২১ শে ফেব্রুয়ারি টু ৭ ই মার্চ

,
প্রকাশিত : ০৭ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: আমাদের এ প্রজন্মের অনেকেই ইতিহাসে অনিহা দেখান। তাদের বুঝতে হবে বর্তমান যে অঙ্গন তা হঠাৎ চর জাগার মতো হয়ে উঠেনি। এই হয়ে উঠার শুরু থেকে চিনে রাখা দরকার। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক দীর্ঘ পথ হচ্ছে গত শতাব্দীর ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ ই মার্চ। এই সময়ে আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা নিজেদেরকে চিনতে পেরেছি আরো নিবিড় ভাবে। পড়ুয়া মানুষ এবং লেখাপড়া না জানা মানুষ যারা এই মাটির সন্তান তারা এই সময়ে আরো গভীর ভাবে জানতে পেরেছি আমরা এক জাতি আমরা বাঙালি। ঘটনার শুরু ১৯৪৭ খ্রীষ্টিয় সালের ১৪ আগস্টে বৃটিশ ভারতের শাসন থেকে পাকিস্তান মুক্ত হবার পর থেকে। পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে মাঝে প্রায় হাজার মাইলের ব্যবধানে ভারতের দুই প্রান্তে দুই খন্ড ভূমি নিয়ে যা পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়ে চলতে শুরু করে। মূলত দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তিতে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের চিন্তা করতে গিয়ে ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে বৃটিশদের কবল থেকে। আমরা এ অঞ্চলের মানুষ আজন্ম এক সম্প্রীতির বন্ধনে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে করছি বসবাস। আমরা মিলে থাকতেই পছন্দ করি। তবে আমরা আমাদের সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা সয্য করিনা। এ কথা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে বারবার। ইতিহাস সাক্ষী।

ঘটনা স্মরণ করছি এখানে। মাতৃভাষা বাঙলা হচ্ছে আমাদের জাতীয়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অস্বীকার করার সুযোগ নাই, বাংলাদেশের বাঙালি জাতির বড়ো বড়ো সকল অর্জনের মূলে রয়েছে আমাদের ভাষা ও লালিত সংস্কৃতি এবং ১৯৫২ খ্রীস্টিয় সালের ভাষা আন্দোলন। ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ খ্রিষ্টিয় সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে। আমাদের এই বাংলাদেশ অঞ্চল অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান তখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এদিকে ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলো শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানে। এটি কোনো সমস্যা হয়তো হতোনা যদি তৎকালীন সরকারের অগণতান্ত্রিক চিন্তা দেখা দিতোনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তৎকালীন পাকিস্তানের শাসক শুরু থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে প্রথম আঘাত হানে আমাদের কথা বলার স্বাধীনতার উপর। পাকিস্তান সরকার উর্দুকে সারা পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার ষড়যন্ত্র করে। অথচ তখনও আমরা সংখ্যায় বেশি কোটি কোটি বাঙালি বাঙলা ভাষায় কথা বলি ও লিখে মনের ভাব বিনিময় করি। আর আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলবো, এটাইতো স্বাভাবিক। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের শাসক ভাষার মর্যাদা বুঝলোনা। ১৯৪৮ খ্রিষ্টিয় সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলেন। দেরি হয়নি প্রতিবাদ করতে। বাংলার ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ করে গর্জে উঠে। এর তিন দিন পর ১৯৪৮ খ্রিষ্টিয় সালের ২৪ মার্চ ঢাকার কার্জন হলে জিন্নাহ ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানে শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে উর্দু। ” তখন থেকেই আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মঘট, সাধারণ ধর্মঘট, সেক্রেটারিয়েট – এসেম্বলি ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হয়। আন্দোলন চলতে থাকে। আর এরই প্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে এ অঞ্চলের নির্যাতিত জনতার নেতা মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ খ্রিষ্টিয় সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভাষা দিবস ‘ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং হরতাল চলবে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরু হবে, তাই আন্দোলনের জন্যে এই দিনটিকে বেছে নেয়া হয়। এদিকে বাংলার মানুষের চেতনাকে দমিয়ে রাখতে ২০ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের জন্যে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু বাংলা মায়ের সূর্য সন্তানদের চেতনাকে ওরা দমিয়ে রাখতে পারেনি। ঠিকই ১৯৫২ খ্রিষ্টিয় সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জনাব গাজিউল হকের নেতৃত্বে সভা শুরু হয়ে যায়। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলে দলে কোথাও চারজন করে আবার কোথাও দশজন করে মিছিল করতে থাকে। যখন ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিভিন্ন স্থানে মিছিলে মিছিলে ঢাকার আকাশ প্রকম্পিত করে তুলে, তখনই বেপরোয়া পুলিশ গুলি শুরু করে মিছিলের উপর। আহারে বাংলা মায়ের সন্তান! পুলিশের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে বাঙলা ভাষার সন্তানেরা। ওইদিনই রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার মৃত্তিকা আর সবুজ ঘাস। শহীদ হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর এবং আরো অনেকে। তখন শহীদের রক্তের বদলা নিতে এগিয়ে আসে সাধারণ জনতা। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় এবং বাঙলা ভাষাকেও রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়। এখানেই মনেপড়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত কথা, “বল বীর চির উন্নত মম শির।” বাংলার মানুষের আত্মত্যাগের ফলেই মাতৃভাষা বাঙলার জন্যে আজ বিশ্বে আমাদের শির উন্নত। এ বিজয় গৌরবের আনন্দের।

