একজন স্বার্থক শিক্ষক-অভিভাবক

,
প্রকাশিত : ১৯ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.কবির চৌধুরী:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আজকের এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সম্মানিত সভাপতি, সংবর্ধিত ব্যক্তি আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন, অনুজপ্রতিম, স্নেহভাজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী, প্রধান অতিথি, সুধী আস্সালামুআলাইকুম।
মেয়র মহোদয় সঠিকভাবেই ধরেছেন যে, আমাকে খুব বিষন্ন দেখা যাচ্ছে। সত্যিই আমি যথেষ্ট অসুস্থ। হৃদরোগের বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত, অতঃপর মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্থ বটে, তাই আমার চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন দেখতে পারছেন। আপনি সঠিক। তবে মেয়র মহোদয়- সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি বলেছেন, আপনি একজন আতংক! আমার কাছে এখন তা-ই মনে হয়। কারণ আমি এখন আপনার পাশেই আছি এবং ভোগান্তিতে ভুগছি। চতুর্দিকে শুধু খাল খনন, পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ কোথাও কেউ রক্ষা পাচ্ছে না। আপনাকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ, নির্ভীকভাবে আপনি উন্নয়নের কাজটা করছেন। আপনি সদ্য প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী মহোদয়কেও ছাড় দেননি! কাউকে আপনি ছাড় দিচ্ছেন না, সবাই আপনার এই আঘাতে আক্রান্ত। আপনি ভালো কাজ করছেন নিঃসন্দেহে, ক্ষতিকগ্রস্থসহ সেটা সর্বজন স্বীকৃত।
আমি অসুস্থ, সেলিম আউয়াল ও সুজিত রঞ্জন দেব ওরা দু’জনকেই আমি বলেছিলামÑবোধ হয় সভায় আমার উপস্থিত থাকা সম্ভব হবেনা, শারিরিক অসুস্হতার কারনে। কিন্তু আজকের এ অনুষ্ঠানে যদি আমি আসতে না পারতাম, হয়তো মনে একটা ব্যথা রয়ে যেতো। আমি এসেছি দু’টি কারনে- একটি হচ্ছে ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী, যাকে আমি আজীবন তার একটি নিক নেইমে ডাকি, যেটা আমার নজরুল ইসলাম বাসনÑআমার প্রবাসী বন্ধু বলে গেছে, তাঁর একটি নাম হলো সাথী। সেই সাথীর ভালোবাসায় এসেছি। আরেকটি কারন আজকের অনুষ্ঠানে যিনি প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছেন তিনি আমার গুরু, আমার শিক্ষক, যার হাত ধরে আমি কিঞ্চিতও যদি ইংরেজি ভাষা শিখে থাকিÑতিনি সেই অধ্যাপক, সেই প্রখ্যাত শিক্ষকÑইংরেজি শিক্ষায়-দীক্ষায় দীক্ষিত করেছেন তিনি আমাকে। সেই গুরু সেই শিক্ষক আজকে এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছেন। আজকে যদি না আসতাম আমি, এই সবকিছু থেকে বঞ্চিত হতাম। আজকের অনুষ্ঠানের যারা আয়োজক তাদেরকে অবশ্য অবশ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি অভিনন্দন জানাচ্ছি। এতো চমৎকার একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা, এই আয়োজনের পেছনে একটা মহৎ উদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। কেন এ অনুষ্ঠান ? কেন একটি জন্মদিবসকে উপলক্ষ করে এতো বড় একটি আয়োজন ! এই আয়োজনের পেছনে যে জিনিসটা খুব বেশি কাজ করছে, তা হচ্ছে জুবায়ের সিদ্দিকীর বৈশিষ্ট। জুবায়ের সিদ্দিকীÑআজীবন যিনি সৈনিক, অস্ত্র ধরেছেন, তিনি হঠাৎ করে হাতে কলম ধরা শুরু করলেন ! একটু আগে তাঁর সহধর্মিনী আসল কথাগুলো বলে গেলেন, তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। আসল বৈশিষ্ট্য কি ? একজন মানুষ যখন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং শিক্ষার অঙ্গনে, শিক্ষার এই ক্যাম্পাসে যখন বিচরণ করেন, দিবা-রাত্র একটিই চিন্তা, একটি মননশীলতাই তার ভেতর কাজ করেÑকিভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রতিষ্ঠান চলে না, চব্বিশ ঘন্টা একটি চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়। একটা দর্শন, একটা আদর্শ, একটা চিন্তা-ভাবনা নিয়ে তাকে এগুতে হয়। আজ আপনারা যে স্কলার্সহোম দেখছেন, এটি ২০০২ সালে স্থাপিত হয়। আজকে খুব ভালো লাগতোÑএই অনুষ্ঠানটায় যদি আমাদের এই স্কলার্সহোমের সকল ছেলে-মেয়ে উপস্থিত থাকতে পারতো। তাহলে তারা আজকের এই অনুষ্ঠান থেকে অনুপ্রাণিত হতো, উৎসাহ বোধ করতোÑতাদেরই একজন শিক্ষককে-অধ্যক্ষকে আজকে আমরা সবাই ফুলের মালা দিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছায় অভিনন্দিত করছি। স্কলার্সহোমের সাথে আমি এবং জুবায়ের সিদ্দিকী প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সম্পৃক্ত। এই প্রতিষ্ঠানটির স্বপ্নদ্রষ্টা হাফিজ আহমদ মজুমদার যদি আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন, আমার মনে হয় তিনিও যথেষ্ট তৃপ্তি বোধ করতেন। কারন যে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ২৯ জন ছাত্র-ছাত্রী ও ৯ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো সেই ২০০২ সালে, আজকে সেই প্রতিষ্ঠানের ৬টি ক্যাম্পাস সিলেটে। এটা শুধু সংখ্যায় নয়, আমরা চেষ্টা করছি গুণগতভাবে শিক্ষার্থীদেরকে এগিয়ে নিতে। আমরা শুধু পরিক্ষার্থী তৈরী করছি না, আমরা শিক্ষার্থী তৈরী করছি। তারা এ জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। তারা যে কোনো দেশে, যে কোনো স্থানে কর্মসংস্থানে যাবে, তারা যেনো সেখানে সেই প্রতিষ্ঠানে স্বমহিমায় নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারেÑআমরা সেই জন্য চেষ্টা করছি। কয়েকদিন আগে আমাদের সেই কোমলমতি শিশুরা বিভাগীয় শুদ্ধ উচ্চারণে জাতীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় শিরোপা অর্জন করেছে, এখন এই কোমলমতি শিশুরা ঢাকায় যাবে, জাতীয়ভাবে তারা প্রতিযোগিতা করবে।
ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী একজন সফল শিক্ষাবিদ, একজন স্বার্থক অধ্যক্ষ। তার একটা বৈশিষ্ট হলো শিক্ষার্থীদেরকে নিজের সন্তানের মতো গণ্য করেন, প্রত্যেকটি ছেলে-মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, এতেই যে ছেলে-মেয়েরা, শিক্ষার্থীরা তৃপ্ত হন। এমসি কলেজের সলমান চৌধুরীর নাম শুনলে আমরা আতংকিত হতাম, তেমনি এখন ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকীর নাম শুনলেও অনেক অভিভাবক আতংকিত হন এবং মাঝে মধ্যে এসে আমাকে অনেক অনুযোগ-অভিযোগ করেন। এই কিছুদিন আগে আমাদের ইলেকট্রিক সাপ্লাই ক্যাম্পাসের একদল অভিভাবক আমার কাছে আসলেন আব্দার নিয়েÑস্যার আপনার কাছে এসেছি, আপনার সাথে খুব সহজে কথা বলতে পারি, কিন্তু ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকীর সাথে কথা বলতে আমাদের ভীষণ ভয় হয়, আতংক হয়। আমি তাদের সব কথা শুনে বললামÑএক কাজ করেন, আপনাদের অভিযোগ নিয়ে আপনারা জুবায়ের সিদ্দিকী সাবের কাছে যান। বিষয়টি তাকে যৌক্তিকভাবে বলেন, উনি শুনবেন। উনারা ফিরে এসে খুব উল্লসিত হয়ে আমাকে বললেনÑস্যার আপনার কথায় গিয়েছিলাম, স্যারতো আমাদের প্রত্যেকটা কথা শুনেছেন। আমি বললাম যৌক্তিক জিনিসগুলি তিনি শুনেন, কারণ তিনি অত্যন্ত আদর্শবান একজন মানুষ, তিনি তার আদর্শ থেকে কখনো কিঞ্চিত সরে আসেন না। এটিই হচ্ছে একজন অধ্যক্ষের আদর্শ। সবাইকে সমানভাবে তিনি সমীহ করেন, শ্রদ্ধা করেন।
ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী আমার একজন সহযোদ্ধা। আমি খুব ঈর্ষা বোধ করছি এই জন্য যে, হয়তো আমার জীবদ্দশায় আমার জন্যে এই ধরনের একটি অনুষ্ঠান দেখে যেতে পারবো না। কিন্তু একটা জিনিস আশা করছিÑআমার মনে হয় মরণোত্তর একটা কিছু পাবার আশা রয়ে গেলো। বিশেষ করে সেলিম আউয়াল, সুজিত রঞ্জন দেব এবং আপনারা যারা এ আয়োজন করেছেন আপনারা একটি মহৎ কাজ করেছেন। আজকের প্রধান অতিথিকে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করি, সুধীজনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন, আমাদের জন্য একটি দোয়া করবেন।
আমরা শিক্ষকতায় আছি। আমার জীবনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত এই কাজটাই করছি, সেটা হচ্ছে শিক্ষকতা। শিক্ষকতা করে আমরা তৃপ্তি পাই, আনন্দ পাই। আমি যে কাজটি করতে পারিনিÑসেইটা আমারই একজন ছাত্র যখন সফলভাবে সম্পন্ন করে তখন আমি নিজের মধ্যে সেই কাজ সম্পন্ন করার আনন্দ, সেই তৃপ্তিটা বোধ করি। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন। আসুন আমরা সবাই ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকীর দীর্ঘায়ু কামনা করি, তার সুস্বাস্থ্য কামনা করি। যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, আমি নিশ্চিতÑতিনি যে কাজে নিয়োজিত, যে দর্শনে তিনি বিশ্বাস করেন, যে আদর্শে তাড়িত হয়ে আজকে এই সিলেটে তিনি শিক্ষাঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছেনÑএই সংবর্ধনায় তার কাজ আরো বেগবান হবে, আরো গতিশীল হবে। এই আশা ব্যক্ত করে আপনাদের সবাইকে আবারো ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আস্সালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
——————————————————————————————ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যক্ষ জুবায়ের সিদ্দিকীর ৭০ বছর পূর্তিতে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন ভিসি, শাবিপ্রবির সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্কলার্সহোম-এর একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ড. কবির চৌধুরী’র বক্তব্য। অনুলিখন: মো. নাসির উদ্দিন


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

ঘাসিটুলা এলাকায় কিশোরের বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার

         সিলেট নগরের ঘাসিটুলা এলাকায় সোহাগ...

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের মৃত্যুতে ছাতক উপজেলা যুব সংহতির শোক

         সাবেক প্রেসিডেন্ট, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয়...

সিলেটের নতুন পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন

         সিলেট জেলার নতুন পুলিশ সুপার...