হাঁদারাম সরদারস্

,
প্রকাশিত : ০৬ এপ্রিল, ২০১৯     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম. আশরাফ আলী: ওদের বয়স ১৭ বা ১৮ এর মধ্যে। লেখাপড়া তেমন করেনি। ক্লাস টু থ্রি পর্যন্ত নিধিরাম, হাঁদারাম, গঙ্গারাম ও জয়রাম চার বন্ধু। ওদের গলায় গলায় ভাব। একে অপরকে একদিন না দেখলে উতলা হয়ে ওঠে। জগৎ সংসারে ওদের তেমন কেউ নেই। নিধিরামের আছে ঠাকুমা, হাঁদারামের পিসি, গঙ্গারামের মাসি আর জয়রামের মা। জয়রামই শুধু পিতৃভিটা দখল করে আছে। নিধিরাম থাকে ঠাকুরমার বাপের বাড়ি, হাঁদারাম থাকে পিসির বাড়ি, আর গঙ্গারাম থাকে মাসির উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভিটায়। কাকতালীয়ভাবে ওরা একই গ্রামে থাকে, একই বয়সী এবং একই সাথে বেড়ে ওঠা। ওদের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে গ্রামের মোড়ল হরিপদ একটা সুন্দর গল্প দিয়ে সবাইকে বুঝান। এতে এক বাক্যে ওদের সম্পর্কে একটা ধারনা গ্রামের ছোট বড় সবার মাঝে চলে আসে। গল্পটি তিনি তার দাদার দাদা থেকে শুনেছেন। অর্থাৎ প্রথমে শুনে ছিলেন দাদার দাদা, তারপর দাদা থেকেই হরিপদ আয়ত্ত করেছেন। গল্পটি এরকম-
এক লোক তার একটি গাধা বিক্রয় করবে। কয়েকবার বাজারে নেওয়ার পরও বিক্রি করতে পারলো না। হতাশ হয়ে সে বসে রইল। একদিন পাশের গ্রামের এক বন্ধু তাকে খবর দিলো রঘুনাথপুর গ্রামে এক গাধা ব্যবসায়ী আছে। ওর গাধা শালও রয়েছে। সেখানে গিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারো। লোকটি অন্ধকারে যেনো আশার আলো দেখলো। পরের দিনই ছুটল রঘুনাথপুর ওর গাধাটি নিয়ে। খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো না। গাধা শালের মালিক আয়ুষ্মান সরদার রাশভারি লোক। গাধাটি তিনি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, আমি এখন কিছুই বলতে পারবো না। গাধাটি আমার এখানে রেখে যান, এক সপ্তাহ পরে আসবেন। লোকটি রাজী হয়ে গাধাটি রেখেই চলে এলো।
এক সপ্তাহ পর লোকটি আবারও ছুটল রঘুনাথপুর। অনেক কষ্টে পৌঁছল সেখানে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর আয়ুষ্মান সরদার আসলেন। লোকটিকে দেখেই বললেন-আমি দুঃখিত দাদা। আপনার গাধাটি আমি কিনতে পারবো না। কারণ জানতে চাইলে আয়ুষ্মান বললেন-যেদিন থেকে আপনি গাধাটি রেখে গেছেন সেদিন থেকেই লক্ষ্য করছি এটা আকর্মন্য গাধাদের সাথে মিশছে। অর্থাৎ আমার গাধার পালের মধ্যে যে গাধাগুলো ফাঁকিবাজ, কাজ করতে চায় না ওদেরই দলে সেও যোগ দিয়েছে। তাই ধরে নেয়া যায় সেও ঐ গাধাদের মত অলস ও নির্বোধ প্রকৃতির। কাজেই এসব দেখেই আমার এ সিদ্ধান্ত। সেদিন এক বুক হতাশা নিয়েই গাধাটি নিয়ে ফিরল লোকটি……..।
