হারানময় দিনগুলো

প্রকাশিত : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জাবেদ আহমদ: দুপুর ১২টা। মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠল। ওপর প্রান্ত হতে জানানো হলো সাকি ভাইয়ের আম্মা অসুস্থ, ভর্তি নূরজাহান হসপিটালে। সন্ধ্যার পর দেখতে যেতে হবে। আরেকদিন ফোন এলো, আশাই চাচা অসুস্থ, আইসিইউতে ভর্তি। দেখতে যেতে হবে। একইভাবে জানানো হলো ৮ নম্বর বিল্ডিং এর শ্যামলির বোন অঞ্জলি দিদি দেশে এসেছেন, গোপালটিলার বাসায় অবস্থান করছেন, সন্ধ্যার পর যেতে হবে। মুরাদের (আব্দুল মুকিত চৌধুরী মুরাদ) জিন্দাবাজারের ফেন্সি হাউসে সময়মতো চলে আসবে। মোবাইলে নিয়মিত বার্তা প্রদানকারী আর কেউ নন, তিনি হলেন আমাদের হারান কান্তি সেন। আম্বরখানা কলোনির প্রিয় মুখ, আমার শৈশব কৈশোরের বন্ধু হারান কান্তি সেন। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে আম্বরখানা কলোনিতে পদার্পনের পর আমাদের নতুন পথচলা শুরু, চলছে আজ অবধি। আম্বরখানা কলোনিতে ক্লাব ঘরের মধ্যে পার্টিসন দিয়ে (বর্তমান সমাজকল্যাণ সমিতির কার্যালয়) পাশাপাশি মোহামেডান ফ্যান ক্লাব আর আবাহনী সমর্থক গোষ্ঠীর কার্যক্রম চালিয়েছি দুজনে।
মোহামেডান মিনি ম্যারাথনে হারান কান্তি সেনের সম্পৃক্ততা ছিল শুরু থেকে। অধুনালুপ্ত সিলেট পৌরসভার এ্যাম্বুলেন্স থাকতো ম্যারথন দৌড়বিদদের পেছনে হারানের বদান্যতায়। মজুমদারীতে সাইক্লোনের ভাড়া কার্যালয়ে কবিতা পাঠ, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা আর গরীব দুঃস্থ লোকদের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান আমরা একসাথে করেছি। অফিস না থাকলেও সাইক্লোনের হয়ে এখনও একসাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।
এক্স আম্বরখানা কলোনি এ্যালামনাই সোসাইটি আর সাইক্লোন কেন্দ্রীয় সংসদ এ দু’ সংগঠনের হয়ে বেশী সময় কেটেছে হারান আর আমার। গত দু বছর ধরে আম্বরখানা কলোনির পুরাতন লোকদের খুঁজে খুঁজে বের করে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করছি, পুরনো সম্পর্ক ঝালাই করছি। হারানই এসবের মূল নায়ক। সিলেট নগরীর নানা প্রান্তে অবস্থান নেয়া বাসা বাড়িতে প্রিয়জনদের দেখতে হারানের সহযাত্রী হয়েছি আমি সেলিম আউয়াল, আব্দুল মুকিত মুরাদ, আশরাফ হোসেন জামান, জামিল চৌধুরী, অধ্যক্ষ ছয়ফুল করিম চৌধুরী হায়াত, আবুল ফয়েজ চৌধুরী, আব্দুল বাতিন ফয়সল, শেখ তোফায়েল আহমদ সেপুল প্রমুখ।
শৈশব-কৈশোর আর তারুণ্যের শুরুটা আম্বরখানা কলোনিতে, এজন্যে আমাদের বিশেষ একটা আবেগ জড়িয়ে রয়েছে এ স্থান আর কলোনির মানুষদের প্রতি। বর্তমান প্রজন্ম ‘কলোনি’ শব্দ ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ বোধ না করে নাম রেখেছেন আম্বরখানা সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার। তবে আমরা এখনও গর্ব বোধ করি আম্বরখানা কলোনিতে এক সময়ে অবস্থান করতে পেরে। আমাদের চোখে এখনও লেগে রয়েছে সেই সময়ের বৃদ্ধ-যুবা-শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষের মুখগুলো। পুরনো মুরব্বিদের খোঁজ খবর নেয়া শুরু করি প্রধানতঃ য্ক্তুরাস্ট্র প্রবাসী সংগঠক জামিল চৌধুরীর অনুপ্রেরণায়। আম্বরখানা কলোনির প্রবীণ মুরব্বি মোঃ নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে দেখতে খাদিমপাড়ার ৪ নম্বর সড়কের বাসায় গমনের মধ্য দিয়ে আমরা হারিয়ে যাওয়া পুরনো কলোনিবাসিদের বাসা বাড়িতে যাওয়া শুরু করি। সব প্রোগ্রামে লিয়াজোঁ করতো বন্ধু হারান কান্তি সেন। আম্বরখানা কলোনির পুরনো কেউ বিদেশ থেকে দেশে আসলে তাকে নিয়ে বসার, অনুষ্ঠান করার বিষয়ে সদা তৎপর থাকতো হারান। ‘সাইক্লোন’কে গতিশীল রাখতে নানা ব্যস্ততার মধ্যেও সদা তৎপর ছিল হারান। ২০১০ সালে সাইক্লোনের ৩০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে সিলেট নগরী থেকে ২০কিলোমিটার ওসমানিনগর উপজেলার গ্রামের বাড়ী থেকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও সপরিবারে উপস্থিত থেকে প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছিল হারান। ডা. এ রসুল সাইক্লোন বৃত্তি শক্ত হাতে হাল ধরে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করে হারান কান্তি সেন। ২৭ বছর ধরে হারান বৃত্তি কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করে যুক্তরাষ্ট্র যাত্রার প্রাক্কালে নতুন বৃত্তি কমিটিতে তাঁর স্থলাভিসিক্ত হলেন সেলিম আউয়াল।