১৩ দিনেও উপশহরের হাফিজ ইফজাল হত্যা রহস্যজট খুলেনি!

প্রকাশিত : ০৮ জুলাই, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

সিলেট নগরীর শাহজালাল উপশহরে হাফিজ ইফজালের হত্যার রহস্য জট ১৩ দিনেও খুলেনি। এমনকি আপন কেউ মামলার বাদীও হয়নি। দূরসম্পর্কীয় এক আত্মীয় অপমৃত্যুর মামলা করে যেন দায়সারা হয়েছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে আসল ঘটনাকে আড়াল করার অপচেষ্টা হিসেবে এই অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরিবারকে দূরে রাখা হয়েছে রহস্যজনকভাবে। বেশ কিছু ক্লু থাকা সত্বেও পুলিশ তদন্তে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেনা। এতে ক্ষোভ বিরাজ করছে পরিচিত মহলে। গত ২৫ জুন সকালে সিলেট নগরীর উপশহরের বি ব্লকের ১৮ নং রোডের ৩নং বাহার মঞ্জিলে আলোচিত এই হত্যাকান্ডিটি ঘটে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইফজালের বোনের স্বামী থাকেন প্রবাসে। এ কারণে সিলেট নগরীর উপশহরের বি ব্লকের ১৮ নং রোডের ৩নং বাহার মঞ্জিলের তৃতীয় তলায় বোন ও দুই ভাগনা নিয়ে থাকতেন তিনি। ২৪ জুন দিনগত রাত ১টার দিকে নিজের শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে পড়লে সকালে উঠে বোন দেখতে পান সামনের দরজা খোলা। এরপর সকাল ১০টার দিকে নিচ তলার পিছনের দেয়ালের পাশে ভাইয়ের লাশ পড়ে থাকার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।
খবর পেয়ে শাহপরান থানার পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ইফজালের লাশ উদ্ধার করে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি পর ময়না তদন্তের জন্য মরদেহ ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। ২৫ জুন দিনগত রাতে ইফজালের মরদেহ কানাইঘাটের ৮নং ঝিংগাবাড়ি ইউনিয়নের কাপ্তানপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরদিন ঝিংগাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দিনকে সাথে নিয়ে ইফজালের বোন নাসিমা বেগমের ভাসুর আবুল হোসেন বাদি হয়ে শাহপরান থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেন।
নিহত ইফজালের বোনের ভাসুর আবুল হোসেনের দায়ের করা অপমৃত্যু মামলার বিবরণকে অবিশ^াসযোগ্য দাবি করে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন স্থানীয়রা। বোনের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ইফজালের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের দাবিতে সিলেট শহীদ মিনার ও এমসি কলেজের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন সহপাঠী, বন্ধুসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।
মধ্যরাতে কিভাবে ভাই ঘরের বাইরে গেলো বা পূর্ব থেকে কেউ ঘরে প্রবেশ করে ওঁৎপেতে ছিল কি না- এই বিষয়ে মুখ খুলছেন না তার বোন। আপন ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার নিরবতা নিয়ে নানা রহস্যের জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নানা প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
তাদের বক্তব্য ভবনের তৃতীয় তলা থেকে পড়ে ইফজালের মৃত্যু হলে বাসায় থাকা অন্য কোন লোক পড়ে যাওয়ার আওয়াজ কি শুনতে পাননি? এছাড়া, যেভাবে দেয়ালের পাশে ইফজালের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় তাতে উপর থেকে পড়ে যাওয়া বা আত্মহত্যার মতো ঘটনার কোন সুযোগ নেই বলে মনে করছেন অনেকে। নিহত ইফজালের মুখে ও হাতে আঘাতের কিছু চিহ্ন ছিল।
সূত্র জানায়, বাসায় ইফজালের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতো তার বোনের দেবর মিনহাজ। কিছুদিন আগেও ইফজালের সঙ্গে তার বাকবিতন্ডা হয়। এরপর বেশ কিছুদিন ধরে মিনহাজ এই বাসায় আসা বন্ধ করে দেয়। পরে ইফজালের মা বুঝিয়ে তার মেয়ের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পুনরায় বুঝিয়ে তাকে ঐ বাসায় পাঠিয়েছিলেন। এরপর এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে।
একটি নিরর্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নিহত ইফজালের মৃত্যুর পর তার বোনের ভাসুর আবুল-মিনহাজদের পরিবারের সঙ্গে কয়েক দফা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। পরে তা মিমাংসা হয়।
অপরদিকে, ঘটনার ১৩দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশের তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই। পুলিশ বলছে, ময়না তদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত তারা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না- এটি স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি কেউ তাকে হত্যা করেছে।
কাপ্তানপুর সমাজ কল্যাণ সমিতি সাবেক সভাপতি জুনেদ বিন মতিন বলেন, এতো সহজ সরল একটি ছেলের এভাবে মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা চাই, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ইফজালের মৃত্যুর আসল কারণ উদঘাটন হোক।
মামলার বাদি আবুল হোসেন জানান, নিহত ইফজালের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এর জন্য তারা অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, ইফজালের মোবাইল এর লক খোলা যাচ্ছেনা। লক খোলা গেলে হয়তো ভালো তথ্য পাওয়া যেত।
তার ছোট ভাই মিনহাজ এর সাথে ইফজালের কোন দ্বন্দ্ব ছিল কিনা জানতে চাইলে আবুল হোসেন বলেন, মিনহাজ ও ইফজাল একই কক্ষে থাকতো ঠিকই, তবে মিনহাজ লকডাউনের আগে বাড়িতে চলে যায়। সে বাড়িতেই অবস্থান করে। এর সাথে তার দ্বন্দ্ব থাকার প্রশ্নই উঠেনা। আবুল হোসেন বলেন, আমরা চাই যত্রদ্রুত পোর্স্ট মর্টেম রিপোর্ট আসুক এবং এই মৃত্যু রহস্য দ্রুত উদঘাটিত হোক। এছাড়া, দ্রুত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেতে কাপ্তানপুর গ্রামের বাসিন্দা ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক খয়ের উদ্দিন চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বলে জানান।
এব্যাপারে শাহপরান থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, স্বাভাবিক মৃত্য না হত্যাকান্ড এখনো নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছেনা। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে কিছু তথ্য আমাদের কাছে এসেছে, আমরা তা তদন্ত করছি। বাসায় কারা কারা থাকতো কিংবা তাদের ভুমিকা কি ছিল এসব বিষয়ে পুলিশ খোঁজ নিচ্ছে। একই সাথে পোস্টমর্টেম রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে জানান ওসি।

আরও পড়ুন