চার বন্ধুর উপরে এমন ধারণা গ্রামবাসীর। ওরা কাজও করে না- বুদ্ধি সুদ্ধিও বেশ মোটা। সারাদিন ঘুরে ফিরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। যার যার অভিভাবক থেকে গালি-বকুনি খেয়ে কোন দিন খেয়ে কোনদিন না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ওরা…………।
একদিন চার বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিল দেশ ভ্রমণের। অর্থাৎ পায়ে হেঁটে হেঁটে যা দেখা যায় তাই তারা দেখবে। পকেটেতো আর পয়সা নেই, আবার হাঁটতেও তো পয়সা লাগে না। তাই এ সিদ্ধান্ত। অচিনপুর গ্রাম থেকে খুব ভোরে উঠে শুরু করল হাঁটা। সকাল দশটায় পৌঁছে গেল ওরা সিলেট শহর। দল বেঁধে হাঁটছিল ওরা। কিন্তু গাড়ি, রিকশা, ঠেলা, সিএনজি এগুলো ওদের সাইজ করে দিল। একের পেছনে অন্যজন বাধ্য হয়েই হাঁটছে। অর্থাৎ প্রথমে নিধিরাম এর পেছনে হাঁদারাম এরপর গঙ্গারাম এবং সর্বশেষ জয়রাম। সবারই মাঝে উৎসুক ভাব। মুখ ফুটে অনেক কথা বেরোতে চায়। কিন্তু লাইন ধরে হাঁটার কারণে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছে না। হাঁটতে হাঁটতে ওরা কীন ব্রীজে উঠল। বা: কী সুন্দর। লোহার কাঠ দিয়ে কী বড় পুল বানিয়েছে। উপরে চলছে গাড়ি আর নিচ দিয়ে চলছে নাও। কীন ব্রীজের মাঝামাঝি ডানে বায়ে দু’টি করে বক্স। অনেকটা মসজিদের ইমাম বাড়ার মত। নিধিরাম বলল ‘আরে দেখ কী আরামের একটা জায়গা দিয়েছে। এখানে দাঁড়াই, গাড়ি ঘোড়া ছুইতে পারবে না।
এ ছাড়া রেলিং ধরে একটু রেস্টও নেয়া যাবে। চারজন বক্সে দাঁড়ালো। ভরা গাং। মানুষের মিছিল দাবী আদায়ের উদ্দেশ্যে যেমন রাজপথ ভরাট হয়ে ছুটে তেমনি পানির মিছিলও যেন ছুটছে কোথাও। সে যাত্রায় বাঁধা হয়ে যদি কোথাও মাটি, পাহাড় বা অন্য কিছু দাঁড়ায়, কোন রক্ষা নেই। নিমিষেই মিশিয়ে নেয় ওদের সাথে। সুরমায় নব যৌবন। তরতর করে যুবতী নারী যেমন সিঁড়ি নামে ওর যেন অবস্থা সে রকম। ভাটি গাঙ্গে দু’একটি নৌকা ছুটে চলেছে খড় কুটোর মত। কোথাও বাড়ি লাগলে উপায় নেই। নির্ঘাত তলিয়ে যাবে। উজান গাঙ্গেও আসছে দু’একটি কার্গো নাও। চলার চেয়ে ওর ইঞ্জিনের শব্দই বেশি, যেন দাঁড়িয়ে আছে আস্ত একটা কুমির। নিধিরাম বলল-‘দেখছস কী সুন্দর নদী আর কী সুন্দর পুল।’ ওরা এক বাক্যে বলল-
-হ্যা হ্যা খুব সুন্দর দাদা।
-আচ্ছা তোমরা একটু ভাব তো। এই যে পুল মানে বিরিজ বানাইছে, কত টাকা খরচ হতে পারে?
-হাঁদারাম বলল-তিনশ’ টাকা।
-গঙ্গারাম তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল আরে দূর হাঁদারামের হাঁদারাম। চারশ’ টাকার কম হবে না। জয়রাম এতক্ষণ ধরে ওদের দর কষাকষি শুনছিল। সে বিজ্ঞের মত মাথা দুলিয়ে বলল-তোরা যাই বলিস কমপক্ষে ৫০০ শত টাকা লাগবেই।
