হাসন রাজার এক উত্তরসূরীর সাথে কয়েক ঘন্টা

প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

তাসলিমা খানম বীথি। সাদিয়া চৌধুরী পরাগ‘র ভাষায়-ফুল কুড়াতে কুড়াতে ফুলের মালী হয়ে যাবো কথাটা কখনো মনে আসেনি। অবচেতন মনেও একথা জাগেনি যে মানুষের যাপিত জীবনের ভিন্ন ভিন্ন প্রকার ভেদ অক্ষরে অক্ষরে উপস্থাপনা করতে পারবো। এ যেন সেই মালীরই কৃতিত্ব যে তার আরাধ্য বাগানটিতে নানা রঙের ফুলে সজ্জিত করে অপ্রকাশিত সৌন্দর্য্য এবং সৃজনশীলতায় হৃদয় বিস্মিত এবং বিমোহিত করে। এরকম একজন কথাশিল্পী তখনি কৃতার্থ হয়, যখন তার কথামালার নিকুঞ্জ দ্বারা মানুষ প্রচন্ড রকম আকর্ষণ অনুভব করে।
বস্তুত বয়:বৃদ্ধির সঙ্গে মানুষে মানুষে পরিচয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সখ্যতা, আন্তরিকতার হারও সেই অনুপাতে বেড়ে যায় এবং এ ধরনের প্রেক্ষাপটে অভিজ্ঞতা লাভেরও প্রচুর অবকাশ পাওয়া যায়। মানব হৃদয়ের কান্নাহাসির উৎস সম্পর্কেও জানা যায়। বলতে গেলে, এসব আহরণ করেই কথা সাহিত্য জগতে আমার অনুপ্রবেশ ঘটে।

সাদিয়া চৌধুরী পরাগ এদেশের একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমাজ সেবক। জন্ম সুনামগঞ্জ জেলার পানাইল-দোহালিয়া এষ্টেটে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁর বাবা। পিতামহ দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ সুর্দীঘ বত্রিশ বছর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সিলেট শাখার সহ-সভাপতি ছিলেন। মা বেগম সাজিদুন্নেসা খাতুন চৌধুরাণী। তার মাতামহ খান বাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজা চৌধুরী একজন স্বভাব কবি গীতিকার আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় ও সমাজ সেবক ছিলেন। পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকে তিনি মরমী কবি দেওয়ান হাসন রাজার উত্তরসূরী।
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ শৈশব থেকে লেখালেখির সাথে জড়িত। সিলেটের প্রাচীণ পত্রিকা আল ইসলাহ ও যুগভেরীতে তাঁর লেখা প্রকাশ হতো। পরে বেগম পত্রিকায় দীর্ঘদিন লোক সাহিত্যের ওপর লেখালেখি করেছেন। বিয়ের পরে সংসারের দায়িত্ব হাতে নিয়ে প্রায় বিশবাইশ বছর লেখালেখির জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। এরপর আবার লেখালেখির জগতে ফিরে এসেছেন। বারচৌদ্দ বছর ধরে তিনি আবার লিখছেন। এ পর্যন্ত তাঁর যেসব বই বের হয়েছে,এগুলো হচ্ছেÑ হাওয়ার বাঁশী, প্রেমবাজারে হাসন রাজা, দামিনী, পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়া, মালিনী ছড়ার ডুগডুগিওয়ালা, সোনায় গড়া সিংহাসন ইত্যাদি।
তাঁর অকাল প্রয়াত স্বামী এ,কে চৌধুরী (খালিক) সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। তার তিন সন্তান রূপো, র‌্যাবো ও রুশো। তার মা সাজিদুুন্নেসা খাতুন চৌধুরানী ব্যক্তিগত জীবনে সাদিয়া চৌধুর পরাগ অত্যন্ত সদালাপী, পরোপকারী এবং অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব।

এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সর্ম্পকে জানার জন্যে সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে আমরা তার একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করি। বিগত ২৫ আগষ্ট ২০১৩ সিলেট নগরীর জালালাবাদ আবাসিক এলাকায় তার ভাইয়ের কন্যার বাসায় সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি এবং আলোকচিত্র ধারন করেন সাংবাদিক মাহমুদ পারভেজ।

বীথি: কবে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমি ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি শুরু করি। ১৯৫৮ সাল থেকে আমার লেখার শুরু । আমার প্রথম লেখা ছিল একটি ছড়া। ছড়াটির নাম মধ্যাহ্ন অথবা বসন্ত । মনে হয় বসন্তই হবে। সেই লেখা সর্বপ্রথম দৈনিক যুগভেরীতে প্রকাশিত হয়। কচিকাঁচা আসরের সদস্য ছিলাম আমি। আমার সদস্য নম্বর ছিল ১৬৯৬৬।ঁ কচিকাঁচার আসর থেকে আমার লেখালেখি জীবন শুরু।

বীথি: জীবনে প্রথম কবিতা লেখার আগে ও পরের অনুভূতি কি মনে পড়ছে ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : একটি সন্তান হলে মায়ের যেমন অনুভুতি হয় ঠিক তেমনি অনুভুতি হয়েছিল। আমার বিয়ের অনেক বছর কেটে গেলো কোন বাচ্চা হয়নি। সে সময় আমার শাশুড়ি মনে করেছিলেন আর কোনদিন বাচ্চা হবে না। ঠিক তখনই ২/৩ বছর পরে আমার মেয়ে হয়েছিল। সে সময় আমার যে রকম অনুভুতি হয়েছিল ঠিক সে রকম আমার অনুভুতি হয়েছিল প্রথম লেখার পর।

বীথি: আপনার লেখা কতটা বই বের হয়েছে ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার এ পর্যন্ত ১৩টা বই একক ভাবে বের হয়েছে। আমি বাংলাদেশের একমাত্র মেয়ে যে সুনামগঞ্জের বিয়ের গান নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করি। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা প্রকাশিত বিয়ের গান নিয়ে লেখা সংগ্রহ করে আমি ‘হাওরবাসী’ নামে একটা বই বের করেছি। এটাকে আবার আমি নতুন করে ‘সুরমা পারের নারী’ নামে লোকসাহিত্য বিষয়ক একটি বই আকারে প্রকাশ করতে চাচ্ছি। বইয়ের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে। বিয়ে গানকে আমরা মনে করি যে শুধু মাত্র বিয়ের অনুষ্ঠানে গাইতে হবে আসলে তা না । বিয়ের উৎসবে আনন্দ আছে, দু:খ আছে, সুখ আছে, ভবিষ্যতে পরিকল্পনা আছে এই পরিকল্পনা সার্থক হবে না ভেস্তে যাবে আমরা তা বুঝি না। এই প্রেক্ষাপটে আমার বই গুলো।

বীথি: নতুন কোন বই বের করার পরিকল্পনা আছে কি ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার বাবাকে নিয়ে আমি একটা বই লেখেছি। এই বইটা এবারের নতুন বই।

বীথি: আপনাকে লেখালেখিতে কে উৎসাহ দিয়েছেন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার বড় ভাই মো: নুরুজ্জামান চৌধুরী খুব উৎসাহ দিতেন লেখালেখি করার জন্য।

বীথি: আপনার শৈশব ও কৈশোর কোথায় কেটেছে ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : সুনামগঞ্জে আমার শৈশব ও কৈশোর কাটে এবং খুব সুন্দরভাবেই কেটেছে।

বীথি : আপনার সংসার জীবন সর্ম্পকে কিছু বলুন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার স্বামী ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। একান্নবর্তী পরিবারে আমার বিয়ে হয়। মধ্যবিত্ত সংসারের চাপে তখন লেখালেখি করতে পারতাম না। বিএ পরীক্ষা দিয়ে আমার বিয়ে হয়ে যায়। সময় পেতাম না লেখালেখি করার। আমি ২০/২২ বছর লেখালেখি না করে সংসার করেছিলাম। আমার এক মেয়ে, দুই ছেলে। আমার বড় মেয়ে রুপো সাম্স, সে ফ্যাশন ডিজাইনার ও রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়। ইতোমধ্যে তার একটা সিডি বের হয়েছে। বড় ছেলে আদনান আখলাক র‌্যাবো নিউইয়ার্কে পুলিশ অফিসার। ছোট ছেলে হায়দার আখলাক রুশো সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের ন্যাশনাল ব্যাংকের চিফ এক্সিকিউটর । আমি বাসায় একা একা থাকি তখন খুব খারাপ লাগে। আমার সন্তানদের খুব বেশি মিস করি। ১৯৯৬ সালে জুলাই মাসে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর আমার সন্তানদের মানুষ করতে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়েছে।

বীথি : কার লেখা পড়ে আপনি আনন্দ পেয়েছেন?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার প্রথম জীবনে তারাশংকরের বই মুগ্ধ করেছে। আমি মনে করি আমার লেখক জীবন সার্থক হবে আমি যদি এধরনের একটা বই লিখে মরতে পারি। বিমল মিত্র, প্রবোধ কুমার সান্যালের বই, পরিবর্তীতে হুমায়ূন আহমদের দুটো বই ‘নন্দিতে নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আমার মন জয় করেছে।

বীথি : প্রিয় লেখক কে ? কার বই বেশি পড়েন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার প্রিয় লেখক অনেকে। তাদের মধ্যে বেশি প্রিয় বিমল মিত্র, প্রমথ নাথ, তারাশংকর। বিমল মিত্র, প্রমথনাথের বই বেশি পড়েছি। ইতিহাসভিত্তিক বই, উপন্যাস আমার ভালো লাগে পড়তে।

বীথি : আপনার সাংগঠনিক জীবন সর্ম্পকে কিছু বলুন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার স্বামী যখন ময়মনসিংহ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন তখন আমি দুস্থ মহিলাদের নিয়ে একটি সংগঠন করি। তাদের কারিগরি শিক্ষা দিয়েছিলাম। যেমন- কাথা সেলাই, প্যাড, কলম বানানো। সেই সংগঠনটি একটা কোম্পানী ফর্মে চলে গিয়েছিলো। আমার স্বামী বদলি হয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। তারপর থেকে আমি আর সেই সংগঠনের কোন খবর জানি না। ব্যক্তিগত জীবনে আমি দুটো অনাথ শিশুকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। সেই সময়টা ছিল ৭৩/৭৪ সাল। দেশে যখন অভাব পড়েছিল তখন দুটো শিশু ছেলে আমার বাসায় এসে খেতো। একটা ছেলে মারা গিয়েছিল। অন্য ছেলেটি আমাদের সাথে চলে আসে এবং থেকে যায়। তাকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করেছি সে এখন একজন কন্ট্রাকটর। তারপর কুমিল্লায় একটা পাগল মহিলার মা সেই পাগল মহিলার এক ছেলে আমার কাছে জোর করে দিয়ে দেয়। তাকে সিলেটে নিয়ে আসি এবং সেও তার স্ত্রী সহ এখন প্রতিষ্ঠিত। এতিম শিশুদের নিয়ে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আমি কাজ করেছি।

বীথি : এই পর্যন্ত আপনি কি কি পুরষ্কার পেয়েছেন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমি পুরষ্কারে বিশ্বাসী না। তবে পুরষ্কার পেলে আনন্দ লাগে। পুরষ্কার মানে আমি বুঝি আরেকটা দায়িত্ব দেওয়া। পশ্চিমবঙ্গ (ভারত) থেকে সাহিত্য ও সমাজ সেবার জন্য ‘আলো-আভাষ’ ক্রেষ্ট ও নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা কর্তৃক সম্মাননা লাভ করি এবং প্রেমবাজারে হাসন রাজা গ্রন্থের জন্য ড.আশরাফ সিদ্দিকী ফাউন্ডেশন থেকে স্বর্ণপদকে ভূষিত হই।

বীথি : কিসের তাড়নায় আপনি কবিতা লেখন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমি ছড়া লেখতাম। মাঝে মধ্যে আমার অনুভুতি, শব্দ, বাক্য চলে আসতো। তখন আমার মনে হতো আমি যদি এগুলো প্রকাশ না করি আমার কথা গুলো অব্যক্ত থাকবে। ছড়া যেভাবে আমার নিজের তাড়নায় লেখি ছোট ছোট কথা দিয়ে যেভাবে মানুষের কথা বলি। কবিতাগুলো সেইভাবে তাড়না দেয় আমাকে লেখতে।