তারপরেও আমাদের এগিয়ে চলার পথে বারবার বাধা আসে অগণতান্ত্রিক ভাবে। এভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের বহুমুখী নির্যাতনের জবাব দিতে দিতে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারী বাংলার মাটি ও মানুষের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন সহ ছয় দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। অবশ্য ৬ দফা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। পাকিস্তানের শাসক তখন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। এরই মাঝে ১৯৬৯ এ গণ অভ্যুত্থান হয়। এতে স্বৈরাচারী শাসক আইয়ুব খানের পতন হয়। ক্ষমতা চলে যায় আরেক সামরিক জেনারেলের হাতে। পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। আসে সাধারণ নির্বাচন। এ অঞ্চলের মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে এবং ভোট দেয়। ১৯৭০ খ্রিষ্টিয় সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ২ টি আসন ছাড়া বাকী সকল আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের অধিকার পায়। কিন্তু এবারো ষড়যন্ত্র শুরু হয় বাঙালির ভোটের বিজয়ের বিরুদ্ধে। তারা বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা দিবেনা। শাসক ইয়াহিয়া সহ পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের ষড়যন্ত্রের মুখে পড়ে আমাদের নেতৃত্ব। কিন্তু আর সয্য করা যায়না। বাঙালি জাতি ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে। এ আমদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই ওদের তালবাহানা বুঝতে পেরে আমাদের নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। ১৯৭১ খ্রীষ্টিয় সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সভা আহবান করা হয়। আমাদের এ অঞ্চলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ এর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন সোহরাওয়ার্দী ( রেসকোর্স ময়দান) উদ্যানে _ ” এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ।” প্রকৃত সত্য হলো, এমন একটি তেজোদ্দীপ্ত ঘোষণার দ্বারা পাকিস্তানের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে জনতার সংগ্রামের পথ দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরের ইতিহাস ভয়াল ভয়ংকর এক কালো অধ্যায়। ধীরে ধীরে ক্যালেন্ডারের পাতায় আসে ২৫ মার্চ। এ এক ভয়াল কাল রাত। ঢাকার শান্তিপ্রিয় মানুষ তখন ঘুমে। সেই রাতেই পশ্চিম পাকিস্তানের লেলিয়ে দেয়া সৈন্যরা ঘুমন্ত ঢাকার বুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানুষ মারে আর ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দেয়। ঘুমন্ত নিরীহ মানুষের উপর এমন অমানবিক আচরণ, নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা ঘটায় পাকিস্তান সেনা। তারপর ধীরে ধীরে বাঙলার কৃষক,শ্রমিক, জেলে , দিন মজুর সহ দামাল ছেলেরা সংগঠিত হয়ে জীবন বাজি রেখে নেতৃত্বের আহ্বানে দেশের স্বাধীনতার জন্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধ চলে কিন্তু বিশৃঙ্খল ভাবে নয় , বরং তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত আমাদের সেনা অফিসারদের দক্ষ নেতৃত্বে বিভিন্ন সেক্টরে সুপরিকল্পিত ভাবে যুদ্ধ হয়েছে শত্রুর বিরুদ্ধে। তখন সকল সসস্র বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বীর বাঙালি সিলেটের কৃতি সন্তান জেনারেল এম এ জি ওসমানী। যুদ্ধ চলে টানা নয় মাস। যুদ্ধে যুদ্ধে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং নারীরা হারিয়েছে সম্ভ্রম। এভাবেই বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদল প্রায় বিরানব্বই হাজার সৈন্য নিয়ে আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করে।

সুপ্রিয় পাঠক, আসুন আমাদের পথটুকু চিনে রাখি। আমাদের এ বিজয়ের পথে পথে আছে সংগ্রাম। সংগ্রামের এই পথ মসৃণ ছিলোনা। বারবার সংগ্রাম এবং বহু রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে এসেছে বারবার বিজয়। মনে রাখতে হবে, আমাদের বিজয়ের এই পথে ‘২১ শে ফেব্রুয়ারি টু ৭ ই মার্চ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ যদি আমরা না চিনে রাখি, তবে আমরা আবারো কোনো জাতীয় দুর্যোগে পড়ে তা মোকাবেলায় দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াবো। পথে থেকেও হবো পথহারা।।
# লেখক _ কলামিস্ট


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টার এর ইন্তেকাল

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার)...

সুবিধা বঞ্চিতদের মধ্যে ছাত্র ও যুব ফেডারেশনের খাবার বিতরণ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট ছাত্র...

অভিবাসন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড দেশ সেরা পুরস্কার পেলেন সাংবাদিক কামরুল ইসলাম

         স্টাফ রিপোর্টারঃ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা...