আলম, নারায়ণা হৃদয়ালয় এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশের চীফ কো-অর্ডিনেটর, ডাঃ দেবী প্রসাদ শেঠি। তাঁর অফিস বাড়ি# ২৫১/খ, ১ম তলা, রোড#১৩ অ, ধানমন্ডি আ/এ ঢাকা-১২০৯ এবং ফোন নং-০২-৯১৩৩৯১০/০২-৯১১০৬১৯ এবং ফোন করা যাবে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে। তবে ডাঃ দেবী শেঠির ই-মেইল এড্রেস এ মেইল করলে খুব তাড়াতাড়ি উত্তর আসে এবং ইহা ভিসা পেতে খুব কাজে লাগে।
এছাড়া নারায়ণা হৃদয়লয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিলেট শহরের সুবিদ বাজারের ব্যবসায়ী বাবু নিত্যকলি আচার্য্য এর ০১৭১২-২২৭২৪৩ নম্বরে কল করলে তিনি আপনাকে অনেক বিষয়েই সহযোগিতা করবেন। আর ব্যাঙ্গালুরু গিয়ে কিভাবে এয়ারপোর্ট বা রেলষ্টেশনে যাবেন, ডাক্তারের এ্যাপয়েনমেন্ট ইত্যাদি বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করতে পারেন ওখানে অবস্থানরত বাঙ্গালী, দেবাশীষ পাল। ফোন নং ০০৯১৯৯৮৬১৫৬০৩০। তাঁর মালিকানাধীন সিরিডি সাঁই গেষ্ট হাউসে নিজে রান্না করে খেতে পারবেন পছন্দমত। নারায়ন হেল্থ সিটির কাছের ২টি রেষ্ট হাউস হলো (১) হোটেল রেড্ডি রেসিডেন্সি, ফোনৎ ০৮০-২৭৮৩৩২৫৬ মোবাঃ ৯৭৪২-৩৭৯৯০২, রুম ভাড়া ৫০০/- রুপি থেকে ১৫০০/- রুপি পর্যন্ত। (২) হোটেল নারায়ণা ইয়াত্রী রেসিডেন্সি ফোনঃ ০৮০-২৭৮৩৩৬০০ রুম ভাড়াঃ ৮৭০/- রুপি থেকে ১৪০০/- রুপি পর্যন্ত। তবে ওখানে হোটেলের খাবার আপনার ভাল নাও লাগতে পারে তাই সিড়িডি সাঁই বা এ ধরনের গেষ্ট হাউসে থাকলে তারা রান্নার জন্য গ্যাসের চূলা ও বাসন পত্র দিয়ে থাকে।
নারায়ণা হেল্থ সিটিতে হৃদরোগ ছাড়াও ক্যান্সার, নিত্তরো, ডেন্টাল, আই, মেডিসিন ইত্যাদি চিকিৎসার জন্য বিশ্বমানের ব্যবস্থা আছে। এই কম্পাউন্ডেই ‘স্প্রাস’ নামে একটি একসিডেন্টাল হাসপাতাল আছে যদিও এটি নারায়ণা গ্র“পের নয়।
ব্যাঙ্গলুরে রোজ আমরা আাঙ্গুর, আপেল, বেদানা, মালটা, সাগর কলা ইচ্ছেমত খেতাম। ভারতে বিদেশ থেকে কোন ফল আমদানী হয়না এবং আমাদের দেশের মত ওখানে ফলে কোন বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার না করায় বেশ নিশ্চিন্তমনেই কলকাতা ও ব্যাঙ্গালোরে তিন সম্পাহ আমরা ফল খেয়েছি। ওখানে যে ফল দেখেছি তাতে মনে হয় বাংলাদেশে বেশীরভাগ আঙ্গুর, আপেল, বেদানা, মালটা ভারত থেকেই আমদানী হয় অথচ বিক্রেতারা বলে এটা ব্রাজিল ওটা অষ্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান থেকে এসেছে।
আমাদের রেষ্ট হাউসে আলাপ হয় নওগা জজ কোর্টের সিনিয়র এডভোকেট মর্তুজা মাহতাব উদ্দিনের সাথে। নাতনীর ওপেন হার্ট সার্জারী হয়েছে ক’দিন আগে। এই সিরিডি সাঁই গেষ্ট হাউসের আরেক বাসিন্দা সুবিদবাজারের মৃনাল কান্তি চক্রবর্তী অঞ্জনা চক্রবর্তী দম্পতি তাদের শিশুপুত্রকে হার্ট চেকআপ করাতে নিয়ে এসেছেন। এই দম্পতিকে সঙ্গঁ দিতে এসেছেন নিকটাতœীর সনজয় চক্রবর্তী-দেবী চক্রবর্তী দম্পতি। হালদার পাড়ার শিক্ষক প্রবাল ভট্ট্যাচার্য দম্পতি এখানে এসেছেন একমাত্র শিশু কন্যাকে নিয়ে।
২৬শে সেপ্টেম্বর ’১৪ সকাল ১০টার দিকে মোরগ কিনতে গিলাম কিতাগান্না হাল্লি রোড এর এক দোকানে। মহিলা দোকনী এত নিপুণ হাতে মোরগ কাটলেন যা এর আগে কখনো দেখিনি। এদিন দুপুরে আমাদের এখানে নিমন্ত্রন খেতে আসে তালতো বোনের ব্যাঙ্গালুরু প্রবাসী পুত্র রাজ। শিলং এর ছেলে রাজ এই ব্যাঙ্গালুরে বি এস সি (আইটি) করে ভারতের অন্যতম বড় অনলাইন কাপড় বিক্রেতা গুহঃৎধ.পড়স এ চাকরী করে দু’বছর ধরে এবং তার সাথে সহকর্মী করিমগঞ্জের তাপস পালও আসে। এদিন দুপুরের দিকে কি এক কাজে ‘নারায়না হৃদয়ালয় এ গেছি, দেখি মূল ভবনের সামনে চার ধর্মের উপাসনালয়ের সম্মুখে মসজিদকে কেন্দ্র করে অন্ততঃ তিন শতাধিক লোক জুম্মার নামাজ আদায় করছেন। এদের অধিকাংশই বাংলাদেশের লোক। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম জায়নামাজ মনে হয় মুসল্লীরা নিয়ে গেছেন কিন্তু নামাজ শেষে দেখি এগুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া আছে এবং সংখ্যায় চারশোরও বেশী হবে। বাজারে এই জায়নামাজ এক একটির মূল্য চার শো রুপি।
‘নারায়ণা হেল্থ সিটি’ থেকে ৩কিলোমিটার দূরে (মূল শহরের দিকে ) ভারতের ইলেকট্রনিক সিটি বা আই টি ক্যাপিট্যাল। ১৯৯৮খ্রীঃ যাত্রা করা এই আই টি সিটিতে গুগল, ইনটেল, ইনফোসিস, স্যামসং সহ আরো অনেক কোম্পানীর ২য় প্রধান দপ্তর আছে। পৃথিবীর বড় বড় কোম্পানীর সফ্টওয়্যার এখান থেকে দেয়া হয়। আইটি ক্যাপিটেল এর প্রতিটি কোম্পানীই হাজার হাজার মানুষের কর্মচঞ্চলতায় মূখরিত থাকে প্রতিদিন। এখানে অনেক বাঙ্গালীও আছেন। ব্যাঙ্গালুরে থাকার দিনগুলোতে রোজ বিকেলে গেষ্ট হাউসের কাছের ø্যাক্সবার থেকে এক গ্লাস টকদই (দক্ষিণ ভারতে মিষ্টি দই হয় না) খেয়ে আমি হাঁটতে বেরুতাম। এরপর ৪/৫ কিলোমিটার পথ বেশ দ্রুত হেঁটে এসে আরেক গ্লাস টক দই খেয়ে রুমে ফিরতাম। এছাড়া আমি ও পুত্র পিদিম রোজ রাতের খাবারের পর অন্তত: দুই পদের ফল খেয়ে তারপর ঘুমাতাম। অবশ্য আমার স্ত্রী পম্পা গ্যাষ্ট্রিক বেড়ে যাবার ভয়ে ফল খেতেন না।
ব্যাঙ্গালুরু শহরের বেশিরভাগ এলাকাই ফ্ল্যাইওভার পরিবেষ্টিত। ভারতের দ্বিতীয় ধনী প্রদেশ কর্নাটক এর রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু ও এর আশেপাশে মাইশুর প্যালেস, চামুন্ডেশ্বরী, চিরিয়াখানা, সাফারী পার্ক, ত্রিরঙ্গাঁ পাটনা, টিপু সুলতানের বাড়ি ও সমাধি, নন্দি হিল্ম (গ্রীষ্মকালে টিপু সূলতানের রাজধানী) বৃন্দাবন গার্ডেন একদিনে সকাল থেকে রাত ৯টা অবধি বেড়িয়ে দেখা যাবে। বৃন্দাবন গার্ডেন সন্ধ্যার পর দেখতে হবে কারন লেজার নাইট সহ বিভিন্ন আলোর ঝলকানী শুধু রাতেই দেখা যাবে।
ব্যাঙ্গালুরে সাধারণতঃ কন্নর ভাষায় সবাই কথা বলে এবং হিন্দি ইংলিশ ও চলে। তবে বিভিন্ন যায়গায়-তা হাসপাতাল, রেষ্টুরেন্ট বা দোকান হোক সব জায়গায় বিভিন্ন কথার মাঝে ‘ইল্লা ও ইদে’র অহরহ ব্যবহার। যেমন তাদের ভাষায় রেষ্টুরেন্টে গিয়ে একজন বললো-‘আন্ডু পান্ডু ইদে?’ সাথে সাথে অপর জন উত্তর দিল ‘আন্ডু পান্ডু ইল্লা’ এখন এই ইল্লা ও ইদে জানতে দেবাশীষদাকে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন-ইল্লা অর্থ নেই এবং ইদে অর্থ আছে। দক্ষিণ ভারতের মানুষ খুব সততার মাঝেই জীবন কাটায়। অনেকেই নিজের বাড়িতে যায়গা না থাকায় রাস্তার পাশে গাড়ী পার্কিং করে রাখে। গাড়ীতে অনেকে টাকার ব্যাগও রেখে যায় এবং পরদিন তা ঠিকই পাওয়া যায়। এমনি করে করে ব্যাঙ্গালুরে প্রায় দুই সপ্তাহ কাটিয়ে আমাদের ঘরে ফেরার দিন চলে আসছে। একদিন সকাল বেলা দেখি আমাদের গেষ্ট হাউসের সামনের রাস্তা দিয়ে ঢোল-করতাল বাঝিয়ে ধর্মীয় শোভাযাত্রা । স্থানীয় তামিলরা রাবণের (শক্তির উপাসনা।) সাজে একজনকে সেই রাজার পোষাকে সামনে রেখে তাঁর পিছনে একই রংয়ের শাড়ীতে প্রত্যেকের হাতে ফুলের ঢালি নিয়ে কয়েক শো মহিলা এবং সফেদ ধুতি (লুঙ্গিরমত) পরে পুরুষরা।
এদিনে তখন শুরু হয়েছে বাঙ্গালী হিন্দুর প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী দূর্গা পূজা। কিন্তু ব্যাঙ্গালুরে দূর্গা পূজার কোন সাড়া শব্দই পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য এই শহরের বাঙ্গালী অধ্যুষিত এলাকায় কয়েকটি পূজার খবর আমি পেয়েছি এবং ইলেক্ট্রনিক সিটিতে বাঙ্গালীরা শ্রী শ্রী দূর্গা পূজা করছেন বলে জানা যায়। তখন ওখানে আসেন সিলেট শহরের লামাবাজার নিবাসী কয়লা ব্যবসায়ী সুনীল পাল সস্ত্রীক ও পলাশ পাল। ব্যাঙ্গালুরে শ্রী শ্রী গণেশ পূজা খুব ধুমধামে পালিত হয়। তবে দশমীতে তারা খুব আড়ম্বরপূর্ণভাবে দশহারা পালন করে। মাইশুরে দুই সম্পাহ ধরে দশহারা ফেষ্টিবেল পালিত হয় এবং এমনি এক লাইভ অনুষ্ঠানে শংকর মহাদেবন এর গান আমি রুমের টিভিতে দেখি। ৩ অক্টোবর ১৪ বাঙ্গালী হিন্দুরা যেখানে শ্রী শ্রী দূর্গাপূজার মহাদশমী পালন করছে সেখানে ব্যাঙ্গালুরে দশহারা পালিত হচ্ছে। অফিস, হাসপাতাল, দোকান, বাড়িঘর এমনকি গাড়িও দশহারার সাজে সাজানো হয়েছে। এদিন সরকারী ছুটি। পুত্র পিদিমকে (তোজো) নিয়ে তার চশমা আনতে ‘নারায়ণা নেত্রালয়’ এ গেলাম বিকেল চারটায়। ওখানে তখন ‘রাধা মাধব’ এর পূজা চলছিল। পুরোহিত বিশুদ্ধ শ্লোক পরিবেশন করছিলেন ভরাট কন্ঠে। বেশ ভাল লাগছিল। ওরা আমাদের কালোজাম আর চরণাম্রিত পান করতে দেন।
৪ অক্টোবর সকাল ৮টায় টেক্সি করে আমরা রওয়ানা হই বমাসান্দ্রা থেকে প্রায় ৮০কিলোমিটার দূরে ব্যাঙ্গালুরু এয়ারপোর্ট। শহরের একটার পর একটা ভি আইপি রোড ধরে গভর্ণর হাউস ইত্যাদি পেরিয়ে আমাদের গাড়ী এগিয়ে চলে। একসময় শহর ছেড়ে শহরতলীর দশর্ণীয় গ্রামগুলো ও তারপর একের পর এক পাথুরে পাহাড় পেরিয়ে ফুলে ফুলে সাজানো এয়ারপোর্ট রোডে পৌছি। এয়ারপোর্টের মূল ভবনটা এমনভাবে নির্মিত যা দেখে মনে হয় যেন এটা কোন যাদুকর বুঝি নির্মাণ করেছেন। দুপুর ১২টা ৫মিনিটে এয়ার ইনিডিগো’র বোয়িং ৭৪৭ ব্যাঙ্গালুরুর আকাশে উড়ে এবং আড়াইটায় কলকাতা দমদম নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আমরা নামি।
৫অক্টোবর ’১৪ সকালবেলা আমরা কলকাতার দক্ষিনেশ্বর শ্রী শ্রী কালী মাতাকে প্রনাম করতে যাই এবং প্রায় ১কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন ধরে তবেই মন্দিরে প্রবেশ করি।
৬অক্টোবর পবিত্র ঈদুল আযহার দিন কলকাতার মুসলিম জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত মারকুইস ষ্ট্রীটের হোটল প্যারাডাইস থেকে বেরিয়ে আমরা ‘এসপ্ল্যানেড’ (ধর্মতলা) ষ্টেশন থেকে পাতাল ট্রেনে চড়ে দম দম যাই। এয়ারপোর্ট বিমানের কোন কাউন্টার না থাকায় ঢাকা ফেরার বিমান টিকেট কনফার্ম করা যায়নি। এরপর ওখান থেকে একটা টেক্সি নিয়ে আমরা সরাসরি কলকাতার বিখ্যাত কলেজ ষ্ট্রীটে চলে যাই। ওখানে আগেও আমি গেছি এবং এবারও টেক্সি থেকে সেই বংকীম চ্যাটার্জী ষ্ট্রীটের এ্যালবার্ট হলের সামনে নামলাম। নীচতলার শ্রীনাথ লাইব্রেরী থেকে কয়েকটা বই কিনে দু’তলায় সেই কফি হাউসে উঠতে গিয়েই দেখি সিঁড়ির গোড়াতে একটা ডিজিটাল সাইনে (১০ বাই ৪) প্রয়াত কন্ঠশিল্পী মান্না দে’র ছবি এবং ‘....ভাতিছ গগনও মাঝে ..’ গানের কলি লিখা। সাথে সাথে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লিখা ও সুপর্ণকান্তি ঘোষের সুরারোপিত ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানটি আমার মনের মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাজতে শুরু করে।
কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেল গুলো সেই আজ আর নেই
নিখিলেশ প্যারিসে মুইদুল ডাকাতে নেই তার আজ কোন খবরে
গ্রান্ডের গীটারিষ্ট গোয়ানিজ ডিসুজা ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে
কাকে যেন ভালবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে পাগলা গারদে আছে রমা রায়
অমলটা ধুকছে দূরন্ত ক্যান্সারে জীবন করেনি তাকে ক্ষমা আর
সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে শুনেছি তো লাখপতি স্বামী তার
আর্ট কলেজের ছেলে নিখিলেশ স্যান্যাল বিজ্ঞাপণের ছবি আঁকতো
...............................................................................
সময় গণনায় মাত্র ছয় মিনিট বিশ সেকেন্ড এ শেষ হওয়া এই গানটি বাংলাগানের কোটি কোটি শ্রোতা যে কত শত কোটিবার বাজিয়ে শুনেছেন তার সঠিক হিসেব কেউ কোনদিন দিতে পারবে না। তবে এই মাইলষ্টোন বাংলাগান শুনে নষ্টালজিয়ার ভোগেননি এমন বাঙ্গালী খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি এমন অনেককে দেখেছি যারা কোন দিনই গান শুনেছেন বলে বিশ্বাস হয়না কিন্তু ‘কফি হাউস’ গানটা শুনে তারাও কেমন নড়ে চড়ে বসেছেন? বেশ পুরনো দিনের তিনতলা ভবনের দু’তলা তিনতলা জুড়েই ইন্ডিয়ান কফি ওয়ার্কার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিঃ এর প্রতিষ্ঠান ‘কফি হাউস’। প্রায় ২৫০০ বর্গফুট পরিমাপের এই কফি হাউসে আমরা দুপুরবেলা পৌছি। নিখিলেশ, মইদুল, ডি-সুজা, রমা রায়, অমল, সুজাতা এরা বিকেল চারটা থেকে আড্ডায় বসলেও আমরা দুপুর একটার কফি হাউসের চেহারা প্রায় সেমতই দেখি। বন্ধের দিন হলেও একেকটা টেবিলে একেক বয়সের যুবা-বৃদ্ধ-বৃদ্ধার ‘কফি হাউস’ যেন একে অপরের পরিপূরক। এখানের ওয়েটাররা বিশেষ পোষাক আর মাথায় পাগড়ী পরে আছে। আমরা মোগলাই পরাটা, ২কাপ হট আর ১কাপ কোল্ড কফির (পুত্র তোজোর জন্য) অর্ডার দিলাম। পুরো হলের দেয়াল জুড়েই নানান পেইন্টিংস। স্ত্রী-পুত্র কি ভাবছে সেদিকে খেয়াল না করলেও আমি তখন বিভিন্ন টেবিলের মুখগুলোর মাঝেই যেন অগুনতি নিখিলেশ, মইদুল কিংবা রমা রায়কে খুঁজছিলাম। আমি যখন সিলেট ল’ কলেজে পড়তাম তখন ক্লাশের অবসরে প্রায় রোজ সন্ধ্যায় আমরা একডজন বন্ধু বান্ধবীরা মিরাবাজার ডায়নার কিং রেষ্টুরেন্টে (পরে বন্ধ হয়ে যায়) অন্তুতঃ দেড় দু’ঘন্টা আড্ডায় বসতাম। কলকাতার এই কফি হাউসে বসে আমি তক্ষুনী ফিরে যাই ১৯৯১ বা ৯২ খ্রীঃ সেই সব আনন্দময় সন্ধ্যায়। আমি মনে করি জীবন মানেই তো এমন নির্ভেজাল আনন্দময় ফেলে আসা স্মৃতি হাতড়ানো। কফি হাউস থেকে বেরিয়ে কলেজ ষ্ট্রীট ষ্টোপেজে (ভারতের একমাত্র কলকাতায় চলাচলকারী) দাঁড়ানো ট্রামে ওঠার জন্য আমার পুত্র পিদিম (তোজো) আগ্রহী হলে তার মা মানা করে-কি আর করা টেক্সিতেই চড়ি।
পরদিন বিমান অফিস খোলে যাওয়াই আমরা ফিরতি টিকেট কনফার্ম করে ৮অক্টোবর ’১৪ দেশে ফিরে আসি।

আরোও ছবি

হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু
হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু
হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু
হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু
হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু
হাইওয়ে টু ব্যাঙ্গালুরু

Free Online Accounts Software