বীথি : জীবনে কি হতে চেয়েছিলেন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম নারীদের জন্য কিছু করব। সমাজে অসহায়, নির্যাতিত ও বঞ্চিত যে সকল নারী আছে তাদের জন্য কাজ করার জন্য স্বপ্ন দেখতাম। আমি এখনো চেষ্টা করি তাদের জন্য কিছু করতে।
বীথি : আপনি কি খেতে ভালোবাসেন ? কি পরতে ভালোবাসেন ?
সাদিয়া চৌধুরী : আমার বেশি ভালো লাগে আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে । বাঙালি নারী হিসেবে আমি শাড়ী পরতেই বেশি সচ্ছন্ধ্য বোধ করি। আমার মেয়ে অবশ্য সোলোয়ার কামিজ বানিয়ে দিয়েছিল পরার জন্য। কিন্তু আমার কেমন যেনো অস্বস্তি লাগতো তাই পরতাম না। একবার আমি লন্ডনে পার্কে গিয়েছিলাম বেড়াতে। তখন আমার পরনে ছিল শাড়ী। আমার মেয়ে আমাকে বলছিল ট্যুারিস্টদের মত হাঁটতে। কিন্তু আমি হাঁটছিলাম খুব ধীরে ধীরে। পার্কে হাটার সময় আমার পেছনে থাকা দু‘জন মহিলা আমাকে দেখে একজন আরেকজনকে বলছিল ‘দেখরায়নি তাইন মনে হয় বাঙালি, আমরার দেশের বয়স্ক মাসীরা,যেলা আটইন তাইন উলা আটরা’। কথাটা শুনে সাথে সাথে বলে উঠলাম ‘এই তুমরা কিতা সিলেটি নি’। তারপর আমি তাদের সাথে আড্ডায় মেতে উঠি। আমার ছেলেমেয়েরা ছিলো অন্যদিকে। তারা খুঁজতে খুঁজতে আবার আগের জায়গা এসে আমাকে দেখতে পায় আমি বাঙালীদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি।

বীথি : বর্তমান সময়ে কার কবিতা পড়তে এবং অনুভবে আনন্দ পান ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : বর্তমান সময়ে আমি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পড়ে আনন্দ অনুভব করি। তার কবিতা আমার মনে হয়েছে অনেক বেশি জীবনধর্মী। ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি আমি বার বার পড়ি আর বার বার মুগ্ধ হই।

বীথি : একজন লেখকের কি কি গুন থাকা উচিত ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : একজন লেখককে ধৈর্যশীল, সহনশীল, অহিংস এবং নিরন্তর সৃজনশীল থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।

বীথি : দেশের উন্নয়নে লেখকরা কি ভূমিকা পালন করতে পারে ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : অবশ্যই একজন লেখকই পারে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে।

বীথি : অবসর সময় কি করেন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : অবসর সময় আমি বই পড়ি আর গান শুনি।

বীথি: কার গান শুনতে ভালো লাগে ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : রবীন্দ্র সঙ্গীত বেশি শুনি। হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, রাধারমন-এর গান খুব ভালো লাগে।

