২৭ কিলোমিটারে দাম্পত্য

,
প্রকাশিত : ২৮ আগস্ট, ২০২১     আপডেট : ২ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তাসলিমা খানম বীথি :
১. তোমার কি মনে আছে বিয়ের প্রথম দিনের কথা। সেদিনের কথা আজো কানে এসে বাজে। গায়ের রং কালো হলেও তুমি কখনোই বুঝতে দেওনি। তারপর আমাদের প্রথম সন্তানের মুখ দেখে দৌড়ে মার্কেটে গেলে। নিয়ে আসলে মেয়েদের ড্রেস। সবাই তোমাকে নিয়ে হেসেছিল। প্রথম সন্তান মেয়ে হোক আমাদের চাওয়া ছিলো। তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আফসানা বেগম স্বামীর বুকে আলতো ভাবে ম্যাসেস করে দিচ্ছে। শরিফ চৌধুরী শ^াসকষ্ট বাড়লেও স্ত্রীকে বুঝতে দেয় না। তিনি জানেন বুঝতে দিলে কাঁন্না ভেঙ্গে পড়বে। জীবনের ফেলে আসা কত শত সোনালী স্মৃতি চোখে ভাসছে। হৃদয়ে ঢেউ খেলছে কথাফুল ঝুরিতে। স্ত্রীর কথা উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে খুব। বুকে প্রচন্ড যন্ত্রনা হলোও মাঝে মাঝে মাথা নেড়ে উত্তর দেওয়া চেষ্টা করছেন। স্প্রীডে গাড়ী চলছে। তবুও কেন জানি রাস্তা ফুরাতেই চায় না। ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে আর কতক্ষন লাগবে যেতে। কিছুক্ষন পর পর দোয়া দরুদ পরে আফসানা বেগম ফুঁ দেয় স্বামীর বুকে।
২.রাত ১০টা। এখনো শরিফের আসার নাম নেই। আর কত অপেক্ষা করবে বেচারি। কলিংবেলের শব্দ- এতক্ষণ আসার সময় হল। শরিফের হাতে সবজি ব্যাগ দেখে দরজা খোলে আবার ঠাস করে লাগিয়ে দিলো আফসানা। কী ব্যাপার! শরিফের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আজকে ত কোন বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়নি। দরজা নক না করে মোবাইলে কল দেয় শরিফ। আফসানা ফোন রিসিভ করতেই-শরিফ বলে-আজ কি বিশেষ কিছু? ভুলে গেলে বাসন্তীর শাড়ি কথা। কিছু বলার আগেই আফসানা লাইন কেটে দেয়। শরিফ সবজির ব্যাগটা দরজার কাছে রেখ বেরিয়ে পড়ে। একমাত্র বউয়ের আবদার। তাও আবার বিয়ের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী বলে কথা। মাস শেষ হয়নি। পকেটেও তেমন টাকা নেই। বন্ধুদের কাছ থেকে ঋণ নিবে ভাবছে। তার মধ্যে মাহবুবের কল-দোস্ত (ও) পজেটিভ ব্লাড লাগবে। তাদের বন্ধুদের ব্লাডের একটি সংগঠন আছে মুমূর্ষ রোগিদের জন্য কাজ করে। শরিফ কথা না বাড়িয়ে হসপিটালে ছুটলো। মানবিক কাজের জন্য শরিফকে আরো বেশি ভালোবাসে। ব্লাড জন্য কখনো কিছু নেয় না সে। হসপিটালে থেকে বের হতেই সেই রোগির স্বামী দ্রুত ছুটে এসে শরিফকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে বলে-ভাই আপনাকে ধন্যবাদ। ১৫ বছর পরে প্রথম সন্তানের মুখ দেখলাম। কিছু বলার আগেই তার হাতে জোর করে একটি খাম তুলে দেয়।
