২১শে ফেব্রুয়ারি ও আমাদের বর্তমান প্রজন্ম

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবু বকর সিদ্দিকঃ

‘’আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি’’

আব্দুল গাফফার চৌধুরীর এই দুটি লাইন জানে না এমন খুব কম মানুষ পাওয়া যাবে আমাদের এই বাংলাদেশে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি শুধু আমাদের কাছে একটা নাম নয় এটা আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি শ্রেষ্ঠ পটভূমি ওবটে।একুশ আমাদের চেতনা; একুশ আমাদের অহংকার।একুশ আমাদের প্রেরণা। একুশের ইতিহাসের প্রায় সবকিছু সকলেরই জানা ।এই বিশ্বের ইতিহাসে ভাষার জন্য জীবন দান করেছে এমন নজির কোথাও নেই ।আমরাই একমাত্র জাতি যারা নিজের দেশ ;দেশের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার নজির স্থাপন করতে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন করেছি।

১৯৪৭ সাল থেকেই আমাদের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে মতবিরোধ তৈরী হয় ।১৯৪৭ সালের ১৮ ই মে হায়াদ্রাবাদে অনুষ্ঠিত ‘উর্দু সম্মেলনে’ এবং ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃজিয়াউদ্দীন আহমদ এঁর পক্ষ থেকে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়। ১৯৪৭ এর পর থেকেই অফিস আদালতসহ প্রায় সবকিছুতেই ইংরেজি আর উর্দু ভাষা ব্যবহার করা হতো। ১৯৪৭ সালে ১লা সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবুল কাশিমের চেষ্টায় তিন সদস্য বিশিষ্ট ‘তমুদ্দিন মজলিস’ ভাষা আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়।১৯৪৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব রাখেন।পাকিস্তানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন এ প্রস্তাবের বিরোধীতা করায় তা অগ্রাহ্য হয়ে যায়।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দাবি প্রত্যাখাত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা শহরে ছাত্র জনতা “রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালন করে।তদানীন্দন মুসলিম লীগ সরকার শামসুল হক,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অলি আহমদসহ অনেক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে তারা ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিলেন।সেই দিনে দেশের অনেক বুদ্ধিজীবিকেও গ্রেফতার করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের পূর্ব বাংলা সফরে ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় তিনি বলেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু,অন্য কোন ভাষা নয়” ।এর ঠিক দুই দিন পর ২৪ শে মার্চ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের কার্জন হলে ঘোষণা করেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।

জিন্নাহের এই ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশের মানুষ শিক্ষিত যুব সমাজ,বুদ্ধিজীবী সহ জনসাধারণের ভিতর চাপা অসন্তোষ আর ক্ষোভ শুরু হতে থাকে।মানুষ বুঝতে শুরু করে যে পাকিস্তান কখনই আমাদের ভালো চায় না।তারা আমাদের মুখের ভাষা হরণ করে নিতে চায় ।তারা আমাদের মা ডাকা বন্ধ করে দিতে চায় কিন্তু আমাদের তখনকার যুব সমাজ বিশেষকরে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে সারা দেশে ধীরেধীরে আন্দোলন গড়ে তুলে।

১৯৫২ সালের ২৬ শে জানুয়ারি নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের ঢাকা অধিবেশনে এবং পল্টন ময়দানের জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্থানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।এ বক্তব্যের প্রতিবাদে ৩০শে জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিবাদ দিবস পালন করা হয় । ৪ঠা ফেব্রুয়ারি হরতাল পালন করা হয় । ১১ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘পাতাকা দিবস’ পালন করা হয়।

১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও বন্দি মুক্তির দাবিতে আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদ আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন।নুরুল আমিনের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে।এমনকি কোন রকমের সভা,সমাবেশ,মিছিল,মিটিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে।দেশের ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী ছোটছোট শোভা যাত্রাসহ ঢাকা বিশ্ববিদযালয় পূরানো কলাভবন প্রাঙ্গণে মিলিত হয়।ছাত্রনেতা গাজীউল হক ও ছাত্রনেতা আব্দুল মতিনের প্রস্তাবে ১৪৪ তারা ভেঙ্গে মিছিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।মিছিল যেদিক দিয়ে অতিক্রম করবে তার সম্মুখপানে পুলিশ,ইপিয়ার,ও স্বশস্ত্র বাহিনী বন্দুকের নলি তাক করে রেখেছিল তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য ।কিন্তু সব ছাত্রছাত্রীরা শান্তিপূর্ণভাবেই মিছিল নিয়ে জগন্নাথ হলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।তাদের সবার মুখে উচ্চারিত হয়েছিল “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” ।পুলিশ প্রথমে লাঠি চার্জ করে এবং পরে কাঁদানো গ্যাস নিক্ষেপ করে ।এতসব করার পরেও ছাত্ররা পিছু হটে নি।ছাত্রদের মনোবল আর তেজোদীপ্ত সাহস দেখে পাকিস্তানী পুলিশ বাহিনী থমকে যায় ।শেষমেশ তারা আর কোন উপায় না পেয়ে নিরীহ আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর স্টিম রুলার চালায়।চলতে থাকে শোষকদের ছাত্রদের হত্যা করার জগন্য পাঁয়তারা।

বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল এর সামনে স্বশস্ত্র বাহিনী অতর্কিত গুলি চালাতে শুরু করে। সর্বপ্রথম ভাষার জন্য শহীদ হন বাদামতলী প্রেসের মালিকের ছেলে রফিক উদ্দিন আহমদ রফিক।কথিত আছে যে, তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন।শহীদ হন ঢাকা মেডিক্যালে নিজের অসুস্থ শ্বশুড়ীকে নিয়া আসা দর্জি আব্দুল জব্বার।শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ তে অধ্যয়নরত মেধাবী ছাত্র আবুল বরকত।শহীদ হন সরকারী কর্মচারি আব্দুস সালাম।শহীদ হন হাইকোর্টের কর্মচারি শফিউর রহমান।শহীদ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের এম এ তে অধ্যয়নরত ছাত্র মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। ২২ শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হন পথচারী অহিদুজ্জামান ওরফে অহিউল্লাহ।আরো শহীদ হন ঢাকার বাসিন্দা ওয়াহিদুল্লাহ।একই দিন শহীদ হন রিকশা চালক আব্দুল আউয়াল। ২৩শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হন কথিত কিশোর অহিউল্লাহ।আরো নাম না জানা অনেকেই সেদিন নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন মাতৃভাষার জন্য।তাদের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল ঢাকার রাজপথ।ফাল্গুনের এই মাসে সেদিন অশ্রু ঝরেছিল ।মা হারিয়েছিল তার প্রিয় সন্তানকে আর দেশ হারিয়েছে এই দেশের শ্রেষ্ঠসন্তানদের।ভাষার মাসে তাদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা আর অফুরন্ত ভালোবাসা।

ভাষা আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে।ভাষা আন্দোলন করার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্নের ছুটেচলা। ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ জয়। ১৯৬৬ এর ছয় দফা আন্দোলন,১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান ,১৯৭০ এর নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয় ।আর সর্বশেষ আমাদের স্বাধীনতা ।আমাদের বাংলাদেশের বিজয় ।আমাদের ভাষা শহীদদের রক্ত বৃথা যায় নি। ১৯৫২ সালে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত সরকার শেষমেশ বাংলা ভাষার স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর ইউনেস্কো আমাদের বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে মর্যাদা দান করে।বাংলা ভাষা শুধু আমাদের জন্য গৌরবের নয় এটা আমাদের অহংকার ও বটে।

আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে যেমন আমাদের গর্ব করার মতো অনেক বিষয় আছে তেমনি শিল্প সাহিত্যে চিন্তার খোরাক যোগায় এমন কিছু বিষয় ও আছে।এই প্রজন্মের অনেকেই ঠিকমতো বাংলা জানে না।ঠিকমতো বাংলায় শুদ্ধভাবে কথা বলতে পারে না। অনেকেই আছে যারা নামেমাত্র বাংলাদেশী কিন্তু তাদের কথাবার্তা আর আচার আচরণে দেশের কোন চিত্রই ফুটে না। এই প্রজন্মের বেশিরভাগ পশ্চিমা ধ্যান ধারণায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছে।তারা অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারে কিন্তু শুদ্ধ বাংলায় অনর্গল কথা বলতে পারে না।বিদেশি ভাষায় কথা বলতে পারা দোষের কিছু নয় কিন্তু তা নিজের ভাষা শিখার পর।বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আছে যারা বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেন তাদের নিয়েও বিদ্রুপ করতে পিছপা হয় না কতিপয় স্মার্ট প্রজন্ম।বর্তমান প্রজন্ম বিদেশী গান বাজনা আর রক মিউজিক নিয়ে ব্যস্ত ।লালন ফফির আর আব্দুল করিম কিংবা এযুগের বারি সিদ্দিকীর পল্লিগীতি শোনার তাদের সময় কই?নজরুল গীতি কিংবা রবীন্দ্র সংগীত তারা স্রেফ নিজেকে ভাবুক হিসেবে প্রমাণ করতে শুনে এর চেয়ে বেশিকিছু নয়।বাংলা সাহিত্যের বই পড়তে তাদের রুচিতে বাঁধে কিন্তু ব্রাজিলের পাওলো কোয়েলহোর বই তাদের বড্ড প্রিয়।

একটা দেশ তখনি এগিয়ে যায়, যখন তার পুরো তরুণ প্রজন্ম দেশের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি এসব নিয়ে কাজ করে এবং বহির্বিশ্বে তা তুলে ধরে । কিন্তু দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এটা যে,আমাদের তরুণ প্রজন্ম দেশের কৃষ্টি কালচার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ।ভাষা আর সাহিত্য নিয়ে কাজ করার মতো তরুণ তরূণীর অনেক অভাব।ভাষা প্রীতি শুধু মুখে নয় কাগজে কলমে মননে লালন করতে হয়। ভাষার প্রতি আন্তরিকতা বছরে একদিন নয় প্রতিদিন হউক ভাষা চর্চা ।দেশের আনাচে কানাচে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ভুল বানানের ছড়াছড়ি।আমাদের সকলের এইসব বিষয়ে নজরদারি করা উচিত ।নিজের দেশের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির কদর আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে। ভাষার মাসে একটা দাবি দেশে আলাদা একটা ভাষা মন্ত্রণালয় গঠন করা হউক। ২১ শে ফেব্রুয়ারির এই দিনে শ্রদ্ধাভরে আবারো স্মরণ করছি যারা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন যারা ভাষার দাবিতে আজীবন আন্দোলন করে গেছেন তাদের সবার রুহের মাগফিরাত কামনা করি। ভাষা আমার অহংকার।ভাষা আমার অধিকার ।ভাষা হউক সার্বজনীন।

আবু বকর সিদ্দিক।

শিক্ষার্থী ও প্রাবন্ধিক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

বিমান দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেন মেয়র

         অল্পের জন্যে ভয়াবহ বিমান দূর্ঘটনা...

ড. মো. রুহুল আমিনকে সিলেটস্থ রংপুর বিভাগের সংবর্ধনা

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: রংপুর বিভাগের...

মাদক ব্যবসায়ী আটক

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: গত বুধবার...