বীথি: আমরা জানি হাসন রাজা আপনার পূর্ব পুরষ। হাসন রাজার সাথে আপনার সম্পর্ক এবং তার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন বলুন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ: হাসন রাজা আর আমি এক বংশের নয়। কিন্তু হাসন রাজার বড় ছেলে খান বাহাদুর গনিউর রাজা তিনি একজন স্বভাব কবি ছিলেন। আমি তার মেয়ের দিকের নাতনি । আর হাসন রাজার বড় মেয়ে রওশন হোসেন বানুর ছেলে আমার বাবা। হাসন রাজা আমার ডান দিকে বা দিকে। তিনি আমার মায়ের দাদা বাবার নানা। আমার মায়ের প্রথম কাজিনদের মধ্যে বিয়ে হয়। আর যেহেতু হাসন রাজার বড় ছেলের কোন ছেলে সন্তান ছিল না। শুধু আমার মা ছিলেন, এজন্যে তার সুনামগঞ্জের সম্পত্তির মালিক আমার মা। কিন্তু হাসন রাজা আর আমি এক বংশের না। আমি রাজা শ্রীমন্ত দেব রায়ের বংশধর। আমরা আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে পাঠানদের সাথে যুদ্ধ করে সিলেটে চলে আসি। আমরা যশোরের অধিবাসি ছিলাম। হাসনরাজাও যশোরের অধিবাসি ছিলেন। তারপর সিলেটের দিকে বাড়ি করেন। হাসন রাজা সর্ম্পকে আমার মূল্যায়নÑতার চরিত্র সর্ম্পকে মানুষ যা বলে আমি সেটাকে অগ্রাহ্য করি। আমার মনে হয় হাসান রাজা সুন্দর পুরুষ ছিলেন। তিনি উদার জমিদার ছিলেন। আমার বাবা ও মায়ের মুখ থেকে শুনেছিÑসকাল বেলা তার কাছে একবস্তা কাচা টাকা আসতো। কিন্তু বিকেল হলেই সব টাকা শেষ হয়ে যেতো। বিকেল বেলা এসে তিনি আবার ফকিরের মত তার স্ত্রীর কাছে টাকা খুজতেন। টাকা না পেলে তার প্রিয় পাখি কুড়া অথবা দোয়েল এগুলো তিনি বন্ধক দিয়ে টাকা আনতো। মানুষ বলে হাসন রাজার রক্ষিতা টক্ষিতা ছিল আমি এগুলোকে এভয়েড করি। হাসন রাজার আনরিজিস্ট্রার বিয়ের একজন মেয়ে আবিদা বান,ু তার সর্ম্পকে আমার একটা বিখ্যাত কবিতা আছে। আবিদা বানুকে আমার সঙ্গে অনেকদিন রেখেছিলামÑহাসন রাজার সর্ম্পকে তথ্য নেবার জন্য। তিনি বলেছিলেন হাসন রাজার খুব সৌন্দর্য ছিলো। তখনকার দিনে যদি আজকালকার মত পুরুষদের পার্লার থাকতো তাহলে হাসন রাজা সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পেতেন। আগুনের আলো দেখে পতঙ্গ চলে আসে,তেমনি তার সৌন্দর্য আকৃষ্ট হয়ে তখন অনেক নারীরা সেভাবে তার কাছে চলে আসতো। হাসন রাজা নিজে কাউকে জোর করে ধরে আনতেন না। তিনি তা করেননি। যারা আসছে স্বেচ্ছায় এসেছে। তাদের গর্ভে যে সন্তানসন্তন্তি হয়েছে,হাসন রাজা তাদেরকে তিনি সম্পতি দিয়েছেন এবং স্বীকৃতি দিয়েছেন তার নাম দিয়ে। তার মধ্যে ছিলেন আবিদা বানু তাকে সম্পত্তির একটা অংশ দিয়ে গেছেন। তার প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা।

