17 Dec 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 3 January 2015 সাহিত্য-সংস্কৃতি  (পঠিত : 2810) 

পাহাড়ীদের ঘরে-সংসারে

   পাহাড়ীদের ঘরে-সংসারে
     

বশির উদ্দিন: আমাদের ভার্সিটি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ । এই ছুটিটা কিভাবে কাটানো যায় তা নিয়ে চিন্তা করছিলাম
হঠাৎ পাখি বলল: এই তোর না গারোদের ওখানে যাওয়ার কথা । তার কথাটা মনে ধরলো ।
তাছারা একটি গারো মেয়ের সাথে আমার বন্ধুত্ব ছিল । ৬ জানুয়ারী ভোরে আমরা সিলেট থেকে রওয়ানা
দিলাম তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে । তারা থাকে সুনামগঞ্জের দোয়ারা থানার সীমান্তবর্তী এলাকা ঝুমগাঁও
গরো টিলায় । সেখানে পৌছতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল । প্রথমে বাস যোগে পরে মটর সাইকেলে
শেষমেশে হেটে গিয়ে পৌছলাম । ঐখানে গিয়ে উঠলাম আমার বান্ধবী আশার বাড়ীতে তার বড় ভাই অরণ্য
আমাদেরকে আগ থেকেই চিনতো । সে পুলিশ লাইনে লেখা পড়া করেছে । পাখির ক্লাসমেট ।
আমাদেরকে এরকম আকস্মিকভাবে দেখে তারা খুব অবাক হলো ।
তারা তাড়াহুড়া করে পানি এনে দিলো । অরণ তো ঝাপটে ধরলো আমাদের । আশা ঘর থেকে
আবেগহীনের মতো বেরিয়ে এসে বলল : আগে জানালেই পারতে । রাতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো
টিলার উঁচুর এক মাচাঙে । আশার বাবা নেই । তার মা এর এক মামা আছেন । তারা তিন বোন এক ভাই ।

আশা সবার ছোট সে হলো তাদের গোত্রের নকমা , অর্থাৎ ভবিষ্যতের গোত্র মাতা । একামাত্র সেই
সকল ক্ষমতা ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে । আর তাকে যে বিয়ে করবে সে হবে নকরম ।


রাতের খাবারের পর মাচাঙে আড্ডায় বসলাম । আশার মামা আমাদেরকে জানালেন , আমরা অনেকদিন থেকেই
এখানে বসবাস করছি । তবে ময়মনসিংহ ও মৌলভীবাজারে আমাদের স¤প্রদায়ের মানুষ বেশী । এখানে আমরা
প্রায় ৩০টা ফ্যামিলি আছি । আর সুনামগঞ্জ সদরের নারায়ন তলায় আছে আরো কিছু পরিবার । বাংলাদেশে
আমাদের জনসংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের মতো ।
এখানে আমরা মারাক ও সাংমা গোত্রের অন্তর্ভূক্ত । আমাদের মূল বসতি ছিল চুরুয়া পাহাড়ে । ভারতের মেঘালয়
রাজ্যের গারো পাহাড়ও আমাদের আদি নিবাস । আর এখন বৃহদাংশ গারোই ওখানে বসবাস করে ।
হঠাৎ আনকেল জিজ্ঞস করলেন খাবার দাবারে কোন সমস্যা হয় নাইতো:আমরা বললাম জিনা । তবে কি খাইছি
বুঝতে পারিনাই । উনি বললেন : শাকসব্জি আর আলো পিসে উচি বানানো হয় সেটা দিয়ে তোমরা খেয়েছো ।
তবে আমরা কিন্তু সব খাই বলে হা হাকরে হাসলেন । কুচিয়া মাঙ্স,শুকর,কাকরা সব খাই এসবে কিন্তু অনেক শক্তি ।


সকাল নয়টার দিকে আশা এসে ঘুম ভঙালো সে কিছু মোয়া আর পানি টেবিলে রেখে বলল তারাতারি উঠে খাও ।
আজ রবিবার আমাদের গীর্জায় অনেক কাছে আমি যাই । ঘন্ঠা খানেকের মধ্যেই আসছি । উঠো ॥
একটু পর অরণ্য আসলো । সাথে একজন মহিলা উনার পিঠে চাদর দিয়ে বাঁধা একটি বাচ্চা ।
আর একটা বাচ্চা বয়স ছয় কি সাত হবে । সে গান ছড়া বলছে :-নাংকা কাচি রেয়াংআ
বলদে নাচি
মাই বল কো দেন বারা
বলং আগাতচি......
ছড়াটি অবশ্য পরে তার কাছ থেকে শুনে শুনে লিখেছি । মহিলা আমাদেরকে আদাব দিয়ে বললেন :
ছুনচি তোমরা নাকি সিলেট থে আসচো ? আমার ছেলেডারে সিলেত ভর্তি করামু । রাতে আমাদের
বাসায় আইছো । মহিলা “ল”উচ্চারন করতে পারেন না? অরণ্য জানালো আমরা অনেকেই “ল” উচ্চারন
করতে পারিনা ।
উঠোন দিয়ে একটা ছেলে হেটে যাচ্ছিলো চৌদ্দ-পনেরো বয়সের হবে । আমি ডাক দিলাম
বললাম এদিকে এসো : কাছে আসলে বললাম :কি নাম তোমার ? ডেভিড ।
আমি বললাম তুমি গোল আলু বলতো? সে বলল: গোর আরু , পাখি বললো তুমি গোল আলু বলতে পারলে
২০ টাকা দেব , বাচ্চাটি গোর আরু ,গোর আরু বলে চেচাচ্ছে । আরেকটু চেষ্টা করে দেখনা! গো....ল..আ...লু ।
সে বলতে লাগলো : মনরে মন একবার ক’না গোরের আরো ,গোর..... । আমি আর পাখি হাসতে হাসতে অবস্থা কাহিল ।
আর বাচ্চাটি বলেই যাচ্ছে গোর আরু...............।


বাইবেলের যোহনে আছে : আর প্রেম এই ,যেন আমরা তার আজ্ঞানুসারে চলি -আশার মুখে
এই বাক্যটি শুনে আমার রা বন্ধ হয়ে গেল , সে বলে যাচ্ছে তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো
তবে আমার মত হয়ে যেতে হবে । আমি হলম নকমা । শুন আমাদের গারো স¤প্রদায়ে নকমা হলো
সংসারের ছোট মেয়ে যে বাবার মার সকল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী এবং প্রায় রাজকুমারীর মতো ।
আর তুমি আমাকে বিয়ে করলে আমার এখানে চলে আসতে হবে । এটাই আমাদের নিয়ম । গারোদের
নিয়ম হলো বিয়ের পর ছেলেকে মেয়ের সংসারে চলে আসতে হবে । শুভ তুমি জানইতো আমাদের
সমাজটা মাতৃতান্ত্রিক ।
এমন সময় উঠোন থেকে শৌল আনকেল ডাক দিলেন : পিসা বাহিরে আসো । পিসা মানে খোকা ।
আমি মাঢাঙগর থেকে বেরিয়ে উঠোনের মতো জায়গাটায় গেলাম । ওখানে আমার বন্ধু পাখি আর
শৌল আনকেল বসা ছিলেন ।
আমি বললাম আনকেল কি সুন্দর জোছনা , আসলে পাহাড়ে বসে জোছনা দেখার স্বাদটাই আুলাদা ।
পাখি আনকেলকে জিজ্ঞেস করলো : তা আপনারা কিভাবে এখনে বসবাস করছেন ? আনকেল আর পাখি
আলাপ করছে । আর আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি ।

বশির উদ্দিন
সমাজকর্ম ( ৩য় বর্ষ)
শাবিপ্রবি,সিলেট।
০১৭৭২-১৮১৬০৫




Free Online Accounts Software