৩. এতক্ষনে হয়তো শপিংমহল বন্দ হয়ে গেছে। বাসায় যাবার পথে দেখে ডাসবিন থেকে বাসিপচা খাবার খাচ্ছে পথকলি শিশুরা। আফসানা জন্য বিরানী প্যাকেটি তাদের হাতে তুলে দেয়। কিছুপথ এগুতেই ফুলের দোকান থেকে একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে বাসায় পৌছে। আফসানা শরিফের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পরে। শরিফ জানে ততক্ষনে আফসানা রাগ মাটি হয়ে গেছে। ভালোবাসার মানুষের সাথে রাগ অভিমান বেশিক্ষন থাকে না।
৪. দেখতে দেখতে শরিফ চৌধুরী আর আফসানা বেগমের জীবনের অর্ধেক বসন্তÍ পার করে দিয়েছে। চোখের পলকে কত দ্রুত কেটে গেলো। দাম্পত্য জীবনের দিনগুলো কত রঙিন ছিলো। সেই মুহুর্ত গুলো যদি সিন্দুকের ভেতরে বন্দি করে রাখা যেতো তাহলে আফসানা বেগম তাই করতেন। স্ত্রী মন খারাপ হলেই শরিফ চৌধুরী কবিতা আবৃত্তি করতেন। শত ব্যস্ততার পরও সুযোগ পেলেই পাহাড় কিংবা সমুদ্র কাছে ছুটে বেড়াতো। একমুহুর্তেও জন্যও আফসানা বেগম নিজেকে অসুখি মনে হয়নি। কেনই বা করবে। বাপের বাড়ি সমস্ত মায়া ত্যাগ করে যে মানুষটি হাত ধরে চলে এসেছিলেন তাকে কষ্ট স্পর্শ করতে দেয়নি কখনোই। প্রত্যেকটি মেয়েই ভালোবাসা আর ভরসার হাত চায়। জীবনের সবচে কঠিন দুসময়েও প্রিয় মানুষটি হাতটি ধরে বলবে-আমি আছি তো। ভয় পেয়ো না। ভালোবাসার পরম প্রাপ্তি নিয়ে জীবনে ঝড়-ঝাপটা প্রতিকূলতায় কেউ কাউকে ছেড়ে যায়নি।
৫. হসপিটালে পৌছাতে ২৭ কিলোমিটারের রাস্তায় অথচ আফসানা বেগমের কাছে মনে হচ্ছে ২৭ যুগের মত। শরিফ চৌধুরী শ^াস প্রশ^াস দ্রুত বাড়ছে। চোখের সামনে স্বামীর কষ্ট দেখে কান্না ভেঙ্গে পরছেন আফসানা বেগম। তোমার কিছুই হবে না। আল্লাহ ভরসা। কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা হসপিটালে পৌছে যাবো। ছেলে আরমানকে বলে ড্রাইভারকে বল আরো দ্রুত যাবার জন্য। তোর বাবার কষ্ট হচ্ছে। শ^াস কষ্ট বেড়েই চলছে তবুও স্ত্রীর হাত ছাড়েনি। বাড়ি থেকে যখন শরিফ চৌধুরীকে গাড়ীতে তোলা হয় তখনই হয়তো ভেবে নিয়েছিলো এটাই শেষ দেখা প্রিয়তমার সাথে। হসপিটালে ভেতরে গাড়ী এসে থামতেই দ্রুত গতিতে ইর্মাজেন্সী রুমে শরিফ চৌধুরীকে নিয়ে যাওয়া হলো। বারান্দা বসে ছেলেকে ধরে আফসানা বেগম কাঁদছেন। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা পর জানান- শরিফ চৌধুরী বেঁচে নেই। স্বামীকে জড়িয়ে ধরে আফসানা বেগম বুক ফেটে আর্তনাত করছেন-তোমার সাথে কথা শেষ হয়নি। আমাকে একা রেখে কখনো চলে যাবে না বলেছিলে…!


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

তন্নী হত্যা: প্রেমিককে মৃত্যুদণ্ড রায় দিয়েছে আদালত

        হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের কলেজ ছাত্রী তন্নী...

মেয়র আরিফের সাথে হাসান মার্কেট সমিতির মতবিনিময়

        সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল...

হবিগঞ্জের পুলিশ এখন চিকিৎসক

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : যতগুলো...