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্টের নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা ছিলেন হারান কান্তি সেন। সীমাহীন কাজের চাপ সত্বেও পরিচিতজনকে কর্পোরেশনের নানান বিষয়ে অতি সহজেই সমস্যার সমাধান করে দিতেন। সিটি কর্পোরেশন কর্মচারী সংসদের প্রিয়মুখ হারান ছিলেন সব সময়ের নির্বাচন কর্মকর্তা।
চাকুরীর দিনে নগরে আর রাতে অবস্থান ছিল তার পল্লীতে। কিন্তু আকাশ সংস্কৃতির ছোঁয়ায় হারান ছিলেন সর্বদা আপডেট। তরতাজা সকল তথ্য থাকতো হারানের ঝুলিতে। পরিচিতজনদের মৃত্যু সংবাদ, জানাজার সময় সব তথ্য হারানই জানাতো সবার আগে। ওসমানীনগর উপজেলার গোয়ালাবাজারের দুলিয়ারবন্দ গ্রামের নির্মল পরিবেশে রাত কাটতো দিনের কার্যক্রমের বর্ণনাসহ ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে।
রম্যলেখক হারান কান্তি সেন যার সেরা রচনাগুলোর সৃষ্টি এই বিখ্যাত দুলিয়ারবন্দ হতে। সিলেটের সবকটি দৈনিকের পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক ও সাময়িকীতে হারানের রম্যগল্প ছাপা হয়েছে। হারান কান্তি সেন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আজীবন সদস্য। প্রাক্তন আম্বরখানা কলোনিবাসীদের নিয়ে হারান বই প্রকাশ করে তার অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন করেছে। বইটি প্রাক্তন আম্বরখানা কলোনিবাসীদের পরিবার সদস্যদের কাছে একটি দলিল হিসাবে কাজ করবে। ছাপানো বইতে যাদের মুখছবি থাকবে সে সব পরিবারের সন্তানদের নিকট বইটির কদর থাকবে অত্যাধিক।
হারান কান্তি সেন সপরিবারে আমেরিকায় চলে যাবে এটা আমরা আগেই জানতাম। সবসময়ই দোয়া করতাম, প্রত্যাশা করতাম কখন আসবে আনন্দের ভিসা প্রাপ্তির খবর। ডিসেম্বর মাসে কোন একদিন হারান ফোনে জানালো সেই মহানন্দের খবর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলো। হারানের দিক থেকে আমেরিকা যাত্রার প্রস্তুতি শুরু হলো আর আমাদের প্রস্তুতি বিদায় জানানোর। দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে আনন্দ পরিণত হতে লাগলো বিষাদের কান্নায়। প্রিয় হারানকে নিয়ে আমাদের পারিবারিক রেস্টুরেন্ট উন্দাল কিং কাবাবে বসেছিলাম। লাঞ্চের পর ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে সম্মাননা জানানোর সময়ই হারানের চোখ গড়িয়ে পানি পড়তে দেখলাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সিলেট প্রেসক্লাবের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, গল্পকার সেলিম আউয়াল, কবি তাবেদার রসুল বকুল, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা চন্দন দাশ, মোঃ আব্দুল বাসিত, মোঃ লুৎফুর রহমান, সংবাদকর্মী তাসলিমা খানম বীথি, উন্দালের ম্যানেজিং পার্টনার সালাহ উদ্দিন চৌধুরী, প্রিয়মুখ হারানের বিদায়ের আবহ শুরুর অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক থাকতে পারেননি।
এপেক্সিয়ান হারান কান্তি সেন দু সপ্তাহ ধরে সামাজিক সাংগঠনিক বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। অজানা-অচেনা মার্কিন মুল্লুকে যাবার প্রস্তুতিও ঠিকমতো নিতে পারছেন না। ৪ মার্চ সাইক্লোন কেন্দ্রীয় সংসদ আর কৈতর প্রকাশনীর উদ্যোগে হয়ে গেল আবেগ ঘন বিদায় আর হারানের দুটো মূল্যবান বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ৯ মার্চ আমেরিকার পথে সিলেট ছাড়বে বন্ধু হারান। বাঙ্গালি অধ্যুষিত মিশিগান সিটি হবে হারানের নতুন ঠিকানা। বন্ধু বৎসল হারান কান্তি সেন তার সরব পদচারনায় বাংলাদেশের মতোই নব আবাস মার্কিন মুল্লুকের মিশিগানে সকলের প্রিয়মুখ হয়ে ওঠবেন এটাই হোক আমাদের বিদায় বেলার প্রত্যাশা-কামনা।

লেখক ঃ জাবেদ আহমদ, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক, সিলেট। সহ সভাপতি, সাইক্লোন, কেন্দ্রীয় সংসদ, সিলেট।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : ভ্রমণ পিপাসী মন

আরও পড়ুন