সেদিন শিশুর কণ্ঠে শুনছিলাম : আমি আল্লাহকে সব বলে দেব

,
প্রকাশিত : ১৫ এপ্রিল, ২০২০     আপডেট : ৬ মাস আগে
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল
…………………………………..

আমি আল্লাহকে সব বলে দেব’, মনে আছে সিরিয়ান শিশুর মৃত্যুর আগের শেষ কথাটা?পুরো পৃথিবী আজ এক জীবাণুর মুখোমুখি, কিন্তু উম্মাহর কাছে জীবাণু ছড়িয়েছিলো অনেক আগেই, সিরিয়াতে। যখন রাশান বিমানগুলো সিরিয়ার জনপদে একের পর এক জীবাণু-বোমা নিক্ষেপ করেছিল। মনে আছে সেই সিরিয়ান শিশুকন্যার কথা? যে মৃত্যুশয্যায় অভিমান করে বলেছিল- “আমি আল্লাহর কাছে গিয়ে সব বলে দেবো, নালিশ করবো তোমাদের নামে!“ আজ মুসলিম উম্মাহসহ গোটা পৃথিবী সেই শিশুর দায়ের করা মামলার সামনে দাঁড়িয়ে। আমরা কতদিন পারবো এই মামলা লড়ে যেতে? একজন মজলুম শিশুর মামলা, প্রতাপশালী আল্লাহর দরবারে।

কোয়ারেন্টাইন থেকে পালাচ্ছে হতবিহবল মানুষগুলো। ফিলিস্তিনের সেই কোয়ারেন্টাইনের কথা মনে পড়ে কী? যেখানে উম্মাহর ভাইয়েরা অতিষ্ঠ জীবন অতিবাহিত করে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। অত্যাচারীরা গযব থেকে বাঁচতে আজ নিজেই নিজের বানানো কোয়ারেন্টাইনে বন্দি। মাজলুমের বসতিতেও তারা আজ অবাঞ্ছিত।

আরাকানেও মাসজিদ ছিলো, ছিলো মাদ্রাসা। কিন্তু সেখানে জামাত হতে পারতো না, দ্বীনের দারস হতে পারতোনা। বর্মী সৈন্যদের বাঁধার মুখে রোহিঙ্গা মুসলিমরা অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকতো শুন্য মাসজিদের দিকে। আহাজারি করতো শূয়রের খোঁয়াড়ে পরিণত হওয়া মাদ্রাসাগুলোর দিকে তাকিয়ে। আজ মুসলিম বিশ্বের মাসজিদগুলো শুন্য। আযান নেই। উমরা নেই। আরাকানের স্বাদ আস্বাদন করে কেমন বোধ করছো হে উম্মাহ!

লক ডাউন করা কাশ্মীর এখন উন্মুক্ত। বরং হিন্দু সন্ত্রাসীদের রাজভবন আজ লকড ডাউন। নিজ পরিবারের কাছেই তারা এখন অচ্ছুৎ। চেতনার ‘জয় শ্রীরাম’ চুপসে গেছে বাস্তবতার ‘করোনা’র কাছে। প্রোপাগান্ডার বায়বীয় ‘গোমূত্র’ থেরাপী স্বয়ং হিন্দুরাই এখন চেখে দেখতে নারাজ। ‘করোনা’ যখন ফণা তুলছিলো তখনো তুমরা দিল্লীতে মেতে ছিলে রক্তের নেশায়। এখন কোথায় সেই দুঃসাহস!?

যে দাঙ্গা পুলিশ লাগিয়ে ইউরোপ শরণার্থীদের তাড়াচ্ছিলো কয়েক সপ্তাহ আগে, তারাই এখন তাড়াচ্ছে ইউরোপিয়ানদের। নিজ বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখতে। মুসলিম নিধনে অবদান রাখা তাদের ডোনেশন গুলো ফিরে এসেছে ‘করোনা’র ছদ্মবেশে। আপনজনের লাশ কতো ভারী হে ইউরোপ?!

অর্থনীতির চীন! কোনটা বেশি দামী? উইঘুর মুসলিমের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাকি করোনার প্রতিষেধক? আজ প্রতিটা এলাকা উইঘুরে পরিণত হয়েছে। মুসলিমের রক্তে রঞ্জিত হাতগুলো কতবার ধুলে করোনামুক্ত হবে? পৃথিবীর প্রতিটা করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি আজ তোমাকে অভিসম্পাত করে হেই চীন। পৃথিবীবাসী কামনা করে- হায়! চীন বলে যদি কিছুই না থাকতো এই দুনিয়ায়!!

কাঁদছে মানবতা!! চোখের পানি আটকাতে পারবেন না!
ফিলিস্তিন,কাশ্মীর,আরাকান, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন আর সিরিয়ার মজলুম শিশুদের কী অপরাধ? অবাক বিশ্ব তাকিয়ে রয়, মানবতা ক্যান্সারে অাক্রান্ত,করোনায় তাদের হেদায়েত কী হবে?

ক্যামন হবে চিরবিদায়ের বেলা?

এই পৃথিবীর সবকিছুর শেষ আছে। আমাদের এই জীবনের শেষ আছে, দুঃখের দিনগুলোরও শেষ আছে। সুখের দিনগুলোও একটানা থাকেনা, তারও শেষ থাকে। এই পৃথিবীটার সবকিছুই এমন। অত্যাচারেরও শেষ আছে, শেষ আছে দাম্ভিকের দম্ভের, মিথ্যাবাদীর মিথ্যার। একদিন শক্তিশালীও হবে দুর্বল। রাস্তার মোড়ের জওয়ান রগচটা ছেলেটাও বৃদ্ধ বয়েসে লাঠি নিয়ে হাঁটবে। তাই যেকোন ক্ষমতার, শক্তির এই ভুলে ডুবে থাকার অর্থ নেই কোন, এ এক পরিপূর্ণ বিভ্রমমাত্র…

চলে যাব, এর চাইতে বড় সত্য আর নেই। পৃথিবীতে আসার পর থেকেই মৃত্যুই আমাদের সবচাইতে অবশ্যম্ভাবী সত্য। আর সবকিছুই হতেও পারে, নাও পারে.. সহস্র কোটি বছরের এই পৃথিবীতে আমার মতন মানুষ এসেছেও ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন। অনেক দূর থেকে যদি দুনিয়াতে আসা এইসব মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয়া অবস্থায় দেখার কথা কল্পনা করি, তাহলে বুঝব, সেই মানুষগুলো উপস্থিতি আমাদের চোখে কীটপতঙ্গের ঝাঁকের একেকটা পোকা, বা পিঁপড়ার বাহিনীর একটা পিঁপড়ার মতন।

আল্লাহ বলেছেন ধৈর্য্য আর সালাতের সাহায্যে সাহায্য প্রার্থনা করতে। আল্লাহ বলেছেন ধৈর্যধারণকারীদের জন্য সুসংবাদ। [১] নিশ্চয়ই সত্য আর মিথ্যা এক নয়। নিশ্চয়ই জাহান্নামের নিকৃষ্ট বাসিন্দা আর জান্নাতের সম্মানিত অতিথিগণ এক নয়। নিশ্চয়ই এই পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর, আখিরাতের জীবন অনন্তকালের। কেবল আল্লাহর বান্দা যারা, তারা জানে, এই জীবন ক্ষণিকের জন্য, সবই খেলনামাত্র। আখিরাতের জীবন উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। [২] তাই তারা বিপদে সবর করে, আনন্দেও মাত্রাছাড়া হয়না, বরং আরো কৃতজ্ঞ হয় আর বুঝে তার এই ভালো সময় অনেক দায়িত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে তার জন্য।

কেমন যেন সহজ হয়ে গেছে এই সমাজে, এই সময়ে মৃত্যু। আগের চাইতে অনেক বেশি সস্তা আর সহজ। মাথায় কারেন্টের পোল ঢলে পড়তে পারে, ফ্লাইওভার আস্ত খসে পড়ে যায়, রিকসার পেছনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে গাড়িচাপা দিয়ে চলে যায়, হঠাৎ আগুণ লেগে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় আস্ত মানুষেরা। ওই মানুষগুলোরও আমাদের মতন স্বপ্ন, চাওয়া, না পাওয়া, বেদনা, আকাঙ্খার অনুভূতি ছিলো, আছে, থাকে। যাওয়ার সময় আমাদের অবস্থা কেমন হবে? আমি, আমরা কি প্রস্তুত থাকি যাবার জন্য? আমি গতকাল থেকে জীবনে প্রথম খুব গভীরভাবে অনুভব করলাম, নামাজের ব্যাপারে কেন সর্বশেষ নামাজ হিসেবে ফিল করে আদায়ের কথা শিখেছিলাম। হতে পারে, এর পর আমার আর কোন ভালো কাজ করার উপায় থাকবেনা। চোখের দু’ফোঁটা অশ্রু হয়ত আল্লাহ মঞ্জুর করে নিতে পারেন, হয়ত তার উসিলায় মুক্তি জুটে যেতে পারে।

যাবার বেলায় অন্তর জুড়ে আল্লাহকে রাখতে চাইলে প্রতিদিন প্রতিক্ষণেই স্মরণে আল্লাহকে রাখতে হবে। পৃথিবীর সেরা ও আখিরাতের জীবনের সফল মানুষরা দু’আ করতেন যেন মৃত্যুর সময়ে তাদের কাজগুলো সবচাইতে ভালো কাজ হয়। মৃত্যু তো যেকোন সময়েই আসতে পারে, তার প্রস্তুতিও নিতে হবে মানসিকভাবে, প্রতিদিন, প্রতিবেলাতেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মৃত্যুকে মুসিবত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটা এমনই এক কষ্টের জিনিস, এমনই এক অবধারিত সত্য।

তাই আমাদের কাজগুলোতে স্বেচ্ছাকৃত পাপ রাখা যাবেনা, করা যাবেনা চুরি, মিথ্যাচারণ, অপর মানুষের প্রতি অবিচার-অন্যায়। অনেক সময় কিছু বন্ধু চলার পথে নামাজ পড়ার ব্যাপারে অজুহাত দেখাত, “কাপড় ভালো নাই” –আল্লাহ জানেন এই কথার পুরো অর্থ কেমন থাকে। তবে, আমাদের বিদায়ের আগে অন্তর-কাপড়-শরীর যেন নাপাক না থাকে। নাপাকি স্পর্শ করার সাথে সাথেই যেন আমরা পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা করি। ভালো কাজ করার এই চেষ্টার ফলই আল্লাহ আমাদেরকে দিবেন, এই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাই আল্লাহর কাছে গ্রহণীয়, অর্থ-সম্পদ-বিত্ত-বৈভব-ক্ষমতার কিছুই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, হবেনা আমাদের মুক্তির পাথেয়।

তাই এই বিষয়টাও মনে হয় খেয়াল রাখা দরকার। একজন মানুষ হিসেবে আমাদের আসলে কোন শক্তিই নেই, আমরা কেবল চেষ্টা করি — সমস্ত কিছু দেয়ার মালিক আল্লাহ, তিনিই সফল করে দেন আমাদের, বিফলও করেন তিনিই। আমাদের সেই চেষ্টাটুকু হোক সুন্দর, আন্তরিক, সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে। কোন অজুহাত যেন না থাকে আল্লাহকে ভালোবাসার, তাকে ভালোবাসার মানুষদেরকে ভালোবাসার। প্রতিটি মানুষের জন্য যেন আমরা একেকজন হয়ে যাই কল্যাণকর, আরেকজনের উপকারে যেন আসে আমাদের প্রতিটি প্রাণ, ক্ষতি যেন না করি কখনো…

হে আমাদের রব, আমাদের ক্ষমা করুন, দয়া করুন। আমরা আমাদেরকে আপনার তরে সোপর্দ করেছি — আমাদের জান-মাল সবকিছু কেবলই আপনার জন্য। আপনি আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমরা সবাই তো আপনার, আর আপনার কাছেই আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে। আপনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তবেই আপনার কাছে নিয়ে যাবেন আল্লাহ। নিঃসন্দেহে আপনিই আমাদের সমস্ত কিছুর মালিক, আপনার হাতেই সমস্ত ক্ষমতা, আপনি প্রেমময়, ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু…

নির্ঘন্ট

[১] আল কুরআনুল কারীম, সূরা আল বাকারাহ — আয়াতঃ ১৫৩।
[২] আল কুরআনুল কারীম, সূরা আল আ’লা — আয়াতঃ ১৬-১৭।


  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

আরও পড়ুন

সিসি ক্যামেরার আওতায় নগর ভবন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সার্বিক নিরাপত্তা...

বিনামূল্যে বই বিতরণ সরকারের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: নগরীর টিলাগড়স্থ...

নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠিত

         নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর ইংরেজি...