নিধিরামও একমত হলো-হ্যাঁ, হ্যাঁ পাঁচশ টাকার কম নয়। জয়রাম বলল-আরতো পারছি না দাদারা। এবার তো কিছু খেতে হয়।
নিধিরাম বলল- টাকা আছে?
-হ্যাঁ দশ টাকা। মা দিয়েছে।
আচ্ছা চল-ওপারে গিয়ে দেখি কোন হোটেল পাই কী না। আমারও খুব ক্ষিধে পেয়েছে।
কীন ব্রীজ পেরিয়ে একটি রেস্টুরেন্ট এ ঢুকলো ওরা। জিজ্ঞেস করল নিধিরাম খাবার কি কি আছে? হোটেল বয় বলল অনেক কিছুই তবে মামলেটটা পছন্দ হলো ওদের। বলল নিধিরাম- আমাদের একটা করে পরোটা আর মামলেট দাও। একটু সময় গেলে জয়রাম বলল ‘কি হলো এত দেরি কেন? আরে মামলেট তো তৈরি করে দিতে হয়- একটু অপেক্ষা করেন- হোটেল বয় বলল।
অনেকক্ষণ পর পরোটা আর মামলেট দিয়ে গেল হোটেল বয়। হাত দিয়ে দেখে আন্ডা ভাজি। একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। নিধি ইশারায় বলে খেয়ে ফেল। শহরে বোধ হয় আন্ডা ভাজিকেই মামলেট বলে। যাই হোক নাস্তা-পানি খেয়ে হোটেল থেকে বের হলো ওরা। সুরমা পয়েন্ট পেরিয়েই কোর্ট ভবন। ভবনের সামনে বড় একটা শিরিশ গাছ। সে গাছের নিচে গোল হয়ে মানুষ কী যেন দেখছে। চার বন্ধু গিয়ে দাঁড়ালো ওখানে। একটা লোক পাকা রাজনীতিবিদের মত কথা বলছে। আর ওর ঔষধের গুণগান করছে। ওষুধ বলতে বোতলজাত এক জাতের ওষুধ মাত্র। সব্যসাচি ফলের টনিক। লোকটার বক্তৃতা শুনে মনে হচ্ছিল সবগুলো কিনে ফেলে নিধি। কিন্তু টাকার অভাবে একটিও কিনতে পারলো না তবে ডাক্তার কিন্তু নিরাশ করেনি। একটি পুটলা (তাবিজের মত) প্রত্যেককে ফ্রি দিলো আর বলল এটি বাড়িতে গিয়ে খুলে দেখবে। প্রত্যেকে একটি করে পুটলা নিয়ে চলল- যার যার বাড়ির দিকে।
নিধি, হাঁদা, গঙ্গা, জয় ওরা মনস্থ করল আজকের ভ্রমণ এখানেই সমাপ্তি। ওদের হাতে যে সময়টুকু আছে সে সময়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হবে। কাজেই ওরা বাড়ির পথ ধরল।
আগের মত লাইন ধরে শহর পার হলো ওরা। গ্রামের রাস্তায় যখন উঠল তখন নিধি বলল এতটুকু জায়গা যেতে অনেকক্ষণ হাঁটতে হবে। এক কাজ কর-একজন একজন করে গল্প বলি ….. গল্প শুনে শুনে …..
কথা শেষ করতে না করতেই হাঁদা বলল আমি একটি গল্প বলি ….. নিধি বলল-আচ্চা ….. হাঁদা বলল-এটা আমার বাবার কাছ থেকে শুনেছি অনেক আগে-
-আচ্ছা ঠিক আছে বলেই ফেল্ নিধি যোগ করে……।
এক বোকা লোক ছিল। তার ছিল এক জোড়া হালের বলদ। গ্রামের অন্য এক লোক একদিন এসে বলল ভাই তোমার বলদ জোড়া আমায় দাও না। আমার একটা ক্ষেত পড়ে আছে, ওতে বীজ বপন করবো। লোকটির বলদ জোড়া ছিল খুব মায়ার। সে মনে মনে রাজি হতে পারলো না। কিন্তু চক্ষু লজ্জায় নাও করতে পারলো না। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও সে বলদ জোড়া দিতে রাজী হলো। লোকটি বলদ জোড়া নিয়ে চাষ দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে গেলো। গরু দুটি যখন ফেরত দিল তখন গেরস্ত দেখলো ওদের মুখ দিয়ে ফেনা উঠেছে। গেরস্ত যার পর নাই দুঃখিত হলো কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না।