বীথি : বিশিষ্ট দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ-এর কন্যা হিসেবে আপনার অনুভূতি কেমন ? সংক্ষেপে আপনার পিতার মূল্যায়ন করুন ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার পিতার মূল্যায়ন আমি তার লেখা দিয়ে করব। তার লেখনিও ছিল আমার কাছে সেরা। তার একটা গল্প পড়ে আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। তিনি জমিদারের ছেলে ছিলেন। সে জমিদারী থাকার সত্ত্বেও তাকে কখনো অহংকার করতে দেখিনি। তখন সিলেটের নানকার প্রথা প্রচলিত ছিল। পৃথিবীর কোথাও এই প্রথা ছিল না। জমিদার বাড়িতে যারা কাজ করতে আসতো দাসী বাদি, ইচ্ছে হলে রাখতেন ইচ্ছে না হলে বিদায় করে দিতেন। একদম ভিটেমাটি উচ্ছেদ করে দিতেন। জমিদার নন্দন হয়েও আমার বাবা সেই প্রথার বিরুদ্ধে চলে গেলেন এবং তার জমিদারী থেকে দুইশ জন দাসীবাদীকে ঘরবাড়ি করে দিয়ে তিনি পূণর্বাসন করলেন।
গল্পটার নাম ছিল ‘নানকার’। এই গল্পটার মূল্যায়নে করতে গিয়ে মূল্যায়ন করি লিও টলস্টয়ের সাথে। তার সাথে বাবার যেন একটা আত্মীক যোগাযোগ ছিলো। জমিদারের দাসীবাঁদিদের উপর যে অবিচার করা হতো, সে জন্য বাবাকে আমি কাঁদতে দেখেছি অনেকদিন। তিনি তাদের কথা বলতেন। যখন তখন জমিদাররা দাসীবাদিদেরকে বের করে দিতেন। আবার যখন ইচ্ছে তখন নিয়ে আসতেন। সেই সব দাসীবাদিদেরকে তিনি পূর্ণবাসন করে দিয়ে বিয়েও দিয়ে দিয়েছেন। আমার বাবার মা মানে আমার দাদী আমার বাবার উপর বিরক্ত হয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। সুনামগঞ্জ কলেজের চাকুরী নেওয়ার পর বাবা আমাদেরকে নিয়ে চলেন আসেন। আমার বাবার বাড়ি থেকে চলে আসা, আমি ইতিহাসের সেই নায়ক দিল্লির বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের সাথে তুলনা করি। আমার বাবা সেই হতভাগ্য যে একটি জমি পর্যন্ত নেননি। তিনি জমিদার হয়েও জমিদারের সম্পদের উপর তার কোন লোভ ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে আমার বাবাকে আমি অনেক মূল্যায়ন করি।
আমরা সাত ভাই দুই বোন। বাবার চাকুরির জীবন দিয়েই আমাদের নয় ভাইবোনদের তিনি মানুষ করেন। আমার বাবা আমাদেরকে জমিদারীর কোন পয়সায় আমাদেরকে মানুষ করেননি। বাবার সীমিত পয়সা এবং আমার মায়ের যে সম্পত্তি থেকে কিছু পয়সা আসতো তাই দিয়ে তিনি আমাদেরকে মানুষ করেন। আমাদের সব ভাইবোনদেরকে বাবা এমনভাবে মানুষ করেছেন যাতে আমরা সহজ-সরল পথে চলতে পারি। আমিও সেভাবে আমার সন্তানদেরকে গড়ে তুলেছি।

বীথি : আপনার বাবার সাথে স্মরনীয় কোন স্মৃতি আছে যা আপনাকে আনন্দ দেয় ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : আমার বাবা মাঝে মাঝে আমাদের সব ভাইবোনদেরকে মজা করে বলতেন যেন তাকে দশবার বাবা আর দশবার মামা বলে ডাকি। কারন আমার মা ছিলেন আমার বাবার মামাতো বোন। সে জন্য আমার বাবা মজা করে এই কথা বলতেন। এই কথাগুলো যখন মনে পড়ে তখন খুব আনন্দ লাগে।

বীথি : বাংলাদেশকে আপনি কেমন দেখতে চান ?
সাদিয়া চৌধুরী : বাংলাদেশকে আমি অসম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে দেখতে চাই।

বীথি : নতুন প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : নতুন প্রজন্মর কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা তারা যেনো বাংলাদেশকে অসম্প্রদায়িক ও দারিদ্রমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলে।

বীথি: সিলেট এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ?
সাদিয়া চৌধুরী পরাগ : তোমাকেও সিলেট এক্সপ্রেস কে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

পরবর্তী খবর পড়ুন : হৃদয়জ কথামালা

আরও পড়ুন



ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদের র‌্যালি

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু...

কবি-সাহিত্যিক কে দায় নিতে হয়

মোহাম্মদ আব্দুল হক: কবিতা কেউ...

স্নেহভাজনের অনুভূতিতে প্রতিবেশী মহৎপ্রাণ জেনারেল

সালেহ আহমদ খসরু: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল...