হাসপাতাল থেকে তাড়িয়ে দেয়া মানুষগুলো যাবে কোথায়? : আসুন আমরা খানিকটা মানবিক হই

প্রকাশিত : ০২ জুন, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

তাইসির মাহমুদ : পয়লা জুন সোমবার। লকডাউন জীবনের একাত্তোরতম দিন অতিবাহিত করলো যুক্তরাজ্য । আজ মারা গেলেন ১১১ । সম্ভবত করোনাকালিন সময়ে এই সংখ্যা সবচেয়ে কম। তবে কাল যে আরো একধাপ বেড়ে যাবে না, তাও বলা যাবে না। কারণ উইক এন্ড আর উইকডের হিসাব নিকাশে সবসময়েই বিস্তর ফারাক থাকে। তবে আমরা আশাবাদী থাকতে চাই- ইউকেতে করোনার যৌবনকাল শেষ হয়ে আসছে। খুব শীঘ্রই আমরা করোনাকে সী-অফ করতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

পয়লা জুন থেকে যুক্তরাজ্যে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। এখন খোলা মাঠে একাধিক পরিবার একত্রে মিলিত হতে পারবে । তবে নির্ধারিত সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামুলক । অনেকেই আজ পার্কে স্বপরিবারে ঘুরতে গেছেন। তবে মানুষের মন থেকে আতংক কাটছে না।

করোনা বিদায় নিচ্ছে তাই আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি । কিন্তু আমাদের নাড়ির টান যে দেশের সাথে; সেই মাতৃভুমি বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের হার বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে । দিনদিন অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকের স্বজন আছেন দেশে । যুক্তরাজ্যে স্বস্তির বাতাস গায়ে লাগলেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা অস্বস্তিতে আছি।

বিশেষ করে যখন করোনা আক্রান্ত নন- এমন কোনো রোগী সারাদিন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে চিকিৎসা করানোর সুযোগ না পেয়ে মৃতু্যবরণ করার খবর দেখি তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়।

সোমবার সিলেটের একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে দেখলাম নগরীর পশ্চিম কাজীরবাজার মোগলটুলা এলাকার বাসিন্দা আবদুল আহাদ লেচু মিয়ার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম (৬৫) প্রায় ৩০ বছর ধরে অ্যাজমা রোগে ভুগছিলেন । গত রোববার রাতে শরীর বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় স্বজনরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান । তিনি নগরীতে অর্ধডজন বেসরকারী হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে রবিবার রাত আড়াইটার দিকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেইটে অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুবরণ করেন।

তিনদিন আগে লন্ডনে আমার এক আত্মীয় জানালেন সিলেটে তাঁর শাশুড়িকে করুণ পরিনতি বরন করতে হয়েছে। করনার উপসর্গ ছাড়া শারিরীক অসুস্থতা নিয়ে বেসরকারী হাপাতালগুলোর দ্বারে দ্বরে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে বিনা চিকিৎসায় গাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেছেন ।
এরচেয়ে আরো ভয়ংকর পরিনতি বরন করতে হয়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগর সদর ইউনিয়নের যুক্তরাজ্য প্রবাসী আব্দুল আজিজ জামাল খানকে । সম্প্রতি তিনি বৃটিশ সরকারের পাঠানো বিশেষ ফ্লাইটে যুক্তরাজ্যে ফিরে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।

যুক্তরাজ্য থেকে ১ মার্চ বাংলাদেশে গিয়েছিলেন তিনি । ৯ মার্চ আকস্মিক বুকে ব্যাথা অনুভব করেন । ওই রাতেই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নগরীর আল হারামাইন হাসপাতালে।
কিন্তু পরিতাপের বিষয়, জামাল খান যুক্তরাজ্য প্রবাসী- এ কথা জানার পর ওই হাসপাতাল তাঁকে চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে । এরপর রাত ১২টার দিকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের ইবনেসিনা হাসপাতালে । একটা কেবিনে রেখে চিকিৎসা শুরু হয় । পরদিন সকালে তাঁকে স্থানান্তর করা হয় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে । সেখানে তাঁকে মনিটরে রাখা হয় । কিন্তু যখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানতে পারে জামাল খান যুক্তরাজ্য প্রবাসী তখনই উত্তেজিত ওঠে। রোগীকে দ্রুত সেখান থেকে নিয়ে যেতে বলা হয়। এতে খানিকটা দেরি হওয়ায় মনিটর খুলে রেখে হুইল চেয়ারে করে হাসপাতালের একেবারে নিচতলায় গাড়ি পার্কিংস্থলে রেখে আসা হয় ।

এরপর সেখান থেকে তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় সিলেটের একমাত্র করোনা চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে । সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা নীরিক্ষা শেষে নিশ্চিত হন জামাল খান হৃদরোগে ভুগছেন । তিনি তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সাথে সাথে সতর্ক করে দেন, তারা যে যুক্তরাজ্য প্রবাসী এ কথা যেন কাউকে ভুলেও না বলেন । ডাক্তারের পরামর্শ মতো, তাঁরা ঢাকায় যাওয়ার জন্য ৪৫ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বল্যান্স ভাড়া করেন । রোগীকে অ্যামবুল্যান্সে শুয়ানোর পর মনিটর লাগানো হয় । কিন্তু দুঃখের বিষয়, কিছুক্ষণ পরে অ্যাম্বুল্যান্স ড্রাইভার জানতে পারেন রোগী যুক্তরাজ্য প্রবাসী । আর তৎক্ষনাৎ মনিটর খুলে রোগীকে জোর করে নামিয়ে দেয়া হয়।

অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সাধারণ একটা অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন জামাল খানের পরিবার । কিন্তু দুর্গতি যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না। ঢাকায় ছয়টা হসপাতাল ঘুরে রোগীকে কোথাও ভর্তি করতে পারলেন না । কারণ হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা তাদের কথাবার্তা থেকে আঁচ করতে পারে তাঁরা বিদেশী। শেষতক বিদেশী পরিচয় লুকাতে সক্ষম হন এবং ১১ মার্চ ধানমন্ডির এক‌টি হসপাতালে রোগীকে ভর্তি করতে সক্ষম হন । দশদিন চিকিৎসা শেষে সিলেটে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান । দেড় মাসের বেশি সময় বাড়িতে একাকী থাকেন । ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় ৭ মে বৃটিশ সরকারের পাঠানো বিশেষ ফ্লাইটে যুক্তরাজ্য ফিরে আসেন।

এমন অমানবিক ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই চলেছে । সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন ঘটনাগুলো দেখি তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। যে ক্লিনিকগুলো রোগী ধরার জন্য ২৪ ঘণ্টা দালাল নিয়োগ করে রাখতো আজ তারা দুর দুর করে রোগীদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব হাসপাতাল যে চিকিৎসা সেবার নামে একেকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তা নতুন করে আবারও জানতে পারছি । হাসপাতালগুলো মানুষের জন্য সেবাকেন্দ্র না হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে । মানুষ টাকা দিয়েও চিকিৎসা করাতে পারছে না। তাহলে এসব হাসপাতালের দরকার কী।

জানিনা, বেসরকারী হাসপাতালগুলোকে কেন করোনা রোগীর চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে না? এ ব্যাপারে কেন কোনো সরকারী নির্দেশনা নেই? মন্ত্রী এমপি কিংবা দলীয় নেতারা যখন করোনা আক্রান্ত হন তখন তো হাসপাতালগুলো তাদেরকে চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে না । তাহলে সাধারণ মানুষের বেলায় এই বৈষম্য কেন?

মানুষের ৫টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি হলো চিকিৎসা সেবা । রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিককে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা । ধরে নিলাম ষোল কোটি মানুষের দেশে রাষ্ট্রের পক্ষে সবমানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই বলে নিজের পকেটের টাকা খরচ করেও একজন মৃতু্যপথযাত্রী রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে না- এ কেমন কথা। এ কেমন দেশ?

জীবন-মৃতু্য আল্লাহর হাতে । হায়াত শেষ হয়ে গেলে এক মিনিটও আমরা বাঁচবো না, কাউকে বাঁচাতেও পারবো না । মরতে পারি আকাশে। মরতে পারি জলে কিংবা স্থলে। কিন্তু মানুষ হিসেবে নু্যনতম চিকিৎসাটুকু তো পাওয়ার অধিকার আছে?

যারা আজ করোনার ভয়ে করোনা আক্রান্ত নন- এমন রোগীকেও হাসপাতালে ভর্তি না করে তাড়িয়ে দিচ্ছেন; তারা যে কতটুকু অমানবিক কাজ করছেন সেই উপলব্ধিটুকুও কি মারা গেছে । এই হাসপাতালগুলোর কোনো মালিক যদি আজ অসুস্থ হন, আর করোনা আক্রান্ত না হওয়া সত্বেও যদি কোনো হাসপাতাল তাকে চিকিৎসা না দিয়ে তাড়িয়ে দেয়, তাহলে তাঁর অনুভুতি কেমন হবে? একবার অন্যের কষ্টের কথাটি নিজের গায়ে নিয়ে উপলব্ধি করলে বোধহয় মারা যাওয়া অনুভুতি চেতনা ফিরে পাবে।

তাই আসুন, আমরা খানিকটা মানবিক হই । করোনার ভয়ে আমরা পালাতে পারবো ঠিক, কিন্তু করোনা পালাবে না । এই অমানবিকতার কারণে করোনা পিছু ছাড়বে না । আমরা মানুষের প্রতি মানবিক হলে মহান প্রতিপালকও আমাদের ওপর মানবিক হবেন।

তাইসির মাহমুদ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
২ জুন ২০২০

পরবর্তী খবর পড়ুন : four Best Anti virus For Fire 2020

আরও পড়ুন

দাউদপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের কমিটি গঠন

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দক্ষিণ সুরমা উপজেলার...

সিলেট ইসকনের বিরুদ্ধে ভূমি দখল পায়তারার অভিযোগ

আদালতের নির্দেশনার পরেও মালিকানাধীন ভূমিকে...

সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের আনন্দ মিছিল

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: নবগঠিত কেন্দ্রীয়...

কুমার গনেশ পাল পরলোকগমন আজ শেষকৃত্য

ষ্টাফ রির্পোটার:-ফটো জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন এর...