মনে দুঃখ চেপে রাখলো। একদিন গেরস্ত লোকটি ফন্দি আটলো। ঐ লোকের তো কিছুই নেই শুধু একটি নৌকা আছে। মাঠ জুড়ে তখন নতুন পানি। গেরস্ত লোকটি গিয়ে বলল ভাই আমাকে তোমার নাও খানা দিবে। আমার একটু কাজ ছিল। লোকটি রাজি হলে সে নৌকা নিয়ে আসলো। মনে মনে বলল- শালা আমার গরুর মুখ দিয়ে ফেনা করেছিলে এইবার দেখ তোর নাওকে আমি কি করি। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়। গেরস্ত নৌকা চালাতে থাকে। সে মনে করছিল নৌকা অনেক কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু নৌকা চালাতে চালাতে সে নিজেই অজ্ঞান হয়ে পড়ল…..।
জয়রাম বলল…. খুব সুন্দর। এখন আমি বলি….. এটা আমার নানার কাছ থেকে শুনেছিলাম….. অন্যরা শুনতে মনোযোগী হল…….।
চার মুর্খ নৌকা করে বাজারে যাচ্ছে। নৌকাটা তেমন ভালো ছিল না। নৌকার তলা দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি ঢুকছিল। বোধ হয় নৌকার তলায় একটা কানা ছিল। একটু তেনা (ন্যাকড়া) দিয়ে সেটা বন্ধ করা ছিল। সেই কানা দিয়েই পানি উঠছিল। মুর্খদের একজন পানি সেচে নৌকা থেকে বাহিরে ফেলছিল। আর তিনজন দাঁড় বৈঠা দিয়ে নৌকা বেয়ে যাচ্ছিল। সেচের সময় হঠাৎ জমাট তেনাটি উঠে এলে বেশ পানি উঠতে লাগলো। অনেক চেষ্টা করেও সে বন্ধ করতে পারল না। সে অন্য একজনকে ডাকলো। অন্যজন এই অবস্থা দেখে বলল- আরে পাগল ঐ ছিদ্রের পাশে জলদি আরেকটি ছিদ্র কর। কোন কিছু না বুঝেই দাঁড়ের চোখা অংশ দিয়ে নৌকার তলায় আঘাত করল। অমনি সাথে সাথে নৌকার তলায় বড় ফাটল দেখা দিল। মুহূর্তেই পানি উঠে সমস্ত নৌকা তলিয়ে গেল। ওদের আর বাজারে যাওয়া হলো না।
নিধি, হাঁদা, গঙ্গা, জয় ততক্ষণে যার যার বাড়ির পথ ধরেছে। বাড়িতে পৌঁছে প্রত্যেকে পকেট থেকে ডাক্তারের দেয়া পুটলিটা বের করল। খুলে দেখে একটি কাগজ। সেখানে লেখা রয়েছে মশার দাওয়াই মশারি। এ কারণে এটা মাগনা দিয়েছে- ওরা ভাবে বাংলাদেশে উপদেশই সবচেয়ে সস্তায় পাওয়া যায়।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

ব্রিটেনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত

        ব্রিটেনের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের একটি প্রাথমিক...

মহিমান্বিত রজনী : লাইলাতুল কদর

        মো: শামসুল ইসলাম সাদিক হাজার...

বাজেট অনুষ্ঠানে মেয়র আরিফের ঘোষণায় বিব্রত সাংবাদিকরা

        সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) ২০২১-২২...