27 Feb 2017 : Sylhet, Bangladesh :

সিলেট 15 June 2014 দিবস  (পঠিত : 6371) 

বাবার যত কথা

বাবার যত কথা
     

হারান কান্তি সেন:-
বিশ্ব বাবা দিবসের বিশেষ রচনা (১৫ জুন)।
১৯৮৪ সাল। মার্চ মাসে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। ফল বেরুবার আগে আড়াই-তিন মাস বেকার থাকবো। সুনীল কাকু (প্রয়াত সুনীল কুমার অধিকারী) আমাকে ‘ওয়েইট রোজ’ নামক একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেলুনে ম্যানেজারী চাকুরী দিলেন। আগে টিউশানি করলেও ৯টা - ৬টা ডিউটি এই প্রথম। সকাল বেলা এসে ঢুকতাম দুপুরে নিজের সাইকেল চড়ে বাসায় গিয়ে খেয়ে আবার এক ঘন্টার মাঝেই ফিরতাম। সন্ধ্যার পর দোকান মালিক এসে ক্যাশ মিলিয়ে আমায় ছুটি দিতেন। একমাস চাকুরীর পর পাঁচশত টাকা প্রথম বেতন পেলাম। মনে হলো আমার হাতের মুটোয় যেন পুরো পৃথিবী। আমার বাবা ননী গোপাল সেন তখন প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত (ডান হাত-পা অবশ) এবং লাঠির উপর ভর করে হাঁটেন। তাই প্রথম বেতনটা পেয়ে ভাবলাম অসুস্থ বাবার জন্য কিছু কিনি। বাবার জন্য লন্ডন ম্যানশন থেকে একটা স্যান্ডে সাদা গেঞ্জি আর জিন্দাবাজার পয়েন্টের তারু মিয়া’র দোকান থেকে একটা হরলিক্স কিনলাম। মা’র জন্য অবশ্য তাঁর প্রিয় পান-সুপারী নিতে ভুললাম না। প্রথম বেতনের টাকায় বাবা-মা’র জন্য যত সামান্য কিনে বাসায় গেলাম। বাসায় গিয়ে যেইনা হরলিক্স’র বৌয়ামটা বাবার সামনে রাখলাম তখনই মা বললেন তোর বাবার তো ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। আমি বললাম তাতে কি হয়েছে- ডায়াবেটিস-এ হরলিক্স খাওয়া যায় না? বাবা তখন মা’কে বললেন- ‘দাও এক কাপ হরলিক্স- একটু খেয়ে নি’ই। একটু না খেলে পাগলটা মন খারাপ করবে।“ আমার প্রথম রোজগারের টাকায় কেনা অনেক স্বপ্নে ঘেরা এই হরলিক্স বাবা খেতে পারলেন না যতবারই ভেবেছি ততবারই আমার মন খুব খারাপ হতো।
১৯৭১ সাল। মার্চ মাসের শেষ দিকে বাবা গেছেন হবিগঞ্জ মহকুমায় পুলিশ লাইনে রেশন বিলি করতে। তৎকালীন সিলেট জেলার হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার মহকুমার বাবা তাঁর চাকরীর সুবাদে প্রায়ই যেতেন। হবিগঞ্জ গিয়ে রেশন বিলি করে ওই বাবত আহরিত সরকারী বিশ হাজার টাকা নিয়ে বাবা পড়েন বিপাকে। তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং চারদিকে পাক সেনাদের নির্যাতন চলছে। এদিকে সরকারী ওই টাকা সিলেট ট্রেজারীতে জমা করার ব্যাপারে বাবা বদ্ধপরিকর কিন্তু অনেকেই তাঁকে নিরুৎসাহিত করছে। একজন পরামর্শ দিল- যুদ্ধের সময় এই টাকা নিজের করে নিন এবং অফিসকে বলবেন রা¯Íায় টাকা লুট হয়ে গেছে। কিন্তু কারো কোন কথায়ই কানে না দিয়ে বাবা ঠিকই সিলেট ট্টেজারীতে পুলিশ বিভাগের রেশন থেকে আয় হওয়া টাকা জমা করেন। মা তখন গ্রামের বাড়িতে আমাদের নিয়ে। সে সময় আমি তিন বছরের শিশু। এদিকে বাবা সিলেটে টাকা জমা দিয়ে বালাগঞ্জে’র তাজপুর আমাদের গ্রামের গ্রামের বাড়ির দিকে রওয়ানা হন। কিন্তু রা¯Íায় কয়েকবার তিনি পাক হানাদারদের সামনে পড়েও সৌভাগ্যবশত: প্রাণে বেঁচে বাড়ি ফিরেন। বাবা নাকি তখন এক কাপড়ে লুঙ্গি পরে মেইন রোডে না উঠে নানা গ্রামীণ রা¯Íা পেরিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেন।
আমরা ভাই-বোনদের মাঝে বাবার সাথে আমার ছিল সবচেয়ে মধুর সম্পর্ক। সে’ই পাকি¯Íান আমল থেকে সিনেমা পাগল বাবা ১৯৭৬ সালে প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত হলে এরপর মাসে দু’একবার সিনেমা দেখতে গেলে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আমি জীবনে হলে গিয়ে বাবার সাথেই প্রথম সিনেমা দেখি। যেদিন ইভিনিং শো’তে যেতাম সেদিন বিকেল বেলা মাঠে খেলতে না গিয়ে আমাকে পড়া শেষ করতে হতো। বাবা খুব ভোজন রসিক ছিলেন। বাজারে গিয়ে প্রায়ই তিনি ২/৩ পদের মাছ কিনে ফেলতেন এবং বাসায় ফিরলে মা বলতেন এতো মাছ তো একদিনে খাওয়া যাবে না তাহলে অপচয়ের কোন মনে হয়। তখন কিন্তু এখনকার মত আমাদের পর্যায়ের পরিবারে ফ্রিজের প্রচলন শুরু হয়নি। মা সে মাছ নানান কায়দায় ভাজা করে ২/৩ দিন পুষিয়ে নিতেন।
আমরা জিন্দাবাজার থাকাকালে বাবা প্রতি বছর রমজান মাসে বন্ধু-বান্ধবদের একদিন ইফতার করাতেন। এরপর ১৯৭৬ সালে আমরা যখন আম্বরখানা সরকারী কলোনীর ৬নং দালানে উঠি তখন থেকে ফি বছর বাবা আমাদের পাশের সফিক চাচার (সফিকুল ইসলাম) বাসায় ইফতারের আয়োজন করতেন। এখানে কলোনীর পরিচিতি জনদের বাবা দাওয়াত করতেন এবং কয়েকটা বাসায় আমরা ভাই-বোনরা ইফতার সামগ্রী পৌছিয়ে দিয়ে আসতাম। এদিকে রমজান মাস জুড়ে আমাদের বাসায়ও বিভিন্ন বাসা থেকে ইফতার আসতো। বাবাকে একদিন আমি হিন্দু-মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা একে অপর থেকে কতটুকু দূরত্ব থাকবো এবং মুসলিম ঘরে খাওয়া যায় কি? প্রশ্ন করলে বাবা বললেন- ‘দেখবে বাবা কোন খাবারে তো জাত-ধর্ম লিখা থাকে না- তোর যেখানে মন চাইবে সেখানেই খাবি আর খেয়ে কখনো জাত যায় বলে আমি শুনিনি’। এছাড়া বাবা বললেন হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই লাইনগুলো সব সময় মনে রাখবে দেখবো খুব ভাল থাকবে।
“মোর একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান
মুসলিম তার নয়ন মনি হিন্দু তাহার প্রাণ...
মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি এক সুরে গাই গান
এক সে আকাশ মায়ের কোলে যেন রবিশশি দোলে
এক রক্ত বুকের তলে একই নাড়ির টান
মোরা এক ভাষাতে মাকে ডাকি এক সুরে গাই গান
মোর একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান....“
ডাঃ আব্দুস শহীদ খান তখন বৃহত্তর আম্বরখানা-মজুমদারী এলাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসক ছিলেন। আমার বাবা প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত হলে তাঁর প্রধান চিকিৎসা ছিলেন ডাঃ আব্দুল খালেক এবং তিনি বাবাকে প্রায় জোর করেই লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে বাধা করেন। কিন্তু আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন ডাঃ আব্দুস শহীদ খান। তাঁকে আমরা চাচা ডাকতাম। চাচা প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন এবং বাবার বøাড-পেশার মাপার পর তাঁকে চা-না¯Íা দেয়া হতো। মা’র সামনে তিনি বাবাকে সিগারেট না খেতে বললেও যাবার আগে বলতেন “দেখি বাবু সিগারেটের প্যাকেটটা বের করেন তো” তখন বাবা সিগারেট বের করতেন আর তাঁরা দু’জনে মিলে দরজা বন্ধ করে বসে সে’ই ধূমায়িত স্বাদ নিতেন। ডাঃ আব্দুস শহিদ খান এমন এক চিকিৎসক ছিলেন যিনি প্রায় তিন যুগেরও বেশী সময় ধরে বৃহত্তর আম্বরখানা-মজুমদারী এলাকার সব শ্রেণীর মানুষের নির্ভরশীল একজন ডাক্তার।
আমরা যখন আম্বরখানা সরকারী কলোনীতে (৬/ঔ) থাকতাম তখন আমি আর বাবা একই বিছানায় ঘুমাতাম। তো প্রায়ই রাতে বাবা আমাকে কলকাতার কৌতুক সম্রাট ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক শোনাতেন এবং আমিও তাঁর কাছ থেকে অনেক কৌতুক মুখস্থ করেছিলাম।
বাবা তাঁর কর্মজীবনে সিলেট শহরে একটু জায়গা কিনতে পারতেন খুব সহজে। কিন্তু এ বিষয়টা আসলেই তিনি নানান অজুহাতে এড়িয়ে যেতেন। কেউ খুব পীড়াপীড়ি করলে বলতেন আমার গ্রামের বাড়ি যখন আছে তখন শহরে খমোকা কেন যায়গা কিনবো। ১৯৮৪ সালের শেষ দিকে বাবা চাকুরী থেকে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৬ সালে আমরা সবাই গ্রামের বাড়ি ওসমানীনগর চলে যাই। যদিও আমি বড়ভাই শহরে থেকে যাই নিজেদের পড়াশোনা এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য।
১৯৮৭ সালের ২৮শে এপ্রিল আমার কাকা (বাবার ছোট ভাই) স্কুল শিÿক নন্দ লাল সেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন। বাবা একমাত্র আপন ছোট ভাই’র মৃত্যুতে অধিক শোকে পাথর হয়ে যান। তাঁর ম¯িÍস্কে রক্ত ÿরণ হয় এবং কাকার মৃত্যুর ১৮ দিন পর ১৯৮৭ সালের ১৫ই মে বিকেল ৪টা ২১ মিনিটে আমার বাবা ননী গোপাল সেন পরলোক গমন করেন।
গত ১৫ই মে ২০১৪ আমার বাবার মহাপ্রয়াণের ২৭ বছর পার হলো। বাবা যেভাবে আমাদেরকে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে রেখে গেছেন সেখানেই আমরা তিনভাই অদ্যাবধি একান্নবর্তী পরিবারে আছি। বাবার একমাত্র স্মৃতি তাঁর নিত্য ব্যবহার্য লাঠিটি এখনও আমাদের সাথে আছে।
এখনও বাবার প্রিয় কোন খাবার খেলে তাঁর কথা আমার খুব মনে পড়ে। ব্যাপারটা কোন ভাই-বোনের সাথে আমি শেয়ারও করি না। আর মনে মনে আÿেপ হয় ইস্ বাবা বেঁচে থাকলে তাঁর সাথে বসে যদি খেতে পারতাম তাহলে কত ভাল লাগতো।
এখনো আমার অফিসে কোন বয়োবৃদ্ধ নাগরিক এলে আমি এঁদের সবাইকে পিতৃজ্ঞানে প্রথমে কুশালাদি জিজ্ঞেস করি এবং তারপর খুব দ্রæত সেবা করার চেষ্টা করি।
বাবাকে নিয়ে নীচের এই গানটি যখনই শুনি তখনই আমার মন খারাপ হয়ে যায়।
“ছেলে আমার বড় হবে মাকে বলতো সে কথা
হবে মানুষের মত মানুষ এক লেখা ইতিহাসের পাতায়
নিজ হাতে খেতে পারতাম না বাবা বলতো ও খোকা
যখন আমি থাকবো না কি করবি রে বোকা
এ তো রক্তের সাথে রক্তের টান স্বার্থের অনেক উর্ধ্বে
হঠাৎ অজানা ঝড়ে তোমায় হারালাম মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো
বাবা কতদিন কতদিন দেখিনা তোমায় কেউ বলে তোমার মত কোথায়
ওরে খোকা বুকে আয় বুকে আয়.. বাবা কত রাত কতরাত দেখিনা
তোমায় কেউ বলেনা মানিক কোথায় আমার ওরে বুকে আয়
....................................................“

হারান কান্তি সেন
রম্য লেখক
মোবা: ০১৭৯০-৩০২৩২০

|

   অন্য পত্রিকার সংবাদ  অভিজ্ঞতা  আইন-অপরাধ  আত্মজীবনি  আলোকিত মুখ  ইসলাম ও জীবন  ঈদ কেনাকাটা  উপন্যাস  এক্সপ্রেস লাইফ স্টাইল  কবিতা  খেলাধুলা  গল্প  ছড়া  দিবস  দূর্ঘটনা  নির্বাচন  প্রকৃতি পরিবেশ  প্রবাস  প্রশাসন  বিবিধ  বিশ্ববিদ্যালয়  ব্যক্তিত্ব  ব্যবসা-বাণিজ্য  মনের জানালা  মিডিয়া ওয়াচ  মুক্তিযুদ্ধ  যে কথা হয়নি বলা  রাজনীতি  শিক্ষা  সমসাময়ীক বিষয়  সমসাময়ীক লেখা  সমৃদ্ধ বাংলাদেশ  সাইক্লিং  সাক্ষাৎকার  সাফল্য  সার্ভিস ক্লাব  সাহিত্য-সংস্কৃতি  সিটি কর্পোরেশন  স্বাস্থ্য  স্মৃতি  হ য ব র ল  হরতাল-অবরোধ